ভলতেয়ার – অধিকার আন্দোলনের অগ্রণী যোদ্ধা

তোমার মতের সঙ্গে আমি হয়তো একমত নাও হতে পারি; কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে যাবো; অষ্টাদশ শতাব্দীতে এরকম উক্তি করেছিলেন যিনি, যা আজকের দিনেও বড্ড বেশি প্রাসঙ্গিক। মত প্রকাশের প্রচলিত পথগুলো যখন ক্রমশই রুদ্ধ ও সংকুচিত হয়ে উঠছে, তখনই বেশি বেশি করে এই ধরণের মানুষদের চেনা দরকার। আসুন ভলতেয়ার (এই নামে বিশ্ব চেনে তাঁকে) নামের এই মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তাঁকে আর একটু ভালো করে চিনে নেওয়া যাক।

ফ্রাঙ্কো ম্যারিক এ্যারোয়েট ভলতেয়ার

১৬৯৪ সালের ২১ নভেম্বর প্যারিসে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অষ্টাদশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফরাসি কবি ও নাট্যকার, ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক ভলতেয়ার। তাঁর বাবা ফ্রঁসোয়া আরুয়ে ছিলেন নোটারি ও সরকারের ট্রেজারি দপ্তরের এক সাধারণ কর্মকর্তা; মা, মারি মার্গ্যরিত দোমার ছিলেন ফ্রান্সের পোয়াতু প্রদেশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন ভলতেয়ার। 

মাত্র সাত বছর বয়সে মা-কে হারিয়ে বালক ভলতেয়ার ধর্মপিতা অ্যাবের কাছে বড় হতে থাকেন; অ্যাবে নিজে একজন মুক্ত-চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৭০৪ থেকে ১৭১১ সাল পর্যন্ত ভলতেয়ার ‘কোলেজ লুই-ল্য-গ্রঁ’ নামক বিদ্যালয়ে জেসুইট পাদ্রিদের কাছে পড়াশনা করেন। এখানেই লাতিন ও গ্রিক ভাষা শেখেন। পরবর্তী জীবনে ভলতেয়ার ইতালীয়, স্পেনীয় ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। 

লেখাপড়া শেষ করার পর তিনি সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। স্বপ্ন ছিল একজন নাট্যকার হবেন, কিন্তু তার ধর্মপিতা বিরোধিতা করেন এবং ধর্মপিতার ইচ্ছে অনুযায়ী প্যারিসে নোটারি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু, তিনি তার অধিকাংশ সময়ই বিদ্রূপাত্মক কবিতা লিখে ব্যয় করেছেন। পরে ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সচিব হিসেবে নেদারল্যান্ডে চলে যান। 

প্যারিসে ফিরে আসার পর ১৭১৭ সালে তিনি ফরাসি সরকারকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক লেখা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ডিউক অব অর্লিন্সকে নিয়ে উপহাস করেছেন। ফলস্বরূপ তিনি কেবল প্যারি থেকেই বিতাড়িত হননি, সেইসঙ্গে তাকে ১১ মাস জেলও খাটতে হয়েছিল। 

অভিজাত ব্যক্তিদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে পরের বার ১৭২৬ সালে বিনা বিচারে তাকে ইংল্যান্ডে নির্বাসন দেয়া হয়। সেখানে তিন বছর নির্বাসনে থাকাকালে তিনি জন লক, নিউটন ও ব্রিটিশ সরকার ব্যবস্থা নিয়ে অধ্যয়ন করেন। প্যারিসে ফিরে আসার পর ১৭৩৪ সালে তিনি ফিলোজফিক্যাল লেটার্স অন ইংলিশনামে একটি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধগুলোতে তিনি ব্রিটিশ সমাজ ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেন, যা ছিল ফরাসি সমাজ ব্যবস্থার বিপরীত। ফলে তার বইগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং জনরোষানলে পড়ে আবারও তিনি শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। 

১৭৩৪ থেকে ১৭৪৯ সময়ে নির্বাসনে থাকাকালে তিনি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নিয়ে অধ্যয়ন করেন। একই সঙ্গে তিনি লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন। বিভিন্ন ধরণের দার্শনিক এবং তাত্ত্বিক বিষয়বস্তু তিনি তার লেখায় তুলে ধরেন। 

১৭৪৯ সালে তিনি পটসড্যাম-এ আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি বার্লিন অ্যাকাডেমি অব সাইন্সের সভাপতিকে আক্রমণ করে লেখা প্রকাশ করেন। ফলে আবারও তিনি জনরোষানলে পড়েন এবং গ্রেফতার এড়াতে তাঁকে সেই শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়। এদিকে ফ্রান্সের শাসক পঞ্চদশ লুই তাকে প্যারিসে নিষিদ্ধ করে দেন। এমতাবস্থায় তিনি এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরতে থাকেন এবং একপর্যায়ে সুইজারল্যান্ডে গিয়ে আশ্রয় নেন 

বিভিন্ন সময়ে নির্বাসনে থাকাকালে তিনি প্রায় ২১ হাজার বই সংগ্রহ করেছেন এবং অধ্যয়ন করেছেন। অতঃপর তিনি রাষ্ট্র থেকে চার্চকে পৃথক রাখার আহ্বান জানিয়ে ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক রাখার পক্ষে বলেন। 

তিনি তার ব্যতিক্রমধর্মী লেখনীর মাধ্যমে নতুন ধারণা ও চিন্তাসমূহকে ফলপ্রসূভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি তার বিখ্যাত ‘CANDIDE’ (১৭৫৯) গ্রন্থে গটফ্রিড উইলহ্যাম লিবনিজ এর অতি আশাবাদী দর্শনের স্পষ্ট সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে ব্লেইস প্যাসক্যাল কর্তৃক মানব অমঙ্গলতা নিয়ে অতি নৈরাশ্যবাদী দর্শনেরও বিরোধিতা করেছেন। 

একজন দার্শনিক হিসেবে ১৭৬৪ সালে তিনি বিখ্যাত ‘Philosophical Dictionary’ গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এছাড়া ১৭৫১-১৭৭২ সালে লেখা তার প্রবন্ধগুলো তিনি ‘Encyclopedia’ শিরোনামে প্রকাশ করেন। এসব লেখায় তিনি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে ফরাসি সমাজ, ধর্ম ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করেছেন। 

ইতিহাসে ভলতেয়ারের অবদান অনস্বীকার্য। কিভাবে ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে হবে, তার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ধারণা দিয়েছিলেন তিনি। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে ধারাবাহিকভাবে ইতিহাসের ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করেছিলেন। 

তিনি খ্রিস্টান, ইসলামসহ প্রায় সব ধর্মেরই সমালোচনা করেছিলেন। তাই অনেকের কাছেই তিনি একজন নাস্তিক হিসেবে পরিচিত। মূলত তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন একেশ্বরবাদী। তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন, তবে অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে পর্যবেক্ষণ ও যৌক্তিক বিচারের মাধ্যমে তিনি ঈশ্বরকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন। ‘Treatise on Toleration’ (১৭৬৩) গ্রন্থে তিনি সব মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, সব মানুষেরই ঈশ্বর একজন। সুতরাং ধর্মকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্য বিভেদ ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা অনুচিত। 

কনফুসিয়াসের রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত ভলতেয়ার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতার সমালোচনা করেছেন। বরং একটি সচেতন, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক রাজতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন তিনি। তার মতে, জনগণকে শিক্ষিত করলে কেবল জনগণেরই উপকার হবে তা নয়, রাজার জন্যও এটা প্রয়োজন। এভাবেই তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে অভিজাত বর্গের সমালোচনা করেছেন এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও বাক স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন। 

২৫ বছর পর প্রথমবারের মতো ১৭৭৮ সালে তিনি তার প্রিয় জন্মভূমি প্যারিসে ফিরে আসেন, প্রধানত তাঁর শেষ নাটক ‘ইরিন’-এর মঞ্চায়নে উপস্থিত থাকতে। এক সময় যাকে বার বার প্যারিসবাসী তাড়িয়ে দিয়েছিল, তারাই তাকে বুকে আলিঙ্গন করে গ্রহণ করেন। ওই সময় বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের সঙ্গে দেখা হলে তিনি ভলতেয়ারকে একজন মুক্ত স্থপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। 

পুরো একটি জীবন বিতর্কে জর্জরিত থাকা সত্ত্বেও, ইতিহাসের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক এবং দার্শনিক হিসেবে বিবেচিত হওয়া ভলতেয়ার ১৭৭৮ সালের ৩০ মে এই মহান দার্শনিক মারা যান। তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে নানা মত পাওয়া যায়, নিশ্চিত করে বলা যায়না ঠিক কি কারণে মারা যান ভলতেয়ার। 

ভলতেয়ারের অসাধারণ শক্তিশালী লেখনী সাধারণ মানুষকে এতটাই প্রভাবিত করত যে, কখনো কখনো শহরের পর শহর লোকজন উত্তপ্ত হয়ে যেত এবং তার রচিত গ্রন্থগুলো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিত। তাঁর চিঠির সংখ্যাই ছিল ২১ হাজার এবং বই-পুস্তকের সংখ্যা ২ হাজারেরও বেশি। 

তিনি সরকারের অকার্যকারিতা, সাধারণ মানুষের মূর্খতা, চার্চের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা এবং দুর্নীতিবাজ ও পরজীবী স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাই আঠারো শতকের ওই সময়ে রোমান ক্যাথোলিক চার্চ, ফরাসি সরকার, এমনকি সাধারণ মানুষেরও কাছে তিনি শত্রুতে পরিণত হয়ে পড়েন। এতদসত্ত্বেও তিনি ছিলেন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের এক অগ্রণী সেনা, যিনি উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, নাটক, ইতিহাসসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই কাজ করেছেন। 

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

1 মন্তব্যসমূহ

  1. অনেক কিছু ই জানলাম। কিন্তু জীবনীর চেয়ে ওনার লেখার আলোচনা হলে আরো ভালো লাগতো

    উত্তরমুছুন
নবীনতর পূর্বতন