আট বছর হল তিনি আমাদের মধ্যে নেই, থাকলে বিরানব্বই-এ পা দিতেন আসন্ন এপ্রিলে। আদতে তিনি আমাদের মধ্যে নেই সেই সত্তর দশকের শেষ থেকে, যখন থেকেই তিনি অন্তরিন। কিন্তু তবুও তাঁর চাহনিতে আজও কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ সকল পুরুষের বুক ধুকপুক করে। হাসিতে আজও মজে সকলে। তাঁর ব্যক্তিত্ব আজও আনম্যাচড। অন্তরালে থেকে চিরঅন্তরালে চলে গেলেও তাঁর দীপ্তি লাইট-সাউন্ড-ক্যামেরা-অ্যাকশনের গণ্ডি পেরিয়ে আজও অমলিন।
বাংলাদেশের পাবনার মেয়ে রমা দাশগুপ্তের কিম্বদন্তি নায়িকা
সুচিত্রা সেন হওয়ার চমকপ্রদ কাহিনী শোনাবো
আজকের লেখায়।
| সুচিত্রা সেন |
১৯৩১ সালের ৬ই এপ্রিল পাবনায় তার জন্ম। তিনি ছিলেন আট ভাইবোনের মধ্যে মেজো। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন স্থানীয় একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও মা ইন্দিরা দেবী ছিলেন গৃহবধূ। বাবার বড় আহ্লাদি ছিল সে, ভালো নাম রেখেছিলেন ‘রমা’। তার ডাক নামছিল কৃষ্ণা। ছোটো বেলায় লেখাপড়াও পাবনাতেই। তিনি ছিলেন কবি রজনীকান্ত সেনের নাতনী।
পাটনায় মামার বাড়িতেও কিছুদিন থেকেছেন। দেশভাগের সময় সুচিত্রা সেন চলে এসেছিল এপারে। তবে বাবা করুণাময় অবসরের পরই পাবনা ছেড়ে স্থায়ী ভাবে চলে এসেছিলেন, উঠেছিলেন শান্তিনিকেতনের পাশে ভুবনডাঙ্গায়।
মাত্র ১৬ বছর বয়সেই কলকাতার বিশিষ্ট শিল্পপতি প্রিয়নাথ সেনের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে রমা-র বিয়ে হয়। অনেকটা জেদের বশেই বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সেই বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। নিত্য নতুন অশান্তির কালো মেঘ সরাতে অবশ্য সময় নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাধা’ ছবি যখন করছেন তখনই ডিভোর্স হয়ে যায়। এই ছবিটি ছিল তার জীবনের সেই সময়েরই প্রতিচ্ছবি। ছবিতে একটি দৃশ্যে সুচিত্রা রাগে সৌমিত্রর জামা ছিড়ে দিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি শূটিংয়ের দিনে তার বাড়িতেই হয়েছিল। কথা কাটাকাটির জেরে স্বামীর জামা ছিঁড়ে চলে এসেছিলেন সোজা শুটিংয়ে।
সুচিত্রার সিনেমায় নামা কিন্তু তার নিজের ইচ্ছায় নয়। স্বামী দিবানাথই জোর করেছিলেন সুচিত্রা যাতে অভিনয় করে। শ্বশুর আদিনাথ সেনের থেকে অনুমতি নিয়ে এক ‘অনিচ্ছুক শিল্পী’ হিসেবে সুচিত্রার টালিগঞ্জ স্টুডিয়ো পাড়ায় প্রবেশ। সিনেমার জন্য প্রথম টেস্ট দিতে গিয়ে ডাহা ফেল করেছিলেন সকলের মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। অবশ্য তখনও তিনি রমা সেন। ততদিনে জেদ চেপে বসেছে। অভিনেত্রী হবেনই। পরে অবশ্য স্ক্রিনটেস্টে উতরে গিয়েছিলেন। শুরু হয় তার চলচ্চিত্রে অভিনয় জীবন।
১৯৫২ সালে প্রথম ছবি ‘শেষ কোথায়’। কিন্তু সেই ছবি মুক্তি পায় নি। মুক্তি পাওয়া প্রথম ছবি ১৯৫৩ সালের ‘সাত নম্বর কয়েদি’। এই ছবিতেই রমা সেন পরিবর্তিত হয়েছিলেন সুচিত্রা সেনে। ছবির পরিচালক সুকুমার দাশগুপ্তের সহকারী নীতিশ রায়ই এই নতুন নামটি দিয়েছিলেন। তবে প্রথম উত্তম কুমারের সঙ্গে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ই ব্রেক এনে দিয়েছিল। তারপর থেকে সুচিত্রা সেন নিজের জেদ ও অধ্যাবসায়ে বাঙালির হৃদয়ের রাণীতে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৫৩ সালেই ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়ার চরিত্রে। আর এই ছবিটিই তার জীবনকে পাল্টে দিয়েছিল। সুচিত্রা তার এক ঘনিষ্ট বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘ভগবান শ্রীষ্ণৃষ্ণচৈতন্য’ ছবি আমার জীবন পাল্টে দেয়। আমি বিষ্ণুপ্রিয়া চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। তারপর থেকেই আমি নির্ভয়, ভেতর থেকে কে যেন আমাকে চালায়।
১৯৫৩ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে একের পর এক সাড়াজাগানো ছবি করেছেন। তার ম্যানারিজমকে পর্যন্ত বাঙালি আপন করে নিয়েছিল। ওরা থাকে ওধারে, অগ্নিপরীক্ষা, উত্তর ফাল্গুনি, শাপমোচন, শিল্পী, দীপ জ্বেলে যাই, হারানো সুর, সাত পাকে বাধা, অগ্নিপরীক্ষা, সূর্যতোরণ, সাগরিকা, সপ্তপদী এমনি অসংখ্য ছবিতে সুচিত্রা সেনের অভিনয় তার সময়কে ছাপিয়ে গিয়েছিল। আর তাই তিনি সহজেই কিম্বদন্তী নায়িকাতে পরিণত হয়েছিলেন। 'সাত পাকে বাঁধা' চলচ্চিত্রটি সুপারহিটের তকমা পেয়েছিল। তার অসাধারণ অভিনয় দক্ষতার জন্য মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার প্রাইজ ফর বেস্ট অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। এরকম মোহময়ী নায়িকা কিন্তু কখনওই পাননি জাতীয় পুরষ্কারের সম্মান।
উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, বসন্ত চৌধুরি সকলের বিপরীতে আভিনয় করলেও উত্তকুমারের সঙ্গে যে ৩০টি ছবি করেছেন তাতে সুচিত্রা-উত্তম জুটির রোমান্স এতটাই স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ ছিল যে কখনোই তা অভিনয় বলে মনে হয় নি। আর দুজনের এই রসায়নের কারণেই মেয়ে মুনমুন সেন পর্যন্ত একবার মাকে বলেছিলেন, মা তোমার উত্তমকুমারকে বিয়ে করা উচিত ছিল। শুনে সুচিত্রা শুধু হেসেছিলেন। আসলে সুচিত্রা-উত্তমের মধ্যে যে প্রবল আন্ডারস্ট্যান্ডিং চলচিত্রে রুপ পেয়েছে তা আগে কখনো হয়নি। আর তাই সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত বলেছেন, পৃথিবীতে খুব কম জুড়ি আছে যাদের মধ্যে বন্ডটা এত ম্যাজিকাল। তবে অত্যন্ত সফিস্টিকেটেড সুচিত্রা সেন ছিলেন খুবই জেদি। যখন যেটা করবেন বলে ঠিক করেছেন তখন সেটাই করেছেন। তিনি প্রযোজকদের উত্তমকুমারের উপরে তার নাম লিখতে বাধ্য করেছিলেন। সকলে সেটা মেনেও নিয়েছিল। আর তাই উত্তম-সুচিত্রা জুটি না হয়ে হয়েছিল সুচিত্রা-উত্তম জুটি।
সুচিত্রা বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দী ছবিতেও অভিনয় করেছেন। ১৯৫৫ সালেই দেবদাস করেছেন। দোনন্দকে নিয়ে করেছেন ‘বাম্বাই কা বাবু’ ও ‘সরহদ’। আর গুলজারের পরিচালনায় ‘আঁধি’ ছবিতে ইন্দিরা গান্ধীর চরিত্রে তার অভিনয় সকলকে মুগ্ধ করেছিল। আজও যখন বিকিনিতে ট্রোলড হন নায়িকারা, তখন সেই আমলে শুধু তোয়ালেতে সমুদ্রের ধারে ক্যামেরায় পোজ দিয়েছেন রিনা ব্রাউন চরিত্রের সুচিত্রা।
তিনি এক মুহূর্তের জন্য আনডিগনিফায়েড হতে দেখা যায় নি। আর তাই সত্যজিৎ রায়কে, রাজ কাপুরকে পর্যন্ত ফিরিয়ে দিয়েছেন। সত্রজিৎ রায়ের সঙ্গে ছবি করতে রাজি ছিলেন সুচিত্রা। কিন্তু শর্ত দিয়েছিলেন সত্যজিৎ, তার সঙ্গে যতদিন কাজ করবেন ততদিন অন্য ছবিতে কাজ করা চলবে না সুচিত্রার। সুচিত্রা এর উত্তরে বলেছিলেন, সেটা কি করে হয়? যারা তাকে সুচিত্রা সেন বানিয়েছেন তাদের তো বাদ দেওয়া চলবে না। তবে তিনি কথা দিয়েছিলেন সত্যজিৎ বাবুর জন্য বেশি সময় দেবেন। কিন্তু পরদিন প্রযোজক যখন চুক্তিপত্রের খসড়া নিয়ে এলেন তাতে এক্লুসিভ আর্টিস্ট কথাটি লেখা দেখে সঙ্গে সঙ্গে সেটি ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন প্রযোজককে। আর রাজকাপুরের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবার পেছনে ছিল অন্য গল্প। রাজকাপুর নাকি সুচিত্রাকে প্রেম নিবেদন পর্যন্ত গিয়েছিলেন। একদিন বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়িতে এসেছিলেন রাজ কাপুর সিনেমার প্রস্তাব নিয়ে। সাদা সুট, সাদা নেকটাই আর হাতে একরাশ লাল গোলাপ নিয়ে সুচিত্রার পায়ের কাছে বসে তার প্রযোজিত কোন ছবিতে কাজ করার জন্য বলেছিলেন। সুচিত্রা তখনই তাকে না বলে দিয়েছিলেন। সুচিত্রার এই না করা নিয়ে ঘনিষ্টদের কাছে তিনি বলেছিলেন, আমার পিত্তি জ্বলে গিয়েছিল। ও পুরুষ মানুষ নাকি, মেয়েদের পায়ের কাছে বসে, দূ-র। আর তাই ‘না’ বলে দিতে কোনও দ্বিধা করিনি।
তবে নিজের সম্পর্কে অসম্ভব সচেতন ছিলেন সুচিত্র। আর তাই ১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ ছবিটি দর্শক ভালভাবে না নেওয়ায় সুচিত্রা সেন সিনেমাকে বাই বাই জানাতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করেন নি। তার ধারণা হয়েছিল পাবলিকের প্রত্যাশা আর পূরণ করতে পারবেন না। সেই থেকেই তিনি চলে গিয়েছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। দীর্ঘ অন্তরাল ভেঙে ভোটার কার্ডের জন্য ফের ক্যামেরার সামনে আসেন মহানায়িকা, ১৯৯৫ সালে।
১৯৮০ সালে ২৪ জুলাই যখন মহানায়কের প্রয়াণে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিল গোটা বাংলা, সে সময় উত্তমের ভিটেয় তাঁর প্রিয় রমা'র আগমনের কাহিনি যে কোনও সিনেমার ক্ল্যাইম্যাক্সকে হার মানাবে। উত্তম কুমারকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে ভোররাতে হাজির হয়েছিলেন মহানায়িকা। বন্ধু বিদায়ের সময় শোকাহত কণ্ঠে মুখে একটাই কথা , 'আমি হেরে গেলাম উত্তম'। মালাটা দিতে যাবে এই সময় উত্তমকুমারের এক আত্মীয় বললেন, “রমা অনেক ছবিতে তো গলায় মালা পরিয়েছ, আজ কেন পায়ে দিচ্ছ, গলাতেই দাও”। সেই কথা শুনে আস্তে আস্তে গলায় পরিয়ে দিলেন। মনে হচ্ছিল, স্টার্ট ক্যামেরা, অ্যাকশন শট শুরু, মালা পরানো শেষ, শট শেষ'।
তবে তার ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গ’ নিয়ে কোন ছবি হলে তাতে দামিনী চরিত্রে তিনি অভিনয় করবেন। একবার কথা পাকা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রযোজক হঠাৎ আত্মহত্যা করায় আর সেই ছবি করা হয় নি। এই একটি ব্যাপারে তার আপশোস জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিল। এমনকি চতুরঙ্গ নিয়ে কেউ যদি নাটক করেন তাতেও তিনি অভিনয় করতে চেয়েছিলেন । সেই সাধও তার অপূর্ণই রয়ে গিয়েছিল। অপূর্ণ রেখেই কাটিয়ে দিয়েছেন সবার অলক্ষে ৩৫টি বছর।
২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় সময় সকাল ৮টা ২৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সুচিত্রা সেনের মৃত্যু হয়। তিন সপ্তাহ আগে ফুসফুসে সংক্রমণের জন্য তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
সুচিত্রাকে ঘিরে বাঙালি পুরুষের ‘রোম্যান্টিক অবসেশন’, সুচিত্রার যে বয়স বাড়তে পারে, ‘স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’-র বাইরে আর কিছু তাঁকে ভাবতে পারেনি, মানতে পারেনি বাঙালি, আজও।
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)