এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন মুক্ত চিন্তার পরিসর ছোটো হয়ে আসছে, ধর্মীয় ভাবাবেগকে হাতিয়ার করে মানুষের মধ্যে ছড়ানো হচ্ছে বিদ্বেষ, সেই সময়ে আড়াইশো বছর আগে ভারতের বুকে জন্ম নেওয়া যে মানুষটি আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন, সেই রামমোহন রায়ের আজ জন্মদিন। এমন যুগসঙ্কট মুহূর্তে রামমোহন রায়ের চিন্তা ও চেতনার দিগন্ত-কে ছুঁয়ে দেখার মধ্যে দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোই এই লেখার উদ্দেশ্য।
![]() |
| রামমোহন রায় |
পলাশীর যুদ্ধের পনেরো বছর পর ১৭৭২ সালের ২২ মে পশ্চিম
বাংলার হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে এক রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে রামমোহন রায়ের
জন্ম। পিতা রামকান্তের তিন বিবাহ। মধ্যমা পত্নী তারিণীর এক কন্যা ও দুই পুত্র, জগমোহন ও রামমোহন। রামমোহনের পিতা রামকান্ত রায় ছিলেন বৈষ্ণবী এবং মাতা
তারিণী দেবী ছিলেন শাক্ত।
রামমোহনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল গ্রামের
পাঠশালায়, যেখানে তিনি বাংলা এবং কিছু সংস্কৃত ও ফারসি শেখেন।
খুবই অল্প বয়সে পড়াশোনা করতে রামমোহন রায়কে পাঠানো হয় ভারতের পূর্বাঞ্চলে
পাটনা শহরে। কথিত আছে তখন তাঁর বয়স ছিল দশেরও কম। পাটনা সেসময় ছিল ভারতে আরবী ও
ফারসি ভাষা শিক্ষার পীঠস্থান। পরে সংস্কৃত ভাষার শিক্ষা আরও পোক্ত করতে এবং হিন্দু
ধর্মশিক্ষা করতে তিনি যান বেনারসে। এর আগে তাঁর সঙ্গে তন্ত্রশাস্ত্রবেত্তা
সুপণ্ডিত নন্দকুমার বিদ্যালঙ্কারের যোগাযোগ হয়। রামমোহনের সংস্কৃতে ব্যুৎপত্তি,
তাঁর বেদান্তে অনুরাগ নন্দকুমারের সহযোগিতায় হয়েছিল।
রামমোহন গবেষক ও ঐতিহাসিকরা বলেন পাটনায় আরবী ও ফারসি
ভাষা শিক্ষাকালে তিনি একেশ্বরবাদের দিকে ঝুঁকেছিলেন এবং হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতা
নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে। তিনি সুফি দর্শনের ব্যাপারেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
হিন্দু ধর্মের আচার ও পৌত্তলিকতা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে বাবা মার সঙ্গে
তাঁর তীব্র বিরোধ বাঁধে এবং পিতা তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করে দেন। আনুমানিক ১৮০৩-০৪
সালে রামমোহন মুর্শিদাবাদ গিয়েছিলেন। সেখানেই আরবি ও ফারসি ভাষায় একেশ্বরবাদ বিষয়ে
তাঁর প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল, যার নাম ‘তুহফাৎ উল মুবাহ ভহিদ্দীন’।
কর্মজীবনের প্রথম দিকে রামমোহন পৈতৃক জমিদারির দেখাশোনা
করতেন,
পরে ১৭৯৬-এ নাগাদ কলকাতায় জোড়াসাঁকো অঞ্চলে মহাজনের কাজ করে নিজে
অর্থোপার্জন শুরু করেন। ১৮০৩ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির কর্মচারী ছিলেন। কলকাতায় তাঁকে প্রায়ই আসতে হ’ত।
এই সুযোগে ভালো করে ইংরেজি শিখে নেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজে
সিভিলিয়ান কর্মচারীদের মধ্যে জন ডিগবির সঙ্গে তাঁর সর্বাধিক ঘনিষ্ঠতা হয় এবং
কোম্পানির কাজে ডিগবির অধীনে তিনি দেওয়ানরূপে রংপুরে কাজ করেন ১৮০৩ থেকে ১৮১৪ সাল
পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে তিনি দু'বার ভুটান সীমান্তে যান
কোম্পানির হয়ে। ডিগবির সাহচর্যে তাঁর সমস্ত নতুন চিন্তা এই সময়ের মধ্যেই
পরিপক্কতা লাভ করে। ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে রামমোহন কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা হন
এবং চৌরঙ্গী ও মানিকতলায় সম্পত্তিও কেনেন। এখন থেকেই প্রকাশ্যে তাঁর
সংস্কার-প্রচেষ্টার শুরু।
রামমোহনের ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে তাঁকে কেন্দ্র করেই একটি
মিত্রগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। ১৮১৫-তে তাঁদের নিয়েই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ‘আত্মীয়
সভা’। প্রতি সপ্তাহে এক দিন এর অধিবেশন হত বিভিন্ন সদস্যদের
বাড়িতে। সেখানে বেদ ও উপনিষদ পাঠ, ব্রহ্মসঙ্গীত পরিবেশন সহ
জাতিভেদ, সতীদাহ, বহুবিবাহ, বিধবাবিবাহ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা হত সদস্যদের মধ্যে। বিশেষ উল্লেখযোগ্য
১৮১৬-তে এই সভারই এক অধিবেশনে ডেভিড হেয়ার হিন্দু কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব রাখেন।
এরপর একেশ্বরবাদ (বা ব্রাহ্মবাদ) প্রতিষ্ঠা করার জন্য
বেদান্ত-সূত্র ও তার সমর্থক উপনিষদগুলি বাংলার অনুবাদ করে প্রচার করতে থাকেন। ১৮১৫
থেকে ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে প্রকাশিত হয় বেদান্তগ্রন্থ, বেদান্তসার, কেনোপনিষদ, ঈশোপনিষদ,
কঠোপনিষদ, মাণ্ডূক্যোপনিষদ ও মুণ্ডকোপনিষদ।
রক্ষণশীল ব্যক্তিরা ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর লেখার কটূক্তিপূর্ণ এবং বিদ্বেষ ভাবাপন্ন
প্রতিবাদ করতে লাগলেন। রামমোহনও প্রতিবাদের প্রতিবাদ করলেন যুক্তি দিয়ে ও
ভদ্রভাষায়। প্রতিবাদ-কর্তারা অবিলম্বে থেমে গিয়েছিলেন। 'বেদান্ত
গ্রন্থ' প্রকাশের সঙ্গে কলকাতায় ২০ আগস্ট, ১৮২৮ খিস্টাব্দে বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদের ভিত্তিতে উপাসনার রীতি প্রচারের উদ্দেশ্যে রামমোহন
"ব্রাহ্মসমাজ" নামে এক নতুন সভা স্থাপন করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল
"নিরাকার ব্রহ্ম", তাই থেকেই নিজেদের ধর্মের নাম
রাখেন ব্রাহ্ম।
বেদান্ত-উপনিষদগুলি বের করবার সময়ই রামমোহন, সতীদাহ যে অশাস্ত্রীয় এবং নীতিবিগর্হিত তা প্রমাণ করে পুস্তিকা লিখলেন 'প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ'। প্রতিবাদে পুস্তিকা
বের হল 'বিধায়ক নিষেধকের সম্বাদ'। তার
প্রতিবাদে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুস্তিকা বের হয়।
জ্যেষ্ঠভ্রাতা জগমোহন রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী
অলোকমণি দেবীর সতী হওয়ার সংবাদ পেয়ে রংপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন রামমোহন। কিন্তু তার
আগেই সুসম্পন্ন হয়েছে পুণ্য সতীদাহ পর্ব! রামমোহনের অন্তর আত্মায় বিদ্ধ হয়ে আগুন
জ্বলে উঠল। সেই অগ্নিকে সাক্ষী রেখে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন নিজের কাছেই। সহমরণ
প্রথা নিষিদ্ধ ও বন্ধ করাই হল তাঁর প্রধান কর্তব্য।
সতীদাহ নিয়ে চূড়ান্ত বিতর্ক বিবাদের ফলে তৎকালীন রক্ষণশীল
হিন্দুসমাজ ক্রমেই রামমোহনের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হয়েছিল। ১৮৩০-এর ১৭ জুন, সংস্কৃত কলেজে এক সভায় হিন্দুধর্ম রক্ষার জন্য রাজা রাধাকান্ত দেব,
রামকমল সেন, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ
রক্ষণশীল নেতৃবর্গ ‘ধর্মসভা’-র পত্তন
করেছিলেন। লর্ড বেন্টিঙ্কের সহযোগিতায় সতীদাহ প্রথা রদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পত্র
জমা দেওয়া, কিংবা ব্যারিস্টার বেথিকে প্রিভি কাউন্সিলে মামলা
লড়তে পাঠানো কোনও কিছুই বাদ যায়নি। অন্য দিকে, রামমোহন
পেয়েছিলেন ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসা আর নিন্দা। শুধু তাই নয়, সমাজে যাঁরা সতীদাহ প্রথা রদের আইনকে সমর্থন করে ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও ফতোয়া জারি হয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে কেউ বিবাহ বা আহার করলে
তিনি জাতিচ্যুত হিসেবে গণ্য হতেন। শোনা যায়, পরিস্থিতি এমনই
হয়ে উঠেছিল যে রাস্তাঘাটে রামমোহনকে নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে চলাফেরা করতে হত। তাই,
যত দিন না পর্যন্ত প্রিভি কাউন্সিল সতীদাহ প্রথা রদের বিরুদ্ধে
রক্ষণশীল গোষ্ঠীর আবেদন পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছিল তত দিন রামমোহনকে দুশ্চিন্তার
মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছিল।
১৮৩০-এর ডিসেম্বর মাসে আইন করে সহমরণ-রীতি নিষিদ্ধ করা
হয়। তবুও গোঁড়ারা চেষ্টা করতে লাগল যাতে পার্লামেন্টে বিষয়টি পুনর্বিবেচিত হয়।
এই চেষ্টায় বাধা দেওয়ার জন্য রামমোহন বিলেত যেতে প্রস্তুত হলেন। এব্যাপারে তাঁকে
আর্থিক সহায়তা দান করেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।
১৮২৪ সালে কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ স্থাপনে গর্ভনর জেনারেল
লর্ড আমহার্স্ট উদ্যোগী হলে রামমোহন তার তীব্র বিরোধিতা করেন। পাশ্চাত্য শিক্ষা
প্রসারের মাধ্যমে ভারতবাসী অজ্ঞতা ও জড়তা থেকে মুক্তি হতে পারবে এই ছিল তাঁর
ধারণা। রাজনৈতিক চিন্তাধারার ক্ষেত্রও
রামমোহন ছিলেন যুগোত্তীর্ণ পুরুষ। ব্রিটিশ শাসনের বিভিন্ন অনিয়মের
বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে সংবাদপত্র বিধি গৃহীত হলে
রামমোহন এর বিরোধিতা করেন।
কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়েও তিনি সজাগ ছিলেন এবং
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রজা - বিরোধী
চরিত্র তুলে ধরেন। এছাড়া, সমর - বিভাগের ভারতীয়করণ, জুরি প্রথা প্রবর্তন ও ফৌজদারি আইন সংকলন প্রভৃতি বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত
ব্যক্ত করেছিলেন। সমকালীন বিশ্বের দুই যুগান্তরকারী বিপ্লব "আমেরিকার
স্বাধীনতা যুদ্ধ" ও "ফরাসি বিপ্লব" রামমোহনকে বিশেষভাবে নাড়া
দিয়েছিল। ইউরোপীয় যুক্তিবাদী দর্শনকেই তিনি শুধু বরণ করেনি ফরাসি বিপ্লব সজ্জাত
"সাম্য - মৈত্রী - স্বাধীনতা" আদর্শও তাঁর চেতনাকে প্রভাবিত করেছিল।
সংবাদ মাধ্যমকে উন্নত করতে রামমোহন তিনটি পত্রিকা প্রকাশ
করেছিলেন। দ্বিভাষিক ‘ব্রাহ্মনিক্যাল ম্যাগাজিন ব্রাহ্মণ সেবদি’,
বাংলায় ‘সংবাদ কৌমুদি’, ও
ফরাসি ভাষায় ‘মীরাৎ-উল-আকবর’।
রামমোহনকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়। প্রায় ৩০টি বাংলা গ্রন্থের তিনি রচয়িতা। তাঁর
রচিত ‘ব্রহ্মসঙ্গীত’, ‘গৌড়ীয় ব্যকরণ’
উল্লেখযোগ্য। শোনা যায়, সে কালের বিখ্যাত
সঙ্গীতজ্ঞ কালীমির্জার কাছে রামমোহন সঙ্গীতশিক্ষা লাভ করে বাংলায় ধ্রুপদ সঙ্গীত
রচনা করেছিলেন। পরে ব্রাহ্মসমাজে এই গান গাওয়ার প্রচলন হয়েছিল। ইংরেজি শিক্ষার
প্রসারে নিজ খরচে তিনি অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল স্থাপন করেছিলেন। এ ছাড়াও ইংরেজি
ভাষায় হিন্দুধর্মের প্রতিশব্দ ‘হিন্দুইজম’ শব্দটি তাঁরই সৃষ্টি।
'রাজা' উপাধি দিয়ে ১৮৩০ সালে
রামমোহন রায়কে তৎকালীন দিল্লির বাদশাহ দ্বিতীয় আকবরের দূত হিসাবে ইংল্যাণ্ডে
পাঠান তাঁকে। বাদশাহ তাঁকে ভার দেন ইংল্যাণ্ডের সরকারের কাছে বাদশাহের ভাতা
বৃদ্ধির সুপারিশ করার জন্য। সেখানে লিভারপুল বন্দরে তিনি সংবর্ধিত হয়েছিলেন। ১৮৩২
সালের শেষের দিকে তিনি প্যারিসে গিয়ে সম্রাট লুই ফিলিপের দ্বারাও সংবর্ধিত
হয়েছিলেন।
মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে আট দিনের জ্বর ভোগের পরে
ব্রিটেনের মাটিতেই ব্রিস্টলে ১৮৩৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর রামমোহন রায়ের মৃত্যু
হয়। মৃত্যুর দশ বছর পরে দ্বারকানাথ ঠাকুর তাঁর সমাধির উপর একটি সুদৃশ্য স্মৃতি
সৌধ তৈরি করিয়েছিলেন।
রামমোহনের চিন্তাধারা ছিল আধুনিক ও প্রগতিশীল। তাঁর দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী, ভাবনা-চিন্তায় তিনি ছিলেন সমসাময়িক মহাপুরুষের চেয়েও অনেক বেশি
অগ্রবর্তী। উনবিংশ শতাব্দীতে রামমোহন যে মুক্ত চিন্তাচেতনার আলো জ্বেলে দিয়ে
গিয়েছিলেন, সেই আলোতেই ভারতে নব-জাগরণের পথটি ত্বরান্বিত
হয়েছিল। অক্ষয় কুমার দত্ত তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেছেন--- "তোমার
উপাধি রাজা। জয় ভূমিখন্ড তোমার রাজ্য নয়। তুমি একটি সুবিস্তর মনোরাজ্য অধিকার
করিয়া রাখিয়াছ। কেবল ভারতবর্ষীয়দের বন্ধু কেন, তুমি জগতের
বন্ধু"।
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)
