হেনরিক ইবসেন – সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার

আধুনিক বাস্তববাদী নাটকের সূত্রপাত যার হাত ধরে, যাকে সম্মান করে বলা হয় আধুনিক নাটকের জনক,  সেই হেনরিক ইবসেনের আজ প্রয়াণ দিবস। নরওয়ের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ লেখক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার ইবসনকে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করবো তাঁকে জানার মধ্যে দিয়ে, যাতে করে আমরা বুঝে নিতে পারি ঠিক কী কী কারণে তাঁকে নরওয়ের জাতীয় প্রতীক বলে আখ্যায়িত করা হয়।

হেনরিক ইবসন

১৮২৮ সালের ২০-শে মার্চ নরওয়ের স্কিয়েনে এক সচ্ছল ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইবসেন। তাঁর বাবার নাম নুড ইবসেনও মায়ের নাম ম্যারিচেন অ্যাটেনবার্গ। তাঁদের জাহাজে করে কাঠ পরিবহনের ব্যবসা ছিল। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর জন্মের কিছুদিন পরেই তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থার বেশ অবনতি ঘটে। তাঁর মা আর্থিক অনটনের দৈন্য থেকে বাঁচার উপায় স্বরূপ ধর্মে মনোনিবেশ করেন। বাবা শিকার হন বিষন্নতার। ইবসেনের যখন আট বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা দেউলিয়া হয়ে যান। তাই শৈশব থেকেই অভাব আর দারিদ্র্যের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি।

পনের বছর বয়সে ইবসেন ফার্মাসিস্ট হওয়ার লক্ষ্যে ঘর ছেড়ে ছোট্ট শহর গ্রিমস্টাডে আস্তানা গাড়েন। এখানেই তাঁর নাটক লেখার সূত্রপাত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উদ্দেশ্যে তৎকালীন ক্রিস্টিয়ানিয়ায় (বর্তমান অসলো) যান, কিন্তু ভর্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পড়ার কারণে সেই চিন্তা বাদ দিয়ে নাটক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে ব্রিঞ্জালফ জারমে (Brynjulf Bjarme) ছদ্মনামে তাঁর প্রথম উপন্যাস ক্যাটিলিনাপ্রকাশ পায়; এটি ছিলো একটি বিয়োগান্তক উপন্যাস। তবে এই উপন্যাসটির নাট্যরূপ মঞ্চায়িত হয় নি। 

১৮৫০ সালেই তিনি লেখেন দ্য বুরিয়াল মন্ড। নাটকটি মঞ্চস্থ হলেও দর্শক ও নাট্যবোদ্ধাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাননি তিনি। তারপর তিনি একে একে লিখলেন সেন্ট জনস ইভ’, ‘লেডি ইঙ্গার অব ওয়েসট্রাট’, ‘দ্য ফিস্ট অ্যাট সোলহগ’, ‘ওলাফ লিলজেক্রানাস’, ‘দ্য ভাইকিংস অ্যাট হেলগেলেন্ড’, ‘লাভস কমেডিদ্য প্রিটেন্ডার্স। কিন্তু এই নাটকগুলোও তাঁকে কোনো সাফল্য এনে দিতে পারেনি।

ইবসেন ১৮৫৮ সালে ক্রিস্টিয়ানিয়াতে আসেন এবং জাতীয় থিয়েটারের সৃজন পরিচালক নিযুক্ত হন। এই সময়েই তিনি পরিচয় হয় সুজানা থোরেনসেন’-এর সঙ্গে এবং তাঁর সঙ্গেই বিবাহের সম্পর্কে আবদ্ধ হন। তাঁদের একমাত্র সন্তান সিগার্ড ইবসেনজন্ম নেয় কিছুদিন পরেই। প্রাথমিকভাবে তাঁরা খুবই অর্থকষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করেছেন। 

এই সময়ে একটি নওরয়েজীয় নাট্যগোষ্ঠীতে যোগ দেন ইবসেন। সেখানে তিনি নাট্যকার, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে প্রায় ১৫০-টি নাটকে কাজ করেন। এই নাট্যগোষ্ঠীতে কাজ করার অভিজ্ঞতাই তাঁর নাট্যজীবনে আনে নতুন মোড়; মনে করা হয় এরই পরিণতিতে তিনি নাট্যসাহিত্যে সোনা ফলাতে সক্ষম হন।

১৮৬৪ সালে তিনি ক্রিস্টানিয়া ত্যাগ করে স্বেচ্ছা নির্বাসনে ইতালি চলে যান। তিনি এর পরের ২৭ বছর আর স্বদেশে ফিরে আসেননি।

১৮৬৫ সালে লেখা ব্র্যান্ডনাটকের মধ্য দিয়ে ইবসেন প্রথম সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ান। এরপর তিনি আরো ১৫-টির মতো নাটক লেখেন। তাঁর লেখা পিয়ার গিন্ট’ (১৮৬৭), ‘এমপেরর অ্যান্ড গ্যালিলিয়ান’ (১৮৭৩), ‘পিলার্স অব সোসাইটি’ (১৮৭৭), ‘আ ডলস হাউস’ (১৮৭৯), ‘গোস্টস’ (১৮৮১), ‘অ্যান এনিমি অব দ্য পিপল’ (১৮৮২)-এর মতো নাটকগুলো তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায়। এ নাটকগুলোর প্রতিটিকেই বিশ্বসাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশেষ করে অ্যা ডলস হাউসব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায়। এটিই বিশ শতকের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার প্রদর্শিত এবং সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনুদিত নাটক। এ নাটকের মাধ্যমে ইবসেন তৎকালীন বৈবাহিক প্রথা-সংসার, সামাজিক নিয়ম-কানুনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং সমাজব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। আবার সেই কারণেও সমালোচিত হন তিনি নিজেও।

অ্যা ডলস হাউস’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র নোরা পৃথিবীর নাট্য-ইতিহাসে প্রথম একজন নারী যিনি তাঁর নিজের সাজানো সংসার ছেড়ে প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়ান স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে। পেছনে তাঁর স্বেচ্ছায় ফেলে আসা সংসার আর সামনে তাঁর অচেনা, অবাধ পৃথিবী। তবু তাঁর আত্মোপলব্ধি, একজন নারী হিসেবে স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের উন্মেষ, পুরুষশাষিত সমাজের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম তাঁকে আলাদা মানুষ হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত করে। নোরা হয়ে ওঠে নারীমুক্তির বিশ্বপ্রতীক।

১৮৮২ সালে রচিত অ্যান এনিমি অফ দ্য পিপলনাটকে বিতর্কই প্রধান আলোচ্য বিষয় এবং পুরো সমাজই ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী। 'অ্যান এনিমি ইফ দ্য পিপল'  প্রধান যে বার্তা এই নাটকটির মাধ্যমে দেয় তা হল, কখনো কখনো একজন ব্যক্তির মতই সঠিক হতে পারে যদিও উল্টো পিঠে সাধারণ জনতা ভিন্ন মত পোষণ করে। সাধারণ জনতাকে এখানে মূর্খ ও ভেড়ার পালের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এর মাধ্যমে তৎকালীন ভিক্টোরিয়ান বিশ্বাস অর্থাৎ সমাজ একটি মহৎ প্রতিষ্ঠান এবং সর্বদা বিশ্বাসযোগ্য - এই ধারণাকে হেঁয় করার সাহস দেখান ইবসেন।

ইবসেনের সময়ে নাটকের সমাপ্তি হতো সত্যের জয় ও সামাজিক মূল্যবোধের গুণগানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ইবসেন এই চিরাচরিত প্রথা ভাঙেন। তিনি বলতেন, আমি যা বিশ্বাস করি, যা দেখি, তা-ই লিখি। তিনি তাঁর দেখা জীবন ও প্রকৃতিকে বস্তুনিষ্ঠভাবেই তাঁর নাটকে স্থান দিয়েছেন। ইবসেন নিজেই এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি যা লিখি তার মধ্যে যদি নিজেকে খুঁজে না পাই, তাহলে পুরোটাই অর্থহীন, মিথ্যা ও ভণ্ডামি হয়ে যাবে। 

প্রথমে তাঁর চিন্তা বিভিন্ন মহলে তীব্রভাবে সমালোচিত হলেও পরবর্তী সময়ে সেই চিন্তাগুলোই সমগ্র ইউরোপে এবং পরবর্তীতে বিশ্বসাহিত্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ইবসেনের চিন্তা জর্জ বার্নার্ড শ, জেমস জয়েস, অস্কার ওয়াইল্ড, আর্থার মিলার, ইউজিন ওনিল ও মিরোসলব করলিজার মতো বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ও নাট্যকারদেরও প্রভাবিত করেছে। ইবসেনের প্রভাব সম্পর্কে জর্জ বার্নার্ড শ বলেছেন, ‘তিনটি বিপ্লব, ছয়টি ক্রুসেড, দুটি বিদেশি আক্রমণ ও একটি ভূমিকম্পের ফল যা হতে পারে, ইংল্যান্ডের ওপর ইবসেনের প্রভাব তার সমকক্ষ।

নাটক যে সমাজকে উপস্থাপন করে, সেটিও নতুনভাবে দর্শকদের উপলব্ধি করান তিনি। ইবসেনের আগে নাটকে রাজা-রানি, বাদশা- বেগম, সেনাপতিঅর্থাৎ বীর ও অভিজাত শ্রেণির চরিত্র চিত্রায়ণ করা হতো। সেখানে জনজীবন ছিল উপেক্ষিত। ইবসেন সাধারণ মানুষের কথা বলেছেন, সামাজিক অসংগতি ও নারীদের অধিকার যথাযথভাবে উপস্থাপন করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। ফলে তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্ব নাট্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারিগর। 

১৯০০ সালের মার্চ মাসে বেশ কয়েকটি স্ট্রোকের পরে ইবসেন ১৯০৬ সালের ২৩-শে মে ক্রিশ্চিয়েনিয়ার আরবিনস গেইডে নিজের বাড়িতে মারা যান। মৃত্যুর আগের দিন ইবসনের শারীরিক অবস্থা কিছুটা হলেও ভালো মনে হয়। সেই অবস্থায় নার্স যখন একজন দর্শনার্থীকে দেখা করার অনুমতি দেন, ইবসেন তাঁর শেষ উক্তি স্বরূপ বলেছিলেন, “অন দ্যা কন্ট্র্যারি। পরের দিন বেলা আড়াইটায় মৃত্যু হয় শেক্সপিয়ারের পরে সবচেয়ে সম্মানিত ও আলোচিত নাট্যকার ইবসেনের।

(সংকলন - তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন