তত দিনে গণনাট্য ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন তিনি। ছেড়ে চলে গিয়েছেন স্ত্রী মহাশ্বেতা। দক্ষিণ কলকাতার ভাড়া বাড়িতে একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তাঁর সংসার। তাঁর নাটকের সংলাপের মতোই বাড়ির ইট-কাঠ-কংক্রিটের পাঁজর সময়ে সময়ে শুনছে, ‘বাঁচতি গেলি খাওয়া জোটে না, খেতি গেলি বাঁচা যায় না...’ কিন্তু তখনও তিনি বিশ্বাস করছেন, দিন বদলের স্বপ্নই বাঁচিয়ে রাখে জীবন। বিশ্বাস করছেন, থিয়েটার একদিন জনগণের হয়ে উঠবে। সংলাপ আর কেবল সংলাপে আটকে থাকবে না, সাধারণ মানুষের বিপ্লবের ভাষা হয়ে উঠবে। তিনি বিজন ভট্টাচার্য, বাংলা নাটকের অন্যতম ‘চর্চিত অথচ বিস্মৃত’ চরিত্র। আসুন প্রবাদ প্রতিম নাটক ‘নবান্ন’-র নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য-কে চেনার ও জানার একটা প্রয়াস করা যাক।
![]() |
| বিজন ভট্টাচার্য |
বিজন ভট্টাচার্য অভিবক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার খানখানাপুরে ১৯১৫ সালের ১৭-ই জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। অন্য মতে জন্ম তারিখ শোনা যায় ১৯১৭ সালের ১৫ জুলাই। এ ব্যাপারে বিজনের লিখিত কোন প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়না। খানখানাপুর সুরাজমোহিনী ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক ক্ষীরোদবিহারী ভট্টাচার্য ও সুবর্ণপ্রভা দেবীর নয় সন্তানের অন্যতম বিজন। ঠাকুরদা রাসবিহারীর জমিজায়গা সে সময়ে গ্রাম্য সমাজে রীতিমতো আলোচনার বিষয় ছিল। আর চর্চিত ছিল তাঁর লেঠেলদের কাহিনি। জমিদারিতে অবশ্য খুব বেশি উৎসাহ ছিল না ক্ষীরোদবিহারীর। দেশ ভাগের অনেক আগেই বিজনকে নিয়ে তিনি চলে এসেছিলেন অধুনা উত্তর ২৪ পরগনার আড়বেলিয়ায়।
বাবার বদলীর চাকরির সুবাদে অনেকদিন ছিলেন বসিরহাট সাতক্ষীরায়। এই সময়ের কথা বলতে গিয়ে বিজন ভট্টাচার্য বলেছেন, “সেইজন্য পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত আঞ্চলিক ভাষা আমার জানা ছিল। আমার ভীষণ ভালো লাগত ঐ গ্রামের মানুষদের সঙ্গে থাকতে, ওদের সঙ্গে মিশতে। আমি লক্ষ করতাম ওদের Reaction কেমন হয়, ওরা কেমন করে কথা বলে। অসুখে কেমন করে কষ্ট পায়। এই মাটিটাকে খুব চিনতাম, ভাষাটাও জানতাম।...আমাকে যা ভীষণভাবে কষ্ট দিত, কোন Art form-এ আমি এদের উপস্থিত করতে পারব। তারাশঙ্কর বা শরৎ চাটুজ্জের মত আমার কলম ছিল না, কিন্তু আমি দেখতাম তাঁরা তো কিছুই করছেন না। আমার জ্বালা ধরতো কারণ আমি বরাবরই জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, কখনো Fringe-এ কখনো ভেতরে ছিলাম।”
১৯৩০ এ কলকাতায় এসে প্রথমে আশুতোষ কলেজ ও পরে রিপন কলেজে পড়াশোনা। ছাত্র আন্দোলনের উৎসাহী কর্মী বিজনের মহিষবাথানে লবণ সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। তবে সম্ভবত পড়াশোনা শেষ করেননি। বাম রাজনীতির জোয়ারে তত দিনে গা ভাসিয়েছেন। রুশ বিপ্লব তখন পৃথিবী জুড়ে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাচ্ছে ‘প্রগতিশীল’ ছেলেমেয়েদের। বিজনরা দেওয়াল লিখন পড়তে পেরেছিলেন। চলতি স্রোতে অবগাহন করতে সময় নেননি। আর তারই প্রেক্ষাপটে ঘটে যায় বঙ্গদেশের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বিজনরা যে মন্বন্তরকে মনে করতেন ‘ম্যান মেড’। জোতদারদের গোলায় খাবার আছে। মহাজনেরা চড়া দামে তা বিক্রি করছে কালো বাজারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে খাবার পৌঁছচ্ছে না। রাস্তাঘাটে, অলিতে গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বুভুক্ষু লাশ। সেই প্রেক্ষাপটেই তৈরি হয় ‘নবান্ন’।
মাত্র ন'দিনে লিখেছিলেন 'নবান্ন'। প্রগতি লেখক সংঘে পড়া হল 'নবান্ন'। নাটক শুনে মরমী কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজনকে বলেন—"আপনি তো জাত চাষা"। সত্যিই তো, বিজনই তো পারবেন এই নাটক লিখতে কেননা তিনি তো থাকেন মাটির কাছাকাছি। তিনি তো চেনেন মাটিটাকে, জানেন সেই ভাষাটাও। মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষ বিজন ভট্টাচার্যের লেখা নাটক 'নবান্ন' প্রথম অভিনীত হল শম্ভু মিত্র ও বিজন ভট্টাচার্যের যৌথ নির্দেশনায় ২৪ অক্টোবর ১৯৪৪-এ শ্রীরঙ্গম নাট্যগৃহে। প্রথম রজনীতে যাঁরা অভিনয় করেছিলেন তার মধ্যে ‘প্রধান সমাদ্দার’-এর মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিজন ভট্টাচার্য স্বয়ং।
প্রবাদপ্রতিম চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটক ‘নবান্ন’ সম্বন্ধে বলেছেন, "বিজনবাবুই প্রথম দেখালেন কি করে জনতার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হয়, কি করে সম্মিলিত অভিনয়-ধারার প্রবর্তন করা যায় এবং কি করে বাস্তবের একটা অংশের অখণ্ডরূপ মঞ্চের উপর তুলে ধরা যায়। হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আলোড়ন বাংলার একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠবৎ শিহরিত করে তুলল।" 'নবান্ন' সেই নাটক যাকে শম্ভু মিত্রও অভিহিত করেছেন 'এপিক নাটক' হিসাবে, যে নাটকে আঁকা রয়েছে মানুষের আত্মিক অপমৃত্যু, মনুষ্যত্বের চরম লাঞ্ছনার মর্মস্পর্শী ছবি।
গণনাট্যের পর্বেই বিজনের সঙ্গে আলাপ মহাশ্বেতার। ’৩৬ সালে তৈরি হওয়া প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘেরও অংশ ছিলেন তাঁরা। শোনা যায়, বিজনের নাটক ‘জিয়ন কন্যা’য় অভিনয়ও করেছিলেন লেখিকা। তবে মহাশ্বেতার স্মৃতিতে প্রেমপর্বে বিজন যতটা না নাট্যকার, তার চেয়ে বেশি গল্পকার। বিজন-মহাশ্বেতার যাপনে সংসার নয়, তাঁরা সে সময় বিশ্বাস করছেন কমিউন-জীবন! বিলাসবিমুখ উদ্যাপন!
এরপর ১৯৩৮ এ আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগদান সাংবাদিক হিসেবে। বছর কয়েকে বুঝে গিয়েছিলেন, ও কাজ তাঁর জন্য নয়। ১৯৪০ এ 'সরণী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প—'জালসত্ত্ব'। আনন্দবাজার পত্রিকায় কার্যকালীন রেবতী বর্মণের সাম্যবাদ সম্পর্কিত গ্রন্থগুলো আলোচনার সময়ে বিজন মার্কসবাদী মতের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং যোগাযোগ ঘটে মুজাফফর আহমেদের সঙ্গে। ১৯৪২ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টির Whole-timer। অন্যদিকে ১৯৪২ এ শুরু হয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং একই সময়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে গঠিত হয় ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ। ১৯৪৩ এ বিয়ে হয় বিশিষ্ট লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে এবং সেই সম্পর্কের সূত্রে জন্মগ্রহণ করেন তাঁদের সন্তান, পরবর্তীকালে সাড়া জাগানো লেখক নবারুণ ভট্টাচার্য।
চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অতি সাধারণ সেই মানুষগুলোই তখন হয়ে উঠছে সময়ের আখ্যান। এ ভাবেই উঠে এসেছে খেটে খাওয়া, তাড়া খাওয়া মানুষের সমাজ। সমাজবীক্ষণ। তথাকথিত বামপন্থী শিল্পীদের কলমে, পরিচালনায় তখন নাটক-সাহিত্যেই ধরা পড়ছে বাস্তব। মিলে যাচ্ছে অন্দর-বাহির। বিশ্ব আর অন্তর। সমাজ আর ব্যক্তিসত্তা।
মঞ্চে যখন এই অভিনয় চলছে, তখন বাড়িতেও ধুন্ধুমার অবস্থা। ’৪৮ সালে জন্ম নবারুণ ভট্টাচার্যের। মতাদর্শের লড়াই করে বিজন ছাড়ছেন গণনাট্য। মহাশ্বেতা-বিজন তখন ভাড়াবাড়িতে। এক চিলতে ঘরে অভাব নিত্যদিন। বাড়িতে ভাত ফুটবে কি না, জানা নেই। অথচ বিজন বাড়িতে ধরে আনছেন কখনও সাপুড়ে, কখনও লোকগায়ক, আউল-বাউলদের। প্রবল অনটনেও শিল্পের খিদে, লোকসংস্কৃতির খিদে মরছে না। অন্য দিকে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছেন মহাশ্বেতা। সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। ৬-৭ বছরের নবারুণ বড় বয়সে বারবার রোমন্থন করেছেন সেই সব স্মৃতি— রোজ বাড়িতে অশান্তি লেগে থাকত। এবং এ ভাবে চলতে চলতে শেষ দিনের তাণ্ডবও মনে ছিল নবারুণের। ভালবেসে মহাশ্বেতাকে নাকি একটা বালা কিনে দিয়েছিলেন বিজন। পার্থিব ভালবাসা। পঞ্চাশের দশকের শেষ পর্বে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে সেই বালা বিজনের কপাল লক্ষ করে নাকি ছুড়ে মেরেছিলেন মহাশ্বেতা। নবারুণ দেখেছিলেন এক দিকে বাবার কপাল থেকে গলগল করে রক্ত বেয়ে নামছে, অন্য দিকে এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়ছেন মা।
বড় হওয়ার পরে নবারুণকে নাকি বিজন বারবার বলেছেন, মহাশ্বেতার অন্য সম্পর্ক ভাল ভাবে মেনে নিতে পারেননি তিনি। বস্তুত, মহাশ্বেতা চলে যাওয়ার পরে বিজন আর কখনও কোনও সম্পর্কেও জড়াননি। বাকি জীবন কেটেছে ছেলেকে নিয়ে।
গণনাট্য ছাড়ার পর নিজের দল তৈরি করেছিলেন বিজন— ‘ক্যালকাটা থিয়েটার’। সেই গণনাট্যের আমল থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন নাটক আসলে ‘ইন্টার্যাকশন’। দর্শকও যার অংশ। সংলাপের মধ্য দিয়ে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া। কথোপকথনের পরিমণ্ডল তৈরি করা।
শিক্ষক বাবার কাছে শেক্সপীয়র শুনেছিলেন বিজন। পড়েওছেন। কিন্তু ক্লাসিক্যাল থিয়েটার কখনওই টানেনি তাঁকে। আকর্ষণ করেনি পেশাদার ব্যবসায়িক থিয়েটার। মনে রাখা দরকার, যে সময়ে বিজন বড় হচ্ছেন, সেই সময়ে কলকাতায় পেশাদারি থিয়েটার যথেষ্টই জনপ্রিয়। পরবর্তী কালে বিজন বারবার বলেছেন, ওই ধরনের থিয়েটারের রীতি, শৈলী কোনও কিছুই তাঁকে আকর্ষণ করেনি। নাটক রচনার ক্ষেত্রেও নয়, পরিচালনার ক্ষেত্রেও নয়। বরং তাঁকে নাটক লিখতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে রেশনের লাইন। যেখানে তিনি দেখেছেন, ধর্ম-জাতি-সামাজিক স্তরের বেড়া ভেঙে সকলে একত্রে দাঁড়িয়েছেন। যোগাযোগ তৈরি হয়েছে একের সঙ্গে অপরের। কথোপকথন হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই লাইনেই তিনি দেখেছেন, সংকীর্ণ স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে প্রশাসন, জোতদারের বিরুদ্ধে শ্রেণিস্বার্থ না ভেবে একত্রে প্রতিবাদ করছে জনসাধারণ। ওই জনসাধারণের মধ্যেই কমিউনিস্ট আস্ফালন দেখেছিলেন বিজন।
বাদল সরকারের কয়েক দশক আগেই বিজনরা বুঝে গিয়েছিলেন নাটক কেবল মঞ্চে নয়, রাস্তাঘাটে ঘুরে ঘুরে করার বিষয়। দর্শক আর অভিনেতার মধ্যে যেখানে মঞ্চের দূরত্ব তৈরি হবে না। আজীবন এ বিশ্বাস লালন করেছেন বিজন। পরবর্তী কালে বাদলরা যার নাম দেবেন ‘থার্ড থিয়েটার’।
মঞ্চের ভাষা আর কথ্য ভাষা নিয়ে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন বিজন। কাজে লেগেছিল ’৪২-’৪৩ সাল জুড়ে সমগ্র বাংলা প্রদেশ পরিক্রমা। নানা সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশার মধ্য দিয়ে বিজন তাদের লোকাচার, জীবনদর্শন, লোকশ্রুতি, সংস্কার ও বিশ্বাস, ভাষা, কথার টান ও সুর আত্মস্থ করেছেন, যা তাঁকে নাটকের ভাষা ও চাল নির্ধারণ করতে পথ দেখিয়েছে। অঞ্চল ভেদে ডায়লেক্টের সেই তফাতকেই নাটকে বারবার ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন বিজন। নিজের দলেও সেই ডায়লেক্ট ভিত্তিক সংলাপের উপরেই জোর দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর দলের অভিনেতারা অনেকেই পরে বলেছেন, উচ্চারণ নিয়ে কী ভয়ংকর খুঁতখুঁতে ছিলেন বিজন! ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠিক উচ্চারণের জন্য লড়াই করে যেতেন।
স্মৃতির কলমে সুবীর বসু লিখেছেন, ‘... একবার হয় রঙ্গনা নয়তো বিজন থিয়েটারে ‘চলো সাগরে’ নাটকের অভিনয় শেষ হয়ে গেছে। সকলে মেক আপ, জামা কাপড় পাল্টাচ্ছে। বিজনকাকা হঠাৎ হাউ হাউ করে কাঁদছেন আর বলছেন— আমরা তো নাটকে ইন্টারন্যাশনাল গাইছি। কিন্তু কবে তা আমাদের দেশের শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে গাইবে? আমরাই কি কেবল গেয়ে যাব?’
এক দিকে যখন মঞ্চ নিয়ে দিনের পর দিন এক্সপেরিমেন্ট করছেন নাট্যকার, একলা সংসারে তখন বড় হচ্ছেন নবারুণ। বন্ধু ঋত্বিক ঘটক নিয়মিত হাজির হচ্ছেন বাড়িতে। ‘বাংলা’র আসর বসছে। আর বিলাসিতা ছিল পাঁঠার মাংস। সুযোগ পেলেই মাংস রান্না হত বাড়িতে। আর কখনও পেটে ব্যথা হলে নবারুণকে হলুদ গোলা জল খাইয়ে দিতেন বিজন। টোটকা!
নাটককে উনি কেবল একটা ‘পারফর্ম্যান্স’ হিসেবে দেখতেন না। শিল্প বলতে বুঝতেন সমাজ বদলের হাতিয়ার। থিয়েটারকে বুঝতেন গণের নাটক। যা কেবল সাধারণ মানুষের ভাল-মন্দ-দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কথা বলবে না। নাটকের মধ্য দিয়ে মানুষও হয়ে উঠবেন সেই গল্পের এক-একজন কুশীলব। দর্শক এবং রঙ্গকর্মী সকলে একত্রে ঢুকে পড়বেন থিয়েটারের অঙ্গনে। তার পরে বিপ্লব ঘটে যাবে। জীবন, রাজনীতি এবং থিয়েটার নিয়ে এ ভাবেই মিলেমিশে ছিলেন বিজন। কোনও একটি সত্তাকে বাদ দিয়ে তাঁর অন্য সত্তাকে বোঝা মুশকিল। যাপন-অর্থনীতি-রাজনীতি-পরব— সব নিয়ে মাখামাখি যিনি, তিনি নিজেই আসলে একটা থিয়েটার! মোনোলগ।
গণনাট্য ছেড়ে তত দিনে একে একে বেরিয়ে যাচ্ছেন বাংলার শিল্পী সাহিত্যিকেরা। শম্ভু মিত্র থেকে উৎপল দত্ত সকলেই নিজের নিজের দল তৈরি করছেন। গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। বিজনের দল আছে বটে। কিন্তু অন্যদের মতো তত নিয়মিত অভিনয় হচ্ছে না। কারণ বিজন সব অর্থেই ছিলেন একজন শিল্পী। কিন্তু ‘অর্গানাইজ়ড’ ছিলেন না। অভিনয়কে, থিয়েটারকে বোধহয় খুব ‘অর্গানাইজ়ড’ ভাবে দেখতেও চাননি বিজন। দল গোছাতে চাননি। বরং সংগ্রামের পথটাই ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। হয়তো সে জন্যই ’৭৮ সালের ১৮-ই জানুয়ারি মুক্তমঞ্চে নাটক চলাকালীন যখন পায়ে পেরেক ফুটে গিয়েছিল, তিনি অভিনয় বন্ধ করেননি। দুই সিনের মাঝখানে পা থেকে বারও করতে পারেননি পেরেক। পেরেক বেঁধা রক্তাক্ত পায়ে শেষ হয় শেষ অভিনয়। রাতে বাড়ি ফিরে রক্ত বমি। দু’বার। পরদিন মৃত্যু।
কার মৃত্যু? ব্যক্তি বিজনের? নাকি একটা সংগ্রামের? বামপন্থী স্বপ্নের? ইন্টারন্যাশনালের?
(তারিণী খুড়ো

👍👍
উত্তরমুছুন