কাদম্বিনী গাঙ্গুলী - দেশের প্রথম মহিলা চিকিৎসক

"কে এই মিসেস গাঙ্গুলীআমায় কিছু জানাতে পারোসে নাকি এর মধ্যেই ফার্স্ট লাইসেনসিয়েট ইন মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি পাশ করে ফেলেছে আর আগামী মার্চ মাসে ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। এই তরুণী বিয়ে করে ফেলেছেডাক্তার হবে ঠিক করার পরে! তার পর অন্তত একটি সন্তানের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু ছুটি নিয়েছিল মাত্র ১৩ দিনআর শুনছি নাকি একটাও লেকচার মিস করেনি!

কাদম্বিনী গাঙ্গুলী

এই কথাগুলো ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্বয়ং তাঁর এক ভারতীয় বন্ধুকে ২০ ফেব্রুয়ারী, ১৮৮৮-তে লেখা চিঠিতে লিখেছিলেন, সুদূর বিদেশে বসে। আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত নাইটিঙ্গেল, যিনি দ্যা লেডি ইউথ দ্যা ল্যাম্প আখ্যা পেয়েছিলেন, তাঁর এই চিঠিটি এক অমূল্য দলিল। এখানে মিসেস গাঙ্গুলী হচ্ছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আজীবন কর্মরত প্রথম ভারতীয় মহিলা কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। বিশ্বের জ্ঞানীগুণী মহলে কী বিশাল বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী, এই চিঠিটি তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। আজ তাঁর জন্মদিন। তাঁকে শ্রদ্ধান জানানোর এ এক সামান্য প্রয়াস। 

১৮৬১ সালে জন্ম হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ডাক্তার নীলরতন সরকারের। আর এই বছরেই জন্ম কাদম্বিনী বসুরও, ১৮৬১ সালের ১৮-ই জুলাই বিহারের ভাগলপুরে। ব্রাহ্ম সমাজ সংস্কারক তাঁর পিতা ব্রজকিশোর বসু ভাগলপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি ও অভয়চরণ মল্লিক ভাগলপুরে মহিলাদের অধিকারের আন্দোলন করেছিলেন এবং প্রথম ভারতীয় মহিলা সংগঠন ভাগলপুর মহিলা সমিতি স্থাপন করেছিলেন ১৮৬৩ সালে। ব্রাহ্ম সমাজের অনুপ্রেরণাতেই কাদম্বনীর বাবা ব্রজকিশোর বসু মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলতে উদ্যোগী হন। কাদম্বিনীর শিক্ষা শুরু হয় ঢাকার ইডেন মহিলা বিদ্যালয়ে। 

মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে কাদম্বিনী আসেন কলকাতায়, ভর্ত্তি হন হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে। শিবনাথ শাস্ত্রী, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী, দুর্গামোহন দাশ ও প্রমুখদের সহায়তায় ১৮৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এনেট সুসানহা এক্রইড বেভেরিজ (Annette Susannah Akroyd Beveridge) নামের এক উচ্চশিক্ষিত ইংরেজ মহিলা। মূলত বোর্ডিং স্কুল। কিন্তু স্থাপন হওয়ার আড়াই বছরের মধ্যে স্কুলটি উঠে যায়। ফের ১৮৭৬ সালে ১ জুন ওল্ড বালিগঞ্জ রোডে বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়নামে স্কুলটি পুনরুজ্জীবিত হয়। এটি ছিল বাঙালি মেয়েদের প্রথম ইংলিশ বোর্ডিং স্কুল। কিন্তু এই স্কুলেরও উঠে যাওয়ার অবস্থা হল। শেষ পর্যন্ত বহু টানাপড়েনের পরে স্কুল বাঁচাতে ১৮৭৮ সালে বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়কে মিশিয়ে দেওয়া হল বেথুন স্কুলের সঙ্গে। কাদম্বিনী ছিলেন এই স্কুল থেকে প্রথম এন্ট্রান্স বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসা মেয়ে। মাত্র এক নম্বরের জন্য প্রথম বিভাগ না পেলেও খোদ লর্ড লিটন তাঁর প্রশংসা করেন। লেডি লিটনের হাত দিয়ে তাঁকে পুরস্কার ও সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। 

কাদম্বিনী নিজে ফার্স্ট আর্টস (এফ এ) পড়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। কিন্তু এর জন্য কলেজ তৈরি করতে হবে। ১৮৭৮-৭৯ সালে ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন এ ডব্লিউ ক্রফট শিক্ষা রিপোর্টে জানালেন, কাদম্বিনীর জন্যই বেথুন স্কুলকে কলেজে রূপান্তরিত করার কথা সরকার ভাবে এবং তা বাস্তবায়িত হয়। বাংলায় সাড়া পড়ে যায়। এক জন ছাত্রী ও এক জন লেকচারার নিয়ে শুরু হল কলেজ। ইংল্যান্ড থেকে এক ব্রিটিশ মহিলা সুপারিন্টেন্ড্যান্টকে আনা হয়। 

কাদম্বিনীরও আগে প্রাইভেটে এন্ট্রান্স দিয়ে সফল হয়েছিলেন চন্দ্রমুখী বসু। তিনিও তত দিনে কলকাতার ফ্রি চার্চ নর্মাল মিশন স্কুলে এসে প্রস্তুত হচ্ছেন এফএ পরীক্ষার জন্য। এঁরা দুজনেই ১৮৭৯ তে এফএ পাশ করলেন এবং তাঁদের যুগ্ম সাফল্য বেথুন কলেজে বিএ পড়ানোর দরজা খুলে দেয়। চন্দ্রমুখী নিলেন পলিটিক্যাল ইকনমি আর কাদম্বিনী গণিত। ১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে ইতিহাস গড়ে দুজনে বিএ পাশ করলেন। দেশের প্রথম দুই মহিলা গ্র্যাজুয়েট। স্ত্রীশিক্ষা বিশেষ করে মহিলাদের উচ্চশিক্ষার উপরে চাপা পড়া জগদ্দল পাথর নড়ে গেল। সে বার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দুই মহিলার ডিগ্রি নেওয়া দেখতে এত ভিড় হয়েছিল যে, পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। ভিড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে ট্রামলাইন পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। কবি হেমচন্দ্র এই দুই বিদুষীকে নিয়ে কবিতা লিখে ফেলেছিলেন। মনে রাখতে হবে, সমস্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে তখনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরা পড়ত না। মেয়েরাও যে বিজ্ঞানসাধনা করতে পারে তার উদাহরণ সৃষ্টি করলেন কাদম্বিনী বসু। চন্দ্রমুখী এ বার বেথুনেই এমএ পড়া শুরু করলেন। কিন্তু কাদম্বিনী সিদ্ধান্ত নিলেন এমবিবিএস পড়বেন। আরও ভয়ঙ্কর প্রতিরোধ ও লড়াইয়ের ইতিহাস সূচিত হল। 

মেডিক্যাল পড়তে চেয়ে তিনি আবেদন করেন ১৮৮১ সালে। শিক্ষা অধিকর্তা আগ্রহী হলেও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ কাউন্সিলের কোনও হেলদোল দেখা যায় না। এর মধ্যে ১৮৮৩-র ১২-ই জুন কাদম্বিনীর বিয়ে হয়ে যায় দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। আর বিয়ের কয়েক দিনের মধ্যে ২৯-শে জুন সরকারীভাবে কাদম্বিনীকে মেডিকেল কলেজে ভর্তির অনুমতি দেওয়া হল। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হলেন কাদম্বিনী। যুগযুগান্তের এক রুদ্ধদ্বার খুলে দিলেন নারীদের জন্য। তাঁকে মাসিক কুড়ি টাকা জলপানিও দেওয়া হ’ত। মেডিক্যালের চিকিৎসকদের একাংশ তা কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারলেন না। তাঁদের অন্যতম ছিলেন রাজেন্দ্রচন্দ্র চন্দ্র। চিকিৎসক চন্দ্র মেডিসিন পড়াতেন। তিনি কাদম্বিনীকে মৌখিক পরীক্ষায় তাঁর পেপারে এক নম্বরের জন্য ফেল করিয়ে দেন। 

চিকিৎসক জে এম কোটস ছিলেন তখন মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ এবং তিনিও মেডিসিনের অধ্যাপক ও অন্যতম পরীক্ষক ছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, কাদম্বিনীর সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী সিন্ডিকেটে আলোচনার পরে কাদম্বিনীকে লাইসেনসিয়েট ইন মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারিবা এলএমএসের সার্টিফিকেট দেওয়া হয় ১৮৮৬ সালের ৭-ই অগস্টে। কিন্তু দুবছর এলএমএস পড়ার পরে ফাইনালে ফের চিকিৎসক রাজেন্দ্র চন্দ্রের বিষয়ে তাঁকে ফেল করানো হল। তখন অধ্যক্ষ কোটস নিজের অধিকারবলে কাদম্বিনীকে গ্র্যাজুয়েট অফ দ্য মেডিক্যাল কলেজ অব বেঙ্গলবা জিএমসিবি উপাধি দেন। কাদম্বিনী ডাক্তারি প্র্যাকটিস করার পূর্ণ অধিকার পেলেন। ১৮৮৭ সালের কনভোকেশনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাঁর উচ্চ প্রশংসা করেন। তবে কাদম্বিনী মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় সহপাঠীদের কাছ থেকে কোন অশালীন ব্যবহারের সম্মুখীন হয়েছিলেন বলে জানা যায় না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত গম্ভীর ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী। 

ইডেন হাসপাতালে তাঁকে কাজের সুযোগ করে দেন কোটস। ১৮৯০ সালে, কেবলমাত্র মহিলা রোগীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত লেডি ডাফরিন হাসপাতালে কাদম্বিনী ৩০০ টাকা মাসিক বেতনে যোগ দেন, তখনকার হিসেবে যা ছিল বেশ উচ্চ বেতন। ডাফরিন হাসপাতালে কাজ পেতে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল অযাচিতভাবেই সাহায্য করেছিলেন, বন্ধু Mary Scharlieb কে লেখা এক চিঠির মধ্যে দিয়ে। ১৮৮৮ থেকেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেছিলেন। তিনিই প্রথম মহিলা চিকিৎসক, যিনি খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্র্যাকটিস করতেন। হিন্দু প্যাট্রিয়টবা বেঙ্গলির মতো কাগজে নিয়মিত বিজ্ঞাপন বেরোত। 

মেডিকেল কলেজে ভর্তির এগারো দিন আগে (১২ই জানুয়ারী, ১৮৮৩) কাদম্বিনী তাঁর শিক্ষক, বিখ্যাত সমাজসংস্কারক ও মানবদরদী সাংবাদিক,‌ বিপত্নীক, উনচল্লিশ বছর বয়ষ্ক, দুই সন্তানের পিতা দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে বিবাহ করেন। দ্বারকানাথের সঙ্গে বিয়ের সময়ে কাদম্বিনীর বয়স ২১, আর দ্বারকানাথের ৩৯। দ্বারকানাথ-এর প্রথম পক্ষের মেয়ে বিধুমুখী প্রায় কাদম্বিনীর বয়সি। ছেলে সতীশচন্দ্র রিকেটরোগী ও মানসিক প্রতিবন্ধী। শোনা যায়, এই ছেলের চিকিৎসার যাবতীয় ভার নিয়েছিলেন বিমাতা কাদম্বিনী। সুস্থ করতে নিজের হাতে সোনা ব্যাঙের ঝোল রেঁধে সতীশকে খাওয়াতেন। দ্বারকানাথ নিজে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করতে পারেন নি, কিন্তু তিনিই বাংলার নারী-শিক্ষার জন্যে বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা এবং জ্ঞানার্জনে নারী-পুরুষের সমাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ও দৃঢ় অবস্থানের জন্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষা দেবার ও প্রথম ডাক্তার হবার সুযোগ মেলে। অনেক নিকটজন এমন কি অনেক ব্রাহ্ম নেতাও এই বিয়ে মেনে নিতে পারেন নি। 

লেডি ডাফরিন হাসপাতালের মেমসাহেব ডাক্তাররা কাদম্বিনীকে রোগীদের সরাসরি চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে, অন্য ধরনের কাজ করিয়ে নিত। অন্যদিকে, গোঁড়া হিন্দুরা তাঁর ডাক্তার হওয়াটাকে মোটেই ভালো চোখে দেখে নি, সমাজছাড়া জীব হিসেবে তাঁকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা-মস্করা, এমনকি চরিত্রহনন শুরু হয়, পত্রিকার কার্টুনে তাঁকে বারবণিতা হিসেবে পর্যন্ত দেখানো হয়। 

এছাড়াও লোকের মন থেকে তাঁর দক্ষতার ব্যাপারে ভুল ধারণা ভাঙা যাচ্ছিল না। কাদম্বিনী বুঝতে পারেন, বিলিতি ডিগ্রি নাহলে এইসব বাধা বা দ্বিধা দূর করা যাবে না। তখনই সিদ্ধান্ত নেন বিদেশে গিয়ে তিনি ডাক্তারি ডিপ্লোমা নেবেন। দ্বারকানাথের অতুলনীয় উৎসাহ, প্রেরণা ও সহায়তায় এক বছর বয়সের কনিষ্ঠ পুত্রসহ পাঁচটি ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে স্বামী এবং সৎ কন্যা বিধুমুখীর তত্ত্বাবধানে রেখে ২৬ শে ফেব্রুয়ারী, ১৮৯৩ তারিখে কাদম্বিনী জাহাজে বিলেত যাত্রা করেন। বিলেত যাওয়ার টাকা জোগাড় করেছিলেন শিকাগো মহাসম্মেলনের প্রদর্শনীতে ভারতীয় মহিলাদের শিল্পকর্ম পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে।

কাদম্বিনীর কাঙ্ক্ষিত ডিপ্লোমাগুলি ছিল এলআরসিপি, এলআরসিএস এবং এলএফপিসি। যা সংগ্রহ করেছিলেন অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায়। ক্লাস করতেন এডিনবরায়। তিনি পরতেন শাড়ি, ফুলহাতা ব্লাউজ, স্কার্টব্লাউজ‍‌, নয়। সেই সময় বিলেতের বুকে বিলিতি পোশাককে অগ্রাহ্য করে ভারতীয় পোশা‍‌কে ক্লাস করাটা কত কঠিন ছিল, সেটা আজ হয়তো বোঝা সম্ভব নয়। ১৮৯৩ সালের জুলাই মাসে স্কটিশ কলেজের তিনটি ডিপ্লোমা লাভ করেন। কলকাতায় ফেরার পরে বামাবোধিনীবা ইন্ডিয়ান মেসেঞ্জার’-এর মতো কাগজগুলি তাঁর তুমুল প্রশংসা করে। 

এখন তিনি হলেন বিলিতি ডিগ্রিধারী প্রথম ভারতীয় পেশাদার মহিলা ডাক্তার। ডাফরিন হাসপাতালে এবার তিনি পেলেন সিনিয়র ডাক্তারের পদ, এক বছরের মধ্যে পান ইডেন ফিমেল হাসপাতালে ডক্টর ইন চার্জের পদ। কর্ত্তৃপক্ষ আর তাঁকে অগ্রাহ্য করতে পারলেন না। ১৮৯৪ সালে নিয়ম পরিবর্তন করে তাঁকে দেয়া হয় Campbell Medical School (R.G. Kar Medical College) Professor of Gynaecology & Obstetrics (Midwifery)-র পদ। তিনি হলেন চিকিৎসাবিদ্যায় প্রথম ভারতীয় মহিলা অধ্যাপিকা। 

কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর নিজস্ব প্রাকটিস এত জমে ওঠে যে তিনি হাসপাতালের কাজ ছেড়ে দেন। কাদম্বিনীকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। নীলরতন সরকার, জে এন মিশ্র, প্রাণকৃষ্ণ আচার্য ইত্যাদি সুবিখ্যাত চিকিৎসকদের সঙ্গে তখন তাঁর নাম উচ্চারিত হত। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা উচিৎ, বিশেষ স্নেহাষ্পদ নাতি সুকুমারের সন্তান সত্যজিৎ জন্মায় তাঁর তত্ত্বাবধানে, ১৯২১ সালের ২-রা মে। 

১৮৮৫ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলে দ্বারকানাথ কংগ্রেসে নারীদের প্রতিনিধিত্বের দাবি তোলেন, ফলে কাদম্বিনীর নেতৃত্বে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ৬ জন নারী কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে যোগ দেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৮৯০ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে কাদম্বিনী ইংরাজীতে ধন্যবাদ (Vote of Thanks) দেন। কাদম্বিনী-ই কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম কোনো নারী বক্তা। মাতৃভাষার মতো স্বচ্ছন্দে ও নিখুঁত উচ্চারণে প্রদত্ত তাঁর বক্তব্য সকলের মনে দাগ কেটেছিল। 

স্বামী দ্বারকানাথের যে দিন মৃত্যু হয়, সে দিন বিকেলে কলকাতার এক জমিদার বাড়ি থেকে কাদম্বিনীকে প্রসব করানোর জন্য কলদেওয়া হয়। সকালে স্বামীহারা চিকিৎসক বিকেলে তাঁর ব্যাগপত্র নিয়ে সেখানে রওনা দেন। হতবাক ও অসন্তুষ্ট আত্মীয়দের বলেছিলেন, ‘‘যে গেছে সে তো আর ফিরবে না, যে নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আসছে তাকে তো আনতে হবে!’’ বড় আশ্চর্য ছিল তাঁর জীবন। অন্য ধাতুতে গড়া ছিল মন। নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলতেন সব সময়। 

১৮৯৮ সালের ২৭-শে জুন মৃত্যু হয় দ্বারকানাথের, সেই বেথুন স্কুলে পড়ার সময় থেকে যিনি প্রতি মুহূর্ত্তে কাদম্বিনীর পাশে থেকে যুদ্ধ করেছেন, পায়ের জমি শক্ত করেছেন, প্রয়োজনমত দশভুজা স্ত্রীর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছেন, তিনি কাদম্বিনীকে একা রেখে চলে গেলেন। এই মহাবিচ্ছেদের পরেও প্রায় চব্বিশ বছর কাদম্বিনী ঘরে ও বাইরে তাঁর বিপুল কর্মযজ্ঞ অব্যাহত রাখেন। আটটি ছেলেমেয়ের প্রত্যেককে কৃতী মানুষ করে তোলেন, তাদের বিয়ে দেন, নাতি ও নাতনীদের নিয়ে তাঁর বিশাল সংসার ছিল জমজমাট। 

নেপালের রাজা জঙ বাহাদুরের মা এক বার খুব অসুস্থ হলেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে কাদম্বিনীকে ডেকে পাঠানো হল। তাঁর ওষুধে রাজমাতা সুস্থ হলেন। কাদম্বিনীকে আলাদা প্রাসাদে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। সোনা-রুপোর থালাবাসনে খেতে দেওয়া হত। ফেরার সময়ে রাজমাতাকে সারিয়ে তোলার পুরস্কার হিসেবে প্রচুর অর্থ, দামি পাথর বসানো সোনার গহনা, মুক্তোর মালা, রুপোর বাসন, তামা-পিতল-হাতির দাঁতের জিনিস আর একটি সাদা রঙের গোলগাল, জ্যান্ত টাট্টু ঘোড়া দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চেপেই তিনি কলকাতার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রোগী দেখতে ছুটতেন। রাস্তায় যাওয়ার সময়টুকু অনবরত লেস বুনে যেতেন! যে দক্ষতায় অস্ত্রোপচারে ছুরি চালাতেন, সেই দক্ষতাতেই তৈরি করতে পারতেন অপূর্ব সব লেসের নকশা। যে রাঁধে সে চুলও বাঁধেপ্রবাদকে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি করে, সময় ও সমালোচনাকে পদানত করেছিলেন কাদম্বিনী! 

জীবনের শেষ দিকে উচ্চরক্তচাপের কারণে রোগী দেখা অনেক কমিয়ে দিলেও মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি কাজ করে গেছেন। সেইদিন সকালেও তিনি একটা জটিল অপারেশন করেন। বাড়ি ফিরে পুত্রবধূ সরলাকে বলেছিলেন বউমা, লোকে বলতে শুরু করেছে, ডাক্তার গাঙ্গুলী নাকি বুড়ো হয়ে গেছেন, তাঁর হাত আর আগের মত চলে না। আজ যে অপারেশন করে এলাম, সে্টা দেখলে তারা আর এ কথা বলতে সাহস করবে না। আমার আজ উড়তে ইচ্ছে করছে।সরলাকে খাবার বাড়তে বলে স্নান করতে গেলেন। খাবারের থালা সাজিয়ে নীচের তলায় সরলা অনেকক্ষণ বসে আছেন। শাশুড়ি আসছেন না দেখে দোতলায় তাঁর শোওয়ার ঘরে গিয়ে দেখেন, বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। হার্ট অ্যাটাক! ডাক্তার আসার আগেই নিস্পন্দ হয়ে গেলেন। শেষ হল ব্যতিক্রমী এক পথ-প্রদর্শকের অভূতপূর্ব জীবন। ১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর। 

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন