নারী অধিকার আন্দোলনের বিশ্ব নেত্রী ক্লারা জেটকিন

বিশ্বের অর্ধেক জুড়ে যে নারী, সেই নারীদের অধিকার আন্দোলনের বিশ্ব নেত্রী ক্লারা জেটকিনের আজ জন্মদিন। জার্মানীর কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ক্লারাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করার সাথে সাথেই আসুন চিনে নেওয়া যাক মানুষটিকে।

বিশ্ব নেত্রী ক্লারা জেটকিন

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ৫-ই জুলাই জার্মানির স্যাক্সোনি প্রদেশের ওয়াইডোরায়ু গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন ক্লারা। বাবা গটফ্রাইড আইজেনার একজন স্কুল শিক্ষক এবং ধর্মপ্রাণ প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ সংগঠক ছাড়াও ছিলেন দক্ষ বেহালা বাদক। ক্লারার মা জোসেকিন ভেইটালে আইজেনার লেইপজিগের সম্ভ্রান্ত ও সুশিক্ষিত বর্গেইস পরিবারের মেয়ে হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন একজন সুশিক্ষিত প্রগতিশীল নারী।

এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যেই ক্লারা জেটকিন বেড়ে উঠেন। একদিকে পিতার সঙ্গীত চর্চার পাশাপাশি মায়ের পুঁথি চর্চা তার মনোগজতে এক উন্নত ক্ষেত্র তৈরি করে। সে সময়ে জার্মানিতে মেয়েদের লেখাপড়ার খুব বেশি সুযোগ না থেকে থাকলেও লেইপজিগের মাতৃকুলের সহায়তায় লেইপজিগের-ই একটি কলেজে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পান। স্কুল কলেজের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি পাঠ করেছেন যে সকল বই তার মধ্যে রয়েছে বায়রন, ডিকেন্স, সেক্সপিয়র, শিলার, গ্যাটে, হোমারসহ আরও অনেকের।

জেটকিন শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করলেও, অচিরেই তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে উঠেন এবং মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৮৭৪ সালের দিকে জার্মানির নারী আন্দোলন ও শ্রম আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তারুণ্য উদীপ্ত একুশ বছর বয়সেই ১৮৭৮ সালে সভ্য হন 'জার্মান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি’-র। ১৮৭৮ সালে বিসমার্ক জার্মানিতে সমাজতন্ত্র-বিরোধী জরুরি আইন এবং সমাজতান্ত্রিক কাজকর্মের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে জেটকিন ১৮৮২ সালে জুরিখ চলে যান এবং সেখান থেকে প্যারিসে নির্বাসনে যান। প্যারিসে থাকাকালীন তিনি সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এই সময়েই তাঁর পরিচয় হয় রাশিয়ান বিপস্নবী ওসিপ জেটকিন’-এর সাথে। দু'জন সমাজ বদলের একনিষ্ঠ কর্মী নিজেরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ততদিনে ক্লারা জেটকিন এক পরিচিত সোস্যালিস্ট নেতা। শ্রমিকদের মধ্যে দিন-রাত একাকার করে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছেন। নিষিদ্ধ করে দেয়া হয় সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি। ১৮৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে যক্ষ্মা রোগে ক্লারার স্বামী ওসিপ-এর মৃত্যু হয়। ১৮৯৯ সালে জেটকিন, তাঁর থেকে ১৮ বছরের ছোটো, শিল্পী জর্জ ফ্রিডরিখ যুন্ডেলকে বিয়ে করেন।

ক্লারা জেটকিনের কথার মধ্যে অদ্ভুত এক সুরের ছন্দবদ্ধ সাবলীলতা ছিল। নিমিষেই যে কারও সঙ্গে অবলীলায় মিশে যেতে পারতেন। অল্প কথায় এবং যে কোনো গভীর বিষয়কে এক উপলব্ধিময় অনুভূতির ভাষা দেওয়ার অসামান্য এক ক্ষমতার গোপন শৈলী জানা ছিল জেটকিনের। অচিরেই হয়ে ওঠেন সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের একজন বিপস্নবী নেতা।

১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নাম পরিবর্তিত হয়ে নতুন নাম হয়- সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ জারমানি (Social Democratic Party of Germany)এই দলে থাকাকালীন সময়ে তাঁর সাথে রোজা লুক্সেমবার্গের বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠে, যাকে জার্মানীর নারী আন্দোলনে গভীরভাবে পাশে পেয়েছিলেন। তিনি নারীর অধিকার এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পক্ষে অত্যন্ত সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি নারী সমাজকে জাগ্রত করার লক্ষ্যে ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দলের নারী বিষয়ক পত্রিকা Die Gleichheit (Equality) সম্পাদনা করেন। এই পত্রিকার মাধ্যমেই ক্লারা নারীদের সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত করার পাশাপাশি তাদের ন্যায্য অধিকারের লড়াইগুলোর নানান বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি সমাজে তার প্রভাবে সুফলগুলো প্রচার করতে থাকেন। এই পত্রিকা জার্মানসহ সারাবিশ্বের নারীদের এক সমাজতান্ত্রিক সমতার পৃথিবী গড়ার স্বপ্নে একত্রিত ও অনুপ্রাণিত করতে শুরু করে। অধিকারের জন্য লড়াই করার প্রেরণা হয়ে উঠেছিল মুখপত্রটি।

সমাজের শ্রেণী বৈষম্য ও পুঁজিতন্ত্র কর্তৃক শ্রেণী শোষণের ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতবাদ মার্কসবাদ অনুযায়ী সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হলে পশ্চাৎপদ নারীদেরকেও যে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলতে হবে এ সত্য ক্লারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন, এবং নারী জাতি তার শৃঙ্খল ভেঙ্গে মুক্ত হতে না পারলে মানব জাতির সামগ্রিক মুক্তি সম্ভব নয় এটা গভীরভাবে বুঝেছিলেন। নারীদের সমস্যা নিয়ে ব্যাপক প্রচার ও বিশ্লেষণ করে দেখান যে জার্মান নারীরা কিভাবে পুঁজিবাদের শ্রম শোষণ এবং যৌন নিপীড়নের শিকার ও পুঁজিবাদ কিভাবে নারীকে ভোগ্যপণ্যে পরিণত করেছে।

ক্লারা জেটকিন ১৮৯৬ সালে অনুষ্ঠিত তার পার্টি কংগ্রেসে নারীদের সমস্যার উপর এক দীর্ঘ বক্তৃতা করেন। কংগ্রেসে প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি বেকোফেন, মর্গান ও বুর্জোয়া নারীবাদীদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ব্যক্তিগত মালিকানাই হচ্ছে নারী নিপীড়নের মূল উৎস এবং সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদই পারে নারী নিপীড়নের মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে। তিনি নারীমুক্তির এই ধারনাকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেবার আহ্বান জানান। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান নারীদেরকে শ্রেণি সচেতন করে তুলতে হবে, শ্রেণি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে হবে, ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে, বৃহত শিল্প ছাড়াও কুটির শিল্প ও কারখানার নারীদেরকে জাগিয়ে তুলতে হবে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটে ১৮৮৯ সালে। প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের মঞ্চ থেকে কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন সর্বপ্রথম রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে নারীর সমানাধিকারের দাবি তোলেন। এরকম একজন নারী নেত্রীই তাই বলতে পারেন, “পুঁজিবাদীদের কাছে স্বল্প মজুরিই নারীর শ্রমকে শুধু বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করেনি, নারীর অধিকতর আনুগত্যও তা করেছে।১৮৯৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট উইমেন্স অর্গানাইজেশন (ISWO)’র কোপেন হেগেন সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন ৮-ই মার্চকে বিশ্ব নারী দিবস হিসাবে পালনের প্রস্তাব দেন। একই সাথে তিনি ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসহিসেবে নিজে পালনকরেন। এরপর থেকেই পৃথিবীব্যাপী ৮ মার্চআন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে দল থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কোনো আন্দোলন করা যাবে না। এর প্রতিবাদে ক্লারা, কার্ল লিবনেখত, রোজা লুক্সেমবার্গ এবং দলের আরও কিছু প্রভাবশালী সদস্যবৃন্দ জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দল বা SPD থেকে সরে আসেন, কারণ এটি ছিল একটি আদ্যপান্ত সুবিধাবাদী নীতি। ফলে বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রম ও আন্দোলন করার জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হন। ১৯১৪ সালের ৭ নভেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে জার্মান সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি বিরোধিতা করে। সেখানে জেটকিন বলেছিলেন, যদি অধিক সংখ্যক নারীরা যুদ্ধ প্রতিরোধের জন্য শ্লোগান দেয় তবেই জনগণের শান্তি নিশ্চিত হতে পারে। এটাই ছিল যুদ্ধের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সমাজতান্ত্রিক বিরোধিতা। যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারীদের নিয়ে যুদ্ধবিরোধী সম্মেলন করেন।

১৯১৭ সালে জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দল বা SPD ভেঙে Independent Social Democratic Party of Germany বা সংক্ষেপে USPD গঠিত হলে এটিরও তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি বা Communist Party of Germany বা সংক্ষেপে KPD প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর সাথে সম্পৃক্ত হন এবং ১৯২০ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত রাইখস্ট্যগে (Reichstag) এই দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯২০ সালে তিনি লেনিনের একটি সাক্ষাৎকার নেন। এই সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম ছিলো— The Women’s Question. ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় অফিসের সদস্য ছিলেন। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯২১ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল বা কমিন্টার্নের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য পদে ছিলেন। এসবের ভিতরেই ১৯২৫ সালে জার্মান বাম সংগঠন Rote Hilfe বা লাল সাহায্য”-এর সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হন। ১৯৩২ সালে প্রবীণ সদস্য হিসাবে রাইখস্ট্যাগের চেয়ার-ওম্যান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ায় কাটান এবং সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। সোভিয়েত যৌথখামারের নারীদের মাঝে তিনি ছিলেন অতি প্রিয়জন।

জার্মানিতে এ্যাডলফ হিটলারের দল ক্ষমতায় এলে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ১৯৩২ সালের ৩০ আগস্ট ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের বিরুদ্ধে এক বক্তৃতায় তিনি শ্রমজীবী সর্বহারা নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন;—মনে রেখ বোনেরা, ফ্যাসিবাদ চায় তোমাদের শুধু দাসি ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র বানাতে। রাইখস্টাগে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ভাষণ দেয়ার সময় তিনি জার্মান ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং তাদের দ্বারা অত্যাচারীত হন। ১৯৩৩ সালে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে পুনরায় নির্বাসনে চলে যান। এর কিছুদিন পর শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে তিনি জার্মানির রাইখস্টাগে আবারও বক্তৃতা দেন।

১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুন ৭৫ বছর বয়সে মস্কোর নিকটবর্তী Arkhangelskoye-তে তিনি মৃত্য বরণ করেন। মস্কোর ক্রেমলিনে তাঁর মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হয়। ১৯৩৮ সালের ৮ মার্চ নারী মুক্তির মহান নেত্রী ক্লারা জেটকিনকে অর্ডার অব লেনিন”— এই মর্যাদাপূর্ণ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন