এককালে এভারেস্টে ওঠার মানে ছিল বিশ্বের গম্ভীরতম গিরিশৃঙ্গগুলির উদাসীন নির্জনতায় প্রকৃতির বিশালতার মুখোমুখি হওয়া৷ আর আজকের দিনে বছরের যে ক'টা দিন এভারেস্টে চড়া যায়, সে ক'দিন পিঁপড়ের মতো সারি দিয়ে পর্বতারোহীদের বাঁধা পথ ধরে উপরে উঠতে দেখা যায়; যে পথে দড়ি লাগানো থাকে, সিঁড়ি পাতা থাকে অস্থায়ী ব্রিজের কাজ করবে বলে, সমস্ত মালপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শেরপা থাকে, এমনকি নিজের অক্সিজেন সিলিন্ডার-টাও বয়ে নিয়ে যেতে পারেন না কেউ কেউ; তবুও তাঁরা এভারেস্ট জয়ী হিসেবে সম্মানিত হন। অথচ অজানা, দুর্গম পথ অতিক্রম করে, নিজেরা নিজেদের পথ খুঁজে নিয়ে যে দুজন এভারেস্টের চূড়ায় প্রথম পা রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম তেনজিং নোরগের আজ প্রয়াণ দিবস। এই অসীম সাহসী কিংবদন্তী পর্বতারোহীকে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি মানুষটিকে একটু ভালো করে জেনে নেওয়া যাক।
![]() |
| এভারেস্ট শৃঙ্গে তেনজিং নোরগে |
না, সঠিকভাবে নিশ্চিত করে জন্মের দিন জানা যায়নি এই প্রবাদ প্রতিম পর্বতারোহীর। নেপালের শোলোখুম্বু জেলার ত্সে-ছু গ্রামে এক শেরপা পরিবারে ১৯১৪ সালের মে-মাসে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর আসল নাম নামগ্যাল ওয়াংদি। বাবার নাম খাংলা মিংমা এবং মায়ের নাম দোকমো কিন-জোম।
ছোটবেলায় তেনজিংকে স্থানীয় এক বৌদ্ধমঠে লামা হওয়ার জন্য শিক্ষিনবিশী করতে পাঠানো হয়। এই বৌদ্ধবিহারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লামা তার নাম পরিবর্তন করে তেনজিং নোরগে রাখেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তেনজিং মঠ ছেড়ে বাড়ি পালিয়ে আসেন। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ১৮ বছর বয়সে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে তেনজিং বারো জন সঙ্গীর সঙ্গে দার্জিলিং শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু ভারত-নেপাল সীমান্তে তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে তেনজিংকে এক স্থানীয় নেপালী আশ্রয় দেন। সেখান থেকে তেনজিং দার্জিলিংয়ের নিকটবর্তী আলুবাড়ীতে যান ও দুধ বিক্রি শুরু করেন। হিউ রাটলেজের নেতৃত্বে ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ব্রিটিশ এভারেস্ট পর্বত অভিযানে মালবাহকের কাজ পেতে ব্যর্থ হওয়ার পরে তিনি তার বাড়ি ফিরে আসেন। কিছুদিন পরেই অবশ্য তেনজিং আবার দার্জিলিং চলে আসেন এবং টংসুং বস্তিতে বসবাস শুরু করেন।
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে জীবনের প্রথম পর্বতারোহণ অভিযান এরিক শিপটনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ এভারেস্ট পর্বত অভিযানে মালবাহক হিসেবে সুযোগ পান, দৈনিক বারো আনা মজুরিতে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পর্বতারোহণের কলাকৌশল শিখেছিলেন এই সুযোগে। এই দল বাইশ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত নর্থ কল অব্দি আরোহণ করতে সক্ষম হন।
সেই বছরেই বসন্ত কালে ভারতীয় ডাক বিভাগের কর্মী কুকের নেতৃত্বে কাব্রু শৃঙ্গ অভিযানে তেনজিং মালবাহক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু অভিযান সফলতা লাভ করে না।
হিউ রাটলেজের নেতৃত্বে ১৯৩৬ ব্রিটিশ এভারেস্ট পর্বত অভিযান এবং ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে গিবসন ও মার্টিনের সঙ্গে বন্দরপুঞ্ছ শৃঙ্গে অভিযান সফল না হওয়ার পরেও হ্যারল্ড উইলিয়াম টিলম্যানের নেতৃত্বে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ব্রিটিশ এভারেস্ট পর্বত অভিযান দলে জায়গা পান। এই অভিযানে ২২,০০০ ফুট উচ্চতার নর্থ কলে চার নম্বর শিবির স্থাপনের পরে ২৫,৮০০ ফুট উচ্চতায় পঞ্চম শিবির স্থাপনের সময় দুজন শেরপা অসুস্থ হয়ে পড়লে নোরগে পুনরায় নেমে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ও জ্বালানী নিয়ে ঐ একই পথ ঐ দিনে আবার উঠে আসেন। পরের দিন ২৭,০০০ ফুট উচ্চতা অব্দি আরোহণ করে ষষ্ঠ শিবির স্থাপন করেও ফিরে আসতে হয়।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে কানাডার পর্বতারোহী স্নিটন দম্পতির সঙ্গে হিন্দুকুশ পর্বতমালার ২৫,২৬০ ফুট উচ্চতার অভিযান ও ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে গিবসন ও মার্টিনের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বন্দরপুঞ্ছ শৃঙ্গ অভিযান অসফল হওয়ার পরে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে কানাডার আর্ল ডেনম্যানের সাথে প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই এভারেস্ট পর্বত অভিযানে যোগদান করেন। অপ্রচলিত পথে রংবুক হিমবাহে পৌঁছে ফিরে আসতে হয় উপযুক্ত সরঞ্জামের অভাবে।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের আন্দ্রে রসের নেতৃত্বে সুইস পর্বতারোহী দলের সঙ্গে ২২০০০ ফুট উচ্চতার কেদারনাথ পর্বতশৃঙ্গ অভিযানে শীর্ষগামী দলের আলফ্রেড সুটার ও ওয়াংদি নোরবু রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় পা পিছলে হাজার ফুট নিচে পড়ে গেলে তেনজিং আঘাতপ্রাপ্ত নোরবুকে উদ্ধার করে নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছে আবার শিবিরে ফিরে এসে শীর্ষ আরোহণ করেন। কেদারনাথ শীর্ষ আরোহণ তেনজিংয়ের জীবনের প্রথম শৃঙ্গ জয়। সেই বছরেই ঐ একই দলের সঙ্গে তেনজিং তিব্বত সীমান্তের বলবালা ও কালিন্দী শৃঙ্গ সর্বপ্রথম জয় করেন।
১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে গিবসনের আমন্ত্রণে তেনজিং তৃতীয়বার বন্দরপুঞ্ছ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং রয় গ্রিনউড ও শেরপা কিন চোক শেরিংকে সঙ্গে করে সর্বপ্রথম এই শৃঙ্গ জয় করেন। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে থর্নলের নেতৃত্বে নাঙ্গা পর্বত অভিযানে থর্নলে এবং ক্রেসের মৃত্যুতে অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে রোগার ডুপ্লের নেতৃত্বে ফরাসীদের নন্দাদেবী অভিযানে তেনজিং যোগদান করেন। নন্দাদেবী মূল শৃঙ্গ আরোহণ করে ডুপ্লে ও গিলবার্ট ভিগনেস নিখোঁজ হয়ে গেলে তেনজিং এবং ডুবো ফিরে আসেন। এরপর ১৯৫১ সালের শরতে তেনজিং সুইজারল্যান্ডের জর্জ ফ্রের নেতৃত্বে কাং পর্বত অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু অভিযান অসফল হয়, কারণ ফ্রে পিছলে গিয়ে হাজার ফুট নিচে পড়ে গিয়ে মারা যান এবং তাকে বাঁচাতে গিয়ে তেনজিংয়ের একটা আঙুল ভেঙে যায়।
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের বসন্তকালে তেনজিং সুইজারল্যান্ডের এডওয়ার্ড উইস-ডুনান্টের নেতৃত্বে এভারেস্ট অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। জেনেভা স্পার ধরে বরফের ধাপ কেটে সিঁড়ি বানিয়ে ও দড়ি খাটিয়ে ২৬-শে মে সকাল দশটায় তাঁরা সাউথ কল পৌঁছে ষষ্ঠ শিবির স্থাপন করেন। সাউথ কল থেকে শেরপারা ক্লান্তিজনিত কারণে নেমে গেলে একদিনের খাবার, একটি তাঁবু ও চারটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে সাউথ কল থেকে ল্যাম্বার্ট, ফ্লোরি, আউবার্ট ও তেনজিং নোরগে শীর্ষের দিকে আরোহণ শুরু করেন। বরফের ঢাল পার হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব শৈলশিরা ধরে উঠে প্রায় ২৮,০০০ ফুট উচ্চতা উচ্চতায় শিবির স্থাপন করা হলে ফ্লোরি ও আউবার্ট নেমে যান। পরের দিন ল্যাম্বার্ট ও তেনজিং ২৮,২০০ ফুট উচ্চতা অব্দি পৌঁছে নেমে আসার সিদ্ধান্ত নেন, যা পর্বতারোহণের ইতিহাসে রেকর্ডে পরিণত হয়। পরে শরৎকালে তিনি গ্যাব্রিয়েল চেভালের নেতৃত্বে সুইস দলের এভারেস্ট অভিযানে অংশগ্রহণ করেন, কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে ২৬,৫৭৫ ফু উচ্চতা থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন।
১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে জন হান্টের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের এভারেস্ট পর্বত অভিযানে তেনজিং অংশগ্রহণ করেন। মার্চ মাসে বেস ক্যাম্প তৈরী করে ধীরে ধীরে দলটি সাউথ কলে তাদের অন্তিম শিবির স্থাপন করেন। ২৬-শে মে টম বুর্দিলঁ ও চার্লস ইভান্স শৃঙ্গজয়ের প্রচেষ্টা অসফল হলে দলপতি হান্ট, তেনজিং ও নিউজিল্যান্ডের পর্বতারোহী এডমন্ড হিলারিকে শৃঙ্গজয়ের চেষ্টা করতে নির্দেশ দেন। ২৮-শে মে আং ন্যিমা, আলফ্রেড গ্রেগরি ও জর্জ লোর সহায়তায় তাঁরা ২৭,৮৮৭ ফু উচ্চতায় তাঁদের শিবির স্থাপন করলেও ন্যিমা, গ্রেগরি ও লো নিচে ফিরে যান। এরপরের যাত্রা শুধুই হিলারি ও তেনজিংয়ের। ত্রিশ পাউন্ড ওজনের সরঞ্জাম নিয়ে তাঁরা শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা শুরু করেন। সকাল ১১:৩০ মিনিটে এভারেস্ট পর্বত শৃঙ্গ জয় করেন। অপ্রতিরোধ্য এভারেস্টে এভাবেই প্রথম অঙ্কিত হয় মানুষের পদচিহ্ন। পাঁচবারের প্রয়াসে এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় বলে তেনজিং নোরগের অদম্য জেদ আর অধ্যাবসায়ের কথা।
পর্বতশৃঙ্গে তাঁরা পনেরো মিনিট ছিলেন। এই সময় হিলারি তেনজিংয়ের আলোকচিত্র তোলেন। এই আলোকচিত্রে তেনজিংকে তার বরফ-কুঠার তুলে ধরে থাকতে দেখা যায়। তার বরফ-কুঠারে জাতিসংঘ, ইংল্যান্ড, নেপাল ও ভারতের পতাকা লাগানো ছিল। তাঁদের শৃঙ্গজয়ের ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে তাঁদের দুইজনকে ঘিরে নেপাল ও ভারতে জনমানসে প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস তৈরী হয়। হিলারি ও হান্ট নাইট উপাধিতে ভূষিত হন এবং তেনজিংকে জর্জ পদক প্রদান করা হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৪৪ সালে দাওয়া ফুটি নামের এক শেরপা মেয়েকে বিয়ে করেন তেনজিং। তাঁদের একমাত্র সন্তান নিমা দর্জি মাত্র ৪ বছর বয়েসেই মারা যান। তাঁদের দুই কন্যা পেম পেম এবং নিমা। পেম পেম –এর পুত্র তাসি তেনজিং পরবর্তী সময়ে এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহণ করেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তেনজিং আং লাহমু নামের এক মহিলাকে বিবাহ করেন, যিনি প্রথম স্ত্রীর পিসতুতো বোন ছিলেন। শেরপা রীতি মেনেই তেনজিং ডাক্কু নামের এক মহিলাকে বিবাহ করেন, দ্বিতীয় স্ত্রী জীবিত থাকাকালীনই।
১৯৫৪ সালে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট স্থাপনের পরে তেনজিং নোরগে তাঁর ফিল্ড ট্রেনিং-এর প্রথম ডাইরেক্টার হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৮ সালে তিনি “তেনজিং নোরগে এডভেঞ্চার” নামের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৫৯ সালে নোরগেকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে ভারত সরকার।
১৯৮৬ সালের ৯-ই মে দার্জিলিং শহরে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের কারণে মারা যান তেনজিং নোরগে নামের এক অসাধারণ পর্বতারোহী। তাঁকে সমাহিত করা হয় হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে।
তাঁর স্মৃতি প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে প্লুটো গ্রহের ১১০০০ ফিট উঁচু পর্বত শৃঙ্গের নাম রাখা হয়েছে তেনজিং মন্টেস।
