স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের
ইতিহাস পাঠ্যবইগুলিতে এমনভাবে ইতিহাস পরিবেশন করা হয়েছে যা অনেক সত্যকে দারুনভাবে
আড়ালে রেখে দেয়। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ, ভারতের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকগুলিতে
শিভাগঙ্গাই রাজ্যের রানী ভেলু নাচিয়ার ও তার সেনাপতি কুয়িলির খোঁজ মেলে না। খুব কম
জানা এই বীরাঙ্গনার কথাই শোনাবো আজ।
![]() |
| ভেলু নাচিয়ার |
রাণী ভেলু নাচিয়ার জন্ম হয়েছিল ৩-রা জানুয়ারি ১৭৩০ সালে। ভেলু নাচিয়ার যুদ্ধে ব্যবহৃত সবরকম অস্ত্রশস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সামরিক যুদ্ধ কৌশল, যেমন ভালারি, সিলাম্বাম (লাঠি ব্যবহার করে যুদ্ধ), ঘোড়াচালনা এবং তীরচালনা ইত্যাদিতে শিক্ষালাভ করেন। তিনি বহু ভাষা জানতেন এবং ফরাসি, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি শিবগঙ্গাইয়ের রাজাকে বিবাহ করেন এবং তাদের একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হউ।
ইংরেজরা ষড়যন্ত্র করে শিভাগঙ্গাই
রাজ্যের রাজাকে হত্যা করার পর থেকেই শুরু হয় রানী ভেলু নাচিয়ারের উত্থানের কাহিনী।
রানী ভেলু নাচিয়ার ভারতের
ইতিহাসে প্রথম যোদ্ধা যিনি মানব বোমার ব্যাবহার করেছিলেন। ইংরেজদের সর্বনাশ করতে
রানী ভেলু নাচিয়ার মানব বোমার ব্যাবহার করে ইংরেজ সেনাকে পরাস্ত করে ইংরেজদের থেকে
নিজের রাজ্যকে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
রানী ভেলু নাচিয়ারের এই মহান
ইতিহাস তৈরির পেছনে যার অবদান সবথেকে বেশি, তিনি হলেন কমান্ডার কুয়িলি (Kuyili)।
বলা হয়, রানী ভেলু নাচিয়ার ও কুয়েলির মধ্যে সম্পর্ক ছিল মা ও মেয়ের মতো। রানীকে
আক্রমন করার অর্থ ছিল কামান্ডোর কুয়েলির সাহসিকতাকে চ্যালেঞ্জ করা।
নিজের বাহুবল ও যুদ্ধকলাকে কাজে
লাগিয়ে কুয়িলি বহুবার রানির প্রাণ রক্ষা করেছিলেন এবং ভিরামাঙ্গাই উপাধি
পেয়েছিলেন। যার অর্থ ছিল বীর নারী। শিবগঙ্গাই রাজ্যকে পুনরুদ্ধার করার জন্য রানী
ভেলু নাচিয়ার তৈরি করেছিলেন সেনাবাহিনী, যার সেনাপতি ছিলেন কুয়েলি। রাজ্যকে বর্বর
অসভ্য ইংরেজদের গোলামী থেকে বের করতে কুয়েলি রানিমার নেতৃত্বে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নেয়।
ভেলু নাচিয়ার জানতেন, ব্রিটিশদের
হারানোর জন্য সবথেকে সহজ উপায়, তাদের অস্ত্রগার ধ্বংস করা। ব্রিটিশদের অস্ত্রগার ছিল
এক দুর্গ, যেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কুয়েলি রাজ্যকে
বাঁচানোর নিজেকে মানব বোমা করে ব্রিটিশদের অস্ত্রগার উড়িয়ে দেওয়ার সিধান্ত নেয়।
যেমন সিধান্ত সেই মতো শুরু হয় কাজ। বিজয়া দশমীর দিন কুয়েলি নিজের শরীরে তেল ও ঘি মেখে নিয়ে প্রবেশ করে অস্ত্রগারে। সেখানেই নিজেকে মানব বোমা তৈরি করে তথা নিজের শাড়িতে আগুন লাগিয়ে ঝাপিয়ে পরে গোলা বারুদের উপর। যার পরেই নিমেষের মধ্যে কুয়েলির বলিদানের মধ্যে দিয়ে ধ্বংস হয়ে যায় অস্ত্রগার। আর অবস্থার সুযোগ নিয়ে রানিমা ভেলু নাচিয়ার তাঁর সেনা নিয়ে ইংরেজদের উপর আক্রমন হেনে রাজ্যকে পুনরুদ্ধার করেন।
১৭৮০ সালে তিনি দেশ পরিচালনা
করার জন্য মারুদু ভাইদের হাতে ক্ষমতা দেন। এর কয়েক বছর পর, ২৫শে ডিসেম্বর ১৭৯৬ সালে, ভেলু নাচিয়ার মারা যান।
লক্ষণীয় রানী ভেলু নাচিয়ার
একমাত্র রানি ছিলেন যিনি নিজের রাজ্যকে ইংরেজদের থেকে ছিনিয়ে আনতে পেরেছিলেন। তবে
দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, ভারতের ইতিহাসে এই মহান
বীরাঙ্গনাদের কাহিনীকে লুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। রানী লক্ষীবাঈ-এর কথা আমাদের ইতিহাস
বইতে জায়গা পেলেও, রানী ভেলু নাচিয়ার-এর জন্য এক লাইনও খরচ করা হয়না, অথচ তিনি-ই
প্রথম ভারতীয় রানী যেনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
আসুন, এই লেখাটিকে বেশি বেশি করে
মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে আমাদের অন্তরের শ্রদ্ধা জানাই এই বীরাঙ্গনা-কে।
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)
