হো চি মিন - মানুষের মুক্তিসংগ্রামের বিশ্বনেতা

সমগ্র বিশ্বের স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষের নেতা হিসেবে যে কজন মানুষের নাম সর্বাগ্রে নেওয়া হয়, তাঁদের মধ্যে একজন হলেন হো চি মিন। ভিয়েতনাম স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা ও ভিয়েতনাম জাতির প্রাণপুরুষ হো চি মিন ১৮৯০ সালের ১৯-শে মে জন্মগ্রহণ করেন; এই মহান বিপ্লবীর জীবন, ভাবনা ও সংগ্রামের কাহিনী জানার মধ্যে দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রয়াস হিসবে এই লেখা। 

হো চি মিন

হো চি মিন তাঁর আসল নাম নয়, এটি তাঁর ছদ্ম নাম। তাঁর প্রকৃত নাম নগুয়েন থাট থান।  পরবর্তীতে দেশের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসায় তিনি পরিচিত হন নুয়েন আই কুয়োক (দেশপ্রেমিক নুয়েন) নামে। আরো পরে তাঁর নাম হয় হো চি মিন বা আলোর দিশারী। 

ফরাসি আশ্রিত রাজ্য আন্নামের নগেয়ান প্রদেশের হোয়াংট্রু গ্রামটি তাঁর জন্মস্থান হলেও শৈশব কাটে কিম লিয়েন গ্রামে। বাবা নগুয়েন হুই ওরফে নগুয়েন সিন সাক ছিলেন ক্ষেতমজুর পরিবারের সন্তান।

হো চি মিনকে প্রথমে গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করে দেন বাবা, সেখানে খুব ভালো ফলাফল করায় পরে শহরের এক হাইস্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয় তাঁকে। শহরে এসেই বুঝতে পারলেন নিজেদের মাতৃভূমিতে কোনো অধিকার নেই। তখন তাঁদের দেশ শাসন করছে ফরাসিরা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফরাসি। অন্য শিক্ষকরা ভিয়েতনামি হলেও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস নেই। স্কুলের এসব পরাধীনতা তাঁর মধ্যে বিপ্লবী চেতনা উদ্রেক করে। 

১৯০৮ সালের কৃষক আন্দোলনের সাথে স্কুল জীবনেই হো চি মিন জড়িয়ে পড়েন। ১৯১০ সালে তিনি প্রায় ৫০০ কিমি পথ অতিক্রম করে ফান থিয়েট শহরে আসেন। এখানেই তিনি পরিচিত হন দেশপ্রেমিকদের এক গোপন বিপ্লবী সংগঠনে। হো চি মিন এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে প্রচারপত্র বিলি করতেন এবং বোঝাতেন, অত্যাচারী ফরাসিদের দেশ থেকে বিতাড়িত না করলে দেশের মানুষের মুক্তি নেই। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠলেন বিপ্লবী আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। আর এ জন্য ফরাসি গুপ্তচর বাহিনীর শ্যেন দৃষ্টি পড়ে তাঁর ওপর।

১৯১১ সালের ২ জুন তিনি ট্রিভিলি জাহাজে সহকারী রাঁধুনির কাজ নিয়ে পরের প্রায় তিন বছর সময় তিনি ঘুরে বেড়ান ইউরোপ, আমেরিকা এবং আফ্রিকার বিভিন্ন বন্দরে। এই জাহাজে ঘুরতে ঘুরতে তিনি ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর, আফ্রিকা পেরিয়ে নিউইয়র্কে ভিড়লেন। দেখলেন স্বপ্নের আমেরিকায় দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষ। মোহমুক্তি ঘটতে দেরি হল না। জাহাজে চেপে এসে পড়লেন লন্ডনে। এখানে নিলেন হোটেল বয়-এর চাকরি। এই তিন বছর অবসরে পড়তেন ইতিহাস বই ও সংবাদপত্র। 

নানা দেশ ঘুরে ঘুরে হো চি মিন ১৯১৭ সালে পৌঁছলেন প্যারিসে। দেখতে পান ভিয়েতনামে উপনিবেশ গড়ে তোলা ফরাসিদের সঙ্গে সামান্যতম মিল নেই প্যারিসের মানুষের। সুস্থ সংস্কৃতির চেতনায় উদ্বুদ্ধ রুশো, ভলতেয়ারের দেশের মানুষদের দেখে তিনি মুগ্ধ হন। স্থির করেন বিপ্লবের জন্মভূমি ফ্রান্স থেকেই অর্জন করবেন বিপ্লবের মন্ত্র। জীবিকার জন্য কাজ নিলেন ছবির দোকানে তুলি দিয়ে রিটাচার করা। যে ঘরে থাকতেন সেখানে থাকত কিছু প্রবাসি ভিয়েতনামী। এই বাড়ির কর্তা ফ্যান ভ্যান ট্র্যং এবং তাঁর সাথে যোগাযোগ ছিল ভিয়েতনামের কিছু জাতিয়তাবাদীর, যাঁদের নেতা ছিলেন ফ্যান চু ত্রিন (১৮৭২ - ১৯২৬) -এর। পরিচয় ঘটলো ফরাসি সমাজতান্ত্রিক নেতাদের সঙ্গে। তিনি যখন ফ্রান্সে বসবাস কালীন তাঁর মানসে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয়। ফ্রান্সের শ্রমিক শ্রেণীর নেতাদের সাথে সেই সময় তাঁর বেশ ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়।

১৯২০ সালে তিনি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। সেই বছর প্যারিসে ফরাসি সোস্যালিস্ট পার্টির অধিবেশনে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিদের সাথে হো যোগ দিয়েছিলেন ভিয়েতনামের প্রতিনিধি হিসেবে। বিশ্বের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেন ভিয়েতনামের ওপর ফরাসিদের শোষণ আর অত্যাচারের কথা। হো বুঝতে পারলেন, দেশের মানুষের সম্মিলিত ঐক্য আর সংগঠনের মাধ্যমেই গড়ে তুলতে হবে বিপ্লব। তিনি গড়ে তুললেন ভিয়েতনামি বিপ্লবী তরুণ সংঘ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২৩ সালে তিনি মস্কোয় অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে যোগ দেন। ভিয়েতনামের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে তিনি ‘ভিয়েতমিন’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেন। ভিয়েতনামের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পরিচালনায় তাঁর এই সংগঠন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯২৫-২৬ সালে তিনি সংগঠিত করেন ‘তরুণ শিক্ষা শ্রেণি’। ১৯২৬ সালের অক্টোবরে জেং জুয়েমিন-কে বিয়ে করেন এবং কমিন্টার্ন এর প্রতিনিধি মিখাইল বরোদিনের (১৮৮৪ - ১৯৫১) বাড়িতে বসবাস করেন। ১৯২৭ সালের এপ্রিলে তিনি পুনরায় মস্কো যান। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে কিছুদিন ক্রিমিয়ায় থাকেন।

১৯২৯ সালে তাঁর গোপন সংগঠন ‘থান নিয়েন’, হংকং শহরে মিলিত হয়ে গোপনে ইন্দো-চায়নিজ কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের জন্য বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। অবশেষে ১৯৩০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। ১৯৩০ সালের অক্টোবরের পার্টির প্রথম প্লেনামে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির নাম পালটে রাখা হলও ইন্দোচিনের কমিউনিস্ট পার্টি। 

১৯৩১ সালের জুনে হংকং-এ বন্দি হলেন। কিছুদিন পর মুক্তি পেয়ে মস্কো গেলেন। ১৯৩৮ সালে চিনে আসার অনুমতি পেলেন। 

১৯৪১ সালের পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বেই স্বাধীনতা সংগ্রাম বজায় থাকে। ১৯৪২-৪৩ সালে মোট ১৩ মাস তিনি চিয়াং কাই শেক (১৮৮৭-১৯৭৫) এর জেলে বন্দি ছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভিয়েতনামের দুই প্রধান শত্রু যখন পুরোপুরি পরাজিত ঠিক সেই সময় হো তাঁর গেরিলা বাহিনী এবং অন্যান্য মুক্তিফৌজের সমবেত সাহায্যে জনতার সম্মুখে ভিয়েতনামকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ২-রা সেপ্টেম্বরে ঘোষণা করেন এবং প্রতিষ্ঠিত হয় কমিউনিস্ট শাসিত ডেমোক্রাটিক রিপাবলিক অফ ভিয়েতনাম সরকার

কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ শেষে মিত্রশক্তির চক্রান্তে আরও নগ্নভাবে দেশটিতে নব্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো আসন গেড়ে বসে এবং ফ্রান্স পুনরায় দেশটি দখল করে নেয়। হো চেয়েছিলেন ফ্রান্সের সাথে একটি সমঝোতায় আসার। কিন্তু তারা কখনই তাঁর দাবি মেনে নেয়নি। অবশেষে ভিয়েতনামিদের গেরিলা যুদ্ধের কৌশল এবং দাপটের কারণে ফ্রান্সের বাহিনী পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ভিয়েতনামকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়।

উত্তর ভিয়েতনাম এবং দক্ষিণ ভিয়েতনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চক্রান্তে পুনরায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। মার্কিন মদতপুষ্ট দিয়েম সরকার জেনেভা চুক্তি অনুসারে ভিয়েতনামের সংযুক্তির প্রস্তাব বাতিল করে। অনিবার্য সংঘাত পুনরায় দেশটিকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনসনের নির্দেশে জেনারেল ওয়েস্টমোরল্যান্ড-এর নেতৃত্বে প্রায় ১,৮৮,০০০ মার্কিন সেনা ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নেয়। দশ বছর স্থায়ী এই যুদ্ধে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে স্বাধীনতাকামী মহান যোদ্ধাদের নৈতিকভাবে সমর্থন যোগায়। হো চি মিনের নেতৃত্বে, যুদ্ধে ভিয়েতনাম জয়লাভ করে। পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তির এমন নির্লজ্জ পরাজয় উপভোগ করে পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী আপামর জনতা।

১৯৫৪ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত, তিনি ভিয়েতনামের উত্তরাঞ্চলের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং স্বদেশের পুনরায় একত্রীকরণ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অনেক ঘটনার পর ১৯৭৬ সালের ২-রা জুলাই উভয় ভিয়েতনাম একীভূত হয়।

দীর্ঘকালের কঠোর বিপ্লবী জীবন তাঁর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেছিলো গুরুতরভাবে। ১৯৬৯ সালের ৩-রা সেপ্টেম্বর কমরেড হো চি মিন গুরুতর হৃদরোগের কারণে মৃত্যুবরণ করেন; বয়স ছিলো ৭৯ বছর।

দক্ষিণ ভিয়েতনামের স্বাধীনতা অর্জনের পর সেখানকার পূর্বতন রাজধানী সাইগনের নাম পাল্টে হো চি মিন শহর রাখা হয় তাঁর সম্মানার্থে। ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান পৃথিবীর মুক্তিকামী ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কমরেড হো চি মিনের জীবন আজো দুনিয়ার শোষিত-নিপীড়িত মানুষের কাছে অসামান্য প্রেরণা। বিশ্বের মানুষের কাছে তিনি বিপ্লবের প্রতীক।

তিনি বলতেন এক অমোঘ কথা ‘মুক্তি ও স্বাধীনতার চেয়ে কোনো কিছুই অধিক মূল্যবান নয়’। পৃথিবীতে যতদিন শ্রেণিভেদ থাকবে ততদিন মানুষ মুক্তির লড়াইয়ে হো চি মিনকে মনে রাখবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন