৭০টির-ও বেশি ভাষায় অনূদিত হওয়া, ৩০ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হওয়া পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে একটি ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’। এই বইটির লেখিকা ‘আনা ফ্রাঙ্ক’-এর আজ ৯৩ তম জন্মদিন। এরকমই এক জন্মদিনে (১৩-তম) একটি লাল ডোরাকাটা মলাটের ডায়েরি উপহার পেয়েছিল আনা, যা তাকে এই পৃথিবীতে অমর করে রেখেছে। মাত্র ১৬ বছরের জীবন, কিন্তু আজও বহু মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা এইরকম একটি মেয়েকে জন্মদিনের গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সাথে স্মরণ করার পাশাপাশি তাকে চিনতে ও চেনাতেই এই লেখার প্রয়াস।
১৯২৯ সালের ১২-ই জুন আনা ফ্রাঙ্ক জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে-এ জন্ম গ্রহণ করেন। মায়ের নাম এডিথ ফ্রাঙ্ক আর বাবার নাম অটো হেনরিখ ফ্রাঙ্ক, বড় বোনের নাম মার্গট। আনার পরিবার ছিল একটি উদার ইহুদী পরিবার যারা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান তেমন পালন করতেন না। এডিথ ও অটো ফ্রাঙ্ক নিজেরাও যেমন জ্ঞানার্জনে আগ্রহী ছিলেন, ঠিক একইভাবে চাইতেন তাদের দুই কন্যাও একইভাবে বই পড়ায় আগ্রহী হয়ে উঠুক, আর তাই ঘরেই একটি বড় লাইব্রেরী গড়ে তোলান।
আনার জন্মের দুই বছর পর আনার পরিবার ডর্নবুশের একটি উদার ও উন্নত এলাকায় বসবাস করা শুরু করে। ১৯৩৩ সালে যখন হিটলারের নাজি পার্টি ক্ষমতায় আসে এবং হিটলার চ্যান্সেলর হয় তখন এডিথ ফ্রাঙ্ক বাচ্চাদের নিয়ে তার মায়ের সাথে থাকার জন্য এচেনে চলে যান। অটো ফ্রাঙ্ক ফ্রাঙ্কফুর্টে থেকে যান। এরপর একটি কোম্পানি খোলার প্রস্তাব পেয়ে প্রতিষ্ঠান গোছানো আর পরিবারের বসবাসের ব্যবস্থা করতে তিনি আমস্টারডামে চলে আসেন। সেখানে তিনি ওপেক্টা ওয়ার্কস নামের কোম্পানির সাথে কাজ শুরু করেন। ঐ সময়ে এডিথ এচেন থেকে আমস্টারডামে আসা যাওয়া করতেন। একসময় আনার পরিবার আমস্টারডামের কাছেই রিভারেনবার্টের মারওয়েভ স্কয়ারে একটি এপার্টপেন্ট খুঁজে পান। সেই এলাকায় বেশির ভাগ জার্মান ইহুদী রিফিউজরা বসবাস করতো। ১৯৩৩ সালের ডিসেম্বরে এডিথ, মার্গটকে নিয়ে তার স্বামীর কাছে চলে আসেন আর আনা ফ্রাঙ্ক তার দিদার কাছেই থেকে যান। ১৯৩৪-এর ফেব্রুয়ারিতে আনার পরিবার নেদারল্যান্ডে মিলিত হয়। আনার পরিবার জার্মানি থেকে ১৯৩৩-৩৯ এর মধ্য পালিয়ে যাওয়া ৩০০,০০০ ইহুদীর মধ্যে অন্যতম। আমস্টারডামে আসার পর মার্গটকে একটি সরকারি স্কুলে ভর্তি করা হয় আর আনা ফ্রাঙ্ককে মন্টেসরি স্কুলে ভর্তি করা হয়। ১৯৩৮ সালে অটো ফ্রাঙ্ক পেকটানন নামের আরেকটি কোম্পানি খোলেন।
১৯৪০ সালে জার্মানি নেদারল্যান্ড দখল করে এবং সেখানকার ইহুদিদের উপর নামিয়ে আনে বিভিন্ন দমন ও বৈষম্যমূলক আইন। অটো ফ্রাঙ্ক নিরাপদ আবাসের খোঁজে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু রটারডামে অবস্থিত ইউএস কনসুলেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের ভিসা আবেদন বিবেচনা করার সুযোগই হয় নি।
১২ জুন ১৯৪২ সালে ১৩ তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে আনা ফ্রাঙ্ক ছোট তালাসহ লাল-সাদা ডোরাকাটা একটি অটোগ্রাফের খাতা উপহার পান, যেটিকে আনা ডায়েরি হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে অটো ও এডিথ ফ্রাঙ্ক বাচ্চাদের নিয়ে ১৯৪২ এর ৬-ই জুলাই একটি লুকানো স্থানে অজ্ঞাতবাসে চলে যান। তাদের এপার্টমেন্ট ছত্রভঙ্গ অবস্থায় রেখে অটো ফ্রাঙ্ক একটি চিরকুট লিখে ইঙ্গিত রেখে আসেন যে তারা সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন। যেহেতু ইহুদীদের জন্য গণপরিবহনে চড়া নিষিদ্ধ ছিল তাই তাদেরকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়েছিল।
এই গুপ্তস্থানটি একটারহুইস (Acterhuis) নামে পরিচিত হয়েছিল, ডায়েরির ইংরেজি সংস্করণে একে secret Annex বা গুপ্ত ঘর বলা হয়েছে। একটারহুইসের দরজা একটা বইয়ের তাক দিয়ে আড়াল করা হয়েছিল যাতে গুপ্ত ঘর কেউ দেখে না ফেলে। গুপ্তস্থানটি ছিল একটি তিন তলা ভবন যেখানে অটো ফ্রাঙ্কের কিছু বিশ্বস্ত কর্মচারী তাদের সহযোগী হয়েছিল। গুপ্ত ঘরের বাসিন্দাদের অন্যতম মিয়েপ গিয়েস-এর স্বামী জ্যান গিয়েস ও বিপ ভসকুজির বাবা জোহানেস হেন্ডরিখ ভসকুজি বাইরের জগতের সাথে গুপ্ত ঘরের বাসিন্দাদের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক উন্নতির খবরাখবর দেওয়া ছাড়াও তাদের খাবার সরবরাহ করা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজটি করেছিলো।
১৩ জুলাই ১৯৪২ সালে আরো কিছু ইহুদী পরিবারের সাথে ১৬ বছর বয়সী পিটার ভ্যান পেলস, ফ্রাঙ্ক পরিবারের সাথে অজ্ঞাতবাসে এসে থাকতে শুরু করেন। বন্দি জীবন যাপনে বাধ্য হওয়া এই মানুষেরা সবসময়েই এক নিদারুন উদ্বেগের মধ্যে থাকতেন। প্রথম দিকে তেমন পছন্দ না করলেও কিছুদিন পর ফ্রাঙ্ক, পিটারের সাথে নৈকট্য অনুভব করেন এবং তারা দুইজন প্রেমে পড়ে যায়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পিটারের প্রতি ফ্রাঙ্কের ভালোবাসা কমতে থাকে, কারণ তার মনে প্রশ্ন জাগে যে পিটারের প্রতি তাঁর অনুভূতি কি বাস্তব নাকি একসাথে বন্দি থাকার ফলাফল। অটো ফ্রাঙ্ক পরবর্তীতে বলেছিলেন তার মতে আনার সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক হয়েছিল তরুণ টাইপিস্ট বিপ ভসকুজির সাথে। তাঁরা দুজন মাঝে মাঝে ঘরের কোণায় দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কথা বলতেন।
স্বেচ্ছাবন্দী জীবনের ঠিক আগে আগেই উপহার পাওয়া ডাইরিতে বন্দীদশার সকলকিছুই লিখতে থাকেন আনা। বহির্বিশ্বের যেসকল ঘটনাসমূহের কথা তাঁর কানে আসত সেগুলির বিবরণ লেখার সাথে সাথে তিনি তার অনুভূতি, বিশ্বাস, স্বপ্ন ও আশা আকাঙ্ক্ষার কথা লিখতে থাকেন সেই ডাইরিতে, বিশেষ করে সেগুলি যে বিষয়ে তিনি কারো সাথে আলোচনা করতে পারতেন না। ক্রমেই নিজের লেখার ক্ষমতায় তাঁর বিশ্বাস বাড়ছিল আর তিনি বড়ও হচ্ছিলেন। তাই তিনি বিমূর্ত বিষয় নিয়ে লেখা শুরু করেন; যেমন স্রষ্টার ব্যপারে তাঁর বিশ্বাস, মানুষের প্রকৃতি নিয়ে তাঁর ভাবনা ইত্যাদি।
লেখায় প্রকাশ পেয়েছে কিশোরী মনের চিন্তাধারা, গেস্টাপোর প্রতি ভীষণ ভীতি এবং তাঁর একাকিত্বের কষ্ট৷ এক জন বান্ধবীর অভাব খুব বেশি অনুভব করেছেন তিনি, প্রায় সারা জীবনই৷ তাই নিজের ডায়েরির নাম দিয়েছিলেন ‘কিটি'৷ এই কিটিই ছিল তাঁর একমাত্র বন্ধু৷ কিটিকে তিনি প্রথমদিকে তাঁর জীবন এবং পরিবার সম্পর্কে বলেছেন৷ আবার বৈষম্যের অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন৷ সে সময় ইহুদিদের দুর্দশা ও নাৎসি বন্দী শিবিরে তাঁদের নির্মম পরিণতি সম্পর্কে তাঁর গভীর অনুভূতি প্রকাশ করেছেন৷
১৯৪৪ সালের ৪ আগস্ট। গ্রীষ্মের এক উষ্ণ দিন। আমস্টারডামের আনাদের গোপন ডেরায় হানা দিল চার গেস্টাপো। বাড়িটির বর্ধিতাংশে একটা দেওয়াল ছিলো লাইব্রেরির মতো, যেটিকে ধরে একপাশে চাপ দিতেই ধীরে ধীরে সরে যায় দেওয়াল, দৃশ্যমান হয় নিচে যাওয়ার সিঁড়ি, নিচের গোপনে আশ্রয় আনা ফ্রাঙ্কের পরিবার সহ আটজন। গেস্টাপোর এক সদস্য যখন অটো ফ্রাঙ্কের ব্যাগ থেকে পাওয়া মালপত্র তুলছিল, হাত ফসকে পড়ে যায় কিছু কাগজ। তার ভেতর ছিল আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি। গেস্টাপোরা চলে গেলে আনা ফ্রাঙ্কদের আশ্রয়দাতাদের একজন ডায়েরিটা তুলে নিজের কাছে রেখে দেয়। পরবর্তী সময়ে অটো ফ্রাংক ফিরে এসে বই আকারে ডায়েরিটি প্রকাশ করেন।
তাঁদের গ্রেফতার করে RSHA হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদেরকে সারারাত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ৫ আগস্ট তাদের কে Huis Van Bewaring (বন্দিশালা)য় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দুইদিন পর তাদেরকে ওয়েস্টারবুর্কের ট্রানজিট ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যেহেতু আনা ফ্রাঙ্কের পরিবার লুকিয়ে থাকা অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছিল তাই তাদেরকে কঠোর পরিশ্রম করানোর জন্য শাস্তি ব্যারাকে পাঠানো হয়েছিল।
৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪ সালে তাদেরকে ওয়েস্টারবুর্ক থেকে অসউইজ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। তারা ৩ দিন পর সেখানে পৌঁছায়। অসউইজে পৌঁছার পরই পুরুষদের কে নারী ও শিশুদের থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। অটো ফ্রাঙ্ক তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। যাদের কর্মক্ষম মনে হতো তাদের কে শ্রম শিবিরে নিয়ে যাওয়া হতো আর যাদের অক্ষম মনে হতো তাদেরকে সাথে সাথে মেরে ফেলা হতো। ১০১৯ জন যাত্রীর মধ্যে ১৫ এর কম বয়সী শিশু সহ প্রায় ৫৪৯ জনকে সরাসরি গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আনা ফ্রাঙ্ক, যিনি কিনা তিন মাস আগেই ১৫ বছর শেষ করেছিলেন, তিনি তাঁর বেঁচে যান।
বেঁচে যাওয়া আরো অনেক নারী ও শিশুর সাথে আনা ফ্রাঙ্ককেও উলঙ্গ করে জীবাণুনাশক দেওয়া হয়েছিল, মাথা কামিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং বাহুতে একটা শনাক্তকারী সংখ্যা এঁকে দেওয়া হয়েছিল। দিনে নারীদেরকে দাসশ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। আনা ফ্রাঙ্ক পাথর বহন ও ঘাসের আঁটি বাঁধার কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর রাতে তাদেরকে সংকীর্ণ ব্যারাকে গাদাগাদি করে রাখা হতো। আনা চর্মরোগে খারাপ ভাবে আক্রান্ত হন। তাঁদের দুইবোনকে সেখানকার হাসপাতালে নেওয়া হয়। ১৯৪৪ সালের অক্টোবরে ফ্রাঙ্কদেরকে আপার সিলিসিয়ার লিবাউ শ্রম শিবিরে স্থানান্তরের জন্য নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও শেষ অবধি আনার গুরুতর চর্মরোগের কারণে তাকে ও তাঁর মা-বোনকে রেখে দেওয়া হয়।
১৯৪৪-এর অক্টোবরে আনা ও মার্গট ফ্রাঙ্ক সহ প্রায় ৮০০০ নারীকে বার্গেন-বেলসেন এ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এডিথ ফ্রাঙ্ক অসউইজেই রয়ে যান এবং না খেতে পেয়ে মারা যান। বার্গেন-বেলসেন এ তাঁবু খাটিয়ে হাজার হাজার বন্দির থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৪৫ এর শুরু দিকে টাইফাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় ১৭০০০ বন্দি মারা যায়। এছাড়া টাইফয়েডও ছড়িয়ে পড়েছিল। এই বিশৃঙ্খল অবস্থায় আনা ফ্রাঙ্কের মৃত্যুর আসল কারণ নির্ণয় সম্ভব নয়। তবে এতটুকু প্রমাণ আছে যে সে মহামারীতে মারা যায়। আনা ও মার্গটের মৃত্যুর সঠিক তারিখ রেকর্ডে নেই। অনেকদিন যাবত ভাবা হতো যে ১৯৪৫ সালের ১৫ এপ্রিলে ব্রিটিশ সৈন্যরা এই ক্যাম্পটি মুক্ত করে দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে তারা মারা যায়। কিন্তু ২০১৫ সালের গবেষণায় দেখা যায় তারা ২০১৫-র ফেব্রুয়ারিতে মারা গিয়েছিলেন।
আনার ডাইরিতে তাঁর জীবনের ১২ জুন ১৯৪২ থেকে ১ আগস্ট ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত সময়ের ঘটনাগুলো ফুটে উঠেছে। আনা ফ্রাঙ্ক সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত এক নাম। ফ্রাঙ্কের লেখা ডায়েরি প্রকাশিত হওয়ার পর তা নিয়ে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়।
বহু মানুষের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছেন আনে ফ্রাঙ্ক তাঁর ডাইরির সৌজন্যে।
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

খুব ভালো লেখা। সুন্দরভাবে অ্যানা ফ্রাঙ্ক এর জীবনের দুঃখ কষ্ট তুলে ধরা হয়েছে।
উত্তরমুছুন