পশ্চিমবঙ্গের রূপকার ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়

তাঁর ছোঁয়াতেই অসুস্থ রোগী সুস্থ হয়ে যেত। আবার তাঁর ছোঁয়াতেই নতুন প্রাণ পেয়েছিল বাংলা। তিনি ভারতরত্ন ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়। আজ তাঁর জন্মদিন, মৃত্যুদিনও। শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ এবং চিকিৎসাবিদ, এই অকৃতদার মানুষটিকে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করার পাশাপাশি আসুন আর একটু ভালো করে চিনে নেওয়া যাক তাঁকে।

ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়
১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ১-লা জুলাই পাটনার বাঁকিপুরে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম। তিনি ছিলেন পিতা প্রকাশচন্দ্র রায় ও মা অঘোরকামিনী দেবীর ছয় সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। সরকারি চাকুরিজীবী প্রকাশচন্দ্র ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। বিখ্যাত ব্রাহ্মনেতা ও ব্রাহ্ম সমাজে 'নববিধান' নীতির প্রবর্তক কেশবচন্দ্র সেন-এর নববিধান-এর ভাবধারায় প্রভাবিত হয়েই কনিষ্ঠ সন্তানের নামকরণ করেন 'বিধান। ঠাকুমা নাম রেখেছিলেন ভজন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে মা-কে হারান বিধান চন্দ্র। 

গ্রাম্য পাঠশালায় বিধানচন্দ্রের লেখাপড়ার সূচনা। পরে পাটনার টি কে ঘোষ ইনস্টিটিউশন এবং তারপর পাটনা কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাটনা কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে পাটনা কলেজ থেকে গণিতে সাম্মানিকসহ বিএ পাস করে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ডাক্তারি পড়বার বিশেষ বাসনা বিধান চন্দ্রের ছিল না, শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ফর্মের জন্য আবেদন করেছিলেন। ডাক্তারির ফর্মটা আগে আসায় ওইটাই আবেদন করলেন। পূরণ করে পাঠিয়ে দিলেন। পরে শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ফর্ম আসায় আর আবেদন করেননি। 

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে এলএমএস এবং দু-বছর পর মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে এমডি ডিগ্রি লাভ করেন। থাকতেন কলেজ স্ট্রিট ওয়াই এম সি এ-তে। অর্থাভাব প্রবল, মাস্টারমশায়রা ছাত্রকে অবসর সময়ে ধনী রোগীদের বাড়িতে মেল নার্স হবার সুযোগ করে দিতেন। রোগীর বাড়িতে বারো ঘণ্টার ডিউটিতে পারিশ্রমিক আট টাকা। মেল নার্স কথাটি আজকাল তেমন শোনা যায় না।

সেই সময় ডাঃ নীলরতন সরকারের কন্যা শ্রীমতি কল্যানীর প্রতি ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের ভালোবাসার উদ্রেক হয়। কিন্তু ডাঃ নীলরতন সরকার তখন ছিলেন ভারতবর্ষের খ্যাতনামা ডাক্তার। বিধান রায়ের মতো নতুন প্রজন্মের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি হননি। আর তাই নিজেকে আরও বড় ডাক্তার করে তুলতেই বিধান চন্দ্র রায়ের লন্ডন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। 

বড় ডাক্তার হওয়ার তাগিদে মাত্র ১২০০ টাকা সম্বল করে বিধান রায়ের লন্ডন গমন। কিন্তু একটু দেরি করে ফেলেছিলেন। লন্ডনে এসে দেখেন ভর্তি হওয়ার তারিখ পার হয়ে গেছে। বিষণ্ণ মনে লন্ডনের বার্থোলোমিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে ঘোরাঘুরি করছেন, এমন সময় ঐ হাসপাতালে একজন রুগি আসলেন। হাসপাতালের সুপার, বিধান রায় কে ঘোরাঘুরি করতে দেখে বললেন "এই যে ইয়ং ম্যান, তুমি কি বলতে পারবে এই রুগিটির কি হয়েছে"? বিধান রায় কিন্তু সেই রুগিকে না ছুঁয়েই বলে দিয়েছিলেন ওর চিকেন পক্স হয়েছে। যদিও রুগিটির শরীরে কোন বসন্তের গোটা তখনও ওঠেনি। এরপর সুপার সাহেব, বিধান রায় কে জিজ্ঞাসা করলেন, "ইয়ং ম্যান তুমি কি করে বুঝলে, ওর চিকেন পক্স হয়েছে"। বিধান রায় বললেন, রুগির শরীরের স্মেল (গন্ধ) থেকে তিনি এটা বলেছেন। এর একদিন পর দেখা গেলো রুগীটির সারা শরীরে চিকেন পক্সে ভরে গিয়েছে। সুপার সাহেব তখন সেই ইয়ং ম্যান, মানে বিধান রায়কে তলব করলেন এবং তারিখ চলে যাওয়া সত্বেও ভর্তি নিলেন। পরে এখান থেকেই ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় মেডিসিন এবং সার্জারী দুই ক্ষেত্রেই এফআরসিএস এবং এমআরসিপি দুটি ডিগ্রী লাভ করেন, মাত্র দুই বছর তিন মাসে। 

প্র্যাকটিস জমাবার প্রথম পর্বে বিধানচন্দ্র রায় যে কলকাতায় পার্ট টাইম ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিলেন; গল্প মনে হলেও কথাটা সত্যি। চালক ও মালিক হিসেবে মোটর গাড়ি সম্বন্ধে তাঁর যে আজীবন আগ্রহ ছিল তা অনেকেরই জানা। 

১৯১১ সালে ডাক্তার রায় বিলেত থেকে যখন কলকাতায় ফিরলেন তাঁর কাছে মাত্র পাঁচ টাকা। বিলেত যাবার আগে কলকাতায় বিধান রায়ের ফি যখন দুটাকা,  

তিনি ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ফিরে প্রথমে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও পরে ক্যাম্পবেল তথা আরজি কর এবং কারমাইকেল তথা নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষকতা করেন। এছাড়া তিনি কলকাতার চিত্তরঞ্জন সেবা সদন, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল, ভিক্টোরিয়া ইন্সটিটিউশন এবং কমলা নেহরু হাসপাতালেও যুক্ত ছিলেন।

প্রথমে প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন ৬৭/১ হ্যারিসন রোডে, পরে দিলখুশ কেবিনের কাছে, ৮৪ হ্যারিসন রোড। সেখানে ছিলেন ১৯১৬ পর্যন্ত, এর পর আসেন ওয়েলিংটন স্ট্রিটের বাড়িতে। শোনা যায়, উপার্জন বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় তিনি বাড়িতে রক্ত ইত্যাদি পরীক্ষার জন্য প্যাথলজিকাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করেন। 

পেশায় বিপুল সাফল্য বিধানচন্দ্রকে বিশেষ সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মাত্র সাড়ে আট বছরের প্র্যাকটিসে কলকাতায় প্রাসাদোপম বাড়ি এবং গাড়ির মালিক হওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না। তাঁর রোগীর তালিকায় তখন কোন্ বিখ্যাত মানুষ নেই? এর মধ্যে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও আছেন। শোনা যায়, গোড়ার দিকে জোড়াসাঁকোর জন্যও ভিজিট নিতেন, যদিও পরবর্তী সময়ে দুজনে খুব কাছাকাছি আসেন। 

মুখ দেখে রোগীর চিকিৎসা করতেন ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়। ডাক্তার রায়ের বিশাল প্র্যাকটিসের কোনও মাপজোক আজও হয়নি। কলকাতার বাইরেও বার্মা থেকে বালুচিস্তান পর্যন্ত তাঁর ডাক্তারি দাপট, যার একমাত্র তুলনা স্যার নীলরতন সরকার। তাঁর রোগীর তালিকায় ছিলেন- দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, মোতিলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধী, বল্লভ ভাই পাটেল, মৌলানা আজাদ, জওহরলাল ও তাঁর কন্যা ইন্দিরা প্রমুখ। তাঁর গুণের প্রশংসক ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি এবং ব্রিটেনের প্রাইম মিনিস্টার ক্লেমেন্ট এটলি। মহাত্মা গান্ধীর অনশনের সময়ে প্রত্যেকবার বিধান চন্দ্র রায় পাশে ছিলেন চিকিৎসক হিসেবে। 

নিজেকে শুধু চিকিৎসার গণ্ডির মধ্যে বেঁধে রাখেননি বিধানচন্দ্র রায়। শিক্ষা, শিল্প, রাজনীতি, দর্শন সব ক্ষেত্রে সমান দক্ষতা রেখে গেছেন। তাঁর এই বিশাল কর্মকাণ্ডে তিন জন মানুষের বিশেষ প্রভাব ছিল। বলা যায়, তাঁদের গুরু হিসাবেই দেখতেন বিধান। চিকিৎসা শাস্ত্রে কর্নেল লুকিস। যিনি বিধানকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, ইংরেজদের সঙ্গে মাথা উঁচু করে কথা বলতে। বিধান বলেছিলেন, “তিনি আমার মধ্যে পৌরুষ জাগিয়ে তুলেছিলেন। আত্মসম্মান বোধ তৈরি করেন। রাজনীতিতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। যাঁর হাত ধরে জাতীয় রাজনীতিতে আসা। গান্ধীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ। আর শেষে শিক্ষা প্রসারে বাংলার বাঘ তথা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। 

কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে ১৯৩০ সালে ইংরেজ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন দিল্লি থেকে। তারপর তাঁকে আনা হয় কলকাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। বিধান রায় জেলে এসেছিলেন প্রথম শ্রেণির বন্দী হিসেবে। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় সশ্রম কারাদণ্ড চেয়ে নিয়েছিলেন জেল কর্তৃপক্ষের কাছে। ফলে ডাঃ বিধান রায়ের ডিউটি পড়ল জেলের হাসপাতালে। কিছু দিনের মধ্যেই বোঝা গেল জেলে রোগীর মৃত্যুসংখ্যা কমে গেছে। নিউমোনিয়া, টাইফায়েড ইত্যাদি কিছু কঠিন অসুখের ওষুধ জেলে থাকত না। সে সব বিধান রায় তাঁর দাদা সুবোধ রায়ের মাধ্যমে বাইরে থেকে নিজের টাকায় আনাতে শুরু করলেন। 

ওই জেল হাসপাতালে তখন ১১০ জন রোগী। একদিন জেলের ডাক্তার বঙ্কিমবাবু কোনও কারণে আসতে দেরি করছেন। বিধান রায় একাই এক এক করে ১১০ জন রোগীকে দেখলেন। তার পর ছুটতে ছুটতে বঙ্কিমবাবু এসে হাজির। কাঁচুমাঁচু মুখে বন্দী বিধান রায়কে বলছেন, স্যার একটু দেরি হয়ে গেল। বিধান রায় হেসে বললেন, না না ঠিক আছে, রোগী আমি দেখে নিয়েছি, আপনি ওদের টিকিটগুলো আনুন, পথ্য আর ওষুধটা আমি বলে দিচ্ছি। আধঘণ্টা আগে দেখা ১১০ জন রোগীর প্রত্যেকের জন্য ওষুধ, পথ্য প্রায় মুখস্থ এক এক করে বলে গেলেন ডাঃ বিধান রায়। এমনই অসামান্য স্মৃতিশক্তি ছিল তাঁর। 

বিধান রায় জেলে থাকাকালীন পেয়ে গেলেন বন্দী কানাই গাঙ্গুলিকে। কানাইবাবু ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডক্টরেট করেছিলেন জার্মানি থেকে। খুব ভালো জার্মান ভাষা জানতেন তিনি। তিনি বরিশালের শঙ্কর মঠের স্বামী প্রজ্ঞানন্দের বিপ্লবী দলের সদস্য ছিলেন। পরে গ্রেফতার হন ব্রিটিশ পুলিশের হাতে। এই কানাই গাঙ্গুলির কাছে জেলের ভিতর বিধান রায় শুরু করলেন জার্মান ভাষা শেখা। এই নিয়ে কানাইবাবু লিখেছিলেন, মাস জেলে থাকাকালীন বিধান রায় একদিনও বাদ দেননি জার্মান শেখার ক্লাস। এবং যখন জেল ছেড়ে চলে গেলেন, তখন তাঁর এই বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হয়ে গেছে। 

একবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সঙ্গে বিধান রায়ের মিটিং চলছে। মিটিং শেষে বিধান রায় বললেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট আমার মনে হচ্ছে আপনার পিঠে মারাত্মক পেইন আছে। কেনেডি অবাক বিস্ময়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, How do you know that? 

বিধান রায় বিনীতভাবে বললেন, আমি পেশায় ডাক্তার, নেশায় রাজনীতিবিদ। কেনেডি তাঁর সেক্রেটারিকে চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল কাগজ বিধান রায়কে দেখাতে বললেন। বিধান রায় নতুন করে প্রেসক্রিপশন দিলেন। দৃঢ়চিত্তে বললেন, নিয়ম করে খাবেন। না সারলে আমাকে জানাবেন। আমি আবার আসবো আমার নিজ খরচে। মিটিং শেষে বিদায় নেয়ার আগে হ্যান্ডশেক করতে করতে বললেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট আমার ফী তো দিলেন না! কেনেডি জানতে চাইলেন, কত দিতে হবে ফী? বিধান রায় মওকা পেয়ে পশ্চিম বঙ্গের উন্নয়নের জন্য ৩০০ কোটি টাকা চাইলেন। সাথে সাথে মঞ্জুর করে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। 

বিধান চন্দ্র রায় ১৯৪২-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৪৩-৪৪ তিনি সেখানকার উপাধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি শিলং হাইড্রো ইলেকট্রিক কোম্পানির অন্যতম ডিরেক্টর ছিলেন। জাহাজ, বিমান, ইনসিওরেন্সের ব্যবসার পাশাপাশি মায়ের নামে পাটনায় একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। 

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের প্রভাবে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচনে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেন। পরে কলকাতা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও কলকাতা পৌরসংস্থার মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্ধির ডাকে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মনোনীত হন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থীরূপে আইনসভায় নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার বছরে ১৫ অগাস্ট পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন ডঃ প্রফুল্ল ঘোষ। ডাঃ রায় ছিলেন সেই মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে গ্রহণ করেন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব; আমৃত্যু তিনি ওই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। 

যখন ডা. রায় মুখ্যমন্ত্রী হলেন তার আগের মাসে ডাক্তারি থেকে আয় ৪২০০০ টাকা, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নিজেই মাইনে ঠিক করলেন ১৪০০ টাকা, বয়স ৬৫। নিকটজনদের বললেন, “দশটা বছর কম হলে ভাল হত।তার উপর চোখের সমস্যা, ম্যাগনিফাইং গ্লাস ব্যবহার করতেন এবং খুব লম্বা কিছু পাঠ এড়িয়ে চলতেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি খুবই খাতির করতেন। এবং স্বাভাবিক সৌজন্যে বলতেন, লেখার অভ্যাসটা যেন ছেড়ে দেবেন না। 

স্বাধীনোত্তর ভারতে বাংলার টালমাটাল পরিস্থিতি ছিল। তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের আমলেই ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৪৮-এ উদ্বাস্তু সমস্যা রাজ্যে ভয়াবহ আকার নিয়েছিল, সেইসময় বিধান রায় তাদের দিয়েছিলেন অন্ন ও বাসস্থানের প্রতিশ্রুতি। বহু পতিত জমি উদ্ধার করে বাসস্থানের জন্য গড়ে তুললেন সল্টলেক, লেক টাউন, কল্যাণী উপনগরী প্রভৃতি। বেকারদের জন্য কর্মনিয়োগের ব্যবস্থা করেছিলেন। বাংলায় শিল্পের জন্য প্রতিষ্ঠা হল দুর্গাপুর ইস্পাত নগরী, চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানা। দার্জিলিং-এ দেশের মধ্যে প্রথম পর্বতারোহণ শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি হল। কলকাতার পর হলদিয়া বন্দর গড়ে ওঠা, এমনকি ফারাক্কা ব্যারেজ গড়ে ওঠার পেছনেও বিধান চন্দ্রের ভূমিকা ছিল। তাঁর প্রচেষ্টায় রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ, পুরুলিয়া, রহড়া, নরেন্দ্রপুরে আশ্রমিক পরিবেশে রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। তাঁর চোদ্দো বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রচুর উন্নতি সাধন হয়েছিল। এই কারণে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের রূপকারনামে অভিহিত করা হয়। মৃত্যুর পর তাঁর সম্মানে কলকাতার উপনগরী সল্টলেকের নামকরণ করা হয় বিধাননগর। 

সংস্কৃতিতেও তাঁর অবদান কম নয়। সত্যজিত রায়ের চলচ্চিত্র পথের পাঁচালিঅসমাপ্ত অবস্থায় দেখেন এবং ছবিটির সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করেন। বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শংকরের জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকীতে রচনাবলী ছাপানোয় উদ্যোগী হন। 

দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁর দুবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, তৃতীয়বার আর ধাক্কাটা সামলাতে পারেননি। ১৯৬২-র ১-লা জুলাই মৃত্যু বরণ করেন তিনি। মানুষের মুখ দেখে নাড়ির খবর বলতে পারা এই চিকিৎসক নিজের আসন্নপ্রায় মৃত্যুর কথা বুঝতে পেরেছিলেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর অবিস্মরণীয় কৃতিত্বের জন্য তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন ১ জুলাই দিনটি সারা ভারতে "চিকিৎসক দিবস" রূপে পালিত হয়। 

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন