শরৎচন্দ্র ডাকতেন ‘গণিত-শিল্পী’ নামে। আর আমার আপনার ছাত্রজীবন তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উঠতে-নামতে কাহিল বাঁদরটার মতন হ’ত যার অঙ্ক বইয়ের রামকঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর সামলাতে, সেই কে সি নাগ ওরফে কেশবচন্দ্র নাগ-এর আজ জন্মদিন। বাঙালির ছাত্রজীবনে (নাকি অংক জীবন) যে মানুষটি আজও তাঁর প্রভাব রেখে চলেছে, আসুন সেই মানুষটিকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করার পাশাপাশি আর একটু ভালো করে চিনে নেওয়া যাক মানুষ কে সি নাগ-কে।
![]() |
| কেশবচন্দ্র নাগ |
গুড়াপের ছেলে সিক্স অবধি পড়েছেন গ্রামেরই বাংলা স্কুলে। গুড়াপে তখন ওই একটিই স্কুল। সপ্তম শ্রেনীতে ভর্তি হলেন ভাস্তাড়া যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়-এ। পরের দু’বছর তিন মাইল দূরের ভাস্তাড়া যজ্ঞেশ্বর স্কুলে। রোজ তিন-তিন ছ’মাইল পথ হেঁটে যাওয়া-আসা। রাস্তাও বলিহারি, গ্রীষ্মে এক পা ধুলো, বর্ষায় হাঁটু-ডোবা কাদা। শীতের বেলা বাড়ি ফিরতে গড়িয়ে যেত সন্ধেয়।
এই সময়ে একদিন বালক কেশব গঙ্গার পাড়ে বসে আছে। দেখছে এক বড় গোঁফওয়ালা ভদ্রলোক এক ইলিশ মাছওয়ালার সঙ্গে দরদাম করছেন। ভদ্রলোক মাছওয়ালাকে জিজ্ঞেস করছেন, ইলিশের মণ দেড়শো টাকা হলে একটা আড়াইসেরি ইলিশের দাম কত পড়বে? কেশবের ঠোঁটের গোড়ায় নিশপিশ করছে উত্তর। ফস করে বলেই বসল— ন’টাকা ছ’আনা। ভদ্রলোক কেশবের কাছে এগিয়ে আসেন, জিজ্ঞেস করেন, ‘নাম কী? কোন স্কুলে পড়ো?’ কেশব উত্তর দেয়। ভদ্রলোক বললেন, ‘স্কুলের হেডস্যরকে বোলো তোমার পড়াশোনার খরচ আর বইখাতা ফ্রি করে দিতে। আর আমার নাম বোলো আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।’
এরপর ক্লাস নাইনে ভরতি হলেন কিষেণগঞ্জ হাইস্কুলে। ১৯১২ সালে সেখান থেকেই প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তাঁর মেজদা তখন কাজের সূত্রে সেখানে। এই মেজদা, পরে কলকাতায় থাকা বড়দা একে একে মারা গেলে কেশবচন্দ্রের উপরেই এসে পড়ে সংসারের ভার। এর পর রিপন কলেজ (আজকের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে ১৯১২ সালে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করলেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগেই আইএসসি পরীক্ষায় পাশ করেন।
আইএসসি পাশ করার পর যে ভাস্তাড়া যজ্ঞেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ে এক দিন ছাত্র ছিলেন, সেখানেই শুরু করলেন শিক্ষকতা। যোগ দিলেন থার্ড মাস্টার হিসেবে। সংসারের ভার তখন কাঁধে, কিন্তু খুব কম বেতনের শিক্ষকতার চাকরিতে বড় সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই স্কুলের পাশাপাশি চলত টিউশন পড়ানো। একইসাথে শুরু করলেন উচ্চ শিক্ষার চেষ্টা। বিজ্ঞান শাখায় না গিয়ে ভালোবাসার বিষয় অঙ্কতেই স্নাতক হলেন কেশবচন্দ্র। সঙ্গে সংস্কৃত এবং কলাবিদ্যা। পেলেন বিএ ডিগ্রি।
এ বার ডাক এল অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার, সেই ছাত্রবেলার কিষেণগঞ্জ হাইস্কুল থেকে। সেখানেও কিছু দিন শিক্ষকতা করলেন তিনি। তার পর বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুল। তখন স্কুলটির হর্তাকর্তা ছিলেন সাহেবরা। কেশবচন্দ্রের ইন্টারভিউ হয়েছিল কলকাতায় গ্র্যান্ড হোটেলে। সাহেবরা চমৎকৃত হয়েছিলেন ছিপছিপে তরুণের আচরণের ঋজুতায়। মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী ঘরের ছেলেদের জন্য টিউটর হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন কেশবকে। তাঁর জন্য খুলে দিয়েছিলেন রাজবাড়ির বিশাল লাইব্রেরি।
তখন তাঁর ধ্যান-জ্ঞান শুধুই গণিত৷ কী করে ছাত্রদের অঙ্কভীতি দূর করা যায়‚ কী করে গণিতকে আরও সোজা করে তোলা যায়, এই ছিল তাঁর স্বপ্ন। আস্তে আস্তে তাঁর পড়ানোর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। শিক্ষক হিসেবে কেশবচন্দ্রের সুখ্যাতির কথা পৌঁছায় স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কানে। তাঁর মনে পড়ে যায় বছর কয়েক আগের বালক কেশবের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা। তিনি আর সময় নষ্ট না করে কেশবচন্দ্রকে ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে নিয়ে আসেন। রসা রোডে মেসবাড়িতে থাকতে শুরু করেন তিনি। আরও অনেক পরে মেসবাড়ি ছেড়ে দক্ষিণ কলকাতার গোবিন্দ ঘোষাল লেনের নতুন বাড়িতে চলে যান।
১৯২৪ থেকে ১৯৬০, ‘মিত্র স্কুল’ দেখেছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তিকে। শুধু কে সি নাগ কেন, বিখ্যাত সব মাস্টারমশাইরা তখন পড়ান মিত্র ইনস্টিটিউশনে। ম্যাট্রিকে প্রথম দিকের র্যাঙ্কগুলো বাঁধা থাকত স্কুলের ছেলেদের, পূর্ণ সিনেমাহলের কাছে মিষ্টির দোকানের বিখ্যাত ‘মাতৃভোগ’ রেজ়াল্টের দিন নাম পাল্টে হয়ে যেত ‘মিত্রভোগ’। কোন মাস্টারমশাইদের শ্রমের ফসল ঘরে তুলত ইস্কুল? বাংলায় কবিশেখর কালিদাস রায়, সংস্কৃতে পণ্ডিত জানকীনাথ শাস্ত্রী, ভূগোলে যতীন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র, আর্টে দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী!
কালক্রমে কবিশেখর কালিদাস রায়ের সঙ্গে কেশবের আলাপ ঘনিষ্ঠ হয়। তখন কালিদাস রায়ের বাড়িতে বসত সাহিত্যিকদের আড্ডা— ‘রসচক্র সাহিত্য সংসদ’। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, জলধর সেনের মতো সাহিত্যিকরা সেখানে নিয়মিত আসতেন। সেখানে মধ্যমণি ছিলেন শরৎচন্দ্র। আস্তে আস্তে কেশবচন্দ্রও সেখানে অন্যতম সদস্য হয়ে ওঠেন। একদিন এ রকম আড্ডা মারতে মারতেই শরৎচন্দ্র কেশবকে বললেন অঙ্কের বই লিখতে। তখন কেশবচন্দ্র বিষয়টাকে বড় একটা পাত্তা দেননি। তার পর এক দিন তাঁকে প্রায় চেপেই ধরেন কবিশেখর কালিদাস। ক্লাস ফাইভ-সিক্সের জন্য বই লেখার কথা বলেন। কালিদাসবাবু বলেন, ‘ক্লাসে যে ভাবে অঙ্ক শেখাও, আর ছেলেরা যে ভাবে চুপ করে ওই শুকনো খড়কুটো গোগ্রাসে গেলে, দেখে তো মনে হয় ভাই যে তুমি গল্প লেখা শেখাচ্ছো। তা হলে নিজে লিখতে পারবে না কেন?’
ভবানীপুরের ১২ নম্বর রসা রোডের মেসে, সেখানে বসেই শুরু হল পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ। তখন তিরিশের দশকের মাঝামাঝি। লিখে ফেললেন পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য ‘নব পাটীগণিত’। প্রকাশক ইউ এন ধর অ্যান্ড সন্স। কিছুদিনের মধ্যেই পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বইটি। পাঠ্যপুস্তক হিসাবেও স্বীকৃত পায় বইটি। কেশবচন্দ্র নাগ থেকে তিনি হলেন কে সি নাগ৷ শরৎচন্দ্র তাঁর নাম দিলেন ‘গণিত শিল্পী’।
পরে পরিচয় ক্যালকাটা বুক হাউস-এর কর্ণধার পরেশচন্দ্র ভাওয়ালের সঙ্গে। এক দিন তিনি কেশবচন্দ্রের ঘরে এসে দেখেন, টেবিলের উপরে মোটা একটা খাতায় পাতার পর পাতা জুড়ে অঙ্ক। শুধু অঙ্কই নয়, কোন অঙ্ক কী ভাবে, কত রকম ভাবে করা যাবে, গুছিয়ে লেখা। পরেশবাবু চাইলেন সেই খাতা, বই আকারে ছাপবেন। কেশবচন্দ্র কিছুতেই দিতে রাজি নন, ছেলেমেয়েরা অঙ্ক শেখার আগে অঙ্কের ‘মানে বই’ হাতে পেলে বিপদ। পরেশবাবু বোঝালেন, অঙ্কের শিক্ষকদের জন্য এ খুবই দরকারি বই হবে, তাঁদের জন্য অন্তত প্রকাশ করা দরকার। রাজি হলেন কেশবচন্দ্র। ১৯৪২-এ বেরোল ‘ম্যাট্রিক ম্যাথমেটিক্স’। ‘নব পাটীগণিত’-এর মতোই, মার্কেট ও মন, দুই-ই জয় করল তা। আর ফিরে তাকাতে হয়নি। মোট ৪২টা বই লিখেছেন, ‘অঙ্কের বই মানেই কে সি নাগ’ লব্জ হয়ে গিয়েছে তত দিনে। ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি, উর্দু ভাষায় অনূদিত হয়। পাকিস্তান বোর্ডের সিলেবাস অনুযায়ী লিখেছিলেন পাক ম্যাথমেটিক্স। দৃষ্টিহীনদের জন্য প্রকাশিত হয়েছে ব্রেল সংস্করণও। ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটির স্নাতক মার্টিন বার্ড স্নাইডার কে সি নাগের বইগুলির বিষয়ে বলেছিলেন, ‘দ্য থিয়োরিটিকাল ট্রিটমেন্ট অব দ্য সাবজেক্ট ইন দিজ বুকস ওয়্যার সুপিরিয়র টু দ্যাট ফাউন্ড ইন সিমিলার বুকস ইন দ্য ইউএসএ’।
গাঁধীজির ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনেও শামিল হয়েছিলেন কেশবচন্দ্র, মিত্র ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতার সময়েই। তাঁর বই তত দিনে বাজারে ঝড় তুলে দিয়েছে। কিন্তু তিনি ফিরে এলেন গ্রামে। ধনেখালি থানা কংগ্রেসের তখন তিনি সভাপতি। চলল মিছিল, আন্দোলন। পুলিশ গ্রেপ্তার করল কেশবচন্দ্রকে। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দিন কাটতে লাগল জেলখানায়। গুজব রটল ইংরেজরা চাইছে কেশবচন্দ্রকে গুম করে দিতে! অবশেষে তিনি ছাড়া পেলেন বেশ কয়েক মাস পর। ফিরে এসে ফের যোগ দিলেন গাঁধীজির অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ আন্দোলনে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁকে সক্রিয় রাজনীতিতে আসার আহ্বান জানান। ভোটে দাঁড়াতে বলেন। সবিনয়ে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন কেশবচন্দ্র।
অঙ্কের মাস্টারমশাই মানেই রাগী, গম্ভীর, নীরস একটা অবয়ব মনে পড়ে সবার। কে সি নাগও কি তেমনই ছিলেন? বকুনি দিতেন? মারতেন? মিত্র ইন্সটিটিউশনের প্রাক্তনীদের স্মৃতিচারণে তাঁদের ‘স্যর’-এর বর্ণনা আছে। মোটা কালো ফ্রেমের চশমা চোখে, গায়ে আলোয়ান, খদ্দরের পাঞ্জাবি-ধুতিতে গটগট হাঁটতেন। ক্লাসে অঙ্ক না পারলে ‘গাধা’ সম্বোধন বিরল ছিল না, তা বলে পিঠে ধাঁইধপাধপ নয়। কারণ অঙ্ক কী কায়দায় শেখানো হচ্ছে তা তো বলাই হল! হেডমাস্টারের ঘর থেকে খেয়াল রাখতেন, পাশের মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে কোন ছেলে কত কড়া ট্যাকল করছে। পরে ডেকে পাঠিয়ে অভিনব শাস্তি: স্কুলের পিছল উঠোন পরিষ্কার, দু’দিন প্যারালাল বার প্র্যাকটিস, বা জ্যামিতির রাইডার সল্ভ করতে হবে!
ক্লাসে মাঝে মাঝে পাওয়া যেত তাঁর রসবোধের ঝলক। একটি বৃত্তের কেন্দ্র O থেকে বৃত্তের পরিধির উপরে একটি বিন্দু X পর্যন্ত রেখা টেনে জিজ্ঞেস করছেন, তা হলে এটা কী হল? ‘একটি ব্যাসার্ধ’, ‘OX ব্যাসার্ধ’, ‘কেন্দ্র O থেকে X বিন্দু পর্যন্ত OX ব্যাসার্ধ’, নানান উত্তর এল। কিছুতেই খুশি নন। বললেন, ‘‘O X যোগ করে হল অক্স, মানে ষাঁড়!’’ এক দিন ক্লাসে নিজের বইখানা ছাত্রদের দেখিয়ে বললেন, এই বইটা পাঁচ টাকায় বিক্রি করলে আমার কত লাভ থাকবে, বল। ছাত্ররা সবাই বইয়ের দাম জানে, তিন টাকা। সমস্বরে উত্তর, দু’টাকা লাভ! মাস্টারমশাই বললেন, হল না। পাঁচ টাকা। সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে, সে কী! ‘‘আমাকে তো আর বইটা কিনতে হয়নি, তাই পাঁচ টাকাই লাভ!’’ বলেই মুচকি হাসি।
ঘরে ছেলে-বৌমা, নাতিনাতনিদের কাছের মানুষ। নাতনি রত্না বন্দ্যোপাধ্যায়ের কত যে সুখস্মৃতি দাদুকে ঘিরে! আদিগঙ্গার কাছে গোবিন্দ ঘোষাল লেনের বাড়িতে তখন ডিসি কারেন্ট। লোডশেডিং হত নিয়ম করে। কারেন্ট যাওয়া মানেই দাদুর কাছটি ঘেঁষে শুয়ে পড়া, ওঁর হাতপাখার বাতাস খাওয়া যাবে! মজার মজার গল্পও বলতেন।
যশোবৃত্তের বাইরে, অন্তরঙ্গ পারিবারিকতা পেরিয়েও তো আর একটা মানুষ থাকে। ভিতরের মানুষ। সেই কে সি নাগকে জানলে বিস্ময়ের সীমা থাকে না। এই কে সি নাগ-ই উত্তম-সুচিত্রার ছবির ভক্ত, নাতনিকে নিয়ে হল-এ গিয়ে ছবি দেখে আসেন। মোহনবাগান ক্লাবের কট্টর সমর্থক। ওঁর আর এক নাতি বলছিলেন, মোহনবাগান ক্লাবের আজীবন সদস্যতালিকায় এক নম্বরে গোষ্ঠ পাল, আর দ্বিতীয় নামটা জানেন? কেশবচন্দ্র নাগ! মারাদোনাকে নিয়ে যে বার বিশ্বকাপে হইহই, আমার হাতে চেক লিখে দিলেন, দোকান থেকে নতুন টিভি কিনে আনার জন্য। এক পুত্রবধূ জানালেন, এমনও হয়েছে, মোহনবাগান ম্যাচ হারলে সে রাতে না খেয়েই শুয়ে পড়েছেন। মিষ্টি খেতে ভালবাসতেন, গজা খুব প্রিয় ছিল। রথের দিন জন্মেছিলেন, প্রতি বছর রথে সন্ধেয় নাগবাড়ির ঘরোয়া স্মরণসভা শেষে আজও সবার জন্য একটা করে গজা বাঁধা। জন্মদিনে ওঁর ছাত্রেরা আসতেন বাড়িতে। অভিনেতা বিকাশ রায় আসতেন গোলাপের তোড়া নিয়ে। যত বছরের জন্মদিন, ততগুলো গোলাপ। ওঁর ছাত্রতালিকায় আছেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সকলের স্মৃতিময় লেখাপত্তরে ভরে আছে মাস্টারমশাইয়ের কথা।
গুড়াপের প্রতিবেশী জিতেন্দ্রনাথ রায়— পরবর্তী কালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অষ্টম অধ্যক্ষ স্বামী বিশুদ্ধানন্দ— ছিলেন তাঁর ফ্রেন্ড ফিলসফার অ্যান্ড গাইড। স্কুল, লাইব্রেরি, রাস্তা, সেবা সংস্থা তৈরি করে কেশবচন্দ্র পাল্টে দিয়েছেন গুড়াপকে। বিবেকানন্দের আর এক গুরুভাই, স্বামী অভেদানন্দের স্নেহভাজন ছিলেন কেশবচন্দ্র। ওঁর বক্তৃতার নোট নেওয়া, বঙ্গানুবাদের কাজও করেছেন। অনুবাদ করেছেন ভগিনী নিবেদিতার ‘শিব ও বুদ্ধ’! আর ছিল নিজের এক খাতা। নাম ‘রত্নবেদী’। খুলতেই প্রথম পাতায় কয়েক লাইনের স্বরচিত কবিতা, নীচে লেখা ‘বিনা অনুমতিতে প্রাইভেট পাঠ নিষিদ্ধ’। সেই খাতায় শ্রীমাকে নিয়ে লেখা কবিতা ‘টু মাদার্স ফিট’, তারই পাশে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বক্তৃতা, ‘দার্শনিক বঙ্কিমচন্দ্র’, ‘ফিলসফি অব রবীন্দ্রনাথ’, বিপিনচন্দ্র পালের ‘দ্য সোল অব ইন্ডিয়া’!
যশস্বী মানুষটিকে ছেড়ে কথা বলেনি পুত্রশোক, যখন ছোটো ছেলে তারাপ্রসাদ নাগ মারা যান। সন্তানের মৃত্যুর বছরখানেকের মধ্যেই মারা যান স্ত্রী লক্ষ্মীমণি, যিনি সংসার সামলাতেন বলে স্কুল, বই লেখা আর হাজারটা কাজ করতে পেরেছেন কাজপাগল শিক্ষক। স্ত্রীর মৃত্যুর পর বলেছিলেন, “আই লস্ট মাই ফ্রেন্ড”।
রসা রোডের মেসে থাকার সময় খেতেন জগদ্বন্ধু ভোজনালয়ে, তার মালিক আঁক কষায় দড় নয় বলে পাইকাররা টাকায় জল মেশাত। তাকেও হিসেব করা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আর কেউ ঠকাতে পারেনি। সেই মালিকের ছেলে, হোটেলের বর্তমান মালিকও মাথায় হাত ঠেকান ‘মাস্টারবাবু’র নামে।
১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫। রেডিয়োয় চলছে ক্রিকেটের ধারাবিবরণী। কানপুরে ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট। কেরিয়ারের শুরুতেই তিন নম্বর সেঞ্চুরিটি হাঁকাচ্ছেন মহম্মদ আজহারউদ্দিন। টানটান রোমাঞ্চ। উত্তেজনায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন কেশবচন্দ্র। সেরিব্রাল। আরও দু’বছর পর থেমে গেল সব অঙ্ক। ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭।
না, থেমে একেবারে যায়নি। আজও তেল মাখা বাঁশে বাঁদর ওঠে, চৌবাচ্চার জল একদিক দিয়ে ঢুকে আরেক দিকে বেরিয়ে যায়। চতুর্থ থেকে দ্বাদশ সমস্ত শ্রেণীর পড়ুয়াই এখনও কে সি নাগের বইতে হাত রাখেন। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন কোনো বইয়ের দোকান থেকে কে সি নাগের বই বিক্রি হয় না।
(তারিণী খুড়ো)

অপূর্ব সুন্দর লাগল।
উত্তরমুছুন