বহুমুখী অনন্য প্রতিভার অধিকারী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

গত বছর করোনার আতঙ্কে কাঁপতে থাকা সারাবিশ্ব যে ঔষধটির উপরে তাকিয়ে আছে; আমেরিকা সহ বিশ্বের ৩০-টি উন্নত দেশ যে রাসায়নিক যৌগটি সংগ্রহের জন্য ফোন করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে অহরহ; তার উৎপাদন হত যে কারখানায় সেই বেঙ্গল কেমিক্যাল ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কসএর নাম কিংবা তার প্রতিষ্ঠাতা আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কে জানে বা চেনে কজন বাঙালি?

প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

রাসায়নিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রথম ভারতীয় স্থপতি, বেঙ্গল কেমিক্যাল ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড ও তার প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নামই শোনেননি, না শোনারই তো কথা! রাষ্ট্র কি চায় ওনার নাম জানুক পড়ুয়ারা? 

ছাড়ুন এসব, ওনার জন্মদিনটা বা মৃত্যুদিন-টা কবে বলুন তো? ইংরেজি ক্যালেন্ডারে নেই, বাংলা ক্যালেন্ডারে ইতুপুজো থেকে ছটপুজোর তারিখ পেলাম, পেলাম অনেক বাবা, ক্ষ্যাপা স্বামীর জন্মদিন, নেই শুধু ওনারটা ! 

রবীন্দ্রনাথের সাথে একই বছরে, ১৮৬১ সালে জন্মেও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বাঙালির মনন থেকে মুছে গেছেন; নাকি মুছে ফেলার ব্যবস্থা করেছে? এহেন মানুষটির আজ প্রয়াণ দিবস; তাঁকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি জেনে নেওয়া যাক মানুষটিকে, বুঝে নেওয়া যাক কেন আজকের দিনে তাঁকে আমাদের এত বেশি করে দরকার। 

১৮৬১ সালের ২-রা আগস্ট খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রাঢ়ুলি গ্রামে জন্ম নেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়। মা ভুবনমোহিনী দেবী এবং বাবা হরিশচন্দ্র রায়ের পুত্র। হরিশচন্দ্র রায় স্থানীয় জমিদার ছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র-এর পড়াশুনা শুরু হয় নিজের গ্রামে নিজের বাবার প্রতিষ্ঠা করা এম.ই স্কুলে। ছোটবেলায় তাঁর অন্যতম শখ ছিল স্কুল পালিয়ে পাতাঘেরা গাছের মগডালে বসে থাকা! 

১৮৭২ সালে পড়াশুনার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান কলকাতা হেয়ার স্কুলে। কিন্তু হঠাৎ করেই অবনতি ঘটে শারীরিক অবস্থার। রক্ত আমাশয়ের কবলে পড়ে ২ বছর ভোগেন তিনি। তবে এই রোগ অন্য আরেক দিক দিয়ে তাঁর জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনে। এই ২ বছর নিয়ে প্রফুল্ল চন্দ্র তাঁর ব্যক্তিগত ডায়রীতে লেখেন, “স্কুলের শুকনো বইখাতা থেকে মুক্তি পেয়ে আমি সুযোগ পেয়েছিলাম নিজের পছন্দানুযায়ী বই পড়ার। এই ২ বছরে তিনি তাঁর বাবার বইয়ের বিশাল সংগ্রহশালায় ডুবে ছিলেন। আর অর্জন করেছিলেন নানা বিষয়ে অগাধ জ্ঞানভান্ডার। 

১৮৭৪ সালে প্রফুল্লচন্দ্র কলকাতায় ফিরে গিয়ে ভর্তি হন অ্যালবার্ট স্কুলে। এই স্কুল থেকেই ১৮৭৮ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজে (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) ভর্তি হন। ১৮৮১ সালে সেখান থেকে এফ এ পরীক্ষায় (ইন্টারমিডিয়েট বা এইচএসসি) দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করে প্রেসিডেন্সী কলেজে বি এ ক্লাসে ভর্তি হন। 

প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় কলেজে তৎকালীন রসায়নের অধ্যাপক আলেক্সান্ডার পেডলারের পাঠদান পদ্ধতি প্রফুল্লচন্দ্রকে রসায়নের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। মূলতঃ রসায়নের প্রতি তাঁর ভালোলাগার শুরু ওখান থেকেই। যদিও তাঁর প্রথম ভালোবাসা ছিল সাহিত্য। যার ধারাবাহিকতায় তিনি ঘরে বসেই ল্যাটিন ও ফ্রেঞ্চ ভাষা রপ্ত করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি রসায়নেই পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সম্মানসূচক গিলক্রিস্ট বৃত্তি (সারা ভারত থেকে সেবছর মাত্র দুজন এই বৃত্তির জন্য উত্তীর্ণ হন) নিয়ে পাড়ি জমান স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবারগে। সেখান থেকে নেন বিএসসি ও পিএইচডি ডিগ্রী। তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল, “কনজুগেটেড সালফেট অফ কপার ম্যাগনেসিয়াম গ্রুপ। অসাধারণ এক গবেষনার জন্য তিনি সে বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের হোপ পুরস্কারলাভ করেন এবং আরো একবছর থিসিস করার অনুমতি পান। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা, দায়িত্বশীলতা, সুন্দর আচরণে তাঁর সহপাঠী ও শিক্ষকগণ এতোই মুগ্ধ ছিলেন যে তাঁকে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিকেল সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয়। অশিক্ষা, কুসংস্কারে ঘেরা উপমহাদেশের কোন শিক্ষার্থীর এমন বিরল নিদর্শন বিরলতম। 

১৮৮৮ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র নিজ ভূমির শিক্ষা ও গবেষণার প্রচার ও প্রসারের জন্য তিনি দেশে ফিরে আসেন। এডিনবার্গের মত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করে এসেও প্রফুল্ল চন্দ্র রায় মাত্র ২৫০ টাকার নাম সর্বস্ব বেতনে প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগদান করেন। শুরু হয় তাঁর শিক্ষক, গবেষকজীবন ও বিভিন্ন সামাজিক কাজ। ঘি, সরিষার তেল ও বিভিন্ন ভেষজ উপাদান নিয়েই তিনি প্রথম গবেষণা শুরু করেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন রসায়নকে শুধু শ্রেণী কক্ষে সীমাবদ্ধ রাখলেই চলবে না। একে কাজে লাগাতে হবে, গবেষণা করতে হবে। তাই তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার বীজ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, যারা প্রতিনিধিত্ব করবে সমগ্র দেশের। তিনি শুধু ভালো মেধাবী শিক্ষার্থীই চাননি, চেয়েছিলেন একদল দেশপ্রেমী মেধাবী। তিনি কিছু ত্যাগী মেধাবীকে এক ছাদের নিচে জড়ো করেছিলেন এবং তাঁদের নিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক দল গড়ে তোলেন। এই দলের অনেক মেধাবী (পঞ্চানন নিয়োগী, নীল রতন ধর, প্রিয়দা রঞ্জন রায়, বীরেশ চন্দ্র গুহ, এস এস ভাটনগর প্রমুখ) পরবর্তীতে সারা ভারতবর্ষে বিজ্ঞান গবেষণার প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছিলেন। 

তিনি ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে মারকিউরাস নাইট্রাইট (HgNO2) আবিষ্কার করেন যা বিশ্বব্যাপী আলোড়নের সৃষ্টি করে। এটি তাঁর অন্যতম প্রধান আবিষ্কার। এ ছাড়া পারদ-সংক্রান্ত ১১-টি মিশ্র ধাতু আবিষ্কার করে তিনি রসায়নজগতে বিস্ময় সৃষ্টি করেন। গবাদি পশুর হাড় পুড়িয়ে তাতে সালফিউরিক এসিড যোগ করে তিনি সুপার ফসফেট অব লাইম তৈরি করেন। তাঁর প্রথম মৌলিক গবেষণা খাবারে ভেজাল নির্ণয়ের রাসায়নিক পদ্ধতি উদ্ভাবন-সংক্রান্ত। এছাড়াও ৫-টি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন। 

এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই ১৮৮৫ সালে সিপাহী বিদ্রোহের আগে ও পরে (India Before and After the Sepoy Mutiny) এবং ভারত বিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ লিখে ভারতবর্ষ এবং ইংল্যান্ডে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। পি সি রায় ১২০০ শতাব্দী এবং তারও পূর্বের ভারতবর্ষের রসায়ন চর্চার ইতিহাস তুলে ধরে প্রমাণ করেন যখন ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ গাছের ছাল বা বাকল পরে লজ্জা নিবারণ করতো, তখন ভারতবর্ষের মানুষ পারদের ব্যবহার সম্পর্কে অবগত ছিলো। বিজ্ঞানের উপর তাঁর লেখা ১৫০-টি গবেষণা নিবন্ধ পৃথিবীর বিভিন্ন র্জানাল মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে। 

১৯১৬ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র প্রেসিডেন্সী ছেড়ে বিজ্ঞান কলেজে যোগদান করেন। ১৯২১ সালে ৬০ বছর বয়সে তিনি তাঁর পরবর্তী সমস্ত বেতন বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যানে উৎসর্গ করেন। যা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফেলোশিপকারীদের ২ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। এভাবে তিনি ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষাদান করে গেছেন। 

কলকাতা বিজ্ঞান কলেজের দোতলার দক্ষিণ-পশ্চিম কোনের একটি কক্ষ। আসবাবপত্রের মধ্যে একটি খাটিয়া, দুটি চেয়ার, ছোট একটি খাবার টেবিল, একটি পড়ার টেবিল ও জামাকাপড় রাখার একটি সস্তা আলনা। পড়নে থাকত কম দামের মোটা খোটা ধুতি, চাদর, গেঞ্জি অথবা গায়ে একটি কোট। এক রাশ দাড়িগোফ মুখে লোকটির চুলে বোধকরি চিরুনি পড়েনি। সকালে মাত্র এক পয়সার নাস্তা। এক পয়সার বেশি নাস্তা হলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন। অনান্য খাবারদাবারও খুব সাদামাটা। অথচ তখন মাসিক আয় হাজার টাকার উপরে। মোট আয় থেকে নিজের জন্য মাত্র ৪০ টাকা রেখে বাকি সব দান করে দিতেন। 

১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গর ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যখন বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলন সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন গোপনে অস্ত্র ক্রয়ের জন্য তিনি বিপ্লবীদের অর্থ সাহায্য করতেন। ১৯১৬ সালে কলকাতায় তিনিই প্রথমবারের জন্য মহাত্মা গান্ধীর জনসভার আয়োজন করেছিলেন। ১৯১৯ সালে কলকাতার টাউন হলে রাউলাট বিলের বিরোধিতায় আয়োজিত জনসভায় ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেন, ‘দেশের জন্য প্রয়োজন হলে বিজ্ঞানীকে টেস্ট টিউব ছেড়ে গবেষণাগারের বাইরে আসতে হবে। বিজ্ঞানের গবেষণা অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্বরাজের জন্য সংগ্রাম অপেক্ষা করতে পারে না। 

১৮৯৩ সালে পি সি রায় নিজের ল্যাবরেটরিতে ব্রিটিশ কোম্পানি ফার্মাকোপিয়ার একটি ওষুধ তৈরির ব্যবস্থা করেছিলেন। এ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে মাত্র ৮০০ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রতিষ্ঠা হয় বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস। যা ১৯০১ সালে কলকাতার মানিকতলায় ৪৫ একর জমিতে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে ঐ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। নিজ জেলা শহর খুলনায় মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন এ পি সি কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি ও এ পি সি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড (পরবর্তীতে খুলনা টেক্সটাইল মিলস)। 

১৯০৬ সালে তিনি রাঢ়ুলি এবং এর আশপাশের গ্রামের মানুষকে জড়ো করে ৪১টি কৃষি ঋণদান সমবায় সমিতি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে সমিতিগুলো নিয়ে রাঢ়ুলি সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল অবিভক্ত বাংলায় তৃতীয় ব্যাংক। 

১৯২৩ সালে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ধর্মগোলা ও সমবায় ভান্ডার স্থাপনের পরামর্শ দেন। ১৯১৭ সালে বেঙ্গল কেমিক্যাল সমবায় সমিতি, ১৯১৮ সালে বঙ্গবাসী কলেজ কো-অপারেটিভ ষ্টোর এন্ড ক্যান্টিন, ১৯২১ বেঙ্গল কো-অপারেটিভ সোসাইটি সহ অনেক সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া একাধিক কাপড়ের মিল ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে প্রতিষ্ঠা করতেও রেখেছেন বিশেষ ভূমিকা। 

চিরকুমার পি সি রায়ের জীবন ছিল অনাড়ম্বর। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমিদারি সম্পত্তি ও তাঁর উপার্জিত সমুদয় অর্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে, ছাত্রবৃত্তি ও জনহিতকর কাজে দান করে গেছেন। পি সি রায় শুধু নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই প্রতিষ্ঠা করেননি, সেই সময়ে প্রতিষ্ঠিত এমন কোন প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে পিসি রায় এর অর্থনৈতিক অনুদান ছিল না। ১৯০৩ সালে তিনি দক্ষিণ বাংলায় প্রথম আর কে বি কে হরিশ চন্দ্র ইনষ্টিটিউট (বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের রাঢ়ুলী গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন যশোর-খুলনার প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ভুবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়। বাগেরহাট পিসি কলেজ তাঁরই কীর্তি। সাতক্ষীরা চম্পাপুল স্কুলও পি সি রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ, বরিশালে অশ্বিণী কুমার ইনষ্টিটিউশন, যাদবপুর হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল সহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পি সি রায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ১ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা দান করে ছিলেন। 

ব্রিটিশ সরকার ১৯৩০ সালে তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। ভারতবর্ষে বিজ্ঞানের অধঃপতনের জন্য আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় একদিকে জাতিভেদ প্রথা ও অন্যদিকে শঙ্করাচার্যের মায়াবাদী দর্শনের প্রভাবকে দায়ী করেছিলেন দ্বর্থহীন ভাষায়। পি সি রায় শুধু বিজ্ঞানীই ছিলেননা। তিনি ছিলেন একজন শিল্পোদ্যোক্তা, সমাজ সংস্কারক, বিজ্ঞানশিক্ষক, দার্শনিক, কবি, শিক্ষানুরাগী, ব্যবসায়ী ও বিপ্লবী দেশপ্রেমিক। তিনি নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন এইভাবে আমি বৈজ্ঞানিকের দলে বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী সমাজে ব্যবসায়ী, গ্রাম্য সেবকদের সাথে গ্রাম সেবক আর অর্থনীতিবিদদের মহলে অর্থনীতিজ্ঞ।দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য যখন যা প্রয়োজন, সেটাই তিনি করেছেন। 

বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থ বলেছেনঃ আচার্য নিজের জয়কীর্তি নিজে স্থাপন করেছেন উদ্যমশীল জীবনের ক্ষেত্রে, পাথর দিয়ে নয়, প্রেম দিয়ে। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বাঙালির অহংকার, বিশ্বের গর্ব। তাঁর র্কীতি বিশ্বে থাকবে চির বহমান। এ মহামানবকে বাঙালি জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।" 

জীবনের শেষ ২০ বছর তিনি কাটান বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছোট এক কামরায়। মাথার উপর পাখাকেও তিনি বিলাস দ্রব্য মনে করে ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানান। তখনকার দিনে একটি নিয়ম ছিল শিক্ষক যখন ক্লাস নিবেন তাঁর আগে একজন কর্মচারী এসে ব্ল্যাকবোর্ড, টেবল মুছে দেবে। এক শীতের দিনে দেখা গেল এক কর্মচারী কোট পরে ব্ল্যাকবোর্ড মুছতে এল। কিছুক্ষন পর প্রফুল্ল চন্দ্র রায়-ও একই রকম একটি কোট পরে ক্লাসে প্রবেশ করলেন। পরে জানা যায় যে তিনি একই কাপড় থেকে দুটি কোট বানিয়েছিলেন, একটি তাঁর জন্য আরেকটি ওই কর্মচারীর জন্য। 

শেষ জীবনে তাঁর স্মৃতি শক্তি লোপ পায়, স্পষ্ট করে কথা বলতে পারতেন না, এমন কি নিজের বিছানা ছেড়ে উঠে বসতে পারতেন না। যেসব ছেলে তাঁর কাছে থাকত, তাঁদেরই একজনের হাতে মাথা রেখে মানুষের উৎকর্ষ সাধনকারী এই মহান বিজ্ঞানী ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন ৮৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে গমন করেন। আমরা কি পেরেছি তাকে যোগ্য সম্মান দিতে? 

ছোটবেলা থেকে ডাল্টন, রাদারফোর্ড, বোর, অ্যাভোগেড্রোর নাম শুনে আসা আমরা কজন জানি বিখ্যাত এই বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম? দায়-টা কি আমার আপনার সকলেরই না? 

(তারিণী খুড়ো)

1 মন্তব্যসমূহ

  1. অনেক কিছু জানা ছিল না আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র সম্পর্কে, সমৃদ্ধ হলাম, এমনি অনেক মানুষ চাপা পড়ে আছেন ইতিহাসের কবরে, আপনাকে অনুরোধ, এই বিরাট মাপের মানুষদের খবর আমাদের কাছে পৌঁছে দিন, রাধানাথ শিকদার সম্পর্কে জানতে চাই

    উত্তরমুছুন
নবীনতর পূর্বতন