বিক্রম সারাভাই – ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার প্রাণপুরুষ

আমেরিকার নাসা-সহ বিশ্বের বাকি উন্নত দেশগুলির মহাকাশ গবেষণা সংস্থাকে আজ সমানে টেক্কা দিচ্ছে ইসরো। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার এই স্বর্ণাভ বর্তমানের নেপথ্যে জড়িয়ে আছে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের নাম, যার মৃত্যুর রহস্যময়তার উপর থেকে যবনিকা আজও সরল না। তিনি বিক্রম অম্বালাল সারাভাই। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ ও প্রাণপুরুষ এই বিজ্ঞানীর জাতীয় স্তরে বিভিন্ন গঠনমূলক ক্ষেত্রে অবদান অনস্বীকার্য।

বিক্রম সারাভাই

১৯১৯ সালের ১২ অগস্ট তাঁর জন্ম গুজরাটের আহমেদাবাদে বিখ‌্যাত সারাভাই পরিবারে। পিতা আম্বালাল সারাভাই এবং মাতা সরলাদেবী সারাভাই। তাঁদের ছিল পারিবারিক কাপড়ের ব্যবসা। স্বাধীনতা আন্দোলনে এই সারাভাই পরিবার প্রচুর অর্থ সাহায্য করেছে বিভিন্ন সময়ে। ভারতের বিখ্যাত মানুষেরা, যেমন, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গান্ধীজী, নেহেরু, মৌলানা আজাদ, এন্ড্রুজ এরা প্রত্যেকেই আহমেদাবাদে সারাভাইদের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। যদিও বিক্রমের আকর্ষণ ছিল বহুমুখী। বিজ্ঞান থেকে ক্রীড়া হয়ে সংখ্যাতত্ত্ব। তবে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনীর আকর্ষণের ভরকেন্দ্র ছিল অবশ্যই বিজ্ঞান। 


মন্টেসরি লাইনে তার বাবা-মা দ্বারা পরিচালিত একটি বেসরকারী স্কুল 'রিট্রিট'-এ তার প্রাথমিক শিক্ষা হয়। গুজরাটে স্কুল এবং কলেজের পর, তিনি ইংল্যান্ডে যান ১৯৩৯ সালে, এবং সেখানকার ‘সেন্ট জনস কলেজ’ থেকে ট্রিপস অর্জন করেন। এরপরে কিছু সময়ের জন্য বিক্রম সারাভাই ভারতে ফিরে আসেন এবং ব্যাঙ্গালোরের ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স-এ স্যার সি ভি রামনের সাথে মহাজাগতিক রশ্মির ক্ষেত্রে কাজ করেন। এরপরে আবার তিনি ইংল্যান্ড ফিরে যান এবং কসমিক রশ্মির ওপর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। 


বিদেশে লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ১৯৪৭ সালে ভারতে ফিরে আসেন। দেশে ফিরেই উদ্যোগী হন গবেষণা কেন্দ্র তৈরির কাজে। ঐ বছরই শুরু করেন PHYSICAL RESEARCH LABORATORY (PRL) প্রতিষ্ঠার কাজ। ১৯৫৪ তে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আহমেদাবাদে PRL ভবনের উদ্বোধন করেন। ডঃ সারাভাইয়ের PRL এর গবেষণা সারা পৃথিবীতে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছিল। ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানের আঁতুড়ঘর বলে বিবেচিত হয় এই ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি 


রাশিয়ার স্পুটনিক মহাকাশ প্রকল্পের উদাহরণকে সঙ্গী করে দেশকেও সেই উচ্চতায় পৌঁছতে চেয়েছিলেন বিক্রম সারাভাই। তাঁর গোটা জীবন সেই কাজেই নিয়োজিত ছিল। তৎকালীন কেন্দ্র সরকারকে তিনি বুঝিয়ে ছিলেন মহাকাশ যাত্রার গুরুত্ব। ১৯৬২ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কমিটি ফর স্পেস রিসার্চ তৈরি করতে সম্মত হয় ভারত সরকার। সেই প্রতিষ্ঠানের জনক ছিলেন বিক্রম। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কমিটি ফর স্পেস রিসার্চই পরবর্তী কালে নতুন করে তৈরি হয়, নাম দেওয়া হয় ইসরো বা ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন। ১৯৬৯ সালে ইসরো তৈরি হয়। যার প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন বিক্রম সারাভাই। 


পাশাপাশি আরও বহু সংস্থার জন্মলগ্ন থেকে জড়িয়ে আছে বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাইয়ের নাম। নেহরু ফাউন্ডেশন ফর ডেভলপমেন্ট, আইআইএম (আমদাবাদ), ভ্যারিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রোন প্রজেক্ট, ইলেকট্রনিক কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড-সহ আরও বহু সংস্থার প্রাণপুরুষ ছিলেন সারাভাই। 


১৯৭৫ সালে রুশ কসমোড্রোম থেকে সফল উৎক্ষেপণ হয় ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ আর্যভট্ট’-র, যা ছিলো বিক্রমের স্বপ্ন। এই সাফল্যে যাঁর অবদান অগ্রগণ্য, সেই বিক্রম সারাভাই কিন্তু এই সুদিন দেখে যেতে পারেননি। ১৯৭১ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে মৃত্যু হয় এই বিজ্ঞানসাধকের। বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেরই অভিমত, তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। 


১৯৭১-এর ডিসেম্বের কেরলের কোভালামে গিয়েছিলেন বিক্রম সারাভাই। সেখানে একটি রুশ রকেটের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণ করেন। একই সাথে থুম্বা রেলস্টেশনের উদ্বোধনও হয়েছিল তাঁর হাতে। কোনও সময়েই তাঁর মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি। কোভালমে প্রায়ই যেতেন তিনি। থাকতেন নিজের পছন্দের সরকারি অতিথিশালায়। সেই অতিথিশালার একটি ঘরে ৩১-শে ডিসেম্বর সকালে পাওয়া গিয়েছিল বিক্রম সারাভাইয়ের নিথর দেহ। 


তাঁর দেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তবে মৃত্যুর কারণ কী? জানার জন্য হয়নি ময়না তদন্ত বা অটোপ্সি। রহস্য উদঘাটনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়নি কোনও তদন্তেরও। অথচ তিনি এতই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে বিমানে তাঁর পাশের আসন ফাঁকা রাখা হত। ট্রেন সফর করলে বুক করা হত গোটা একটা কুপ। কিন্তু তাঁর মৃত্যু ঘিরে আছে শীতল উদাসীনতার রহস্য। 


তাঁর পরিবারের তরফেও কোনও তদন্ত দাবি করা হয়নি। বিক্রম ও মৃণালিণী সারাভাইয়ের দুই সন্তান, কন্যা মল্লিকা ও পুত্র কার্তিকেয়। পরবর্তীকালে কার্তিকেয় জানিয়েছিলেন, তাঁদের ঠাকুমা সরলাদেবীই চাননি ছেলের মৃতদেহ কাঁটাছেড়া করা হোক। 


বিক্রমপুত্র কার্তিকেয় নিজে কেম্ব্রিজে বসে বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েছিলেন। শুটিং উপলক্ষ্যে মল্লিকা ছিলেন তৎকালীন বম্বেতে। বিশ্বের দুপ্রান্তে বসে তাঁরা শুনেছিলেন বিজ্ঞানতপস্বী বাবার হঠাৎ চলে যাওয়া। অথচ তাঁরা জানতেন নিউ ইয়ার্স ইভ পালন করতে বাবা ফিরে আসবেন আমদাবাদ। 


অমৃতা শাহ-এর লেখা বিক্রমের জীবনী বিক্রম সারাভাইএ লাইফ’-এ কিন্তু বিজ্ঞানীর মৃত্যুতে ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত আছে। আইআইএম আমদাবাদ সূত্রে বিক্রম-ঘনিষ্ঠ কমলা চৌধুরী সেখানে বলেছেন, বিক্রম তাঁকে বলতেন রাশিয়া ও আমেরিকা, দুটি দেশই তাঁর উপর নজর রাখছে। 


সারাভাইয়ের আগে আরও এক যশস্বী ভারতীয় বিজ্ঞানীর রহস্যমৃত্যু আলোড়ন ফেলেছিল। ভারতের পারমাণবিক গবেষণার জনক ডক্টর হোমি জাহাঙ্গির ভাবার মৃত্যু হয়েছিল বিমান দুর্ঘটনায়। ১৯৬৬ সালের ২৪-শে জানুয়ারি আল্পসের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মঁ ব্লাঁ-র কাছে আছড়ে পড়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ১০১। প্রাণ হারান ডক্টর ভাবা। তাঁর সঙ্গেই চিরকালের জন্য হারিয়ে যায় পারমাণবিক গবেষণার বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি। একে অন্তর্ঘাতবলেছে অনেক মহলই। 


হোমি ভাবার মৃত্যুর তেরো দিন আগে তাসখন্দে প্রয়াত হয়েছিলেন ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী। তিনি গিয়েছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল আয়ুব খানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করতে। খাতায় কলমে বলা হয়েছে মৃত্যু হয়েছিল হৃদরোগে। কিন্তু সে তথ্য বিশ্বাসই করতে চাননি তাঁর স্ত্রী। বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছিল ময়নাতদন্তের দাবি। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। রহস্যের পর্দা উন্মোচিত হয়নি। 


ভারতের অন্তরীক্ষ গবেষণার জনক, ইসরো প্রতিষ্ঠাতা, তিরুঅনন্তপুরমে ভারতের প্রথম রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের রূপকার বিক্রম সারাভাইয়ের সম্মানে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন তার নামে চাঁদের একটি গর্তের নামকরণ করে ১৯৭৩ সালে। পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ, শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পদকজয়ী বিক্রম সারাভাইয়ের মৃত্যু ঘিরে থাকা রহস্য, মহাকাশের অনন্ত রহস্যকেও হার মানায়। শাসকের এহেন অসহ্য উদাসীনতার বিরুদ্ধে আপামর বিজ্ঞানপ্রেমী মানুষদের সোচ্চার হওয়া উচিৎ নয় কি? 


(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন