ভারতীয় উপমহাদেশে পরীক্ষাভিত্তিক
বিজ্ঞানচর্চার জনক আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু এক সুবিদিত নাম হওয়া সত্বেও মানুষ জগদীশ
চন্দ্র সম্বন্ধে আমাদের জানার পরিধি সীমিত; আর সেটা খেয়াল করেই জগদীশ চন্দ্র বসুর
জীবন, আদর্শ ও চিন্তাচেতনার জগৎ-টি তিলে ধরতেই এই লেখার অবতারণা।
| আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু |
সে সময় এ রকম অভিজাত পরিবারের
সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়াই ছিল প্রচলিত রীতি। মাতৃভাষা
ভালভাবে শেখার আগে, মাতৃভূমিকে ভালভাবে জানার আগে তারা শিখত বিদেশি ভাষা, রপ্ত করত
বিদেশি আদবকেতা ও দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু তাঁর বাবা চেয়েছিলেন, ছেলের গাঁথুনি
আগে পোক্ত হোক মাতৃভাষায়, সন্তান আগে স্বদেশকে চিনুক, জানুক। তাঁর বাবার এ প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত
জগদীশের জীবনকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। গ্রামের পাঠশালায় তিনি মিশেছেন জেলের
ছেলের সাথে, কৃষকের ছেলের সাথে। মুগ্ধ হয়ে শুনেছেন পাখি, প্রাণী ও
বিভিন্ন জলজ প্রাণের কথা। তাঁর মতে, পাঠশালার বন্ধুদের সাহচর্যেই তাঁর মধ্যে প্রাকৃতিক
ক্রিয়াকৌশল জানবার প্রতি তীব্র আগ্রহ তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে এই দিনগুলির কথা
বলতে গিয়ে জগদীশ চন্দ্র বসু বলেছিলেন, “আমাদের সময়ে সন্তানদের ইংরেজী স্কুলে ভর্তি করানো ছিলো
আভিজাত্যের প্রতীক। যে স্বদেশী স্কুলে আমাকে ভর্তি করে দেয়া হয়েছিলো, সেই স্কুলে
আমার ডানপাশে বসতো আমার পিতার মুসলিম পরিচারকের ছেলে এবং আমার বামপাশে বসতো একজন
জেলের ছেলে। তারাই ছিলো আমার খেলার সাথী। আমি সম্মোহিতের মতো শুনতাম তাদের বলে
যাওয়া পশুপাখির গল্প, জলজ প্রাণীদের গল্প। হয়তো এই গল্পগুলোই আমাকে প্রকৃতির
কর্মকাণ্ড নিয়ে গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। যখন আমরা ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে
আসতাম, আমার মা আমাদের একসাথেই খাবার খেতে দিতেন। আমার মা স্বধর্মপরায়ণ এবং
প্রথাসম্মত গৃহিণী ছিলেন। কিন্তু ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি করা তার স্বভাব ছিলো না। তাই
তিনি তাঁর ছেলের সঙ্গী অস্পৃশ্য বালকদের প্রতি ছিলেন যথেষ্ট মমতাশীল।”
পরবর্তীতে ১৮৬৯ সালে জগদীশ চন্দ্র
কলকাতা হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন এবং এরপর ভর্তি হন সেইন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে।
পরবর্তীতে ১৮৭৫ সালে তৎকালীন প্রবেশিকা (যা বর্তমানে মাধ্যমিকের সমমান) পাশ করে
ভর্তি হলেন সেইন্ট জেভিয়ার্স কলেজে এবং এরপর সুযোগ পেলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে
পড়ার। সেইন্ট জেভিয়ার্স কলেজের খ্রিষ্টান যাজক বা ফাদার ইউজিন ল্যাফোন্টের নিবিড়
সান্নিধ্য লাভ করেন তিনি এবং তাঁর প্রকৃতির প্রতি অনুসন্ধান করার মানসিকতা তৈরী হয়
ফাদারের প্রভাবেই। এই কলেজ থেকেই পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন ১৮৭৯ সালে।
এরপর তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে
চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করার জন্য ইংল্যান্ডে যান। কিন্তু শবচ্ছেদ কক্ষের গন্ধে
বার বার অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে শেষটায় ছেড়েই দিলেন। তৎকালীন ভারতের বিশিষ্ট
বিতার্কিক ও জগদীশ চন্দ্রের বোনের স্বামী আনন্দমোহন বসুর সুপারিশক্রমে কেমব্রিজের
ক্রাইস্টস কলেজে ভর্তি হন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যাচারাল সায়েন্সে (Natural Sciences) লাভ করলেন বিএ ডিগ্রী, ১৮৮৪ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রী; এখানে উল্লেখ্য
ন্যাচারাল সায়েন্স বলতে বিজ্ঞানের সেই শাখাকে বোঝায় যা পৃথিবীর বাহ্যিক প্রকৃতি
নিয়ে জ্ঞান দান করে, মূলত পদার্থবিজ্ঞান,
রসায়ন, ভূতত্ত্ব ও জীববিজ্ঞানের সমন্বিতরূপেই
ন্যাচারাল সায়েন্সের পরিধি।
কেম্ব্রিজে জন উইলিয়াম স্ট্রাট, ৩য় ব্যারন
রেলি, মাইকেল ফস্টার, জেমস ডেওয়ার,
ফ্রান্সিস ডারউইন, ফ্রান্সিস
মেটল্যান্ড বালফুর, সিডনি ভাইনসের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানসাধকেরা তাঁর শিক্ষক
ছিলেন। যখন বোস কেমব্রিজের ছাত্র ছিলেন,
ঠিক সেই সময়ে বাংলার আরেক কিংবদন্তি, রসায়নবিদ
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এডিনবার্গের ছাত্র ছিলেন। লন্ডনে থাকাকালীন তাদের দুই
জনের পরিচয় ও ঘনিষ্টতার সূত্রপাত।
১৮৮৫ সালে জগদীশ চন্দ্র ভারতে
ফিরে আসেন। তত্কালীন ভারতের গভর্নর-জেনারেল জর্জ রবিনসন, প্রথম
মার্কুইস অব রিপন-এর অনুরোধে স্যার অ্যালফ্রেড ক্রফট বসুকে প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রেসিডেন্সি
বিশ্ববিদ্যালয়) পদার্থবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক নিযুক্ত করেন। কিন্তু এখানে তিনি
শিকার হন বৈষম্যের, শুধু যে তাঁকে গবেষণার জন্য কোন রকম সুবিধা দেওয়া হত না তাই
নয়, তিনি ইউরোপীয় অধ্যাপকদের অর্ধেক বেতনেরও কম বেতন পেতেন। এর প্রতিবাদে বোস
বেতন নেওয়া বন্ধ করে দেন এবং তিন বছর বিনা বেতনে অধ্যাপনা চালিয়ে যান। দীর্ঘকাল
ধরে এই অনন্য প্রতিবাদের ফলে পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ তাঁকে যথাযোগ্য বেতনসহ
পূর্ববর্তী ৩ বছরের প্রাপ্য বেতন পরিশোধ করে নিজেদের ভুল সংশোধন করে। তাঁর বেতন
ইউরোপীয়দের সমতুল্য করা হয়। এমনই ছিলেন আমাদের বোস। তাঁর স্নেহধন্য ছাত্রদের
মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সত্যেন্দ্র নাথ বসু,
মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানচন্দ্র
ঘোষ, প্রশান্ত চন্দ্র, মহলানবিস, শিশির কুমার মিত্র,
দেবেন্দ্র মোহন বসু সহ আরো অনেক।
১৮৮৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসুর সাথে
অবলার বিয়ে হয়। অবলা ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের বিখ্যাত সংস্কারক দুর্গা মোহন দাসের
কন্যা। বিয়ের আগে অবলা বসু কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে চাইলেও তাঁকে ভর্তি
হতে দেয়া হয়নি, কারণ সেখানে তখন মেয়েদের পড়ানো নিষেধ ছিল। ১৮৮২ সালে
বঙ্গ সরকারের বৃত্তি নিয়ে অবলা মাদ্রাজে যান পড়াশোনার উদ্দেশ্যে। সেখানে চিকিত্সা
বিজ্ঞানে অধ্যয়ন শুরু করলেও অসুস্থতার কারণে আবার ফিরে আসতে বাধ্য হন।
পদার্থবিদ ম্যাক্সওয়েল –এর বিভিন্ন
তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তাড়িৎচৌম্বক বিকিরণ তরঙ্গের তত্ত্ব-এর উপরে ভিত্তি করে ১৮৮৬ থেকে
১৮৮৮ সালের মধ্যে জার্মান পদার্থবিদ হেনরিক হার্জ তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের উপর করা
তাঁর পরীক্ষার গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন এবং শূন্য স্থানে তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের
অস্ত্বিত্ব প্রমাণ করেন। হার্জের মৃত্যুর পরে ব্রিটিশ পদার্থবিদ অলিভার লজ
তাড়িতচৌম্বক নিয়ে আরো গবেষণা করেন এবং হার্জিয়ান তরঙ্গের আপাত-আলোক প্রকৃতির (Quasi-optical nature) কথা তুলে ধরে বলেন এই তরঙ্গ দৃশ্যমান আলোর মতোই প্রতিফলন, প্রতিসরণের
মতো বৈশিষ্ট্য সমন্বিত। সেই সময়ে তাঁর এই গবেষণা বোস সহ আরো অনেক বিজ্ঞানীর দৃষ্টি
আকর্ষণ করেছিলো।
জগদীশ চন্দ্র, অলিভার লজের এই
গবেষণাকে আরো উন্নত করলেন। তিনি দেখলেন তরঙ্গের আলোক প্রকৃতি ব্যাখ্যায় বৃহৎ
দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ খুবই অনগ্রসর। তাই তিনি তরঙ্গকে মিলিমিটার পর্যন্ত হ্রাস করলেন
(প্রায় ৫ মি.মি.)। ১৮৯৪ এর নভেম্বরে বোস তার মিলিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তরঙ্গ দিয়ে
কলকাতা টাউন হলে গানপাউডার প্রজ্জ্বলিত করেন এবং টাউন হল থেকে ৭৫ ফুট দূরে অবস্থিত
একটি ঘন্টা বাঁজাতে সক্ষম হন। বলা বাহুল্য, ঘন্টা বাজানোর জন্য এই তরঙ্গকে একটি
দেয়াল টপকাতে হয়েছিলো। এই ক্ষুদ্রতরঙ্গের উপরে লেখা তাঁর ‘অদৃশ্য আলোক’ (Invisible Light) বইটিতে তিনি লিখেছেন যে অদৃশ্য আলো (অর্থাৎ ক্ষুদ্রতরঙ্গ) সহজেই ইটের
দেয়াল এমনকি দালান ভেদ করে বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে এর সাহায্যে সহজেই তার ছাড়াই
যেকোনো বার্তা একস্থান থেকে অন্যস্থানে প্রেরণ করা যেতে পারে।
লজের গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রায়
একবছরের মধ্যেই ১৮৯৫ সালের মে মাসে বোস তাঁর প্রথম গবেষণা পত্র “On polarization of electric rays by
double-refracting crystals” প্রকাশ করেন।
একই বছর অক্টোবর মাসে তাঁর দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটি লর্ড র্যালের হাত দিয়ে পৌছায়
লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে। ১৯৯৫ সালে ডিসেম্বরে লন্ডনের ‘Electrician’ নামক জার্নালে তার রচিত ‘On
a new electro-polariscope’ প্রকাশ পায়।
জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর গবেষণাটি
যথাযথভাবে করলেও পেটেন্ট করতে পারেন নি। খুব ভালোভাবে বলতে গেলে পেটেন্ট করতে চান
নি। এরপর লন্ডনে গিয়ে তাঁর পরিচয় হয় বিজ্ঞানী মার্কোনির সাথে। মার্কোনি অনেকদিন
থেকেই বেতার টেলিগ্রাফি নিয়ে কাজ করছিলেন। এই টেলিগ্রাফ তিনি ব্রিটিশ পোস্ট সার্ভিসের
জন্য উন্নত করতে চেয়েছিলেন ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। সেখানে বোস বাণিজ্যিক
টেলিগ্রাফির প্রতি তাঁর অনীহা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে বিজ্ঞান শিক্ষা বা গবেষণাকে
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা উচিৎ নয়। তিনি অন্যদের তারঁ গবেষণাপত্র নিয়ে
কাজ করতেও পরামর্শ দেন। অথচ একবারও নিজের গবেষণার স্বত্বাধিকার নিয়ে ভাবেন নি। পরে
১৮৯৯ সালে রয়্যাল সোসাইটির একটি পেপারে তিনি তাঁর ‘Iron-Mercury-Iron Coherer with Telephone Detector’ নামক গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেন।
বোসের কাজ ছিলো মূলত রেডিও
মাইক্রোওয়েব অপটিক্স এর তাত্ত্বিক দিক নিয়ে। অর্থাৎ তিনি তাঁর গবেষণায় এই তরঙ্গের
প্রকৃতি ও প্রণালী ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু তিনি তাঁর গবেষণার দ্বারা যোগাযোগের
উদ্দেশ্যে বেতার যন্ত্রের উন্নয়নের দিকে কোনো ইচ্ছা বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি।
মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি যখন একদিকে বেতার তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে তখন
মার্কোনিও গবেষণা করে যাচ্ছেন একই বিষয়ে। শুধু পার্থক্য হচ্ছে বোস করছেন তাত্ত্বিক
গবেষণা, তিনি যন্ত্রের উন্নয়ন নিয়ে চিন্তিত না। আর মার্কোনি বেতার যন্ত্র উন্নত
করে রীতিমত হুলস্থূল করে ফেলছেন এবং বেতার টেলিগ্রাফের উন্নয়নে অনেক দূর অগ্রসরও
হয়েছেন।
বোসের রেডিও যন্ত্র উন্নয়নের
প্রতি কোনো আকর্ষণ ছিলো না। তিনিই সর্বপ্রথম রেডিও তরঙ্গ শনাক্ত করতে
সেমিকন্ডাক্টর জাংশন ব্যবহার করেন। এখনকার সময়ে ব্যবহৃত অনেক মাইক্রোওয়েভ
যন্ত্রাংশের আবিষ্কর্তাও তিনি। তাঁর গবেষণা থেকেই ১৯৫৪ সালে পিয়ার্সন ও ব্রাটেইন
রেডিও তরঙ্গ শনাক্তকরণের জন্য সেমিকন্ডাক্টর ক্রিস্টাল ব্যবহার করেন। এমনকি তিনি
নিজের গবেষণাপত্র অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সুবিধার্থে উন্মুক্ত করে দেন। পেটেন্ট এর
প্রতি ছিলো তাঁর তীব্র অনুরাগ। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি তাঁর আবিষ্কৃত গ্যালেনা
ক্রিস্টাল ডিটেক্টরের কার্যপ্রণালী নিজের লেকচারেই বিবৃত করেন। তাঁর একজন আমেরিকান
বন্ধু এই যন্ত্রটির জন্য তাকে পেটেন্ট নিতে বলেছিলেন কিন্তু তিনি সেটা করেন নি। জেনে
অবাক হতে হয় যে তাঁর সেই গবেষণা থেকেই তৈরী করা ১.৩ মিলিমিটার মাল্টি বিম রিসিভার
যা এখন আমেরিকার এরিজোনায় অবস্থিত NRAO
12 Meter Telescope-এ ব্যবহৃত
হচ্ছে।
বোসের সম্পর্কে বলতে গিয়ে নোবেল
বিজয়ী স্যার নেভিল মট বলেন, “জে. সি. বোস তাঁর নিজের সময় থেকেও আরো ৬০ বছর পরের
চিন্তাভাবনা করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি আজকের P-Type ও N-type সেমিকন্ডাক্টরের দূরদর্শন করতে
পেরেছিলেন সেই সময়ে।” স্যার নেভিল মট ১৯৭৭ সালে সলিড-স্টেট ইলেক্ট্রোনিক্স-এ অবদানের
জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তাঁর এই গবেষণার পেছনে বোসের গবেষণার বেশ
প্রভাব ছিলো।
বিজ্ঞানে বোসের অবদানের মধ্যে এক
বিরাট অংশ জুড়ে আছে জৈবপদার্থবিদ্যা বা বায়োফিজিক্স। তিনি গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন
যে উদ্ভিদের উপর বিভিন্ন প্রকার বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে ইলেক্ট্রন প্রবাহের
ঘটনা ঘটতে পারে। একে এক সময় রাসায়নিক ক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করা হত। বোস এই ধারণাকে
পরবর্তীতে পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনিই ছিলেন প্রথম
ব্যক্তি যিনি উদ্ভিদের টিস্যুর উপর মাইক্রোওয়েভের প্রভাব এবং এর ফলে কোষ
মেমব্রেনের বিভব (cell membrane
potential) পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন। কোষ
মেমব্রেনের বিভব বলতে বোঝায় কোষের অন্তঃত্বক ও বহিঃত্বকের ভেতর ঘটিত তড়িৎ বিভবের
পার্থক্য (সাধারণত -৪০ মিলিভোল্ট থেকে -৮০ মিলিভোল্ট পর্যন্ত)।
১৯০১ সালে বোস বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন
অবস্থায় এবং বিভিন্ন সময়ে কোষ মেমব্রেন বিভবের পর্যবেক্ষণ করে অনুমিত করেন যে
উদ্ভিদও প্রাণীর মতো বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে সাড়া দিতে সক্ষম, অর্থাৎ তাদের
ভেতর কিছু সাদৃশ্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। তারা ব্যথা অনুভব করতে সক্ষম, আনন্দ অনুভব
করতে সক্ষম, এমনকি স্নেহ অনুভব করতেও সক্ষম। তাঁর এই গবেষণাপত্র তখন লন্ডনের রয়্যাল
সোসাইটিতে স্থান করে নিয়েছিলো।
উদ্ভিদও যে তাপ, শীত, আলো, শব্দ ও
অন্যান্য অনেক বাহ্যিক উদ্দীপনায় সাড়া প্রদান করতে পারে সেই কথা বোস প্রমাণ করে
দেখিয়েছেন। আর এই প্রমাণের জন্য নিজেই তৈরী করেছিলেন ক্রিস্কোগ্রাফ (Crescograph) নামক বিশেষ যন্ত্রের। ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্রটি মূলত কয়েক সিরিজ গিয়ার
এবং ঘোলা/ঘষা কাচের প্লেট দিয়ে তৈরী। এই কাচের প্লেটটি উদ্ভিদের গতিবিধি বা
নাড়াচাড়াকে রেকর্ড করতে সক্ষম। এর বিবর্ধন ক্ষমতা প্রায় ১০,০০০ গুণ হওয়ার
ফলে উদ্ভিদ হতে প্রতিফলিত আলো যখন এই কাচ প্লেটের উপর আপতিত হয়, তখন প্লেটে
সেই অনুযায়ী দৃশ্য ফুটে ওঠে। প্লেটটি উদ্ভিদ কোষের গতিবিধি ও উত্তেজনার প্রতিফলন
ধারণ করে এবং তদানুরূপ পরিবর্তিত হয়। বাহ্যিক উত্তেজকের প্রভাবে উদ্ভিদের এই
স্পন্দন (Pulse Beat) আলোক-বিন্দু আকারে প্লেটে প্রতিভাত হয় এবং নড়াচাড়া করে।
উদ্ভিদের এই স্পদন তত্ত্ব বোসই প্রথম দেন।
১৯০১ সালের ১০ মে লন্ডনের রয়েল
সোসাইটির সেন্ট্রাল হলে অন্যান্য বিশিষ্ট বিজ্ঞানীগণের উপস্থিতিতে, তিনি এই
পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন। অন্যান্য বিজ্ঞানীগণ অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তাঁর এই
কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন। বোস প্রথমে উদ্ভিদের একটি শাখা বা ডাটা নিয়ে সেটাকে
ব্রোমাইড দ্রবণে ডুবিয়ে নেন। উল্লেখ্য হাইড্রোব্রোমিক এসিডের লবণ সাধারণত বিষাক্ত
হয়। এরপর তিনি ক্রিস্কোগ্রাফ যন্ত্রটিকে চালু করলেন এবং পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।
বিষের প্রভাবে উদ্ভিদকোষের স্পন্দনের কারণে প্রতিফলিত আলোক-বিন্দুটি প্লেটের উপর
ইতস্তত নাড়াচাড়া করতে লাগলো, অনেকটা পেন্ডুলামের মতো। সময়ের সাথে সাথে এই স্পন্দন আরো
বাড়তে লাগলো, প্রচন্ড হতে লাগলো এবং একসময় আকস্মিকভাবে এই স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেলো।
ঠিক যেমন বিষ প্রয়োগকৃত ইঁদুর বিষের প্রভাবে উত্তেজিত হয়ে একসময় নিস্তেজ হয়ে যায়, উদ্ভিদও তেমন
নিস্তেজ হয়ে গেলো। ব্রোমাইডের প্রভাবে উদ্ভিদের মৃত্যু হলো।
এই পরীক্ষা সবার কাছে প্রশংসার
সহিত গৃহীত হলো। যদিও কিছু উদ্ভিদ শারীরতাত্ত্বিক এতে সন্তুষ্ট হলেন না এবং তাঁকে
উদ্ভিদবিজ্ঞানে অনধিকার প্রবেশকারী হিসেবে মন্তব্য করলেন। তথাপি জগদীশ চন্দ্র ক্রিস্কোগ্রাফের
সাহায্যে তিনি এরপর আরো পরীক্ষা চালালেন। পর্যবেক্ষণ করলেন অন্যান্য বাহ্যিক
উদ্দীপক যেমন সার, আলোকরশ্মি, বেতারতরঙ্গ, তড়িৎ, রাসায়নিক দ্রব্য ইত্যাদির প্রতি উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া
কিরূপ হতে পারে।
জগদীশ চন্দ্রের সাথে কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্ব ছিলো গভীর। কবিগুরু সাহিত্যরসে প্রগাড় হলেও বিজ্ঞানের
বিষয়ে তিনি নিতান্ত জ্ঞান শুন্য, অন্যদিকে বোস বিজ্ঞানে নিপুণ হলেও সাহিত্যজ্ঞানে ছিলেন
তুচ্ছ। সেদিক থেকে তাঁদের বন্ধুত্বের ফলে একদিকে রবীন্দ্রনাথ বোসের কাছ থেকে
বিজ্ঞানের ব্যাপারে জানতেন এবং বোস রবীন্দ্রনাথের থেকে সাহিত্য সম্পর্কে জানতেন।
বোসকে রবীন্দ্রনাথ বেশ প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। কারণ ১৮৯৬ সালে বোস ‘নিরুদ্দেশের
কাহিনী’ নামক তাঁর বিখ্যাত
গল্পটি লেখেন। পরে অবশ্য একে আরো বিস্তৃত
করে ‘অব্যক্ত’ নামক রচনাসমগ্রে ‘পলাতক তুফান’ নামে সংকলিত করা হয়। বাংলা ভাষায় এটিই প্রথম সায়েন্স
ফিকশন। অর্থাৎ বাংলা সায়েন্স ফিকশনও তাঁর হাত ধরে এসেছে।
১৯১৭ সালে জগদীশ চন্দ্র বসু
কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’
(Bose Institute) যা ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও
প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান। জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর এই প্রতিষ্ঠানকে চিরকাল পৃথিবীর
যেকোন প্রান্তের গবেষক এবং আন্তঃশাখা (interdisciplinary)
বিজ্ঞান গবেষণার জন্য উন্মুক্ত রাখতে
চেয়েছেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, সিভি রামন, মেঘনাদ সাহাসহ
অসংখ্য বিজ্ঞানীকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে ও গবেষণার সুযোগ করে দিয়েছে এই
প্রতিষ্ঠান। ১৯১৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করে। ২০১২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর
মিলিমিটার-ব্যান্ড বেতার তরঙ্গের ওপর জগদীশ চন্দ্রের পরীক্ষামূলক কাজকে তড়িৎ ও
কম্পিউটার প্রকৌশলের এক মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় আইইইই (IEEE, Institue Of Electrical and Electronic
Engineers). ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য এ ধরনের
স্বীকৃতি এটিই প্রথম।
বাংলাদেশের বিক্রমপুরে অবস্থিত
তাঁর পৈতৃক বাড়িতে ‘জগদীশ চন্দ্র বসু স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠিত
হয়েছে। জীবিত অবস্থায় পৈতৃক সম্পত্তি দান করে এখানে জগদীশ চন্দ্র বসু ১৯২১ সালে
সুরুজ বালা সাহা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে এখানে তাঁর
সম্মানে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্সটিটিউট স্কুল ও কলেজ’।
১৯৩৭ সালের ২৩শে নভেম্বর ভারতের
ঝাড়খণ্ডে এই কৃতী বিজ্ঞানী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মরণে চাঁদের একটি আগ্নেয়গিরির
জ্বালামুখের নামকরণ করা হয়েছে ‘বোস ক্রাটার’
(Bose Crater) নামে। বোস ক্রাটার-এর ব্যাস প্রায়
৯১ কিলোমিটার।
জগদীশ চন্দ্র যে
গ্যালিলিও-নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানী তাঁর স্বীকৃতি দিয়েছিল লন্ডনের ডেইলি
এক্সপ্রেস পত্রিকা, ১৯২৭সালে। আর আইনস্টাইন তার সম্পর্কে নিজেই বলেছেন : 'জগদীশচন্দ্র
যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন তার যে কোনটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন
করা উচিত।' রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঋষিতুল্য বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে বলেছেন-
'ভারতের কোনও বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি হে আর্য আচার্য জগদীশ।'
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)