"তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।"
ঠিক একান্ন বছর আগে ১৯৭১ সালে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সমাবেশে এই আহ্বান জানিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ‘বাংলাদেশ’ নামক একটা নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের পথে এই আহ্বান-টির গুরুত্ব কমবেশি সকলেই জানলেও, কজন জানেন এই স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান রয়ে গেছে দুই ঘোষ ভাইয়ের, যারা দেশভাগের সময়ে ভারতে যেতে গিয়েও যাননি।
১৯৭১ সালে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান
১৯৪৮ সাল। কমাস আগেই একটা গোটা দেশ ভেঙে হয়েছে দুটো আলাদা দেশ। সবকিছু হয়ে গেছে ওলটপালট। কাহিনী শুরু হচ্ছে ওই ওলটপালট সময়ে ঢাকার সূত্রাপুরের এক হিন্দু পরিবার নিয়ে। দুই ভাই হরিপদ ঘোষ আর দয়াল ঘোষ। একবার ঠিক করেছিলেন আর সবাইকার মতো দেশ ছেড়ে চলে যাবেন। পরে ঠিক করেন বাপ-দাদার ভিটে আঁকড়েই পড়ে থাকবেন। তবে কি করে পরিবার চালাবেন তা ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না।
অনেক ভেবে ঠিক করলেন লাইটের ব্যাবসা করবেন। পুরানো ঢাকায় তখন এধরনের দোকান ছিল না বললেই চলে। মাসখানেকের মধ্যে ব্যবসা শুরু হলো। চেন লাইট, পাঁচ-ছয়টি হ্যাজাগ, কটা রিভলবিং লাইট। ঠিকানা হলো লক্ষ্মীবাজার মনুর গলি। নাম দিলেন ‘আরজু লাইট হাউস’। তারপর থেকে বছর দুয়েক বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু তাদের দেখাদেখি আরো বেশ কিছু একইরকম দোকান হয়ে যায় পুরান ঢাকায়। ব্যবসা দিন দিন মার খেতে লাগলো। দুভাই বুঝলেন ধারা বদলাতে হবে।
হটাৎ হরিপদের মাথায় একটি আইড়িয়া আসে। পুরান ঢাকায় লাইট আর সাউন্ডের দোকান ছিল না খুব একটা। লাইটের পাশাপাশি এরপর তারা গ্রামোফোনও ভাড়া দেয়া শুরু করলেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লাইটের সঙ্গে গ্রামোফোনও ভাড়া নিতে থাকে লোকজন। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ভারত থেকে কয়েকটি মাইক নিয়ে আসেন দুই ভাই। তাতেও যেন চাহিদা মেটাতে পারছিলেন না। কোনো কূল না পেয়ে হরিপদ ঘোষ যন্ত্রপাতি কিনে এনে নিজেই কয়েকটি হ্যান্ডমাইক সেট তৈরি করে ফেললেন।
এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। আন্দোলনের নেতা কর্মীরা মাইক ভাড়া নিতে শুরু করেন এই দোকান থেকে। চাহিদা বাড়তেই থাকে দিনদিন। ভারত থেকে আরো কটি মাইক কিনে আনেন তারা। এবারে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবসাকে আলাদা নাম দিতে চাইলেন। হরিপদ চাইলেন এমন একটা নাম দরকার যে নামটা বলতে সহজ। এই দায়িত্ব দেওয়া হয় পাশের জগন্নাথ কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের। যার নাম পছন্দ হবে তার জন্য পুরস্কারেরও ব্যবস্থা করেছিলেন তারা। অবশেষে জগন্নাথ কলেজের এক ছাত্রের বুদ্ধিতে নতুন নাম রাখেন ‘কল-রেডি’ (Call - ready).
এলো ১৯৭১, হাটে-মাঠে-ঘাটে সব জায়গায় তখন স্বাধিকারের চেতনায় ফুঁসছে মানুষ। সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকে সারা দেশের মানুষ ভোট দিয়েছে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করছে না। দফায় দফায় মিটিং করেও হচ্ছে না সুরাহা।
চলে এল মার্চ। কল-রেডির মালিক হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষকে ধানমণ্ডির বাসায় ডেকে পাঠালেন বঙ্গবন্ধু। নির্দেশ দিলেন রেসকোর্স ময়দানে মাইক লাগাতে। কাজে নেমে পড়েন হরিপদ ও দয়াল ঘোষ। কাজটা তখন সোজা ছিল না। পুলিশের কড়া নজরদারি ছিল। রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে মাইক লাগাতে লাগলেন দুই ভাই। মাইক লাগিয়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন। কিছু বাড়তি মাইক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মজুদ রাখেন যেন সমাবেশের দিন তাৎক্ষণিকভাবে লাগিয়ে নিতে পারেন। তিন দিন ধরে ৩০ জন কর্মী নিয়ে বাঁশ, খুঁটি গাঁথার কাজ করেন দুই ঘোষ ভাই।
অবশেষে এলো ৭ই মার্চ। বঙ্গবন্ধু গিয়ে দাঁড়ালেন জনতার মঞ্চে। মুখের সামনে কল-রেডি। বলেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।'
ঐদিন ময়দানে দাঁড়িয়ে কল-রেডির যে মাইক্রোফোনে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই মাইক্রোফোন ও তার স্ট্যান্ডটি আজও তাদের দোকানে সংরক্ষিত আছে।
এরপর বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আবারো ‘কল-রেডি’-র মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই শুরু, তারপর গত বাহাত্তর বছরে কে না ভাষণ দিয়েছেন তাদের মাইক্রোফোনে? ইন্দিরা গান্ধী থেকে ইয়াসের আরাফাত, ম্যান্ডেলা থেকে বিল ক্লিনটন, হালের বাজপেয়ী থেকে প্রণব মুখার্জি। শেখ হাসিনার প্রতিটি সমাবেশে থাকে ‘কল রেডি'-র মাইক।
‘কল-রেডি’ নামটি এক কথায় বাংলার
ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের
যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সভা-সমাবেশেও
কল-রেডির মাইকে বক্তব্য দিয়েছেন নেতারা।
আজও ঢাকায় মাইক শব্দটি কানে এলেই সবার মনে পড়ে কল-রেডির কথা। বাংলাদেশের মানুষ এক নামে চেনে যে প্রতিষ্ঠান কে, তাহলো ঘোষ ভাইদের কল রেডি।
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)
👍👍👍
উত্তরমুছুন