“সোনার পিঞ্জরে ধরে রেখো না আমায়,
আমারে উড়িতে
দাও দূর নীলিমায়।”
মুক্তির এমন
আকুতি একবিংশ শতকের বিশ্বায়নের কালে বসেও শিহরিত করে যে কোনো মানুষকেই, বিশেষ করে
তা যদি এক মহিলার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়। উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে বিশ শতকের তিনদশক
ছিল এই মানবের বিচরণ ক্ষেত্র; তিনি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন।
| বেগম রোকেয়া |
নারী
জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯-ই ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামের
এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বেগম রোকেয়ার পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ
আবু আলী হায়দার সাবের ছিলেন দিনাজপুর জেলার সবচাইতে প্রভাবশালী ব্যক্তি। আর তাঁর
মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। তাঁরা দুজনেই ছিলেন বেশ উচ্চবংশীয় এবং জমিদার
শ্রেণিভুক্ত।
রোকেয়ারা
ছিলেন তিন বোন ও তিন ভাই। বোনেদের মধ্যে রোকেয়া ছিলেন মেজো। তৎকালীন মুসলিম সমাজে
ছিল কঠোর পর্দা ব্যবস্থা। বাড়ির মেয়েরা পরপুরুষ তো দূরে থাক, অনাত্মীয় নারীদের সামনেও নিজেদের
চেহারা দেখাতে পারতো না। এমনকি তাদের কণ্ঠস্বর যাতে কেউ না শুনতে পায়, তাই তাদেরকে অন্দরমহলের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হতো। বেগম রোকেয়ার বাড়িতেও শুরু
থেকেই এই প্রথার চর্চা চলে আসায় রোকেয়া ও তাঁর বোনদের কখনোই বাড়ির বাইরে পড়াশুনা
করার জন্য পাঠানো হয়নি। বাড়ির ভেতরেই আবদ্ধ অবস্থায় চলতো আরবী ও উর্দু ভাষার পাঠ।
কারণ পবিত্র কুরআন ও হাদিস পাঠ এবং অন্যান্য ধর্মীয় আচার-আচরণ পালন করতে গেলে এই
দুই ভাষা জানাটা জরুরি।
কিন্তু বেগম
রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের ছিলেন আধুনিকমনা। তিনি চাননি তাঁর বোনেরা পিছিয়ে
থাকুক। তাই তিনি রোকেয়া ও করিমুন্নেসাকে ঘরেই গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখান। তিনি
সর্বদাই রোকেয়াকে ইংরেজি শেখার জন্য উৎসাহিত করতেন এবং বলতেন, “বোন, এই
ইংরেজি ভাষাটা যদি শিখে নিতে পারিস, তা হলে তোর সামনে এক
রত্নভাণ্ডারের দ্বার খুলে যাবে।”
১৮৯৮ সালে
মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ভাগলপুরের উর্দুভাষী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত
হোসেনের সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সাথে সাথেই বেগম রোকেয়া পেয়েছিলেন
স্বাধীনতার স্বাদ, নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করার অফুরন্ত সুযোগ। রোকেয়ার স্বামী ছিলেন
আধুনিকমনস্ক ও বিদ্যার জাহাজ, বেগম রোকেয়াকে তিনিই লেখালিখি
করতে উৎসাহিত করেন। বিয়ের পর রোকেয়ার আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ালেখা পুরোদমে শুরু
হয় এবং সাহিত্যচর্চার পথটাও তাঁর জন্য খুলে যায়।
১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ নামক
একটি গল্প লিখে বাংলা সাহিত্য জগতে বেগম রোকেয়া তাঁর পথচলা শুরু করেন। তাঁর সবচেয়ে
উল্লেখযোগ্য রচনা ‘Sultana’s Dream’, যার অনূদিত নাম ‘সুলতানার স্বপ্ন’। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলো:
পদ্মরাগ (১৯২৪), অবরোধবাসিনী (১৯৩১), মতিচুর
(১৯০৪)। প্রত্যেকটিতে রয়েছে নারীর অবরোধের কাহিনী। এছাড়াও লিখেছেন বহু ব্যঙ্গধর্মী
রচনা, ছোট গল্প, রস রচনা এবং কবিতা। তিনি
তাঁর প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য
দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন।
১৯০৯ সালে স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর ৫ মাস পর বেগম রোকেয়া ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ নামে একটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, আত্মপ্রকাশ করলেন এক নতুন বেগম রোকেয়া।
তখন যে মেয়েরা শিক্ষা লাভ
করবে, তাও আবার স্কুলে, এই কথাটা কেউই
বিশ্বাস করতে চাইতো না। এখন হয়তো এটা আষাঢ়ে গল্প মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই সত্যি।
তখন মেয়েদের
অবস্থা ছিল খুবই করুণ ও বেদনাদায়ক। কিন্তু কিছুদিন পর ১৯১০ সালে সম্পত্তি নিয়ে
ঝামেলা হওয়ায় স্কুল বন্ধ করে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। সেখানে এসে ১৯১১ সালের ১৫ই
মার্চ কলকাতার ১৩ নম্বর ওয়ালীউল্লাহ্ লেনের একটি বাড়িতে তিনি আবারো দ্বিগুণ উদ্যমে
‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল
গার্লস স্কুল’ চালু করেন। প্রাথমিক অবস্থায় এখানে ছাত্রী ছিল
৮ জন। চার বছরের মধ্যেই ছাত্রীসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪-তে। ১৯৩০ সালে তাঁর হাড়ভাঙ্গা
পরিশ্রমে সেটি একটি উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। নারীশিক্ষার
প্রসারে বেগম রোকেয়া আমৃত্যু কাজ করে গিয়েছেন। নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা,
নারীর ক্ষমতায়ন, ভোটাধিকারের জন্য লড়াইটা শুরু
করেছিলেন বেগম রোকেয়া।
তিনি সবসময়
সাম্যের ডাক দিয়ে গেছেন। তিনি পুরুষতান্ত্রিক কিংবা নারীতান্ত্রিক সমাজ গড়তে
চাননি। তিনি চেয়েছিলেন সমাজে নারী ও পুরুষ যাতে একসাথে সমান মর্যাদা এবং অধিকার
নিয়ে বাঁচে। তিনি কখনোই পুরুষকে ছোট করে দেখেননি। তাই তো তিনি লিখেছিলেন, “আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কীরূপ? কোনো ব্যক্তি
এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের
স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা
আমাদের লক্ষ্য তাহাই।”
তিনি আরো বলেন, “দেহের দু’টি
চক্ষুস্বরূপ, মানুষের সবরকমের কাজকর্মের প্রয়োজনে দু’টি চক্ষুর গুরুত্ব সমান।” তিনি নারী ও পুরুষকে একটি
গাড়ির দু’টি চাকার সাথে তুলনা করেছেন। কেননা একটি চাকা ছাড়া
পুরো গাড়িটাই অচল। তাই নারী ও পুরুষ যদি মিলেমিশে কাজ করে, তাহলে
সমাজে পরিবর্তন আসবেই। সমাজের অর্ধেক অংশকে বাদ দিলে কখনোই রাষ্ট্রের উন্নতি হবে
না। তাই তো তিনি ছিলেন সমতায় বিশ্বাসী।
আর
নারীসমাজের কল্যাণ সাধিকা রোকেয়ার কলম ঝলসে ওঠে “যদি এখন স্বাধীন ভাবে জীবিকা
অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয় তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডী কেরাণী হইতে
আরম্ভ করিয়া লেডী ম্যাজিস্ট্রেট, লেডী ব্যারিস্টার, লেডী জর্জ — সবই হইব! পঞ্চাশ বৎসর পরে লেডী Viceroy হইয়া এদেশের সমস্ত নারীকে রাণী করিয়া ফেলিব! উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা ‘স্বামী’র গৃহকার্য্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন
ব্যবসা করিতে পারিব না? আমরা যদি রাজকীয় কার্য্যক্ষেত্রে
প্রবেশ করতে না পারি, তবে কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করিব” – এমন জোরালো ও আত্মবিশ্বাসী লেখনীতে। তিনি বিশ্বস করতেন নারীদের আপন মনে
জাগিয়ে তুলতে হবে আত্মবিশ্বাস। আত্মবিশ্বাস থেকেই আসবে আত্মজাগরণ। যা নারী মনের
দাসত্ব মোচনের সহায়ক হবে। আর এইজন্য আবশ্যক নারী শিক্ষা। এইজন্য তাঁর জোরালো ঘোষণা
“কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্য্যক্ষেত্রে
ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্নবস্ত্র উপার্জ্জন করুক।”
তাঁর
সমাজসেবা শুধু বিদ্যালয় তৈরি করা পর্যন্ত থেমে থাকেনি। ১৯১৬ সালে তিনি বাঙালি
মুসলিম নারীদের সংগঠন ‘আঞ্জুমান খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে
বিধবা নারীদের কর্মসংস্থান, দরিদ্র অসহায় বালিকাদের শিক্ষা,
বিয়ের ব্যবস্থা, দুঃস্থ মহিলাদের কুটির
শিল্পের প্রশিক্ষণ, নিরক্ষরদের অক্ষর জ্ঞান দান, বস্তিবাসী মহিলাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
করেন।
যথষ্ট স্বছল
পরিবারের একজন হয়েও কিন্তু তিনি নিজে কখনো বিলাসী জীবনযাপন করেননি। তিনি সর্বদাই
অসহায় নারীদের জন্য কাজ করে গিয়েছেন। তিনি নিজস্ব জমিদারী থেকে প্রাপ্ত আয়ের
বহুলাংশ তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যয় করেন৷ স্কুলের সুপারিনটেডেন্ট ও প্রধান
শিক্ষিকা হিসেবেও কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না। একদম সাধারণ ও স্বচ্ছ ছিল তাঁর
জীবনদর্শন।
মাত্র ৫৩
বছর বয়সে ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর মারা গেলেন মহীয়সী এই নারী। যে রাতে মারা গেলেন, ওই রাতেও লেখালেখি করেছেন। মৃত্যুর
পর তাঁর টেবিলে পেপারওয়েটের নিচে ‘নারীর অধিকার’ শীর্ষক একটি অর্ধসমাপ্ত লেখা পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর নিশ্বাস, বিশ্বাস, কর্ম ও ধ্যানে শেষ পর্যন্ত তিনি সেই একই
চিন্তাধারাকে লালন করে গেছেন— ‘মেয়েমানুষ
নয়, মানুষ হয়ে বাঁচতে হবে, তবেই
সার্থক মানব জনমের।’
এহেন একজন
মানুষের কথা, তাঁর জিবনদর্শনের কথা যত বেশ বেশি করে আলোচত হবে, ততই এগোবে সমাজ
প্রগতির পথে।
(তারিণী
খুড়ো)