অ্যাডভেঞ্চার জগতের প্রবাদপুরুষ এডমন্ড হিলারি

এভারেস্ট বিজয়ের জন্যই যার দুনিয়াজোড়া খ্যাতি। অথচ প্রথম মানুষ হিসেবে তিন তিনটি মেরু (উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু এবং এভারেস্ট যাকে বলা হয় থার্ড পোল ) জয়ের রেকর্ডও তাঁরই দখলে। কজন জানি, নেপালের সুউচ্চ জায়গাগুলোতে বাস করা, আধুনিক পৃথিবীর ন্যুনতম সুবিধাটুকুও না পাওয়া দুঃস্থ মানুষগুলোর জন্য আজীবন নিস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন তিনি? সবসময় বিনয়ের সাথে নিজের কৃতিত্ব এড়িয়ে যাওয়া এই মানুষটি, আর কেউ নন, তিনি এডমণ্ড হিলারী।

এডমন্ড হিলারি

আজ শোনাবো তাঁরই কথা।

অ্যাডভেঞ্চার জগতের প্রবাদপুরুষ এডমন্ড পার্সিভাল হিলারি ১৯১৯ সালের ২০-শে জুলাই নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ছিল পার্সিভাল অগস্টাস হিলারি ও মায়ের নাম ছিল গার্ট্রুড ক্লার্ক। হিলারি টুয়াকাউ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অকল্যান্ড গ্রামার স্কুল থেকে শিক্ষালাভ করেন। ছোট বেলায় তিনি ছিলেন স্কুলের পিছনের সারির ছাত্র। কোনো রকম টেনেটুনে স্কুলের গণ্ডি পার করেন। ষোল বছর বয়সে বিদ্যালয় থেকে মাউন্ট রুয়াপেহু পর্বতে ভ্রমণের সময় তিনি পর্বতারোহণের প্রতি উৎসাহিত হন। পরবর্তীকালে তিনি অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অঙ্ক ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক হন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ আল্পস পর্বতমালার মাউন্ট অলিভিয়ার পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করার মাধ্যমে জীবনের প্রথম শৃঙ্গজয় করেন।

কিন্তু জীবিকার তাগিদে ভাইয়ের সঙ্গে মধুর ব্যবসায় যোগ দেন হিলারি। দুর্গম পার্বত্য বনভূমিতে মৌয়ালের (মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহের পেশা) কাজ করাটা তাঁর নেশার মতো। গ্রীষ্মকালে মৌয়াল এবং শীতকালে জমানো টাকা ভাঙিয়ে চলে যান পর্বতের চূড়ার দিকে। এর মাঝে শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তিনি যুদ্ধে যোগ দিলেন রয়েল নিউজিল্যান্ড এয়ারফোর্সের উভচর সি-প্লেনের নেভিগেটর হিসাবে। যুদ্ধের শেষ বছর ১৯৪৫ সালে ফিজি, সলোমন আইল্যান্ড বিভিন্ন জায়গায় উভচর যুদ্ধে অংশ নেন এবং একটি অভিযানে মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হন। 

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে জানুয়ারি হ্যারি এয়ার্স ও মিক সুলিভানের নেতৃত্বে হিলারি ও রুথ অ্যাডামস নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আওরাকি আরোহণ করেন। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে এরিক শিপটনের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের সন্ধানী এভারেস্ট অভিযানে অংশগ্রহণ করেন হিলারি। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে এরিক শিপটনের নেতৃত্বে চো ওইয়ু শৃঙ্গ অভিযানেও ছিলেন তিনি। 

১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে জন হান্টের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানে হিলারি আমন্ত্রণ পান। এই অভিযানে ৩৬২ জন মালবাহক ও ২০ জন শেরপা সহ চার শতাধিক মানুষ অংশ গ্রহণ করেছিলেন। মার্চ মাসে বেস ক্যাম্প তৈরী করে ধীরে ধীরে দলটি ৭,৮৯০ মিটার (২৫,৮৮৬ ফুট) উচ্চতায় আরোহণ করে সাউথ কলে তাঁদের অন্তিম শিবির স্থাপন করেন। ২৬-শে মে টম বুর্দিলঁ ও চার্লস ইভান্স শৃঙ্গজয়ের প্রচেষ্টা করে কিন্তু ইভান্সের অক্সিজেন সরবরাহকারী ব্যবস্থায় গোলযোগ দেখা দিলে এবং আবহাওয়া হঠাত করেই প্রতিকূল হয়ে পড়ায় তাঁরা শৃঙ্গ থেকে ৩০০ ফুট নিচে থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

এরপর দলপতি হান্ট, তেনজিং নোরগে ও এডমন্ড হিলারিকে শৃঙ্গজয়ের চেষ্টায় পাঠান। ২৮-শে মে তাঁরা আং ন্যিমা, আলফ্রেড গ্রেগরি ও জর্জ লোর সহায়তায় ৮,৫০০ মিটার (২৭,৮৮৭ ফু) উচ্চতায় তাঁদের শিবির স্থাপন করলে ন্যিমা, গ্রেগরি ও লো নীচে ফিরে যান। হিলারির জুতো সারা রাত তাঁবুর বাইরে থাকায় পরদিন সকালে সেগুলিতে বরফ জমে গেলে দুই ঘন্টা ধরে দুইজনে মিলে চেষ্টা করে সেগুলিকে পূর্বাবস্থায় নিয়ে আসেন ও ত্রিশ পাউন্ড ওজনের সরঞ্জাম নিয়ে ২৯-শে মে তাঁরা শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা শুরু করেন। শৃঙ্গের ঠিক নিচে চল্লিশ ফুটের খাড়া একটি পাথরের দেওয়ালে একটি খাঁজ ধরে এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে সকাল ১১:৩০ মিনিটে মাউন্ট এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করেন। পর্বতশৃঙ্গে তাঁরা পনেরো মিনিট ছিলেন।

এভারেস্ট শিখর থেকে নামার পথে অনেকটা সময় পরে প্রথম যে মানুষটির সঙ্গে হিলারি ও তেনজিং-এর দেখা হল তিনি ছিলেন সেই ঐতিহাসিক অভিযানের আর একজন কিউই, হিলারির ঘনিষ্ঠ বন্ধু জর্জ লোয়ে, যিনি হিলারি এবং তেনজিং এর জন্য গরম স্যুপের পাত্র নিয়ে বেশ খানিকটা উপরের দিকে এগিয়ে আসছিলেন। বন্ধুকে দেখতে পেয়ে হিলারি বললেন তাঁর সেই অমর বাক্য, “well George we knocked the bastard off”.

শৃঙ্গজয়ের ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে তাঁদের দুইজনকে ঘিরে নেপাল ও ভারতে জনমানসে প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস তৈরী হয়। হিলারি নাইট উপাধিতে ভূষিত হন এবং তেনজিংকে জর্জ পদক প্রদান করা হয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে।

এভারেস্ট আরোহণের পর হিলারি নেপালের শেরপাদের উন্নতিকল্পে তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন। তিনি হিমালয়ান ট্রাস্ট নামক একটি সংস্থ্যা প্রতিষ্ঠা করে তাঁদের জন্য বিদ্যালয় ও হাসপাতাল নির্মাণ করেন। ১৯৭৫ সালে পাপলু নামের এক নেপালি গ্রামে হাসপাতাল নির্মাণের সময় তার সাথে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে বিমানযাত্রাকালীন সময়ে স্ত্রী লুই এবং বেলিন্ডা দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, যার ফলে চরম ভাবে মুষড়ে পড়লেও তার সমাজসেবা অব্যাহত রাখেন হিলারী। এর ১৪ বছর পরে তিনি তার মৃত ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বিধবা স্ত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

এভারেস্ট জয়ের পরে হিলারি থামেননি। হিমালয় অঞ্চলে আর ছয়টা শৃঙ্গ জয় করেন ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। কমনওয়েলথ ট্রান্স-অ্যাটলান্টিক অভিযানের অংশ হিসেবে তিনি ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ মেরু পৌঁছন। পরবর্তীকালে তিনি উত্তর মেরু অভিযান করলে বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে পৃথিবীর দুই মেরু ও সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পদার্পণের দুর্লভ কৃতিত্ব অর্জন করেন। উত্তর মেরু জয়ে তাঁর সফর সঙ্গী ছিলেন চাঁদে পা রাখা প্রথম মানুষ নীল আর্মস্টং। 

১৯৮৫ সালে নিউজিল্যান্ড সরকার তাঁকে ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশ এই তিন রাষ্ট্রের হাইকমিশনার হিসাবে ভারতে প্রেরণ করে।

২০০২ সালে মে মাসে উনার একমাত্র পুত্র পিটার তার বাবার মহা অর্জনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অভিযানে এভারেস্ট বিজয়ে সক্ষম হন, তেনজিংএর ছেলে জামলিংও সেই অভিযানের সাথে ছিলেন। 

২২-শে এপ্রিল ২০০৭ সালে কাঠমান্ডু ভ্রমণের সময় হিলারি পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছিলেন এবং নিউজিল্যান্ডের ফিরে আসার পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারপর ২০০৮ সালের ১১-ই জানুয়ারি অকল্যান্ড সিটি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় এই মহান অভিযাত্রীর।

(সংকলনেঃ তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন