গত কয়েক দশকে সার্ন-এ পদার্থের মূল কণার অস্তিত্ব সন্ধানে বৈজ্ঞানিক তৎপরতার কারণে বারে বারে বিভিন্ন মাধ্যমে উচ্চারিত হয়েছে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামাঙ্কিত ‘বোসন’ কণার কথা। গত বছর ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে পদার্থের পঞ্চম দশা তৈরির চেষ্টার ঘটনায় ফের খবরের শিরোনামে বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট। তিনি বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, যাকে আমরা সত্যেন বসু নামেও চিনি।
| সত্যেন্দ্রনাথ বোস |
বিশ্ববিজ্ঞানের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্মতারিখ ১-লা জানুয়ারি ১৮৯৪। তাঁর বাবা সুরেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন ‘ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি’ এর একজন হিসাবরক্ষক। সত্যেন্দ্রনাথের মা-এর নাম আমোদিনী দেবী।
সত্যেন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের আদি ভিটে ছিল, নদিয়া জেলার বড় জাগুলিয়া গ্রামে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে নদিয়া ছিল প্রাচ্যবিদ্যার অন্যতম অধ্যয়ন কেন্দ্র। তারই ফলশ্রুতিতে ইংরেজি শিক্ষায় মন দেয় বসু পরিবার। ফল মেলে হাতেনাতে। অম্বিকাচরণ চাকরি পান ইংরেজ সরকারি দফতরে। বদলির চাকরি ছিল তাঁর। দেশের নানা জায়গায় বদলি হতে হত। মেরঠ শহরে অ্যাকাউন্ট্যান্ট পদে চাকরিকালীন জীবনাবসান। অম্বিকাচরণ মারা যাওয়ার পরে বসু পরিবার বড় জাগুলিয়া ছেড়ে কলকাতায় আসে। কলকাতাই যে আগামীদিনে পরিবারের গন্তব্য হবে, তা বুঝেছিলেন অম্বিকাচরণের বাবা। বাড়িও একটা কিনে রেখেছিলেন হেদুয়ার কাছে ঈশ্বর মিল লেনে। কিন্তু সে বাড়ির ভাড়াটেরা অন্যত্র চলে যেতে না চাওয়ায় প্রথমে বসু পরিবারকে উঠতে হয়েছিল জোড়াবাগানে ভাড়াবাড়িতে।
অম্বিকাচরণের মতো সুরেন্দ্রনাথও ইংরেজি শিখে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের অ্যাকাউন্ট্যান্ট। অগাধ পড়াশোনা তাঁর। এক দিকে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য দর্শন, অন্য দিকে তেমনই মার্কস-এঙ্গেলসের রচনা। সে মানুষটাই আবার ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়র্কস-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের হাতে গড়া বেঙ্গল কেমিক্যালের সমসাময়িক এ কোম্পানি। সুরেন্দ্রনাথের বিয়ে হয় ডাকসাইটে উকিল মতিলাল রায়চৌধুরীর মেয়ে আমোদিনীর সঙ্গে। তাঁদের সাত সন্তান। ছ’টি মেয়ে, এক ছেলে। ছেলে সত্যেন্দ্রনাথ সকলের বড়।
বাবা সুরেন্দ্রনাথ টের পেয়েছিলেন, তাঁর প্রথম সন্তান বিশেষ মেধাবী। সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল তো বটেই, গণিতেও। বালকের মধ্যে ওই বিষয়ে ব্যুৎপত্তি দেখে সুরেন্দ্রনাথ তা আরও বাড়াতে প্রয়াসী হলেন। অফিসে বেরোনোর আগে তিনি কঠিন কঠিন অঙ্ক দিয়ে যেতেন সত্যেন্দ্রনাথকে। হোম টাস্ক। বালকের কাজ ছিল দুপুরবেলায় সিমেন্টের মেঝেতে চক দিয়ে সে-সব অঙ্কের সমাধান বার করা। বালকের কাছে খেলা।
পাঁচ বছর বয়স হলে সত্যেন্দ্রনাথকে ভর্তি করে দিলেন নর্মাল স্কুলে। এ সেই শিক্ষায়তন, যেখানে কিছু দিন পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সুরেন্দ্রনাথ বাসস্থান বদলালে সেখান থেকে সত্যেন্দ্রনাথ ভর্তি হন নিউ ইন্ডিয়ান স্কুলে। সুরেন্দ্রনাথের মন ভরল না। ছেলে প্রচণ্ড মেধাবী, তার জন্য আরও ভাল স্কুল চাই। অবশেষে হিন্দু স্কুল। ছোটবেলা থেকেই দৃষ্টিশক্তির সমস্যা। সত্যেন্দ্রনাথ তাতে দমে যাওয়ার ছাত্র নয়। পাঠ্য বইয়ের বাইরেও পড়ার বিরাম নেই।
সত্যেন্দ্রনাথ যখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তখন পাঠ্যপুস্তক ছিঁড়ে ফেলার এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা দিয়েছিল তার মধ্যে। মা বকুনি দিতে সত্যেন্দ্রনাথ বলতেন, “গোটা বইটাই তো আমি মুখস্থ করে ফেলেছি, ও বইয়ের আর বোনেরা দরকার নেই”। পরীক্ষা করার জন্য পাশের বাড়ির একটি ছেলের কাছ থেকে মা পাঠ্যপুস্তক চেয়ে নিয়ে এলেন। প্রথম থেকে শেষ অব্দি গরগর করে মুখস্ত বলেছিলে সেদিনের বালক সত্যেন্দ্রনাথ। মা অবাক হয়ে গালে হাত দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় কোন পাতায় কোন প্রশ্নের কী উত্তর লেখা আছে তাও সত্যেন্দ্রনাথ মনে রেখেছিলেন। এমনই অবিশ্বাস্য ছিল তার স্মরণশক্তি। আমৃত্যু তিনি এই অসাধারণ মেধা ও স্মৃতিশক্তি নিয়ে কাজ করেছেন।
মেধাবী ছাত্র সত্যেন ছিলেন সব মাস্টারমশাইয়ের প্রিয়। ওঁকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন অঙ্কের স্যর উপেন্দ্রনাথ বক্সী। একবার তো অঙ্কের পরীক্ষায় তিনি ওঁকে ১০০ নম্বরের মধ্যে ১১০ দিয়ে বসলেন। ব্যাপার কী? হেডমাস্টার রসময় মিত্রের প্রশ্নের উত্তরে উপেন্দ্রনাথ জানালেন, ছাত্রটি ১০০ নম্বরের সব প্রশ্নের সমাধান তো করেছেই, উপরন্তু বিকল্প সব প্রশ্নেরও উত্তর বার করেছে। প্রিয় ছাত্র সম্পর্কে শিক্ষকের ভবিষ্যদ্বাণী, ও একদিন ফরাসি পিয়ের সিমো লাপ্লা কিংবা অগাস্টিন লুই কাউচির মতো প্রাতঃস্মরণীয় গণিতজ্ঞ হবে!
১৯০৮। সত্যেন্দ্রনাথের এন্ট্রান্স অর্থাৎ স্কুলের শেষ পরীক্ষা। পরীক্ষা শুরুর ঠিক দু’দিন আগে বিপত্তি। সত্যেন্দ্রনাথের বসন্ত রোগ। পরীক্ষায় বসা হল না। বসলেন পরের বছর। হলেন পঞ্চম। বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সহপাঠী হিসেবে পেলেন, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, নিখিলরঞ্জন সেন, পুলিনবিহারী সরকার, মানিকলাল দে, শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ, অমরেশ চক্রবর্তী-র মত একঝাঁক মেধাবী ছাত্র, যাঁরা প্রত্যেকেই পরবর্তীকালে গবেষণায় উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। দু’বছর পরে যোগ দেন আর এক রত্ন, মেঘনাদ সাহা। আর অধ্যাপক হিসেবে পেলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়-এর মত এক একনিষ্ঠ বিজ্ঞান সাধক-কে।
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা ঘিরে কলকাতা শহর তখন উত্তাল। চার দিকে স্বদেশী হাওয়া। ছাত্ররা যুবকরা আন্দোলনে দলে দলে যোগ দিচ্ছে। কেউ কেউ পড়াশোনা ছেড়ে। এ দিকে বাবার কড়া নির্দেশ, আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়ে ব্রিলিয়ান্ট কেরিয়ার মাটি করা চলবে না। সত্যেন্দ্রনাথ আন্দোলনে মদত জোগালেন পরোক্ষে। কখনও বিপ্লবীদের গোপন চিঠির কুরিয়ারের কাজ করে, কখনও বা পুলিশ যাঁদের খুঁজছে, তাঁদের লুকিয়ে রেখে। পাশাপাশি চলতে লাগল গরিব সন্তানদের নাইট স্কুলে পড়ানো। কারণ, মনে আছে এক প্রত্যয়। দেশের প্রকৃত নাগরিক তৈরি করতে প্রয়োজন শিক্ষা। ১৯১৩-য় বিএসসি, ১৯১৫-য় এমএসসি। দু’টি পরীক্ষাতেই সত্যেন্দ্রনাথ ফার্স্ট, মেঘনাদ সেকেন্ড। এমএসসি পরীক্ষায় ৮০০ নম্বরের মধ্যে ৭৩৬ নম্বর পেয়ে এমন একটি রেকর্ড করলেন, যা আজও কারোর পক্ষে ভাঙ্গা সম্ভব হয়নি।
তার পর? বেকার। ও দিকে, মায়ের কথায় এমএসসি-র ছাত্রাবস্থায় কুড়ি বছর বয়সে ঊষাবতী ঘোষকে বিয়ে। তিনি নামী ডাক্তার যোগীন্দ্রনাথ ঘোষের একমাত্র মেয়ে। যোগীন্দ্রনাথ জামাই বাবাজিকে সাহায্য করতে চান। সত্যেন্দ্রনাথ অরাজি। তাঁর সে সবে রুচি নেই। তিনি পিএইচডি করবেন। কার অধীনে? গণেশ প্রসাদ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে এনেছেন বারাণসী থেকে। এমএসসি-র পেপার সেটার। কঠিন কঠিন প্রশ্ন করতে পছন্দ করেন। ছাত্ররা উত্তর দিতে না পারলে যা-তা বলে দেন। ছাত্রদের মাস্টারমশাইদেরও নিন্দে করেন। সত্যেন্দ্রনাথ গণেশ প্রসাদের সঙ্গে দেখা করলে, তিনি এই ছাত্রের মাস্টারমশাইদেরও নিন্দে করলেন। সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে বচসা হল। পিএইচডি করা হল না।
সত্যেন্দ্রনাথ আর মেঘনাদ গিয়ে দেখা করলেন স্যর আশুতোষের সঙ্গে। এমএসসি ক্লাসে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান— যা পাশ্চাত্য মাতাচ্ছে— তার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে না ছাত্ররা। সে সব পড়ানোর শিক্ষক নেই। সদ্য পাশ করা এমএসসি যুবকরা আধুনিক পদার্থবিদ্যা পড়াতে চান। স্যর আশুতোষ রাজি। মাইনে মাসে ১২৫ টাকা। মেঘনাদ পড়াবেন কোয়ান্টাম থিয়োরি। আর সত্যেন্দ্রনাথ রিলেটিভিটি। টেক্সট বই কোথায়? কোথায় রিসার্চ জার্নাল? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বাজারে ভারতে দুটিই অমিল। কিছুটা হলেও তা পাওয়া গেল শিবপুরে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রফেসর পি জে ব্রুলের কাছে। ওঁর কাছে ছিল ম্যাক্স প্লাংক, লুডভিগ বোল্টজমান, উইলহেলম ভিয়েনের লেখা বই। সে সব পড়ে বোঝার জন্য মেঘনাদ এবং সত্যেন্দ্রনাথ শিখলেন জার্মান। ১৯১৯। জেনারেল রিলেটিভিটি নিয়ে সারা পৃথিবীতে হইচই। অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকে ধন্যি ধন্যি। সত্যেন্দ্রনাথ আর মেঘনাদ মিলে স্পেশাল এবং জেনারেল রিলেটিভিটির মূল পেপারগুলির একত্রিত অনুবাদ প্রকাশ করলেন ইংরেজি ভাষায়। বিশ্বে প্রথম।
১৯২১। গড়া হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ফিজ়িক্সে রিডার পদে চাকরি পেলেন সত্যেন্দ্রনাথ। চাকরি পেয়েই সপরিবারে ঢাকায় চলে গেলেন সত্যেন্দ্রনাথ। এর কিছুদিন পর উপাচার্যের কাছে সত্যেন্দ্রনাথ আবেদন করেন ইউরোপের বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের সাথে কাজ করার জন্য ১২ হাজার ৫০০ টাকার অনুদানের জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার পি জে হার্টজ তাকে ১৩,৮০০ টাকা অনুদান দেন এবং সাথে বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডের সাথে কাজ করার সুপারিশ করেন। রাদারফোর্ড তখন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানচেস্টারে তাঁর ছাত্রদের নিয়ে গবেষণা করছেন। তার ল্যাবরেটরিতে তখন আর জায়গা ছিল না। সত্যেন্দ্রনাথ তাই জার্মানি আর ফ্রান্সে কাটিয়ে দিলেন দুই বছর। এর মধ্যে তিনি হাইজেনবার্গের সান্নিধ্য পেয়েছেন। কাজ করেছেন দ্য ব্রগলির রঞ্জন রশ্মি গবেষণা কেন্দ্রে। মাদাম কুরির রেডিয়াম ইনস্টিটিউটেও কাজ করেন এই বিজ্ঞানী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র পড়াতে পড়াতেই ১৯২৪ সালে তাঁর সেই জগদ্বিখ্যাত পেপার। ‘প্লাংক’স ল অ্যান্ড লাইট কোয়ান্টাম হাইপোথিসিস’। প্রবন্ধটির ইতিহাস বড় বিচিত্র। বিশেষ ধরনের বস্তু থেকে তাপ বা এনার্জি বিকিরণের এক ফর্মুলা আবিষ্কার করেন ম্যাক্স প্লাংক। ফর্মুলাটি অনেকের মনঃপূত হয়নি। অনেকে ওটি শোধরানোর চেষ্টা করেন। সত্যেন্দ্রনাথ প্লাংকের মতো সাবেক ধারণার সাহায্য না নিয়ে, নতুন পন্থায় এনার্জি বিকিরণের ফর্মুলা উদ্ভাবন করেন। পেপারটি সত্যেন্দ্রনাথ প্রথমে পাঠালেন ব্রিটিশ জার্নাল ফিলজফিক্যাল ম্যাগাজিন-এ। পাঠিয়ে ছাপার জন্য অপেক্ষা করলেন ছ’মাস। ছ’মাস পরে চিঠি এল জার্নাল থেকে। বিশেষজ্ঞরা বাতিল করেছেন পেপার। এর পর মরিয়া হয়ে যে কাজটি করলেন সত্যেন্দ্রনাথ, তা অভিনব। ১৯২৪ সালের ৪ জুন বাতিল পেপারটি সরাসরি পাঠালেন স্বয়ং আইনস্টাইনের বার্লিনের ঠিকানায়। সঙ্গে এই চিঠি— ‘আপনার পড়ে দেখার ও মতামত জানার প্রত্যাশায় সঙ্গের নিবন্ধটি পাঠাতে প্রয়াসী হলাম।... আমি যথেষ্ট জার্মান জানি না বলে পেপারটি জার্মানে অনুবাদ করতে পারলাম না। আপনি যদি এটা ছাপার যোগ্য বিবেচনা করেন, তবে ‘শাইটসিফ্রট ফ্যুর ফিজিকে’-এ ছাপার ব্যবস্থা করে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব।... যদিও আপনার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত, তবু আপনাকে এ অনুরোধ করতে আমি দ্বিধা বোধ করছি না। কারণ আমরা সকলে আপনার ছাত্র। আপনার লেখাপত্র পড়েই আমরা উপকৃত হয়েছি। জানি না, এখনও আপনার মনে আছে কি না যে, কলকাতা থেকে একজন আপনার অনুমতি চেয়েছিল রিলেটিভিটি বিষয়ে আপনার লেখা পেপারগুলি ইংরেজিতে অনুবাদ করার। আপনি অনুরোধে রাজি হয়েছিলেন। বইটি প্রকাশিত হয়েছে। আমিই জেনারেল রিলেটিভিটি বিষয়ে লেখা আপনার পেপারটি অনুবাদ করেছিলাম।’
জহুরি জহর চেনে। তড়িঘড়ি চিঠির উত্তর দিলেন আইনস্টাইন। লিখলেন, আমি আপনার পেপারটি অনুবাদ করে ‘শাইটসিফ্রট ফ্যুর ফিজিকে’-এ ছাপতে পাঠিয়েছি। ওটা এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, আমি দারুণ খুশি। আর ‘শাইটসিফ্রট ফ্যুর ফিজিকে’-এ ছাপা পেপারের সঙ্গে আইনস্টাইন নিজের যে মন্তব্য জুড়ে দেন, তা এ রকম— ‘বসুর উদ্ভাবন আমার মতে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এখানে যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে, তা দিয়ে আদর্শ গ্যাসের কোয়ান্টাম থিওরিতে পৌঁছনো যায়। আমি তা অন্যত্র দেখাব।’ সত্যিই সত্যেন্দ্রনাথের পেপার পাওয়ার হপ্তাখানেকের মধ্যে আইনস্টাইন এক পেপার পেশ করলেন প্রুশিয়ান আকাদেমি অব সায়েন্সেস-এ, যা সত্যেন্দ্রনাথের ওই বিখ্যাত প্রবন্ধের পরবর্তী ধাপ। ওই পেপারের সূত্রে পরের বছর ১৯২৫ সালে আরও দু’-দুটি পেপার লিখলেন আইনস্টাইন। যার মধ্যে দ্বিতীয়টিতে ওই বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট-এর ধারণা এসে গেল।
সত্যেন্দ্রনাথ প্লাংকের সূত্র উদ্ভাবন করতে গিয়ে নতুন সংখ্যায়ন প্রয়োগ করেছিলেন। এই নতুন সংখ্যায়ন আইনস্টাইন প্রয়োগ করলেন বস্তুকণার ক্ষেত্রে। যা বেরিয়ে এল, তা বসু-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন। বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিস্টিকস। অন্য এক রকম স্ট্যাটিস্টিকসের প্রবর্তন করেছিলেন এনরিকো ফের্মি এবং পল অ্যাড্রিয়েন মরিস ডিরাক। তার নাম ফের্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিকস। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যত কণা আছে, তার সবই ওই দুই সংখ্যায়নের কোনও একটাকে মানতে বাধ্য। দুই সংখ্যায়নের বাইরে কোনও কণা থাকতে পারে না। যে সব কণা বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিস্টিকস মানে, তারা হল বোসন। অন্য সব কণা যারা ফের্মি-ডিরাক স্ট্যাটিসটিকস মেনে চলে, তাদের বলে ফের্মিয়ন। বোসন কণারা এক জায়গায় ঠাসাঠাসি করে থাকতে পারে। ফের্মিয়নরা তা পারে না। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সস্ত্রীক ডিরাক এসেছিলেন কলকাতায়। এক বক্তৃতার পরে ফিরছিলেন হোটেলে। গাড়িতে পিছনের সিটে ডিরাক এবং তার স্ত্রী। সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে সত্যেন্দ্রনাথ। তিনি এক ছাত্রকে ডাকলেন তাঁর পাশে বসতে। ডিরাক শশব্যস্ত। সামনের সিটে চাপাচাপি হবে দেখে। তা দেখে সত্যেন্দ্রনাথ হেসে বললেন, ‘উই বিলিভ ইন বোস স্ট্যাটিস্টিকস!’
নাহ, নোবেল প্রাইজ় জোটেনি তাঁর। দুই স্ট্যাটিস্টিকসে মোট চার জন। বাকি তিন জন—আইনস্টাইন, ফের্মি এবং ডিরাক ওই পুরস্কার পেলেও, তিনি ওই পুরস্কার থেকে বাদ! যেমন জোটেনি সত্যেন্দ্রনাথের বন্ধু মেঘনাদের। এ ব্যাপারে ওঁরা দু’জন আর এক সমসাময়িক চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামনের চেয়ে একেবারে আলাদা। রামন জানতেন, বড় আবিষ্কার শুধু করলেই হয় না, কী ভাবে তার স্বীকৃতিও আদায় করে নিতে হয়। শিল্পপতি ঘনশ্যাম দাস বিড়লার কাছে স্পেক্টোগ্রাফ যন্ত্র কেনার টাকা চেয়েছিলেন এই যুক্তিতে যে, তা হলে তিনি ভারতকে নোবেল প্রাইজ় এনে দেবেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁর আবিষ্কারের পেপার তিনি ‘নেচার’ জার্নালে ছাপাতে পাঠিয়েছিলেন টেলিগ্রাম করে। পাছে তাঁর পেপার ছাপার আগে অন্যদের পেপার না ছাপা হয়ে যায়! ইংরেজিতে যাকে বলে অ্যাগ্রেসিভনেস, তা সত্যেন্দ্রনাথের চরিত্রে ছিল না।
১৯২৪ সালের অক্টোবরে দু’বছরের স্টাডি লিভ-এ বিদেশ যাওয়ার কথা আগেই লিখেছি। সাধ ছিল আইনস্টাইনের অধীনে গবেষণার। হায়, যিনি জীবনে কখনও পিএইচডি ছাত্র নেননি, তাঁর অধীনে গবেষণা! প্যারিসে কয়েক জনের ল্যাবরেটরিতে কাজ করে এবং বার্লিনে কয়েক জনের সুখ্যাতি পেয়ে ফিরতে হয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথকে। চিঠিপত্রে তিনি বারবার আইনস্টাইনকে ‘মাস্টার’ বলে সম্বোধন করতেন। ডিড দ্য মাস্টার লেট হিম ডাউন? প্রশ্নটা বারবার উঠেছে। সত্যেন্দ্রনাথের একমাত্র জীবিত ছাত্র বিজ্ঞানী পার্থ ঘোষ এ ব্যাপারে বলেছেন, ‘আইনস্টাইন এমন পদক্ষেপ করেছিলেন, যা বিজ্ঞানের জগতে নজিরবিহীন। সত্যেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় পেপারে আইনস্টাইন (যা তিনি জার্মানে অনুবাদ করে ছাপান) জুড়ে দেন এক ফুটনোট। সত্যেন্দ্রনাথকে না জানিয়েই। ওই ফুটনোটে আইনস্টাইন লেখেন, বসুর নতুন সম্ভাব্যতা সূত্র (যা বসু সংখ্যায়ন থেকে আলাদা) ভুল! ওই ফুটনোট সহযোগেই ছাপা হয় পেপার। ওই মন্তব্য প্রায় পেপারটিকে হত্যা করার শামিল!’
এই প্রসঙ্গে নিজের এক অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন পার্থ। বললেন, ‘একদিন স্যরের বাড়ি গিয়েছি। তিনি আমাকে বললেন, এক গোপন কথা শোনাবেন। কী? আমি উৎসুক। স্যর বন্ধ করলেন দরজা-জানালা। তার পর আমাকে ফিসফিস করে বললেন, আজ তোকে যা বলছি, তা আর কাউকে বলিস না। কথা দিলাম যে, আমি কাউকে তা বলব না। কিন্তু কী ব্যাপার? স্যরের আবিষ্কৃত সংখ্যায়নে একটা সংখ্যা (৪) এসেছিল। সেটা হবে ৮। কেন হবে, তার ব্যাখ্যাও স্যর দিয়েছিলেন। হবে এ কারণে যে, আলোককণার স্পিন (ঘূর্ণনের মতো একটা ব্যাপার) আছে। এখন, আলোককণা ঘুরতে পারে দু’ভাবে। এক, আলোককণা যে দিকে ছুটছে, সে দিকেই ঘোরা। দুই, যে দিকে ছুটছে, তার উল্টো দিকে ঘোরা। তাই ৪-এর বদলে ৮ (৪x ২)। স্যরের বিখ্যাত পেপারটি দেখার পর আইনস্টাইন তা পাল্টে দেন। স্যর আমাকে বললেন, বুড়ো ওটা কেটে দিলে। পরে আলোককণার স্পিন পরীক্ষায় ধরা পড়ে। আমি স্যরকে বললাম, আলোককণার স্পিন ধরা পড়ার পর কেন আপনি আইনস্টাইনকে বললেন না যে, আপনিই ঠিক! তা হলে তো আলোককণার স্পিনের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য আপনার কৃতিত্ব স্বীকৃত হত। স্যর উত্তরে বললেন, কে বার করেছে তাতে কী যায়-আসে রে? বেরিয়েছে তো! এই হলেন সত্যেন্দ্রনাথ।’
পার্থ যোগ করেন, স্যর যে দিন আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন, তার অনেক বছর পরে আমি কাল্টিভেশন অব সায়েন্সেস-এর লাইব্রেরিতে বসে জার্নাল ঘাঁটছিলাম। হঠাৎ আমার হাতে এল ১৯৩১ সালে প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ফিজিকস’-এ সি ভি রামন এবং এস ভগবন্তমের লেখা এক পেপার। ওই জুটি ব্যাখ্যা করেছেন আলোককণার স্পিনের পরীক্ষামূলক প্রমাণ। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, এ পেপার কি স্যর দেখেননি ? এ পেপার প্রকাশিত হওয়ার পরেও তো স্যর আইনস্টাইনকে বলতে পারতেন যে—আইনস্টাইন নন, তিনিই ঠিক। আসলে কী জানেন, স্যর প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতেন আইনস্টাইনকে।’
হ্যাঁ, তা ঠিক। ওই শ্রদ্ধাকে বিজ্ঞানী অমলকুমার রায়চৌধুরী তুলনা করেছিলেন মহাভারতে বর্ণিত একলব্যের গুরু দ্রোণাচার্যের প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে। নোবেল প্রাইজ় সত্যেন্দ্রনাথ না পেতে পারেন। তবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে দু’জাতের মধ্যে এক জাতের কণার নামের ভিতরে ‘বোসন’ হিসেবে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।
সত্যেন বসু ভাষা প্রেমিক ছিলেন। তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে তার একটি বিখ্যাত উক্তি বলার লোভ সামলাতে পারলাম না, “যারা বলেন যে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব নয়, তারা হয় বাংলা জানেন না, নয়তো বিজ্ঞান বোঝেন না।” সারা জীবন ধরে তিনি বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা প্রসারের জন্য বিভিন্ন কর্মকান্ডও হাতে নেন। এইসময় বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারের লক্ষ্যে ‘বিজ্ঞান পরিচয়’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন তিনি। এছাড়াও বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার জন্য তিনি বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রথম দিন থেকেই এখান থেকে একটি পত্রিকা প্রকাশ হয়ে আসছে – জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকা।
মানুষ হিসেবে এই অঙ্কের যাদুকরটি ছিলেন একেবারেই যাকে বলে ‘আত্মভোলা বাঙালি’। পোশাক পরিচ্ছদের ব্যাপারে ছিলেন মাত্রাতিরিক্ত উদাসীন। প্রায়শই পরনের ফতুয়া ভুল করে গায়ে না জড়িয়ে কাঁধে চাপিয়ে রাখতেন। জুতোর অবস্থাও ছিল এমন যে প্রায় সময়ই দু’পায়ে দু’রকম জুতো পরে সবখানে ঘুরে চলে আসতেন। মাথায় তো চিরুনী বোলানোর কথা তার সজ্ঞানেও আসতো না হয়তোবা। কিন্তু এই খেয়ালি মানুষটি যখন অঙ্ক কষতে বসতেন তখন আর সময়জ্ঞান হিসেবে থাকতো না তার। আবার কখনও কখনও জটিল ধারার অঙ্ক থেকে ছুটি নিয়ে ডুবে যেতেন সাহিত্য এবং সঙ্গীতের জগতে। বিজ্ঞানের পাশাপাশি সঙ্গীত এবং সাহিত্যেও ছিল তার আন্তরিক আগ্রহ ও বিশেষ প্রীতি। প্রায়ই তাকে দেখা যেত সদ্য প্রকাশিত ফরাসি বইয়ের মধ্যে গভীরভাবে ডুবে থাকতে।
বসু একজন ভালো সঙ্গীতজ্ঞও ছিলেন বটে। উচ্চমানের সঙ্গীত শোনা ছাড়াও তিনি খুব ভালো এস্রাজ বাজাতেন। মন খারাপের সময়গুলো কাটাতেন এস্রাজের সুর-সাধনার জগতেই। যখন তিনি কোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তামগ্ন থাকতেন তখনই বেজে উঠতো তার এস্রাজের সুর। ঢাকা থাকার সময় তার এই অভ্যাস নিয়মিতই ছিল।
সত্যেন্দ্রনাথের লেখালেখিতে পাওয়া যেত এক পুরোদস্তুর সাহিত্যিকের ছোঁয়া। তার বিভিন্ন লেখা পড়লে তা সহজেই বোঝা যায়। সাহিত্যজগতে আনাগোনার মধ্য দিয়ে তার পরিচয় ঘটে সাহিত্য জগত দিকপাল বুদ্ধদেব বসুর সাথে। আর তার সে পরিচয় কালের আবর্তে পৌঁছে গিয়েছিল কোলকাতার ২০২ রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ‘কবিতা ভবন’ দ্বারপ্রান্তে। সেখানে প্রায় সময় সত্যেন্দ্রনাথ যেতেন, আড্ডা দিতেন, সময় কাটাতেন। আড্ডার আসরে তিনি ছিলেন মধ্যমণি। কথিত আছে, তিনি বুদ্ধদেব বসুর ‘মেঘদূত’ এবং বদলেয়ার অনুবাদ নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছিলেন। ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ও অনেক সময় তার মতামত নিতেন।
ছাত্রছাত্রীদের ভিড় লেগে থাকত বাড়িতে। ছাত্রছাত্রীরা যেন ওঁর ছেলেমেয়ে। বাড়িতে আড্ডা লেগে থাকত। শিল্প, সাহিত্য, দর্শনের আড্ডা। অতুল বসু, যামিনী রায়, বিষ্ণু দে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায় যেন বাড়ির লোক!’ সেই আড্ডায় বাড়ির ছোটরাও কিন্তু যোগ দিতে পারত।
২০০৯ সালে কলকাতায় নানা বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট প্রথম তৈরির সাফল্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী হোলফগাং কেটারলি। বক্তৃতার ফাঁকে একবার গিয়েছিলেন ২২ নম্বর ঈশ্বর মিল লেনে সত্যেন্দ্রনাথের বাড়িতে। আজও এতটাই সমাদৃত এই বঙ্গসন্তান বিজ্ঞানী।
১৯৭৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আশি বছর বয়সে ব্রঙ্কিয়াল নিউমোনিয়ায় ভুগে এই মহান পদার্থবিদ মৃত্যুবরণ করেন। তাকে স্মরণ করে আজও গর্বিত এবং বিজ্ঞান চর্চায় অনুপ্রাণিত হয় দুই বাংলার কোটি কোটি মানুষ।
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)