“না, দু’জনে একসঙ্গে নয়। সাগরমাথার চুড়োয় প্রথম পদক্ষেপ ছিল আমার।“
খোদ
তেনজিং নোরগের মুখে এমন কথা শুনে চমকে উঠেছিলেন ওঁর পারিবারিক চিকিত্সক ডা. বিমল
ঘোষাল। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য যে অন্য কথা বলে!
![]() |
| ১৯৫৩-র এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে তেনজিং ও হিলারি |
পাল্টা তিনি প্রশ্ন করেন, “কিন্তু এত দিন যে বলে আসছেন, আপনি আর হিলারি একসঙ্গেই চুড়ো স্পর্শ করেছিলেন?”
তেনজিং
উত্তর দেন, ‘‘সেটা কিছুটা ভয়ে,
কিছুটা ভালবাসায়, আসলে সাহেবরা এ রকমই আমায় বলতে বলেছিল।”
দিন কয়েক আগে তেনজিং
নোরগের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এ কথা বলছিলেন বিমলবাবু।
এভারেস্ট
জয় করে ফেরার পর, মাঝে মাঝেই শারীরিক খুঁটিনাটির
বাইরে দীর্ঘ আলাপচারিতা চলত দু’জনের মধ্যে। এমনই এক
সান্ধ্যকালীন শীতের আড্ডায় ডা. ঘোষালের কাছে এই স্বীকারোক্তি তেনজিংয়ের।
সত্যিই মানুষটি
কত সরল! কত মোহহীন !!
নেপালের
উত্তর-পূর্ব অংশে খুম্বু অঞ্চলের সোলো খুম্বুতে ১৯১৪ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে
জন্ম হয় নামগিয়াল ওয়াংগির। বাবা খাংলা মিংমা ও মা ডোকমার। বাবা ইয়াক পালক।
তেরো ভাই বোনের মধ্যে নামগিয়াল ছিলেন এগারোতম। পরবর্তী কালের তেনজিং।
ছোটবেলা রংবুক
গুম্ফার প্রধান লামা নামগিয়ালের নামকরণ করেন তেনজিং নোরগে।
কৈশোরে
রোমাঞ্চকর অভিযানের নেশায় তেনজিং দু’দুবার পালিয়ে যান বাড়ি থেকে।
প্রথম বার কাঠমাণ্ডু। দ্বিতীয় বার দার্জিলিং। এর পর বাড়ির লোক তাঁকে পাঠিয়ে দেন
থিয়াংবোচে গুম্ফায়, লক্ষ্য ছিল তেনজিং গুম্ফায় পাঠ নিয়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হবে।
কিছু দিন
পরে তেনজিং বুঝতে পারে, সন্ন্যাস ধর্ম তাঁর জন্য নয়।
উনিশ বছর বয়সে তিনি পাকাপাকি ভাবে দার্জিলিংয়ে ‘তু সুং’ শেরপা বস্তিতে বসবাস
শুরু করেন। ঠিক করলেন, এভারেস্টে তাঁকে যেতেই হবে।
১৯৩৫ সাল
থেকে শুরু হয়ে গেল লাগাতার অভিযান। বছরের পর বছর ধরে। শুরুতে তেনজিং ছিলেন নিছকই
মালবাহক মাত্র। কিন্তু প্রথম অভিযানেই তিনি তাঁর জাত চিনিয়ে দেন।
সালতা
১৯৫৩, তেনজিং-এর জীবনে এটি ছিল সতেরোতম এভারেস্ট অভিযান। কলোনেল জন হান্টের
নেতৃত্বে চারশো সদস্যর এই অভিযানে ছিলেন ৩৮২ জন মালবাহক ও ২০ জন শেরপা।
অভিযান
চলাকালীন একটা দুর্ঘটনায় হিলারি হঠাত্ বরফ খাদে পড়ে যান। কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধি
ও তাত্ক্ষণিক দ্রুত প্রচেষ্টায় মৃত্যুর গহ্বর থেকে হিলারিকে ফিরিয়ে আনেন
তেনজিং। সে দিন থেকে তেনজিংয়ের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ হিলারি। এর পর থেকে হিলারি-তেনজিং
একই দড়িতে ক্লাইম্বিং পার্টনার হিসাবে নতুন উদ্যমে অভিযান শুরু করলেন।
এভারেস্ট
অভিযানের বেস ক্যাম্প তৈরি হয় বরফ খাদে ভরা খুম্বু হিমবাহর নীচে। শুরু হয়
পরবর্তী অভিযানের ক্যাম্প তৈরির কাজ। মে মাসে সাউথ কল-এর ২৫৯০০ ফুট উপর তৈরি হয়
সামিট ক্যাম্প। এত দিন আবহাওয়া মোটামুটি ভালই ছিল। কিন্তু সামিট ক্যাম্প তৈরি
হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া গেল বিগড়ে। শুরু হল প্রচণ্ড তুষার ঝড়।
মে ২৬।
ডেপুটি লিডার ইভান, তাঁর সঙ্গী বরিলিয়ানকে নিয়ে
অন্তিম আরোহণের জন্য চূড়ার দিকে যাত্রা শুরু করলেন। তখন আবহাওয়া ভালই। এ বার জয়
প্রায় নিশ্চিত। এভারেস্ট হাতের মুঠোয় আসবেই! কিন্তু অক্সিজেন সিলিন্ডার গোলমাল করল। চূড়োর
মাত্র তিনশো ফুট নীচ থেকে ফিরে এলেন ইভান-রা।
দলনেতা জন
হান্ট বুদ্ধিমান। কালক্ষেপ না করে তেনজিং-হিলারিকে পাঠিয়ে দিলেন। সামিট ক্যাম্প
ওঁরা দখল নিলেন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার জন্য দু দিন ক্যাম্পে বন্দি রইলেন।
তেনজিং-এর মনে তখন আবার ভয়। খুব ভেঙে পড়লেন তিনি। বয়সও বেড়ে যাচ্ছে। তখনই তিনি
আটত্রিশ। এর পর শরীর যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এ বারও কি হিমালয় খালি হাতে ফিরিয়ে
দেবে তাঁকে?
হান্ট এ
বার আস্তিনের শেষ তাসটি ফেললেন। ২৮ মে তিন জনের একটি সহযোগী দল পাঠালেন। তাঁরা
সামিট ক্যাম্প থেকে এগিয়ে ২৭ হাজার ৯০০ ফুটে একটি তাঁবু গেড়ে নীচে বেস ক্যাম্পে
ফিরে এলেন।
এ বার
তেনজিংরা প্রস্তুত। সুন্দর ঝকমকে সকাল। শুরু হবে সর্বোচ্চ শৃঙ্গের দিকে শতাব্দীর
সেরা অভিযান। শুধু সময়ের অপেক্ষা। প্রস্তুত হয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়েই হিলারির
মাথায় বাজ পড়ল। তিনি আবিষ্কার করলেন, তাঁর চামড়ার বুট জোড়া বরফে জমে
গিয়েছে ভুলবশত আগের দিন বিকেলে বাইরে শুকোতে দিয়ে জুতো জোড়া ভিতরে আনতে ভুলে
গিয়েছিলেন। তা হলে কি আজ এগোনো হবে না!
প্রায় দু’তিন ঘণ্টার চেষ্টায় অবশেষে ভিজে জুতোয় পা গলানো গেল। এর পর বাকিটা ইতিহাস।
১৯৫৩
সালের ২৯ মে। সকাল সাড়ে এগারোটা। প্রথম বারের মতো এভারেস্ট চূড়া স্পর্শ করলেন
দুই অভিযাত্রী তেনজিং নোরগে আর স্যার এডমন্ড হিলারি। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে উড়ল
ইউনিয়ন জ্যাক। দুজনে শিখরে কাটালেন মিনিট পনেরো।
শৈশব থেকে
নিজের জন্মের তারিখটা সঠিক জানতেন না তেনজিং। এভারেস্ট জয়ের পর ২৯-শে মে
তারিখটাকেই তিনি জন্মদিন হিসেবে উদ্যাপন করতেন। এই অভিযানের পর সত্যিই তো এক নতুন
তেনজিংয়ের জন্ম হয়েছিল পৃথিবীর বুকে। তাঁকেই বোধহয় মনে মনে স্বীকৃতি দিতে
চেয়েছিলেন তেনজিং!
এভারেস্ট
অভিযানের পরে খুব সিগার খাওয়ার অভ্যেস তৈরি হয়েছিল ওঁর। স্টাইল করে সিগার খেতেন।
এমনিতে তেনজিং ‘ছাং’
খেতে খুব ভালবাসতেন।
স্কচ-হুইস্কি প্রায় ছুঁতেনই না। প্রথম জীবনে নস্যি নিতেন। আর সবাইকে বলতেন, নস্যি নিলে নাকি পাহাড়ে খুব ভাল চড়া যায়। খাবারের মধ্যে তাঁর স্ত্রীর
হাতে তৈরি মোমো ছিল অসম্ভব প্রিয়।
প্রবীণ
পর্বতারোহী অমূল্য সেন ছিলেন তেনজিংয়ের বিশেষ পরিচিত। তাঁর সঙ্গে একসময় ‘ইনস্ট্রাকটর কোর্স’ করেছিলেন তিনি। অমূল্য সেন বলেন, সদাহাস্যময় তেনজিং সব সময় চিন্তা করতেন কী ভাবে বাঙালি পর্বতারোহী তৈরি করা
যায়। নেপালে জন্মালেও ভারতের প্রতি তাঁর ছিল আমৃত্যু নাড়ির টান।
শেষ বয়সে
দার্জিলিং-এর ঠান্ডা হাওয়া তেনজিংয়ের সহ্য হত না। অন্তত শীতের মাস ক’টা শিলিগুড়ির মহানন্দা নদীর পাশে থাকার ইচ্ছে ছিল। একটা বাড়িও ঠিক হয়ে
গিয়েছিল। কিন্তু সে বাড়িতে শেষ পর্যন্ত তাঁর আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
এভারেস্টে
অভিযান সফল হয়েছিল। বহু চেষ্টার পর। কিন্তু কোথায় যেন এই অভিযান নিয়ে এক চাপা
দুঃখ আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন তেনজিং। না,
সে দুঃখ এভারেস্ট
প্রথম স্পর্শ করার কথা লুকিয়ে রাখা নয়। তিনি বলতেন,
“প্রথম এভারেস্ট জয়
করলাম বটে, কিন্তু শিখরে ভারতের তেরঙা পতাকা ওড়াতে পারলাম কই!”
এভারেস্ট
জয়ের সুখ পেয়েও এই অপূর্ণ স্বাদ তাঁকে আমৃত্যু পীড়া দিয়ে গিয়েছে।
তবে বাঙালি
পর্বতারোহী তৈরি করার স্বপ্ন কিন্তু সফল হয়েছে তেনজিং-এর।
শুধু কি বাঙালি পুরুষ? বাঙালি মেয়েরাও যে বাঁধনছেঁড়া আবেগে পৌঁছে যাচ্ছে তেনজিংয়ের মহাতীর্থে।
কৃতজ্ঞতা - আনন্দবাজার পত্রিকা
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

প্রকৃত তথ্যগুলো তারিনী খুড়োর সংকলন থেকে জানলাম, কিছুটা আগেই জানতাম।
উত্তরমুছুনশেয়ার করছি।