শম্ভু মিত্র - বাংলা নাটকে রেনেসাঁর প্রতিভু

শ্মশানের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীটি মধ্যরাতের শ্মশানযাত্রীদের দেখে ও মৃত মানুষটির নাম জেনে প্রশ্ন করেছিলেন, “ইনি কি সেই শম্ভু মিত্র? যিনি নাটক করেন?” উত্তর পাননি। পাওয়ার কথা নয়। কারণ, নিজের শেষ ইচ্ছাপত্রে ঘনিষ্ঠজনেদের প্রতি স্পষ্ট নির্দেশ ছিল তাঁর, “আমি সামান্য মানুষ, জীবনে অনেক জিনিষ এড়িয়ে চলেছি। তাই মরবার পরেও আমার দেহটা যেন তেমনি নীরবে, একটু ভদ্রতার সঙ্গে, সামান্য বেশে, বেশ একটু নির্লিপ্তির সঙ্গে পুড়ে যেতে পারে।

শম্ভু মিত্র
এহেন মানুষটি, যিনি বাংলা নাটককে করে তুলেছিলেন ঐতিহ্যিক প্রবাহের সঙ্গে ঐশ্বর্যবান ও আধুনিক, সেই শম্ভু মিত্রের প্রয়াণ দিবস ছিলো গতকাল। কেমন ছিলেন নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষের পর বাংলা নাট্যজগতের সর্বাধিনায়ক? আসুন জেনে নেওয়ার একটা প্রয়াস করা যাক।

শম্ভু মিত্রর জন্ম ১৯১৫ সালের ২২-শে অগস্ট কলকাতার ডোভার রোডে। বাবা শরৎকুমার, মা শতদলবাসিনী। শম্ভুরা তিন ভাই, পাঁচ বোন। পাঁচ বোনের মধ্যে একজন শৈশবেই মারা যান। শরৎকুমার, হুগলি জেলার কলাছড়া গ্রামের জমিদার বংশের ছেলে হয়েও কোনও দিনই জমিদারি বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার গ্রন্থাগারে চাকরি করতেন। অন্য দিকে মা শতদলবাসিনী ছিলেন ভবানীপুরের স্বনামধন্য ডাক্তার আদ্যনাথ বসুর কন্যা। কলকাতার ডোভার রোডে একটি বাড়ি তিনি যৌতুক দিয়েছিলেন জামাইকে। শতদলবাসিনী খুব বেশি দিন বাঁচেননি। কিন্তু শম্ভুর জীবনে মায়ের প্রভাব এতটাই ছিল যে, খারাপ কাজ করার কথা ভাবতে পারেননি। তাঁর শুধু মনে হত, ‘মা আকাশ থেকে সব দেখছেন 

শম্ভু মিত্রর পড়াশোনার শুরু বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে। এখানে পড়ার সময় থেকেই অভিনয় ও আবৃত্তির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হতে শুরু করে। তাঁর সঙ্গে একই ক্লাসে পড়তেন তাঁর ভাগ্নে দুর্গা, যার সঙ্গে ছাত্রজীবনে তিনি নাটক করেছেন কখনও স্কুলে, কখনও বকুলবাগানের গোল মাঠে। অন্য যে আগ্রহটি ছেলেবেলায় ক্রমশ তাঁর মনের মধ্যে চেপে বসেছিল, তা আবৃত্তি। প্রতিবেশী প্রবোধ মিত্র অল্প বয়সে তাঁকে আবৃত্তিতে উৎসাহী করে তুলেছিলেন। মুখস্থ করে ফেলার এক অদম্য অভ্যেস ছিল তাঁর। মুখস্থ করার নেশা এবং ক্ষমতা এতটাই ছিল যে, ‘সঞ্চয়িতাকিংবা তারও পূর্বে প্রকাশিত চয়নিকা’, গোটাটাই মুখস্থ বলতে পারতেন, এমনকি কোন্ পৃষ্ঠায় কোন্ কবিতা আছে তা পর্যন্ত বলে দিতে পারতেন।

১৯৩১ সালে শম্ভু প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর যদিও ভর্তি হলেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে, কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি তিনি আগ্রহ হারিয়ে কলেজ ছেড়ে দেন। এর পরই বাবার সঙ্গে দুই ভাই চলে যান উত্তরপ্রদেশ। তত দিনে শরৎকুমার অবসর নিয়েছেন। প্রথমে লখনউ, তার পর ইলাহাবাদ। ইলাহাবাদে থাকার সময় থেকেই শম্ভু মিত্র শরীর এবং স্বরের চর্চা সমান ভাবে চালাতে থাকেন। সেই সঙ্গে ছিল পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করে নিজেকে তৈরি করার আপ্রাণ চেষ্টা। নাটক, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব প্রভৃতি নানা বিষয়ের বই তিনি পড়তে শুরু করেন।

১৯৩৬-৩৭ সালে শম্ভু মিত্র ফিরে এলেন কলকাতায়। প্রথম ঠিকানা, ছেলেবেলার বন্ধু বিশ্বনাথ মিত্রর বাড়ি। সেখান থেকে ল্যান্সডাউন রোডে জ্যোতিনাথ ঘোষের বাড়ি। যাঁকে তিনি ডাকতেন জ্যোতিনাথদা বলে। এইখানে শম্ভু থাকতেন গৃহকর্তার ভাইয়ের মতো। জ্যোতিনাথের ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। এই বাড়িই তাঁকে শম্ভু মিত্রহয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। জ্যোতিনাথ তাঁকে থিয়েটার, সিনেমা দেখাতেন, বিদেশি বই জোগাড় করে দিতেন। শরীরচর্চা, স্বরচর্চা একই ভাবে চলত। থিয়েটারের প্রেমে মগ্ন শম্ভু মিত্র আকস্মিক ভাবে নিছক চ্যালেঞ্জজানিয়ে থিয়েটার পাড়ায় যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা? শম্ভু মিত্রর ভাষায়, “গিয়ে দেখি কোথায় সেই কল্পনার থিয়েটার! একটা পার্ট ধরিয়ে দিলে, এতটুকু একটা কাগজের মধ্যে খুদে খুদে অক্ষরে লেখা। বলল, কাল সন্ধেবেলায় এটা অভিনয় করবেন।এই ভাবেই শম্ভু মিত্র যুক্ত হলেন রঙমহলথিয়েটারে, সম্ভবত ১৯৩৯ সালে।

এই রঙমহল থিয়েটারেই তাঁর প্রথম দেখা হয়েছিল গুরুমনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের সঙ্গে। যাঁকে তিনি ডাকতেন মহর্ষি। মহর্ষির প্রজ্ঞা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যেন ওই নামকে সার্থক করেছিল। পরম স্নেহে ও ভালবাসায় তিনি কাছে টেনে নিয়েছিলেন শম্ভুকে। আমৃত্যু অটুট ছিল এই সম্পর্ক।

রঙমহলে কয়েকটি পুরনো নাটকে অভিনয় করার পর তিনটি নতুন নাটক মালা রায়’, ‘রত্নদীপঘূর্ণি’ -তে অভিনয় করেন। প্রখ্যাত অভিনেতা ভূমেন রায় এর পর তাঁকে নিয়ে যান মিনার্ভাথিয়েটারে। সেখানে তখন জয়ন্তীনাটকটি হচ্ছিল। এক দিন এখান থেকেও বেরিয়ে আসেন, কারণ মহর্ষিকে অপমানিত হতে দেখেছিলেন। এ বার ভূমেন রায় তাঁকে নিয়ে এলেন নাট্যনিকেতন’-এ। তারাশঙ্করের কালিন্দীতে শম্ভু মিত্র পেলেন মিস্টার মুখর্জির ভূমিকা। কিন্তু নাট্যনিকেতনও উঠে গেল এক দিন। সেই থিয়েটার চলে এল শিশির ভাদুড়ীর হাতে। শ্রীরঙ্গমনাম নিয়ে নতুন করে শুরু হল তার যাত্রা। মহর্ষি নিয়ে এলেন শম্ভু মিত্রকে। শিশির ভাদুড়ীর নাটক আর অভিনয় ধারার সঙ্গে পরিচয় ঘটল শম্ভুর।

যত দিন যাচ্ছিল কলকাতার রঙ্গালয়ের পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। ১৯৪০-৪১ সালে শ্রীরঙ্গম ছেড়ে বেরিয়ে এসে যুক্ত হলেন কালীপ্রসাদ ঘোষ বি এস সি-র টুরিং কোম্পানিতে। কিন্তু এখানেও বেশি দিন থাকেননি। কারণ তত দিনে তিনি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন। যুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ, মন্বন্তর, দাঙ্গা চল্লিশের দশককে উত্তাল করে তুলেছিল। এর কিছু আগে তৈরি হয়েছিল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন। যার থেকে পরে গণনাট্য সংঘর জন্ম। এই সংগঠনের ছাতার তলায় বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও সাহিত্যিকরা সমবেত হতেন।

২৬ বছরের যুবক শম্ভু, বোমা পড়ার ভয়ে শহর কলকাতা যখন প্রায় নাগরিকশূন্য, সেই একাকিত্বের মধ্যে লিখেছিলেন তাঁর প্রথম নাটক উলুখাগড়া’, শ্রীসঞ্জীব নামে। তবে তাঁর সেই অসহায় অবস্থা কেটে গিয়েছিল ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের ডাক পেয়ে। ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটের বাড়িতে পা রেখে এমন সব মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন, যাঁরা জনতার মুখরিত সখ্যেথাকতে চান। এমন ইচ্ছে তাঁরও মনে তখন দানা বাঁধছিল। আজীবন তিনি তাঁর নাটকের মধ্য দিয়ে সেই চেষ্টাই করে গিয়েছেন। গণনাট্য সংঘশম্ভু মিত্রকে প্রথম সেই পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিল।

১৯৪২-৪৩ সালে বিনয় ঘোষের ল্যাবরেটরিও বিজন ভট্টাচার্যের আগুনমঞ্চস্থ হল। তার পর হল জবানবন্দীনবান্ননবান্নর সাফল্য তো মিথে পরিণত হয়েছে। এর পরিচালক ছিলেন বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্র। এই নাটকই বাংলা নাটকের ইতিহাসে নবনাট্য আন্দোলন সূচিত করে। শম্ভুবাবু তাঁর নাট্যচিন্তার প্রথম সার্থক প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন এই নবান্ননাটকে।

বিজন ভট্টাচার্যর সঙ্গে আগুনকরার সময়ে তৃপ্তি ভাদুড়ির সঙ্গে পরিচয় হয় শম্ভু মিত্রর। দুজনকেই বিজন ভট্টাচার্য নিয়ে এসেছিলেন গণনাট্য সংঘে। পরবর্তী কালে আইপিটিএ-র হয়ে খাজা আহমদ আব্বাস যখন জবানবন্দীনাটকের হিন্দি অনুবাদ শেষ অভিলাষাঅবলম্বনে ধরতী কে লালছবি পরিচালনায় হাত দিলেন, শম্ভুবাবুকেই ডেকে নিলেন ছবির অভিনেতা এবং সহপরিচালক হিসেবে। এই ছবিতে অভিনয় করতে শম্ভু-তৃপ্তি দুজনেই মুম্বই যান। এবং এই শহরেই পরিণয় সূত্রে বাঁধা পড়েন ১৯৪৫ সালের ১০ ডিসেম্বর মুম্বই শহরে খাজা আহমদ আব্বাসের বাড়িতে। বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা। ১৯৪৫ সালে যাঁর বিয়ে ছিল গ্র্যান্ড আই পি টি এ ইভেন্ট’, মাত্র তিন বছর পরে ১৯৪৮ সালে সেই শম্ভু মিত্রই গণনাট্য ও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। সে দীর্ঘ ইতিহাস অনেকেরই জানা।

সেই সময়ে শম্ভু মিত্র ছাড়াও বিজন ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র সহ আরও অনেক বাম মনোভাবাপন্ন গণতান্ত্রিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী শিল্পীরা বেড়িয়ে বিকল্প হিসেবে জন্ম তৈরি করেছিলেন বহুরূপী’-, ওই একই বছরে। যদিও বহুরূপীনামকরণ-টা পরে হয়েছিলো মহর্ষির প্রস্তাব মেনে। প্রথম প্রযোজনা ছিল অবশ্যই নবান্ন। রঙমহলে তা মঞ্চস্থ হয়েছিল অশোক মজুমদার ও সম্প্রদায়নামে।

নবান্নর পর দীর্ঘ এক বছর সময় নিয়েছিলেন শম্ভু মিত্র নিজেকে ও দলের বাকিদের প্রস্তুত করতে। ১১এ, নাসিরুদ্দিন রোডের ফ্ল্যাটে ছিল শম্ভু ও তৃপ্তির সংসার। ওই ফ্ল্যাটে সংসার পেতেছিল বহুরূপীও। এখানে বসেই মিত্র দম্পতি এক দিকে যেমন নিদারুণ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে নবনাট্যের ভিত তৈরি করছিলেন। এই দলের সদস্য হওয়ার সঙ্গে একটি বিশেষ জীবনবোধ ও চর্চার যোগ ছিল। যার কেন্দ্র ছিল দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। আর লক্ষ্য, ‘ভালো নাটক, ভালো করে করে যাওয়া

এই ভাবনা থেকেই একে একে মঞ্চস্থ হতে লাগল পথিক’ (১৯৪৯), ‘উলুখাগড়া’ (১৯৫০), ‘ছেঁড়া তার’ (১৯৫০), ‘বিভাব’ (১৯৫১)। এইভাবেই নবনাট্য আন্দোলন শম্ভু মিত্র ও বহুরূপীর হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছিল অনেকখানি। সেই আন্দোলনকেই আজ আমরা গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন বলে জানি।

চার অধ্যায়বহুরূপীর প্রথম রবীন্দ্রনাটক। খালেদ চৌধুরীর ধারণা, বিষয়ের তাগিদেই একটি উপন্যাসকে নাট্যরূপে উপস্থিত করতে চেয়েছিলেন শম্ভু মিত্র। যদিও সেই সময়ে নাটকটি আপামর বামপন্থী মহলে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল। দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে অভিনীত হয়েছিল নাটকটি। 

১৯৫২ সালে ইবসেনের দশচক্রর পর রক্তকরবীমঞ্চস্থ হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। এই নাটকেই শম্ভু মিত্র ও তাঁর বহুরূপী তাদের পূর্ণ প্রতাপ নিয়ে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিল। রক্তকরবীবাংলা তথা ভারতীয় নাটকে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এ নাটক নিয়ে মুগ্ধতা আমাদের আজও শেষ হয়নি। তবে মনে রাখা দরকার, তৎকালীন বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ এই নাটকের প্রথম দুটি অভিনয়ের পর তা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। 

এর পর পুতুলখেলা’ (১৯৫৮), ‘মুক্তধারা’ (১৯৫৯), ‘কাঞ্চনরঙ্গবিসর্জন’ (১৯৬১), ‘রাজা অয়দিপাউসরাজা’ (১৯৬৪), ‘বাকি ইতিহাস’ (১৯৬৭), ‘বর্বর বাঁশি’ (১৯৬৯), ‘পাগলা ঘোড়াচোপ আদালত চলছে’ (১৯৭১) অবধি শম্ভু মিত্রর নেতৃত্বে বহুরূপী এগিয়ে ছিল উল্কার গতিতে। রক্তকরবীপুতুল খেলা নাটক দুটির নিয়মিত অভিনয় হত নিউ এম্পায়ার হলে, এছাড়াও এই দুই নাটকের প্রদর্শন হয়েছে ভারতের বিভিন্ন শহর, এমনকি ঢাকাতেও। শম্ভুবাবু রাশিয়া-সহ পূর্ব ইউরাপের নানা দেশে বহু বার গিয়েছিলেন সাংস্কৃতিক আমন্ত্রণে, আন্তর্জাতিক নাট্যজগতের সঙ্গে পরিচিত হতে। এ দিকে ১৯৬৮ সালে শুরু হয়েছিল জাতীয় নাট্যমঞ্চগড়ার কর্মযজ্ঞ। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই তিনি মুদ্রারাক্ষসতুঘলক’-এর মতো নাটকও করেছিলেন। যদিও সে স্বপ্ন অধরাই থেকে গিয়েছিল। 

বহুরূপী দলটি চিরকাল এক রকম থাকেনি। কালের নিয়মেই তার ভাঙন শুরু হয়েছিল। একে একে মহর্ষি’, গঙ্গাপদ বসু প্রমুখ বহুরূপীর সদস্য ও স্বজনরা ইহলোক ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। অনেকে দল ছেড়েছিলেন। ১৯৭৮ সালের ১৬-ই জুন বহুরূপীর প্রযোজনায় পুতুলখেলানাটকে শম্ভু মিত্রকে শেষ বারের জন্য মঞ্চে দেখা গিয়েছিল। এর পর বহুরূপীর দফতরে আর তাঁকে দেখা যায়নি। যদিও তাঁকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছিল অনেক পরে। বহুরূপী ছেড়ে গেলেও শম্ভু মিত্র কিন্তু নাটক থেকে দূরে যাননি। অন্য নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনায় মঞ্চে এসেছেন কয়েক বার। ১৯৮০ সালের ১৮ নভেম্বর গ্যালিলি গ্যালিলিওনাটকে নামভূমিকায় শেষ বারের মতো তিনি মঞ্চে এসেছিলেন। ১৯৭৮ সালের ১৫ অগস্ট অ্যাকাডেমিতে শম্ভু মিত্র পাঠ করেন চাঁদ বণিকের পালা

শম্ভু মিত্রর চলার পথ কখনওই মসৃণ ছিল না। বারে বারে দলেরই সদস্যদের বিশ্বাসঘাতকতা, অপমান, অসম্মান তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। তৃপ্তি মিত্রর সঙ্গে বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের দিনগুলি তাঁকে যাপন করতে হয়েছে নীরবে।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে রচিত ক্ষুদ্র একটি ইচ্ছাপত্রে শম্ভুর অভিমান, ক্ষোভ ও বিপন্নতা উন্মোচিত হয়েছে। শম্ভু মিত্র অন্তিম জীবনে সমাজ, রাষ্ট্র, সহযাত্রী ও আত্মজনকে কোন দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিপ্রেক্ষিত জ্ঞানে বুঝতে চাইতেন, এ-ইচ্ছাপত্র যেন তারই নিদর্শন হয়ে থাকলো। এ শুধু প্রামাণিক দলিল নয়, এ-ইচ্ছাপত্রে আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাঁর জীবনদর্শনেরও অনুষঙ্গ। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভন্ডামি ও ক্ষুদ্রতার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ এ-ইচ্ছাপত্র। এ ধরনের ইচ্ছাপত্র বাঙালির চৈতন্যে কি কোনো আঘাত করেছিল? 

(সংকলন তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন