বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসে জানুন এই রোগটিকে

'থ্যালাসেমিয়া' শব্দটির সাথে কমবেশি সকলেই আমরা পরিচিত কিন্তু এটি আসলে কি সে সম্বন্ধে আমাদের সকলের ধারণা খুব পরিষ্কার নয়। আসুন ‘বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস’-এ আমরা জানার চেষ্টা করি এই রোগ-টি সম্বন্ধে কিছু কথা।

থ্যালাসেমিয়া একটি জিনঘটিত বংশগত রক্তের রোগ। সংক্রামক বা ছোঁয়াচে নয়। এটি পিতামাতার কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে আসে। হিমোগ্লোবিন রক্তের খুবই গুরত্বপূর্ণ উপাদান। আমরা নিশ্বাসের সঙ্গে যে অক্সিজেন বহন করি, হিমোগ্লোবিনের কাজ হলো তা শরীরের সমস্ত অংশে বহন করে নিয়ে যাওয়া। এ রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী এই হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়।

স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন গঠিত হয় চারটি পলিপেপটাইড (অনেকগুলি অ্যামাইনো অ্যাসিড দ্বারা গঠিত রৈখিক পলিমার) শৃঙ্খল দ্বারা, যার মধ্যে দুটি ‘আলফা’ শৃঙ্খল এবং দুটি ‘বিটা’ শৃঙ্খল থাকে। এখানে আলফা শৃঙ্খলটি গঠিত হয় ১৪১-টি অ্যামাইনো অ্যাসিড দ্বারা এবং বিটা শৃঙ্খলের ক্ষেত্রে অ্যামাইনো এসিডের সংখ্যা থাকে ১৪৬। চারটি শৃঙ্খলের প্রতিটিই এক অনু করে অক্সিজেন এর সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে ফুসফুস থেকে দেহের অন্যান্য অংশে অক্সিজেন পরিবহন এবং একই সঙ্গে দেহের অন্যান্য অংশ থেকে ফুসফুসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড প্রত্যাবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক অনু হিমোগ্লোবিন চার অনু অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এই রোগে হিমোগ্লোবিনের উৎপাদন কম হওয়ায় রক্তাল্পতা (anaemia) হতে দেখা যায় এবং দেহে অক্সিজেনের ঘাটতি ঘটে।

কোন্ শৃঙ্খলের পরিমাণগত উৎপাদনের হার কমেছে তার উপর নির্ভর করে থ্যালাসেমিয়া কে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়েছে – আলফা থ্যালাসেমিয়া (যেখানে হিমোগ্লোবিনের আলফা পলিপেপটাইড এর উৎপাদন কমে) এবং বিটা থ্যালাসেমিয়া (যেখানে বিটা পলিপেপটাইড এর উৎপাদন কমে)।

সাধারণভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া, বিটা থ্যালাসেমিয়ার থেকে কম তীব্র। আলফা থ্যালাসেমিয়া রোগের উপসর্গ মৃদু বা মাঝারি প্রকৃতির হয়ে থাকে। অন্যদিকে বিটা থ্যালাসেমিয়ার রোগের তীব্রতা বা প্রকোপ অনেক বেশি; এক-দুই বছরের শিশুর ক্ষেত্রে ঠিকমত চিকিৎসা না করলে এটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিশ্বে বিটা থ্যালাসেমিয়ার চেয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি।

প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১ লক্ষ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বিশ্বব্যাপী প্রতি ১ লাখ ব্যক্তির মধ্যে বার্ষিক একজনকে বিটা থ্যালাসেমিয়া রোগে ভুগতে দেখা যায়। বিশ্বে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক সংখ্যা প্রায় ২৫০ মিলিয়ন।

আলফা থ্যালাসেমিয়া কে সাধারণত চারটি উপ বিভাগে ভাগ করা যায়: ০১) Haemoglobin Bart Hydrops Fetalis Syndrome (আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর), ০২) Hb-H disease, ০৩) Silent carrier state এবং ৪) Alpha thalassemia trait.

রোগের তীব্রতার উপর নির্ভর করে বিটা থ্যালাসেমিয়া কি তিনটি উপবিভাগে ভাগ করা হয়েছে: ১) বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর (Cooley's anaemia নামেও পরিচিত এই রোগে শিশুরাই প্রধানত আক্রান্ত হয় এবং বছর দুয়েকের মধ্যেই উপসর্গগুলো বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়), ২) থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া এবং ৩) বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর।

থ্যালাসেমিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ, রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া। হলদে ত্বক বা জন্ডিস, দেহে অতিরিক্ত আয়রন জমা হওয়া, সংক্রমণ, স্প্লিন বা প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া, মুখের হাড়ের বিকৃতি, শারীরিক বৃদ্ধি হ্রাস পাওয়া, পেট বাইরের দিকে প্রসারিত হওয়া, গাঢ় রঙের মূত্র, হৃৎপিণ্ডের সমস্যা ইত্যাদি হলে তার যথাযথ রোগ নির্ণয় করা জরুরী।

রোগ নির্ণয়-এর জন্য ৩-টি পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়, তা হ’লঃ

০১) ব্লাড টেস্ট - যেহেতু এক্ষেত্রে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতার আধিক্য দেখা যায়, তাই রক্তে উপস্থিত লোহিত রক্ত কণিকার সংখ্যা, আকৃতি এবং প্রকৃত রং এর নির্ণয় চিকিৎসা পদ্ধতিতে বিশেষভাবে সাহায্য করে।

০২) ডিএনএ এনালিসিস - মিউটেটেড জিনের নির্ধারণের জন্য এটি করা হয়ে থাকে।

০৩) এম্নিওসেন্টেসিস - গর্ভস্থ শিশুর পরবর্তীতে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের পর্যায়ে ১৬ সপ্তাহে, অ্যামনিওটিক স্যাক থেকে ফ্লুইড সংগ্রহ করে পরীক্ষাটি করা হয়ে থাকে।

মাইনর থ্যালাসেমিয়াতে সাধারণত চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। থ্যালাসেমিয়া মেজরে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন প্রধান চিকিৎসা। বার বার রক্ত নেবার একটি বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো বিভিন্ন প্রত্যঙ্গে অতিরিক্ত লৌহ জমে যাওয়া। এর ফলে যকৃত বিকল হয়ে রোগী মারাও যেতে পারে। এধরনের জটিলতা প্রতিরোধে আয়রন চিলেশন থেরাপী দেয়া হয়, অতিরিক্ত লৌহ বের করে দেবার জন্য।

স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন / অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন থ্যালাসেমিয়ার একটি কার্যকরী চিকিৎসা। থ্যালাসিমিয়া মেজর এ আক্রান্ত বেশ কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সরাসরি অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের পদ্ধতিটিকেই বেছে নেওয়া হয়।

থ্যালাসেমিয়া এমন একটি রোগ যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। যদি স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়া বাহক বা একজন থ্যালাসেমিয়া বাহক এবং একজন হিমোগ্লোবিন ‘ই’-এর বাহক হয় তবে প্রতি গর্ভাবস্থায় –

এ রোগে আক্রান্ত শিশু জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ২৫ ভাগ ।

বাহক শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ৫০ভাগ।

আর সুস্থ শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ২৫ ভাগ।

স্বামী স্ত্রী দুজনের যেকোন একজন যদি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকেন, তাহলে নবজাতকের থ্যালাসেমিক হবার কোন সম্ভাবনা থাকে না। তবে নবজাতক থ্যালাসেমিয়ার বাহক হতে পারে যা কোন রোগ নয়।

এই রোগের বাহকদের একে অপরকে বিয়ে না করাই ভাল। সেই জন্য বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। তাই এ রোগের বাহকদের মধ্যে বিয়ে নিরুৎসাহিত এবং প্রতিহত করার মাধ্যমে সমাজে নতুন থ্যালাসেমিক শিশুর জন্ম হ্রাস করা যায়।

যদি দু’জন থ্যালাসেমিয়ার বাহকের বিয়ে হয়েও যায়, সে ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় ভ্রুণের রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত। গর্ভস্থ সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কি না, জানার জন্য কোরিয়োনিক ভিলাস স্যাম্পলিং, অ্যামনিওসেনটেসিস, ফিটাল ব্লাড স্যাম্পলিং - এই পরীক্ষাগুলি করা প্রয়োজন।

থ্যালাসেমিয়া মানেই জীবন শেষ হয়ে গেল, তা একেবারেই নয়। বরং নিয়মিত চিকিৎসা করালে সুন্দর ভাবে বাঁচা সম্ভব। বিয়ে করে সংসারও করতে পারেন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীরা। বাচ্চা হওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা নেই। তবে নিজেকেই নিজের যত্ন নিতে হবে। সঙ্গে একটু সচেতন হতে হবে, যাতে আর কোনও থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু না জন্মায়।

ভারতেই থ্যালাসেমিয়া মেজর শিশুর সংখ্যা সবথেকে বেশি। এবং প্রতি বছর নতুন করে ১০ থেকে ১৫ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এই দেশেই।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের জন্য আরও বেশি প্রচার দরকার। প্রয়োজন মানুষকে সচেতন করাও। তবেই হয়তো এই রোগ থেকে মুক্তি মিলবে। আশা করি, এই লেখা যাঁরা পড়লেন তাঁরা কিছুটা হলেও বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত হলেন এবং এই রোগ প্রতিরোধে নিজেদের মতন করে নিজেরা প্রয়াস করবেন।

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন