আনকন্ডিশনাল স্যারেন্ডার - নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ

১৯৪৫ সালের ১৪ অগস্ট। আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করল অক্ষশক্তির বড় শরিক জাপান। শেষ হল সর্বক্ষয়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধশেষের খবর ছড়িয়ে পড়তেই নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিল মানুষের ঢল। নার্স গ্রেটা ফ্রিডম্যান ম্যানহাটনে এক দাঁতের ডাক্তারের সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন সেই সময়ে। চ্যাম্বারে রোগীদের মধ্যেও উচ্ছ্বাস। অস্ট্রিয়ায় অভিবাসী গ্রেটা বুঝে পাচ্ছেন না, কী করবেন। নার্সের সাদা অ্যাপ্রন আর পায়ে জুতো ও লম্বা সাদা মোজা পরিহিত গ্রেটা একছুটে চলে যান টাইমস স্কোয়্যার। সেখানে তখন বিজয়োৎসব চলছে।

আনকন্ডিশনাল স্যারেন্ডার

গ্রেটা হঠাত করেই খেয়াল করলেন, মাথায় সাদা টুপি আর গায়ে কালো পোশাক পরা একটি লোক, যাকে দেখলেই বোঝা যায় যে সে একজন নাবিক, তার খুব কাছে চলে এসেছে। জয়ের আনন্দে ভাসা শহরে হঠাৎই কাছাকাছি এসে পড়া ২১ বছরের নাবিক জর্জ মেন্ডোসা তার সমবয়সী অপরিচিতা নার্স গ্রেটার কোমর জড়িয়ে গভীর আশ্লেষে চুম্বন এঁকে দিয়েছিলেন তাঁর ঠোঁটে।

গ্রেটা ও জর্জের এই চুম্বনরত ছবিটি ক্যামেরাবন্দি করেন চিত্রসাংবাদিক আলফ্রেড আইজেনস্টাট। পরে আমেরিকার একটি জনপ্রিয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ছবিটি। কিন্তু ছবিটির কথা তখনই জানতে পারেননি গ্রেটা। প্রায় ১৫ বছর পরে, ১৯৬০ সালে আলফ্রেডের ছবির একটি বইতে ছবিটি দেখেছিলেন তিনি। গ্রেটা ওই ছবিটি দেখেন তারও প্রায় ১৫ বছর পরে- ১৯৬০ সালে আলফ্রেডের তোলা ছবির একটি সংকলনে। পরে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সেদিন শুধুমাত্র আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ছিল অপরিকল্পিত ওই চুম্বন। জর্জও জানান, দাঁতের চিকিৎসকের সহকারী গ্রেটাকে সেদিন চুমু খেয়েছিলেন কিছু না জেনেশুনেই। রক্তক্ষয়ী বিশ্বযুদ্ধ শেষের আনন্দে কিছুটা মদ্যপানও করেছিলেন সেদিন। সব মিলিয়ে ঘটে যায় ঘটনাটা।

তবে মজার ব্যাপারটা হল, ওই সময়েই সেখানে উপস্থিত ছিলেন মেন্ডোসার প্রেমিকা রিটা পেট্রিও, পেশায় যিনিও একজন নার্স ছিলেন। পরে রিটার সঙ্গেই বিয়ে হয় জর্জের। ওই বিখ্যাত চুমু নিয়ে রীতিমতো মস্করা করতেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে রিটা জানিয়েছিলেন যে জর্জ কোনওদিনই রিটাকে ওই বিখ্যাত গ্রেটা-চুমুউপহার দেননি।

আরও জানা যায় যে, ছবির দুজনের পরিচয় ১৯৮০ সাল পর্যন্ত অজ্ঞাতই ছিল। ছবিটি বিখ্যাত হওয়ার পরে অন্তত ১১ জন দাবি করেছিলেন যে, তাঁরাই ওই ছবির নাবিক। আর ৩ জন মহিলা জানিয়েছিলেন, ছবির নার্স তাঁরাই। শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে লরেন্স ভেরিয়ার লেখা দ্য কিসিং সেলর: দ্য মিস্ট্রি বিহাইন্ড দ্য ফটো দ্যাট এন্ডেড ওয়ার্ল্ড ওয়ার টুবইয়ে পাওয়া যায় ওই দুজনের নাম ও বাকি তথ্য। প্রযুক্তির সাহায্যেই ওই দুজনের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিলেন তিনি।

২০১৬ সালে ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছিলেন সেই ছবির নায়িকা গ্রেটা ফ্রিডম্যান। ২০১৯-এর ১৭-ই ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হয়েছেন সেদিনের সেই নাবিক জর্জ মেন্ডোসা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫। তার দুদিন পরেই ছিল তাঁর জন্মদিন।

অবশেষে রইলেন না নায়ক নায়িকা কেউই। রয়ে গেল শুধু সেই টাইমস স্কোয়ারেই দাঁড়িয়ে থাকা ২৫ ফুট দীর্ঘ সেই মুহূর্তের ভাস্কর্য— 'আনকন্ডিশনাল স্যারেন্ডার'; যার অর্থ, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।

(সংকলন তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন