মার্ক্সের জীবনের কম আলোকিত দিক সমূহ

মানবজাতির অন্যতম সেরা শিক্ষকদের একজনের আজ জন্মদিন, তিনি কার্ল মার্ক্স। সারা বিশ্বের আপামর মানব জাতির ‘চেতনার জাগরণ ঘটানো’ এই মানুষটিকে নিয়ে এতো লোকের এতো লেখা আছে যে, নতুন করে তাঁর সম্বন্ধে লেখার প্রয়োজন পরে না। আজ তাই এই মহান মানুষটির কিছু বিশেষ দিক তুলে ধরার চেষ্টা করবো।



০১) কার্ল মার্কসের প্রথম হাইস্কুল ট্রিয়ার জিমন্যাশিয়ামের উপর কড়া পুলিশি নজরদারি রাখত প্রুশিয়ান সরকার৷ কারণ সরকারের ধারণা ছিল, এই স্কুলের শিক্ষকরা অতিরিক্ত উদারবাদী৷

০২) বাধ্যতামূলকভাবে সৈন্যদলে নিয়োগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন মার্ক্স। কারণ তাঁর বুকের অবস্থা ভালো ছিলো না এবং গভীর রাত পর্যন্ত জেগে কাজ করা, খারাপ ডায়েট, মদ্যপান এবং চেইন ধূমপানের কারণে সেটি আরও বেড়ে গিয়েছিল।

০৩) কথায় অত্যন্ত দৃপ্ত ও শক্তিশালী হলেও মার্ক্স শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল ছিলেন। জীবনের বহু বছর ধরেই মার্ক্স মাথাব্যথা, চোখের প্রদাহ, জয়েন্টে ব্যথা, অনিদ্রা, লিভার এবং পিত্তথলির সমস্যা এবং বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ছিলেন।

০৪) কার্ল মার্ক্স যে সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন তার মূলে ছিলেন লুডভিগ ফন ভেস্টফালেন, যিনি আবার মার্ক্সসের পিতার বন্ধুও। সেই লুডভিগ ফন ভেস্টফালেনের কন্যা জেনি ফন ভেস্টফালেনকে ভালোবেসে ফেলেন বয়সে চার বছরের ছোটো মার্ক্স। ১৮৪৩ সালের ১৯ জুন তারা দু’জন ট্রিয়ারের কাছে ক্রোয়েটসনাখ শহরে খ্রিস্টান মতে বিবাহ করেন।

জেনি মার্ক্সও তার পিতার উত্তরাধিকার বহন করেছেন। তিনিও ছিলেন বিদুষী মহিলা। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর জানাশোনা ও লেখাপড়া ছিল। শুধু মেধার দিক থেকেই নয়, একজন নারী হিসেবে তিনি যথেষ্ট আকর্ষণীয় ছিলেন। জেনি মার্ক্সসের মত একজন নারীকে কার্ল মার্ক্স স্ত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন বলেই হয়ত কার্ল মার্ক্স হতে পেরেছিলেন একজন সমাজ পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক দার্শনিক ও বিপ্লবী! জেনি মার্ক্সসের মেয়ে এলিনর মার্ক্স এভেলিং তার মা’কে স্মরণ করে লিখেছিলেন, স্ত্রী জেনী মার্ক্সসের সহায়তা না পেলে কার্ল মার্ক্স কোন কিছুই করে যেতে পারতেন না।

আর কার্ল মার্ক্সও, জেনি মার্ক্সকে ছাড়া ছিলেন যেন হালবিহীন বা পালবিহীন নৌকার মতো। ম্যারী গ্যাব্রিয়েল ’লাভ এন্ড ক্যাপিটাল: কার্ল এন্ড জেনী মার্ক্স এন্ড বার্থ অব এ রেভ্যলুশন’ বইয়ে কার্ল মার্ক্সসের জীবনে জেনি মার্ক্সসের অপরিহার্যতা সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছিলেন, ’ তিনি (জেনি মার্ক্স) কার্ল মার্ক্সসের শুধুমাত্র একজন বন্ধু এবং প্রণয়ী বা প্রেমিকাই ছিলেন না। তাঁদের দু’জনের মধ্যে পরিণয় বন্ধনের ১৩ বছর আগে থেকেই জেনি মার্ক্স ছিলেন কার্ল মার্ক্সসের বিশ্বস্ত বৌদ্ধিক আলোচনার সহসাথী। জেনি মার্ক্সকে ছাড়া কার্ল মার্ক্সসের মন এবং মস্তিষ্ক কোনটাই কাজ করত না (Neither his heart nor his head functioned without her.)। 

০৫) মার্ক্স জীবনে কখনও কোনও চাকরি করেননি৷ তবে তিনি ১৮৫১-৬২ পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউন-এর ইউরোপিয়ান করেসপন্ডেন্ট ছিলেন৷ একবার তিনি রেল দপ্তরের কেরানির পদে চাকরির আবেদন করেছিলেন বটে, তবে কৃতকার্য হননি।

০৬) ১৮৪০-এর দশক জুড়ে, মার্ক্স নিজেকে ‘দেশহীন’ এক মানুষ হিসাবে আবিষ্কার করেন। প্রুশিয়া থেকে তাঁকে ১৮৪২ সালে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, ১৮৪৪ সালে ফ্রান্স থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। ১৮৪৮ সালে বেলজিয়াম তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে। ১৮৮৪ সালে আবারও তাঁকে প্রুসিয়া থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। তিনি ১৮৪৯ সালে ইংল্যান্ডে চলে যান, কিন্তু ব্রিটেন তাঁকে নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করে এবং প্রুসিয়া তাঁকে পুনরায় নাগরিকত্ব প্রদান করতে অস্বীকার করে।

০৭) ১৮৪৯ সালের গোড়ার দিকে তিনি ইংল্যান্ডে চলে আসার সময় থেকে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মার্ক্স এবং তাঁর পরিবার চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করেছেন। লন্ডনে পৌঁছানোর এক বছরের মধ্যেই, ভাঁড়া দিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তাঁকে তার দুটি কক্ষের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের করে দেওয়া হয়। পাওনাদারদের হাত থেকে রেহাই পেতে তাঁকে নিজের নাম অবধি পরিবর্তন করতে হয়। কোনো একদিন এমনও হয়েছে যে মার্ক্স গৃহবন্দী হয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ তার স্ত্রী জেনি বাচ্চাদের মুখে খাবার জোগাতে শেষ সম্পদ হিসেবে মার্ক্সসের প্যান্টটি বন্ধক রাখতে বাধ্য হন।

০৮) কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর লেখক বা “দুনিয়ার মজদুর এক হও” স্লোগানের জনক মার্ক্স কিন্তু প্রেমের অসামান্য কিছু কবিতা লিখেছেন, যেগুলির বেশীরভাগই সেই সময়কার যখন তিনি জেনির সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। একটি কবিতায় তাঁকে লিখতে দেখা যায় (বাংলায় তর্জমা করে) “আগামী শতাব্দী দেখতে চলেছে প্রেমই জেনি আর জেনিই প্রেমের নাম”।

তাই হতে পারত। কিন্তু প্রেমিক মার্ক্সকে আড়াল দার্শনিক মার্ক্স তাঁর ছায়া বিস্তারিত করল এমন প্রবলভাবে যে আমরাও রীতিমতো উপেক্ষা করে গেলাম এক অবিসংবাদী প্রেমের আখ্যানকে।

মার্ক্স ছাপ্পান্নটি কবিতা (যার বেশীরভাগই প্রেমের কবিতা), একটি উপন্যাস (স্করপিয়ন অ্যান্ড ফেলিক্স) এবং একটি নাটক (উলানেম) লিখেছিলেন, যার কোনওটিই জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি৷

০৯) মার্কস চার্লস ডারউইনকে ‘দাস ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ডের একটি কপি ১৮৭৩ সালে পাঠিয়েছিলেন৷ সে বছরই ১ অক্টোবর, মার্কসকে লেখা এক চিঠিতে ডারউইন লেখেন- ‘Though our studies have been so different, I believe that we both earnestly desire the extension of knowledge, & that this is in the long run sure to add to the happiness of mankind.’

১০) মার্কস চেকারবোর্ড খেলায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। মার্ক্স রচিত 'ম্যানিফেস্টো ওফ দ্যা কমিউনিস্ট পার্টি' এবং 'দাস ক্যাপিট্যাল' বই দুটি-ই ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ ডকুমেন্ট হিসেবে স্বীকৃত। 

১১) একটি অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে এঙ্গেলসসহ ১১ জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন মার্ক্সের শেষকৃত্যে। কার্ল মার্ক্সের মৃত্যু সম্পর্কে বন্ধু এঙ্গেলস লেখেন: ‘১৪ মার্চ বেলা পৌনে তিনটায় জীবিতদের মাঝে সেরা চিন্তাবিদ তাঁর চিন্তার পরিসমাপ্তি ঘটান। মাত্র দুই মিনিটের জন্য আমরা তাঁকে রেখে বাইরে গিয়েছিলাম, ফিরে এসে তাঁকে তাঁর আর্মচেয়ারে বসা অবস্থায় পেলাম, তিনি ততক্ষণে শান্তিতে নিদ্রায় গিয়েছেন—চিরদিনের জন্য।’

১২) ১৮৮৩ সালের ১৪ই মার্চ ৬৪ বছর বয়সে জীবনাবসানের পর মার্ক্সকে লন্ডনের হাইগেট সমাধিতে সমাহিত করা হয়। ১৯৫৬ সালে যুক্তরাজ্যের কমিউনিস্ট পার্টির অর্থায়নে তার সমাধির ওপর স্তম্ভটি নির্মিত হয়। তিন দশমিক সাত মিটার উঁচু এই স্তম্ভটির মাথায় ব্রোঞ্জে তৈরি আবক্ষ একটি মূর্তি রয়েছে মার্ক্সের। ওই স্মৃতিস্তম্ভে একটি সাদা মার্বেল পাথরে কালো অক্ষরে খোদাই করে মার্ক্সের নাম, জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ দেওয়া আছে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কিছু অজানা হামলাকারী হাতুরি দিয়ে পিটিয়ে সেই সাদা মার্বেল পাথরটি বিকৃত করে। যেটি পরে আংশিক মেরামতি সম্ভব হয়। এই ঘটনার সপ্তাহ দুই পরে আবারো আক্রান্ত এই সৌধ, স্মৃতিস্তম্ভে লাল রঙে বিতর্কিত ভাষ্য লিখে দেয় কিছু অজ্ঞাত হামলাকারী।

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন