বরাবর বিশ্বাস করে এসেছেন, তিনি লিখতে পারেন না। যা লেখেন, সবই ছাইভস্ম। তাই জীবনের শেষ লগ্নে এসে এক দিন স্তূপীকৃত জঞ্জালের মতো নিজের প্রায় সমস্ত পাণ্ডুলিপি তুলে দিয়েছিলেন বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের হাতে। বলেছিলেন, “আমার মৃত্যুর পরে সব পুড়িয়ে দিয়ো।” ভাগ্যিস ম্যাক্স কথা দিয়েও কথা না রেখে যত্ন করে সেই লেখাকে প্রকাশ করেছিলেন। তা না হলে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত এক উপন্যাস ‘দ্যা ট্রায়াল’ –কে পেতামই না আমরা। মৃত্যুর অনেক পরে পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী লেখক হিসেবে জায়গা করে নিলেন এই ব্যক্তি, নাম ফ্রান্ৎস কাফকা। তার উপন্যাসে, ছোটগল্পে প্রভাবিত হয়ে সাহিত্য রচনা শুরু করলেন শত শত লেখক। নিজের অজান্তেই জন্ম দিয়ে গেলেন ‘Kafkaesque’ বলে নতুন এক ধারার। আজ তাঁর জন্মদিন। তাঁকে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করার পাশাপাশি আসুন চিনে নেওয়া যাক মানুষটাকে।
![]() |
| ফ্রান্ৎস কাফকা |
তৎকালীন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের প্রাহা (প্রাগ) শহরের 'ওল্ড টাউন স্কয়ারে' একটি মধ্যবিত্ত জার্মান-ইহুদী পরিবারে ১৮৮৩ সালের ৩-রা জুলাই জন্মগ্রহণ করেন ফ্রান্ৎস কাফকা। তার বাবার নাম হারমেইন কাফকা আর মায়ের নাম জুলি। হারমেইন এবং জুলির ছয়টি সন্তানের মধ্যে ফ্রান্ৎস কাফকা ছিলেন জ্যেষ্ঠ। জীবিকার প্রয়োজনে ব্যস্ত বাবা-মায়ের সঙ্গ শৈশবে খুব একটা না পেলেও তিন বোন এলি, ভ্যালেরি আর ওটলির সাথে শৈশব কেটেছে কাফকার। এর মধ্যে ওটলি ছিলেন ফ্রান্ৎসের সবচেয়ে কাছের মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইহুদি বন্দীশিবিরেই প্রাণ হারিয়েছেন তিন বোনের সবাই।
প্রাগের মাসনা স্ট্রিটে, ডয়েচ ক্যানাবেনশুল জার্মান বয়েজ এলিমেন্টারি স্কুলে হাতেখড়ি কাফকার। ১৮৮৯ থেকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত এই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষার পাট চুকিয়ে ওল্ড টাউন স্কয়ারের জার্মান মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। পাঠ্যক্রম ছিলো জার্মান ভাষায়, বাড়িতে সবাই কথা বলতো ইদ্দিশ ভাষায় আর প্রাগের সাধারণ মানুষ কথা বলতো চেক ভাষায়। তাই কাফকা অনেকটা নিজের গরজেই তিন ভাষাই শিখে নিয়েছিলেন। সেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাফকা পুরো আট বছর অধ্যয়ন করেন এবং বেশ ভাল ফলাফল অর্জন করেন।
১৯০১ সালে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে প্রাগ শহরের জার্মান চার্লস-ফার্দিন্যান্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে ভর্তি হন। কিন্তু দুই সপ্তাহ যেতে না যেতেই তিনি রসায়ন ছেড়ে আইন শাস্ত্রে ভর্তি হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অনেক দীর্ঘ কোর্স হওয়ায় তিনি এই সময়কালে তার প্রিয় বিষয় ইতিহাস, কলা ও জার্মান শিক্ষায় ছোট ছোট কোর্স করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বছরেই দেখা হয় তার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে যাওয়া ম্যাক্স ব্রডের সাথে। ম্যাক্সের শুরুতেই ভালো লাগে কাফকাকে। কাফকা আর ব্রড দুজন মিলে প্লেটোর ‘Protagoras‘ থেকে শুরু করে গুস্তাব ফ্লবেয়ারের ‘Sentimental Education‘ পর্যন্ত পড়েছেন, আলোচনা করেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তবে দস্তইয়েফস্কি, ফ্লবেয়ার, ফ্রানৎস গ্রিলপারসার আর হাইনরিখ ফন ক্লাইস্ট, এই চার লেখকের লেখা পড়ে মুগ্ধ কাফকা তাঁদের ‘সত্যিকার অর্থে নিজের রক্তের ভাই’ বলেই ঘোষণা করেছিলেন। জার্মান সাহিত্যের আরেক দিকপাল গ্যোয়েটে র সাহিত্যকর্ম পড়েও বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তরুণ কাফকা।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাশ করে চাকরিতে প্রবেশ করেন ইতালিয়ান বিমা কোম্পানি ‘Assicurazioni Generali’ তে। পাশাপাশি লেখালেখিও শুরু করেন। সকাল আটটা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কাজ করে লেখালেখিতে সময় দিতে পারছিলেন না বলে চাকরিটাই ছেড়ে দিয়ে চাকরি নিলেন ‘Workers’ Accident Insurance Institute for the Kingdom of Bohemia’-তে। দৈনিক ছয় ঘন্টার চাকরি, সাথে চলছে লেখালেখি। ১৯০৮ সালে কাফকা তার প্রথম লেখা ছাপেন। ১৯১২ সালে প্রকাশিত হয় তার লেখা ‘Das Urteil’ (literally: ‘The Verdict’)। এই গল্প নির্মিত হয়েছে বাবা আর ছেলের সম্পর্কের টানাপোড়নের বুননে। বিশ্লেষকদের মতে কাফকার নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবিই ফুটে উঠেছে এই গল্পে। কাফকার জীবনজুড়ে তার বাবা তার উপর এত বেশি প্রভাব খাটিয়েছেন যে তিনি অনেকটা দুঃখের সাথেই লিখেছিলেন, “বাবা আমার পৃথিবীর পুরো মানচিত্রের উপর শুয়ে ছিলেন। তিনি আমার জন্য খুব কম জায়গাই রেখেছিলেন।”
১৯১৫ সালে জার্মানির লিপজিগ থেকে প্রকাশিত কাফকার অন্যতম সেরা সাহিত্যকর্ম ‘Die Verwandlung’ (‘The Metamorphosis’)। এই উপন্যাসের প্রথম লাইনটিই ছিলো ঠিক এমন, “এক সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা দেখলো – সে পোকা হয়ে গেছে”। পৃথিবীর হাজারো মানুষকে এই একটি লাইন যুগ যুগ ধরে ভাবনার খোরাক দিয়েছে। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ আন্দোলিত হয়েছিলেন এই একটি লাইন পড়ে। কী সাবলীলভাবে একজন মানুষের শারীরিক রুপান্তরের খোলসে সামাজিক রুপান্তরের কথা বলে গেলেন। এই উপন্যাসের লেখনী শুধু মার্কেজের মতো তরুণ সাহিত্যিককেই প্রভাবিত করেনি, যুগের পর যুগ ধরে প্রভাবিত করে গেছে শত সহস্র সাহিত্যবোদ্ধাকে।
এরপর একে একে প্রকাশিত হয়েছে ‘In the Penal Colony’,’ A Hunger Artist’ এর মতো কালজয়ী সব সাহিত্যকর্ম, যা তখন অবশ্য সেভাবে প্রচারের আলো পায়নি। ১৯১৭ সালে কাফকার যক্ষ্মা ধরা পড়ে। ভয়ংকর ছোঁয়াচে এই রোগের চিকিৎসা তখনও তেমন প্রচলিত ছিলনা। যক্ষ্মার কারণে কাফকাকে চাকরি থেকে পেনশন দিয়ে বাধ্যতামূলক অব্যাহতি দেওয়া হয়। লেখালেখিতে আরো ভালোভাবে মনোনিবেশ করতে চেয়েও পারছিলেন না। ক্রমান্বয়ে রোগা হয়ে যাচ্ছিলেন, হাসপাতাল আর যক্ষ্মা নিবারণ কেন্দ্রগুলোতে দিন কাটছিলো কাফকার। হতাশা আর একাকিত্বও হয়তো জেকে বসেছিলো কাফকার কাঁধে।
বিয়ে করেননি কাফকা, ভালো করে বলতে গেলে সুযোগ হয়ে ওঠেনি। অনেক নারীর সংস্পর্শেই এসেছেন, কিন্তু কাউকেই ধরে রাখতে পারেননি। কাফকার প্রথম প্রেমিকা ছিলেন বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের আত্মীয়া ‘ফেলিৎস বাউয়ার’। বছর ছয়েক সম্পর্ক ছিল। দেখা হয়েছিল সাকুল্যে তিন থেকে চার বার। পুরো যোগাযোগটাই ছিল চিঠিতে। সেই চিঠিতেই নিজের মনের কথা, অবসাদের কথা, বিপন্নতার কথা উজাড় করে লিখতেন কাফকা। অথচ, ফেলিৎসে কখনও দেখা করতে চাইলে রাজি হতেন না। তাঁর মনে হত, একা না থাকলে লেখা যাবে না। তাকে কম করে হলেও কাফকা পাঁচশত চিঠি লিখেছেন। মৃত্যুর পরে সেই চিঠির সংকলন নিয়ে ‘Letters to Felice’ নামে বইও বেরিয়েছে।
ফেলিৎসের সঙ্গে দু’বার বাগদান ঠিক হয়েছিল তাঁর। কিন্তু দু’বারই কাফকা নিজে তা ভেঙে দেন। প্রথম বার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা হারমান কাফকা। আর দ্বিতীয় বার বাগদানের কিছু দিন আগেই ধরা পড়ে, লেখক যক্ষ্মায় আক্রান্ত। ফেলিৎসের সঙ্গে প্রেমপর্বের ওই ছ’বছরেই ‘দ্য মেটামরফোসিস’, ‘দ্য ট্রায়াল’, ‘দ্য স্টোকার’, ‘দ্য জাজমেন্ট’ এবং অসমাপ্ত ‘আমেরিকা’-র মতো একের পর এক লেখা বেরিয়েছে কাফকার কলম থেকে।
পত্রনির্ভর এই প্লেটোনিক প্রেম যখন চলছে, তখনই নাকি ‘গ্রেটা ব্লখ’ নামে ফেলিৎসেরই এক বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন কাফকা। ম্যাক্স ব্রড দাবি করেছেন, গ্রেটার সঙ্গে রীতিমতো শারীরিক সম্পর্ক ছিল তাঁর বন্ধুর। ১৯১৪ সালে গ্রেটার যে ছেলে হয়, কাফকাই তাঁর বাবা বলে দাবি করেছেন ম্যাক্স।
ফেলিৎসে আর গ্রেটার সঙ্গে বিচ্ছেদের ১৯১৯ সালে চিকিৎসার জন্য এল্ব নদীর ধারে শেলসেন শহরে গিয়ে পরিচয় এবং প্রেম ক্যানসার-আক্রান্ত ইউলি ওরিৎজেকের সঙ্গে। ইউলির সঙ্গেও বাগদান হয়েছিল কাফকার। কিন্তু সে বারেও বাবা হারমান বেঁকে বসায় হার মানলেন কাফকাই। ১৯৪৪ সালে জার্মানরা চেকোস্লোভাকিয়ার দখল নিলে গ্রেটা ব্লখের মতো ইউলিরও ঠাঁই হয় আউশভিৎস-এ। সেখানেই মারা যান তিনি।
‘আপনার দ্য স্টোকার গল্পটি অনুবাদ করতে চাই। যদি অনুমতি দেন, বাধিত হব’— প্রাগে কাফকার বাড়িতে এক দিন এল এমনই একটি চিঠি। প্রেরকের নাম মিলেনা ইয়েজেনস্কা। তরুণী। সুন্দরী। সাংবাদিক। নিবাস ভিয়েনা। কাফকা অনুমতি দিলেন, সঙ্গে নিজের হৃদয়টিও। ফেলিৎসের মতো মিলেনাকেও রোজ চিঠি লিখতেন কাফকা (‘লেটার্স টু মিলেনা’ নামে এই চিঠিগুলো নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে আরেক বেস্টসেলিং বই); প্রেমের রাংতায় মোড়া অবসাদের আখ্যান। মিলেনার সঙ্গে তখন তাঁর স্বামীর সম্পর্ক তলানিতে। কাফকার সঙ্গে বার দুয়েক দেখা হয়েছিল তাঁর। কাফকা চেয়েছিলেন মিলেনা তাঁর সঙ্গে এসে থাকুন। কিন্তু মিলেনা বিবাহবিচ্ছেদে রাজি হননি। শেষমেশ সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসেন কাফকা। এই সম্পর্ক চলাকালীনই কাফকা লিখেছিলেন ‘দ্য ক্যাসল’।
সব চেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হল, কাফকার যে পাঁচ প্রেয়সীর কথা জানা যায়, তাঁদের তিন জনই মারা গিয়েছেন হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে।
মিলেনার সঙ্গে বিচ্ছেদের পরে অসুস্থতা বাড়ল কাফকার। শরীর জুড়ে রাজত্ব করছে যক্ষ্মা। আর সেই ব্যাধিকেই ধীরে ধীরে জমি ছেড়ে দিচ্ছেন তিনি। তবু তারই মধ্যে আবার প্রেম। শেষ বারের মতো। ডোরা ডিয়ামান্ট। ১৯২৩ সালে বাল্টিক সাগরের ধারে এক রিসর্টে আলাপ দু’জনের। পরিচয় প্রেমে গড়াতে দেরি হয়নি। নিঃসঙ্গ, অবসন্ন, অসুস্থ কাফকা তখন খড়কুটোর মতোই আঁকড়ে ধরেছিলেন ডোরাকে। শরীরের লড়াই আর কত দিন চালাতে পারবেন, তাও জানতেন না। কিন্তু মনের লড়াইয়ে এই প্রথম এক সক্রিয় সহযোদ্ধাকে পেলেন। ম্যাক্স ব্রড যাঁকে কাফকার ‘জীবনসঙ্গী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। ডোরা তাঁর জীবনে আসার পরই প্রথম বার হাওয়ার বিপরীতে দাঁড় বাইতে সাহস পেলেন তিনি। বাড়ি ছেড়ে বান্ধবীর হাত ধরে চলে এলেন বার্লিনে। ছাড়লেন বলা ভুল, আসলে পালিয়ে এলেন। যাতে কেউ সন্দেহ না করে, তার জন্য সঙ্গে বিশেষ মালপত্রও নিলেন না।
সাহিত্যজগতে যে তাঁর কোনও ভবিষ্যৎ নেই, তত দিনে সে ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে কাফকার। তবু হাতের কলম নামিয়ে রাখতে পারেননি। লিখে যেতেন লেখার নেশায়। যক্ষ্মায় ধুঁকতে থাকা সেই ব্যর্থ লেখকের সঙ্গেই বার্লিনে ছোট্ট সংসার পাতলেন দস্তয়েভস্কির ভক্ত ‘ডোরা’। তিনি একাই তখন রোজগেরে। প্রাণপাত পরিশ্রম করেন। তবু অনটন ঘোচে না। কিন্তু সেই দিন আনি-দিন খাই অবস্থাতেই বয়ে যেত অনাবিল এক আনন্দধারা। ডোরা কাজে বেরোলে লেখার খাতা নিয়ে বসতেন কাফকা। বিকেলে প্রেয়সী ফিরে এলে তাঁকে বাহুডোরে নিয়ে পড়ে শোনাতেন পাণ্ডুলিপি। কখনও হয়তো ক্লেইস্টের বই থেকে পড়ে শোনাতেন ডোরা। আবার গ্যেটের বই থেকে কবিতা পড়তেন কাফকা। ডোরার সঙ্গে সংসার পেতে এই প্রথম মনখারাপ থেকে ছুটি নিলেন তিনি। কঠিন দারিদ্রের মধ্যেও আনন্দে ছিলেন দু’জনে। খবরের কাগজ কেনারও সামর্থ্য ছিল না। রাতের নিভন্ত মোমের আগুনে সকালের রান্না গরম করতেন ডোরা। জ্বালানির জোগানও যে অপ্রতুল।
কাফকার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে দ্রুত। ১৯২৪-এর শুরুতে বার্লিনে তখন শীত। কাফকার প্রবল জ্বর। একা ডোরা তাঁকে আগলে রেখেছেন। সেবাযত্ন করছেন। কিন্তু কাফকার বাড়ির লোকজনের কাছে খবর পৌঁছতে দেরি হল না। তাঁরা এসে আবার প্রাগে নিয়ে গেলেন কাফকাকে। কাফকার সেখানে মন টেকে না। দিনে অন্তত দুটো করে চিঠি লেখেন ডোরাকে। এর কয়েক মাস পরে এপ্রিলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। যক্ষ্মা ছড়িয়ে গিয়েছে স্বরযন্ত্র পর্যন্ত। ঠিক হল, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে ভিয়েনার কাছে এক হাসপাতালে। কাফকার পরিবার খবর পাঠাল ডোরাকে। ডোরা ছুটে এলেন।
হাসপাতালেও অবস্থার উন্নতি হল না। গলার যন্ত্রণায় কথা বন্ধ। সামনে দাঁড়ানো ডোরাকে কাগজে লিখে জানাতেন মনের কথা। ওই অবস্থাতেই ডোরার বাবাকে চিঠি লিখলেন কাফকা। ‘আপনার মেয়েকে ভালবাসি। বিয়ে করতে চাই।’ ডোরার বাবা ধর্মপ্রাণ ইহুদি। রাবাইয়ের পরামর্শ নিয়ে জানিয়ে দিলেন, এ বিয়ে সম্ভব নয়। ডোরা বাবার অমতেই বিয়েটা করে ফেলতেন, কিন্তু ওই অবস্থায় কাফকার পক্ষে বিয়ের ধকল নেওয়া সম্ভব ছিল না।
জীবনের নড়বড়ে সাঁকোটা যে এ বার পেরিয়ে যেতে হবে, তা বুঝতে পারছিলেন কাফকা। চিকিৎসক ডক্টর ক্লপস্টক-এর সঙ্গে রোগীর এক গোপন বোঝাপড়া হয়েছিল। অন্তিম মুহূর্ত আসার আগেই ডোরাকে কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হবে, যাতে কাফকার মৃত্যুযন্ত্রণা তাঁকে দেখতে না হয়।
সেই মতো ১৯২৪ সালের ৩ জুন ডাকবাক্সে চিঠি ফেলার অছিলায় বাইরে পাঠানো হল ডোরাকে। কিন্তু তাঁকে না দেখে অস্থির হয়ে উঠলেন কাফকা। তাঁর অনুরোধেই দৌড়ে গিয়ে ডোরাকে ডেকে আনলেন কেউ। প্রিয়তমের জন্য এক তোড়া ফুল কিনেছেন ডোরা। সেটা হাতে নিয়েই এলেন কাফকার সামনে। চোখ বেয়ে নামছে অঝোর ধারা। ধীর পায়ে বসলেন রুগ্ণ শরীরটার পাশে। সময় বেশি নেই। সাঁকোয় পা রেখেছেন সাহিত্যিক। ও পারে অন্ধকার এক জগৎ। এ পারে ডোরার বাহুডোর। চোখ বুজে এল তাঁর। তবু এক বার তাকালেন ওই মুখখানা দেখবেন বলে। কান্নায় গলা বুজে এল ডোরার। মৃদু হাসলেন সাহিত্যিক। ফুলের ঘ্রাণ নিতে মাথাটা তুললেন এক বার। কপালে খেলে গেল ডোরার আদর।
নিস্পন্দ দু’টি চোখে অবশেষে নেমে এল সারা জীবনের কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তি। আজ আর কোনও অবসাদ নেই। আজ আর কোনও ভয় নেই। আজ আর কোনও দুঃখ নেই।
তার মৃত্যুর পর ম্যাক্স ব্রড প্রকাশ করেন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘The Trial’, এছাড়াও তার চিঠির সংকলন, অসম্পূর্ণ উপন্যাসও প্রকাশের ব্যবস্থা করেন তিনি। এই উপন্যাসে কাফকা তুলে ধরেছেন বিচারব্যবস্থা আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক অনবদ্য ছবি। এভাবেই তার লেখা থেকে জন্ম নেয় সাহিত্যের এক নতুন ধারা ‘Kafkaesque’। এভাবেই সব পুড়িয়ে দিতে চাওয়া ব্যক্তির নামে রচিত হয়েছে শত-সহস্র বই। পৃথিবীর সীমানায় বেঁধে রাখতে না পারলেও কাফকাকে কাগজের কারাগারে চিরতরে তাকে বন্দী করে রেখে দিয়েছেন পৃথিবীজোড়া সাহিত্যবোদ্ধারা।
(তারিণী খুড়ো)