বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা ছোটগল্পকার মপাসাঁ

যিনি লিখেছিলেন, “একটা বৈধ চুম্বন ততো মূল্যবান নয়, যতোটা মূল্যবান একটা চুরি-করা চুম্বন”, বিশ্বসাহিত্যের সেরা ছোটগল্পকারদের নাম করতে গেলেই যাঁর নামটি অনিবার্যভাবেই প্রথম দু-তিনজনের মধ্যে আসবে, সেই গী দ্য মপাসাঁ’-র আজ মৃত্যুদিন। আধুনিক ছোটগল্পের জনক তথা ফরাসী সাহিত্যের কবি, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক মপাসাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করার পাশাপাশি মাত্র ৪৩ বছরের জীবনে কেমন করে সৃষ্টি করলেন সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের এহেন অমর সম্পদ, আসুন তা জানার প্রয়াস করা যাক।

গী দ্য মপাসাঁ
তাঁর পুরো নাম হেনরি রেইনে আলবার্ট গি দ্য মোপাসঁ বা মোপাসাঁ। ১৮৫০ সালের ৫ আগস্ট ফ্রান্সের এক ছোট্ট উপকূলীয় শহর নরম্যান্ডিতে জন্ম গী দ্য মপাসাঁ-র। বাবার নাম গুস্তাভ দ্য মপাসাঁ আর মায়ের নাম লরা লি পয়টিভিন। অভিজাত পরিবারের সন্তান লরা, ম্যালানকোলিয়া নামক এক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ছিলেন। 

ভালোবেসে গুস্তাভকে বিয়ে করলেও পরবর্তীতে স্বামীর লাগামছাড়া উশৃংঙ্খল আচরণ সহ্য করতে না পারায় সন্তানদের নিয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন লরা। তাই মপাসাঁর শৈশবের প্রায় পুরোটাই কেটেছে মায়ের কাছে। সাহিত্যের একজন বিশেষ অনুরাগী লরা-র প্রিয় লেখক ছিলেন উইলিয়াম শেক্সপিয়ার। শিল্প-সাহিত্যপ্রেমী মায়ের সাহচর্য তাঁর শিশুমনে দারুণ প্রভাব ফেলেছিলো। ছোটবেলা থেকেই মনের মধ্যে সাহিত্যের জন্য আলাদা জায়গা তৈরী হয়ে গিয়েছিলো।

মপাসাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। এরপর তাঁকে ভর্তি করে দেওয়া হয় স্থানীয় এক মিশনারী স্কুলে। কিন্তু মিশনারী স্কুলের বাঁধাধরা পরিবেশে তাঁর প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছিলো। ধর্ম সম্বন্ধে তাঁর মনে এক বিরূপতার ছাপ পাওয়া যায় সেই ছোটো বয়স থেকেই। এরই মাঝে মপাসাঁ অভিযুক্ত হলেন অশ্লীল কবিতা লেখার দায়ে। রুক্ষ আচরণের জন্য স্কুল কতৃপক্ষ তাঁকে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করেন। অবশ্য এরই মধ্যে স্কুলের সাহিত্য শিক্ষক বোলহেতের, মপাসাঁর সাহিত্য প্রতিভাকে চিনতে পেরে তাঁকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেন।

১৮৬৭ সালে মপাসাঁ জুনিয়র হাই স্কুলে ভর্তি হন এবং মায়ের আগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় এখানেই তাঁর পরিচয় ঘটে গুস্তাভ ফ্লবেয়ার নামের একজন ফ্রেঞ্চ লেখকের সঙ্গে। এর পরের বছর শরৎকালে মপাসাঁ লাইসি পিয়ের করনেইলি-তে ভর্তি হন যেখানে নিজেকে এক মেধাবী ছাত্র যে কবিতা লেখার পাশাপাশি নাটকের অভিনয়েও পারদর্শী হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। ১৮৬৮ সালে তৎকালীন বিখ্যাত কবি আলগেরনন চার্লস সুইনবার্ণ-কে সমুদ্রের জলে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে তাঁর প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন। ফ্লবেয়ারের উৎসাহে মোপাসাঁ নানান পত্রপত্রিকায় নিজের নামে ছোটগল্প আর আর্টিকেল পাঠাতে আরম্ভ করেছিলেন। মোপাসাঁকে তিনি নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন আর সত্যিকার অর্থেই তাঁর অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন। ১৮৮০ সালে ফ্লবেয়ারের অপ্রত্যাশিত মৃত্যু মপাসাঁকে ভীষণ রকমের ব্যথিত করেছিলো।

১৮৬৯ সালে তিনি প্যারিসে আইন বিষয়ে লেখাপড়া শুরু করেন, কিন্তু শীঘ্রই ফরাসি-প্রুশীয় যুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৮৭২ থেকে ১৮৮০ সাল পর্যন্ত সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে ফ্রান্সের নৌ মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। পাশাপাশি চালিয়ে যান লেখালিখির কাজও। সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে না থাকলেও এর সাথে ওতপ্রোতভাবেই জড়িত ছিলেন মপাসাঁ। যুদ্ধের ভয়াবহতা আর অস্থির পরিস্থিতি তাঁকে বেশ ভালোমতনই স্পর্শ করেছিলো। এই অভিজ্ঞতা থেকেই লিখেছিলেন তাঁর প্রথম স্বার্থক ছোটগল্প ব্যুল দ্য সুইফবা একতাল চর্বি। এই গল্প প্রকাশের সাথে সাথে চারদিকে মপাসাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিলো। চাকুরি ছেড়ে মপাসাঁ নাম লেখালেন পুরোদস্তুর সাহিত্যিকের খাতায়। আজও এই গল্পটিকে মোপাসাঁর সেরা একটি গল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৩৪ সালে এই গল্প থেকে নির্মাতা মিখাইল রম একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন।

১৮৮০ থেকে ১৮৯০, এই দশ বছরে প্রায় তিনশরও বেশি ছোটগল্প, ছয়টি উপন্যাস, তিনটি ভ্রমণকাহিনী লিখেছিলেন মপাসাঁ! লেখার সংখ্যা অধিক হলেও মানের সাথে কখনোই আপস করেননি তিনি। মপাসাঁর বেশিরভাগ সৃষ্টিকর্মের জন্মকাল মূলত এই দশ বছরে। সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের সাথে মিশতেন। কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করতেন তাদের জীবনযাত্রাকে। এরাই যে তাঁর গল্পের মূল উপজীব্য। রাজসভার মন্ত্রী থেকে শুরু করে সমাজের নিচুতলায় বসবাসকারী একজন কেরানীকেও তাঁর গল্পের চরিত্র হতে দেখা গিয়েছে।

মপাসাঁ রচিত ছোটগল্পগুলোর মাঝে দ্য নেকলেস, মরোকা, দ্য হোরলা, ল্যা মসিয়েন তেলিয়ের, ম্যাডময়েস ফিফি, ইউজলেস বিউটি ইত্যাদি খুবই বিখ্যাত। মপাসাঁর ছোটগল্পগুলো বাংলাসহ বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

মপাসাঁ রচিত উপন্যাসগুলোর মাঝে বেল আমি, স্ট্রং অ্যাজ ডেথ, জোয়েত, একটি জীবন, আমাদের হৃদয়, পীয়ের, মতঁ ওরিয়েল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এর মাঝে বেল আমিতাঁর সবচেয়ে বহুল পঠিত এক উপন্যাস।

একদিকে লেখালেখিতে মপাসাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ছিলো, অন্যদিকে শরীরে বাসা বাঁধছিলো ভয়ঙ্কর সিফিলিস আর গনোরিয়ার জীবাণু। প্রথম যৌবনের অত্যাচারই এই রোগের মূল উৎস। যৌনবাহিত এই ভয়াবহ রোগের কোনো কার্যকরী ঔষধ তখনো আবিষ্কৃত হয়নি। প্রচুর জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও মপাসাঁ ছিলেন আমৃত্যু একাকী এক বিষাদগ্রস্ত মানুষ। এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে মানসিকভাবে ভীষণ রকমের ভেঙ্গে পড়েছিলেন। একদিন রিভালবার দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন। পরিচারক আগেই ঘটনা আন্দাজ করতে পেরে রিভালবার থেকে গুলি সরিয়ে রেখেছিলো। তাই গুলিতে কাজ না হওয়ায় ধারালো ছুরি দিয়ে কণ্ঠনালিতে আঘাত করেন, দিনটা ছিলো ১৮৯২ সালের ২ জানুয়ারি। ডাক্তার এসে রক্তপাত বন্ধ করলেও কমলো না মানসিক অসুস্থতা। একপর্যায়ে মপাসাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো মানসিক হাসপাতালে।

দিনটা ছিলো ১৮৯৩ সালের ৬ই জুলাই। তেতাল্লিশতম জন্মদিনের কিছুদিন আগেই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন ছোটগল্পের এই জাদুকর। মাত্র ৪৩ বছরেরও কম সময় পৃথিবীর বুকে তাঁর সাহিত্যের জাল বিস্তারের সময় পেয়েছিলেন মপাসাঁ। মৃত্যুর একশো ঊনত্রিশ বছর পরেও বিশ্বসাহিত্যে গি দ্য মোপাসাঁ বহুলচর্চিত একটি নাম হিসেবেই রয়ে গিয়েছেন। যতদিন ছোটগল্প থাকবে, ততদিন লেখক পাঠকদের মনে তাঁর কাজ দিয়ে চির অমর হয়ে থাকবেন আধুনিক ছোটগল্পের জনক গী দ্য মপাসাঁ।

(তারিণী খুড়ো) 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন