পিট সিগার – গান ছিলো যার হাতিয়ার

গান ছিল তাঁর হাতিয়ার। সেই গানের লক্ষ্য প্রতিবাদ, নিজের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ তোলা। অন্যকে নিজের সঙ্গে শামিল করে গাওয়া এই গান। চৌরাস্তার মোড়ে, স্টেডিয়ামে, ব্যারিকেডের সামনে, হাজার মানুষের সঙ্গে মিছিলে চলতে চলতে তিনি গান গেয়েছেন সব সময় সবাইকে নিয়ে।

বিশ্বের লক্ষ লক্ষ নিপীড়িত মানুষের কন্ঠ পিট সিগার

মার্কিন লোকসঙ্গীতকে নয়া জীবন প্রদান করা পিট সিগারের আজ জন্মদিন। আজীবন সাধারণ মানুষের গান গেয়েছেন যে মানুষটি, আসুন তাঁকে আর একটু ভালো করে চিনে নেওয়া যাক তাঁর জন্মদিনে।

১৯১৯ সালের ৩-মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন শহরের এক সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা চার্লস সিগার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত শেখাতেন, আর মা কনস্ট্যান্ট সিগার একজন দক্ষ বেহালাবাদক ছিলেন যিনি জুয়েলিয়ার্ড স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের বেহালা বাজানো শেখাতেন। তিন ভাই-বোনের মধ্যে পিট ছিলেন সবার ছোট। তাঁর বড় ভাই মাইক পরবর্তীকালে ‘নিউ লস্ট সিটি র্যােম্বলারস’ গানের দলের সদস্য, আর বোন পেগি একজন লোকসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে খ্যাত হয়েছিলেন।

সঙ্গীত পরিবারের একজন উত্তরসূরী হিসেবে ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক পরিমন্ডলে নানা বাদ্যযন্ত্রের হাতেখড়ি হয় তাঁর। কোনো স্বরলিপি অনুসরণ করে গানের তালিম নেন নি; শুধু কানে শুনে, অনুশীলনের মাধ্যমে শেখেন পিয়ানো, এ্যাকর্ডিয়ান বাজানো শেখেন ছোটোবেলাতেই। পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে শৈশবে প্রতিদিন নিয়ম করে বাবা-মা আর ভাই-বোনের সাথে তাঁর সঙ্গীতের পাঠ নিতে হতো।

শৈশব থেকেই পিট সিগার বেশ প্রতিভাধর ছিলেন, পড়াশোনায় ছিলেন বেশ মনোযোগী। পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী এই ছাত্র অ্যভন ওল্ড ফার্মসে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৩৬ সালে বৃত্তি পেয়ে ভর্তি হন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সেখানে দুই বছর পড়াশোনার পরে, তৎকালীন মার্কিন সমাজে তরুণদের মধ্যে হিপি হওয়ার যে প্রবণতা ছিলো, পিটও সেই জোয়ারে গা ভাসালেন। হিপিদের সাথে ছন্নছাড়া জীবনে মেতে উঠলেন। পড়াশোনা শিকেয় উঠলো। পিট পড়াশোনার ইতি টানেন এখানেই।

যখন পিটের বয়স ১৬ বছর, তখন এক গ্রীষ্মের দিনে বাবার সাথে তিনি ঘুরতে যান নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাশভিলের একটি লোকজ মেলায়, যেখানে বিভিন্ন রকম বাদ্যযন্ত্রের প্রদর্শনী চলছিল। হঠাৎই পিটের চোখ এক অন্য ধরনের বাদ্যযন্ত্রের উপর আটকে যায়। সেই প্রথম পিট সিগার ব্যাঞ্জোর প্রেমে পড়লেন। এই যন্ত্রটি মার্কিন লোকসঙ্গীতের সাথে ঐতিহ্যগতভাবে যুক্ত ছিল। এই পাঁচ তারের ব্যাঞ্জোই পরবর্তীকালে হয়ে উঠলো তাঁর পরবর্তী গানের প্রধান হাতিয়ার। আর এই ব্যাঞ্জোকে সঙ্গী করে সঙ্গীতের প্রতি পিটের নতুন করে আগ্রহ জন্মাতে শুরু করে। 

১৯৩৬ সালে ১৭ বছর বয়সে, পিট সিগার ইয়াং কমিউনিস্ট লীগ (ওয়াইসিএল)-এ যোগদান করেন, তারপর লীগের সবচেয়ে জনপ্রিয়তা এবং প্রভাবের সময়ে ১৯৪২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিস্ট পার্টির (CPUSA) একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন।

১৯৪০ সালে পিট সিগার প্রথম গান লেখা নিয়ে মনোযোগী হন। এই সময়ে, মিলার্ড ল্যাম্পেল এবং লি হেইসের সাথে যুক্ত হয়ে 'অ্যালম্যান্যাক সিঙ্গারস' নামে লোকসঙ্গীতের একটি দল তৈরি করেন। তাঁদের প্রথমদিকের তৈরি গান ‘The Talking Union Blues’ শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এরপর  ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে তাঁদের শান্তিবাদী গান ‘The Balled of October 16’ আমেরিকার সমাজে গানের এক নতুন ভাষা তৈরি করে। 

১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় সবকিছু থমকে যায়। সামরিক এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে মার্কিন সব তরুণের মতো ব্যান্ডের সব সদস্যকেই আমেরিকার সৈন্যদলে যোগ দিতে হয়। সামরিক প্রশিক্ষণও নিতে হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পিট 'সিঙ্গ আউট' নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। লেখালেখির পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি একক সঙ্গীতের অনুষ্ঠান করতে শুরু করেন।

১৯৪৯ সালে নিউ ইয়র্কের গ্রিনউইচ গ্রামের এক স্কুলে পিট সঙ্গীতের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫০ সালে অ্যালম্যান্যাক দলটি নতুন করে গড়ে তুলে দলের নাম পরিবর্তন করে রাখেন 'দ্য ওয়েভার্স'। এই বছরেই পুরনো লোকসঙ্গীতের সংকলন নিয়ে তাঁদের বেশ কয়েকটি গানের অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ‘On Top of Old Smokey’, ‘‘Michael Row the Boat Ashore’, ‘It Takes a Worried Man’, গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এই ব্যান্ড দলের সদস্যদের লেখা ও সুরে গাওয়া ‘If I Had a Hammer’ এবং ‘Kisses Sweeter Than Wine’ দারুণ সমাদৃত হয়।

১৯৫৩ সালের দিকে পিট বাম ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁদের সমর্থনে নানা প্রতিবাদে নিজেকে এবং তাঁর দলকে সম্পৃক্ত করায় তাঁরা মার্কিন সরকারের বিরাগভাজন হয় পড়ে। তখন ওয়েভার্সকে কোথাও গান করার অনুমতি দেয়া হতো না। ফলে দলের কার্যক্রম থমকে যায়।

১৯৫৫ সালে পিট ‘সিং আউট’ ম্যাগাজিনে ‘Where Have All the Flowers Gone?’ নামের একটি কবিতা প্রকাশ করেন। সেই সময়ে তাঁর গাওয়া ‘Where Have All the Flowers Gone?’ এবং ‘Turn, Turn, Turn’ প্রভৃতি গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ষাট থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত তাঁর বেশ কয়েকটি গানের অ্যালবাম দারুণ প্রশংসিত হয়। তাঁর অ্যালবামে গাওয়া গানগুলোর মধ্যে ‘God Bless The Grass’, ‘Dangerous Songs!’, ‘American Industrial Ballads’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

প্রথাবিরোধী গান গাওয়ার পাশাপাশি আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের পুরনো হারিয়ে যাওয়া লোকগান পুনরুদ্ধারে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। লোকসঙ্গীতের প্রতি ভালবাসা তাঁকে লোকসঙ্গীতের উৎস খুঁজতে উৎসাহিত করে। প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ অ্যালান লোমেক্স  এবং সঙ্গীতশিল্পী রিঙহামকে সাথে নিয়ে প্রাচীন ও প্রচলিত লোকসংগীত সংরক্ষণের এক উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং People's Music Library নামে একটি আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৪০ থেকে ১৯৫০ এর আমেরিকার শ্রমিক আন্দোলন, সামাজিক অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে পিটের গানের কথা ও সুরে। ষাটের দশকের স্নায়ুযুদ্ধের সময় পিট সিগারের গাওয়া প্রতিবাদী গণসঙ্গীতকে সরকার খুব একটা ভাল চোখে কখনোই দেখেনি। এর মধ্যে পিট নিউ ইয়র্কে দুগ্ধজাত শিল্পের কর্মীদের ধর্মঘটে অংশ নেন। ১৯৬১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয় এবং তাঁকে আন-আমেরিকান অ্যাক্টিভিটিস কমিটিতে ডাকা হয়। কিন্তু পিট সিগারের রাজনৈতিক বিশ্বাস, দর্শন এবং চিন্তা-ধারণাকে কিছুতেই বাগে আনতে সক্ষম হয়নি প্রশাসন।

ষাটের দশেকের আমেরিকা জুড়ে চলা ‘সিভিল রাইটস আন্দোলনে’র অন্যতম পুরোধা ছিলেন পিট সিগার। মার্কিন সরকারের জনবিদ্বেষী, হঠকারী নীতি এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে, এমনকি ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা সরকারের বিরুদ্ধতায় গান লেখেন তিনি। মুক্তিপাগল মানুষের প্রতিনিধি পিট সিগার বরাবরই যুদ্ধবিরোধী ছিলেন। যুদ্ধের বিপক্ষে মানুষকে সচেতন করতে তাই মঞ্চকেই বেছে নিলেন তিনি। ম্যানহাটনের স্কুলের বারান্দায়, নিউ ইয়র্কের পথ চলতি ব্যস্ত রাস্তার ধারে, সর্বত্রই তাঁর ব্যতিক্রমী সুর ঝড় তুলতে শুরু করে। শুরু হলো তাঁর বারুদের বিরুদ্ধে ব্যাঞ্জোর মূর্ছনা, অশান্তির বিরুদ্ধে ভালোবাসার স্লোগান।

পিট সিগারের এই ভূমিকায় মার্কিন প্রশাসন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কারাবন্দী করা হলো তাঁকে। তারপরও তাঁকে থামানো যায়নি। যেকোনো যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে সব সময় সোচ্চার ছিলেন পিট সিগার। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে ইরাকের যুদ্ধ, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলন, ওয়াল স্ট্রিট দখল অভিযান থেকে হাডসন নদী বাঁচাও আন্দোলন- সব জায়গায় শান্তিকামী, অহিংস জনতা তাঁর গানে আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে, পেয়েছে প্রতিবাদের নতুন স্লোগান।

তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলছে। আমেরিকায় একটি অনুষ্ঠানে পিট সিগার গান গাইছেন। অনুষ্ঠান শেষে গ্রিন রুমে ভিয়েতনাম-ফেরত এক অচেনা যুবক দেখা করতে আসেন কমিউনিস্ট’ পিট সিগারের সাথে। তিনি বলেন, ‘মিস্টার সিগার, আমি আজ আপনাকে খুন করতে এসেছি’! হতভম্ব ভাবটা কাটার পর পিট পুলিশ না ডেকে সেই যুবকের সঙ্গে কথা বলতে বসেন। কিছু ক্ষণ বাদে দেখা যায়, দু’জনে মিলে একসঙ্গে গান গাইছেন: “হোয়্যার হ্যাভ অল দ্য ফ্লাওয়ার্স গন”। চলে যাওয়ার আগে তরুণটি বলে যান: আই ফিল ক্লিন। 

পিট তাঁর জীবনের শেষ কয়েকটি বছর নিয়োগ করেছিলেন নিউইয়র্কের হাডসন নদীর পুনরুদ্ধারে। দীর্ঘদিনের অবহেলায় নদীটির জল দূষিত হয়ে পড়ে। গান দিয়েই তিনি মানুষকে আহ্বান করলেন নদী বাঁচাতে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে প্রায় মৃত সেই নদীতে তিনি তার পুরোনো শ্রী ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

গানের মাঝপথে থেমে প্রায়ই বলতেন একটি গল্প। পঞ্চাশের দশকে নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে একটা পোস্টার নিয়ে দাঁড়িয়েছিল একজন। একাকী। পথচারীদের টিটকিরি গায়ে না মেখে। একজন তো সোজা প্রশ্ন করে বসেন, রাগিয়ে দেওয়ার ছলে, “মাঝরাত্তিরে পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে আছ যে, দুনিয়াটা বদলাতে পারবে?” খুব শান্ত গলায় পোস্টারধারী উত্তর দেয়, “হয়তো আমি বদলাতে পারব না কাউকে, কিন্তু দুনিয়াটা পাল্টাতে পারবে না আমাকেও।”

নাগরিক অধিকার আন্দোলনের এনথেম হিসেবে পরিচিত গান ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ পিটের কারণেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায়, এমনকি বাংলাতেও, সে গান রয়েছে। পিট সিগার বিশ্বের ৫০টির মতো দেশে গান গেয়ে শুনিয়েছেন।

২০১৪ সালের ২৭ জানুয়ারি ৯৪ বছর বয়সে থামলো ব্যাঞ্জোর জাদু। জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরষ্কার হিসেবে পেয়েছেন সারা বিশ্বের অসংখ্য মানুষের ভালবাসা। বিশ্বের লক্ষ লক্ষ নিপীড়িত মানুষের পক্ষে আজীবন লড়াই করে গেছেন এই নির্ভীক শিল্পী।

গানের শক্তিতে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন পিট। গান ও হাতের ব্যঞ্জো নিয়ে পিট পৃথিবী বদলাতে চেয়েছিলেন। তিনি চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর গান রয়ে গেল আমাদের জন্য। পৃথিবী এখনো বদলায়নি, কিন্তু তেমন বদল যে সম্ভব, পিট আমাদের সে বিশ্বাসে উজ্জীবিত করে গেছেন।

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন