মার্ক টোয়েন - বিশ্বসাহিত্যের জনপ্রিয়তম লেখকদের অন্যতম

স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লিমেন্স নামটার সাথে আমরা খুব একটা পরিচিত নই; কিন্তু দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব টম সয়ারবইটির সাথে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত। হ্যাঁ, আপনারা ঠিকই ধরেছেন, আমি মার্ক টোয়েনের কথাই বলছি। "দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব হাকলবেরী ফিন", "দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব টম সয়ার", "দ্য প্রিন্স অ্যান্ড দ্য পপার" সহ অসংখ্য জনপ্রিয় বইয়ের জন্য বিশ্বসাহিত্যে আজও বিখ্যাত হয়ে থাকা মার্ক টোয়েন-এর জীবনের গল্প নিয়েই এই লেখার অবতারণা।

স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লিমেন্স - মার্ক টোয়েন

মার্ক টোয়েন ছদ্মনামে অনুপম সাহিত্য সৃষ্টির জন্য বিখ্যাত হয়ে থাকা স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লেমেন্স-এর জন্ম ১৮৩৫ খৃষ্টাব্দের ৩০-শে নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা প্রদেশের মিসৌরীতে। মার্ক টোয়েন শব্দটি মূলত আমেরিকার মিসিসিপি এলাকার স্টীমবোট চালকদের একটি পরিভাষা, যার অর্থ ১২ ফুট গভীর জল!

হাজারো শিশুর শৈশবকে রঙিন করা এই সাহিত্যিকের শৈশবটা ছিলো অনেকটাই বিবর্ণ। টোয়েনের ১২ বছর বয়সে মারা যান তার বাবা। বাবার মৃত্যুর পর স্কুলের সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে পরিবারের হাল ধরার চেষ্টা শুরু করেন। হানিবাল কুরিয়ারনামে স্থানীয় পত্রিকায় প্রতিদিনের খাদ্যের বিনিময়ে টাইপসেটার হিসেবে চাকরি নেন তিনি। পরবর্তীতে বড়ভাই ওরিয়ন ক্লেমেন্সের সম্পাদনায় চালিত পত্রিকা হানিবাল ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নপত্রিকায় টাইপিং এর পাশাপাশি লেখালেখি আর সম্পাদনা করার সুযোগ পান টোয়েন। বড়ভাই এর নানান কাজে ব্যস্ততার সুযোগের সদ্ব্যবহার করতেন ছোটভাই। পরবর্তী জীবনে লেখালেখির এই অভিজ্ঞতা যে কাজে লেগেছে তা বলাই বাহুল্য।

১৮৫৭ সাল, ২১ বছরের টোয়েন স্টীমবোট চালক হবেন বলে মনস্থির করলেন। মিসিসিপিতে এক স্টীমবোটের পাইলট হবার দায়িত্ব পেয়ে গেলেন হাসিখুশি এই তরুণ। স্বপ্ন ছিলো জাহাজে করে সমুদ্র পাড়ি দেবার। তবে ভাগ্য সহায় ছিলো না বলে ১৮৬১ সালের আমেরিকান সিভিল ওয়ারের সময় সেই চাকরীতে ইস্তফা দেন।

এরপরে স্বর্ণের খনিতে মাইনিং এর কাজ নিলেন। কিন্তু বেশীদিন তীব্র পরিশ্রম-এর এই কাজ করতে না পেরে ভার্জিনিয়া সিটি টেরিটোরিয়ালসংবাদপত্রে রিপোর্টার হিসাবে কাজ নিলেন। ছদ্মনাম হিসাবে মার্ক টোয়েননিয়ে সংবাদকে হাস্যরসাত্মক ভাবে উপস্থাপনের কাজ শুরু করলেন। শুধু সংবাদই নয়, ব্যঙ্গচিত্র আঁকায় বেশ পটু ছিলেন টোয়েন। সাংবাদিকের পাশাপাশি ছোটগল্পকার হিসাবে খ্যাতি বাড়তে থাকে টোয়েনের। মাইনিং ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর লেখা ছোটগল্প “Jim Smiley and His Jumping Frog” প্রকাশ পায়। এই ছোটগল্পটি মূলত সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যরসাত্মক লেখক হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটায়।

টোয়েনের জীবনে ইচ্ছা ছিলো নাবিক হয়ে দূর সমুদ্রে জাহাজ নিয়ে ভেসে বেড়াবার। কিন্তু নাবিক না হলেও পর্যটক হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে পবিত্রভূমি প্যালেস্টাইন যাত্রার বাস্তব কাহিনীকে হাস্যরসিকতার রঙ চড়িয়ে ১৮৬৭ সালে তিনি লিপিবদ্ধ করেন “Innocents Abroad” নামক বইয়ে। প্রকাশের প্রথম বছরেই ৭০ হাজার কপির বিক্রি টোয়েনকে খ্যাতির তুঙ্গে পৌছে দেয়। ১৮৭২ নাগাদ ১,০০,০০০ কপির বিক্রি হয়। তাই মার্ক টোয়েন মজা করে এই বইয়ের একটি নতুন নামকরণ করেছিলেন “The New Pilgrims’ Progress“!

মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই মার্ক টোয়েন সাংবাদিক থেকে আমেরিকার সবচেয়ে খ্যাতিমান লেখকদের একজন হয়ে ওঠেন। ১৮৭০ এর ফেব্রুয়ারিতে বিয়ে করেন অলিভিয়া ল্যাংডনকে। তার বিখ্যাত উপন্যাস এডভেঞ্চারস অভ টম সয়্যারপ্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। সেই বছরেই তাঁর সিকুয়েল এডভেঞ্চারস অফ হাকেলবেরী ফিনলেখা শুরু করেন। মূলত তার বাস্তব জীবন আর শৈশবকে তিনি এই দুটি উপন্যাসে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। এমনকি মার্ক টোয়েন টম সয়্যার চরিত্রটিকে নিজের শৈশবের প্রতিচ্ছবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাকেলবেরী ফিন চরিত্রটিও কাল্পনিক ছিলো না, সমাজের বাস্তবতা থেকেই উঠে এসেছে। টম সয়্যার সিরিজের আরো দুটি সিকুয়েল আছে একটি “Tom Sawyer Abroad (1894)আরেকটি “Tom Sawyer, Detective (1896)তবে "এডভেঞ্চার অফ হাকেলবেরী ফিন" মার্ক টোয়েনের জীবনের সেরা কাজ বলেই বিবেচিত।

১৮৮৪ সালে যখন এডভেঞ্চার অভ হাকেলবেরী ফিনপ্রকাশিত হয়। ততদিনে মার্ক টোয়েন আমেরিকার সেরা ধনীদের একজনে পরিণত হয়ে যান। ১৮৮৫ সালে টোয়েন তার নিজস্ব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠা করেন। বিজ্ঞানের প্রতি ছিলো মার্ক টোয়েনের অনুরাগ। নিকোলা টেসলা ছিলেন তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু। টেসলার ল্যাবরেটরিতে একইসাথে তারা অনেক সময় কাটিয়েছেন। টেসলার সাথে এই বন্ধুত্ব তাঁকে কল্পবিজ্ঞান নিয়ে লেখায় অনুপ্রাণিত করে।

১৮৮৯ এ প্রকাশিত হয় তার প্রথম সায়েন্স ফিকশন “A Connecticut Yankee in King Arthur’s Court“আমেরিকান কল্পবিজ্ঞান সবে তখন একটু একটু করে ডানা মেলছে।

মার্ক টোয়েন বিখ্যাত তাঁর সূক্ষ রসবোধ, অর্থব্য শ্লেষ এবং নিঁখুত ব্যাঙ্গের কারনে। তাঁর কিছু রসাত্মক মন্তব্য ও জীবনের কয়েকটি ঘটনা এখানে দিলামঃ

১। সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস ছিল মার্ক টোয়েনের। সিগারেট ছাড়ার কথা বলতে গিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, "সিগারেট ছাড়া অনেক সহজ! আমি অনেক বার ছেড়েছি!"

২। মার্ক টোয়েন তখন সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছেন। স্কুলের নিয়ম ছিল কোনো ছাত্র যদি স্কুলের টেবিলে দাগ দেয়, তবে দুটি শাস্তি থেকে একটি বেছে নিতে হবে। হয় ৫-টা বেত অথবা ৫ ডলার জরিমানা।

একদিন মার্ক টোয়েন টেবিলে দাগ দিয়ে ফেললেন এবং ধরাও পড়লেন।

টিচার জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোন শাস্তি চাও?'

মার্ক টোয়েন উত্তর দিলেন, 'কাল এসে জানাব।'

বাড়িতে এসে বাবাকে সব খুলে বললেন মার্ক টোয়েন। তিনি মার্ক টোয়েনের হাতে ৫ ডলার দিয়ে দিলেন।

পরদিন মার্ক টোয়েন টিচারকে জানালেন তিনি বেতই খাবেন।

সুতরাং জীবনে মার্ক টোয়েন সেই প্রথম রোজগার করলেন- ৫ ডলার।

৩। এক পত্রিকায় ৬ মাস কাজ করার পর মার্ক টোয়েনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেয়া হল।

মার্ক টোয়েন জানতে চাইলেন, 'কেন?'

সম্পাদক বললেন, 'কারন আপনি ভয়ানক অলস এবং কোনো কাজের নন।'

'এখানে চাকরিতে ঢোকার দিন থেকেই আমি জানি, আমি অত্যন্ত অলস এবং কোনো কাজের নই', বললেন মার্ক টোয়েন। 'এই সহজ সত্যটি বুঝতে আপনার এত দিন লাগল? আপনার মাথায় কি ঘিলু আছে?'

৪। মার্ক টোয়েনের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে অজস্র বই। সব এলোমেলো ছড়ানো। বইয়ের তুলনায় বুকশেলফ অনেক কম।

একজন শুভাকাঙ্খী একদিন তাঁকে বললেন, 'শেলফের অভাবে বই গুলোর কি অবস্থা! কয়েকটা শেলফ যোগার করে নিলেই তো হয়ে যায়।'

মার্ক টোয়েন উত্তর দিলেন, 'বই যেভাবে বন্ধু-বান্ধবের কাছে ধার চাওয়া যায়, বুকশেলফ তো আর সেভাবে ধার চাইতে পারি না।'

মার্ক টোয়েন খুব বিড়ালপ্রেমী ছিলেন। একটা সময় তার বাড়িতে একইসাথে ১৯টি বিড়াল ছিল। এমনকি কোথাও গেলে সঙ্গী হিসেবে জন্য নিজের সাথে ভাড়া করা বিড়াল নিয়ে যেতেন। নিজের বিড়ালগুলোর নামও দিয়েছিলেন তিনি।

টোয়েনের জীবনের শেষ ১৫ বছরে ছিলো তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা সময়। তখন পৃথিবীব্যাপী মানুষের কাছে সমাদৃত হন তিনি। অক্সফোর্ড থেকে ইয়েল নামিদামী সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীর ফুলঝুরিতে ভেসে গিয়েছেন এই সাহিত্যিক।

টোয়েনের জন্ম হয়েছিলো ১৮৩৫ এ যখন হ্যালির ধুমকেতু দেখা যায়। আর মারা যান ৭৫ বছর পরে ১৯১০ সালে যখন আরেকবার হ্যালির ধুমকেতুর আবির্ভাব হয়। ১৯০৮ সালে মারা যাবার বছর দুই আগেই এই ব্যাপারে টোয়েনের একটা ভবিষ্যৎবাণী মিডিয়ায় বেশ তোলপাড় করেছিলো, যা অনেকটা এমন- ১৮৩৫ এ আমি আর হ্যালির ধুমকেতু এসেছিলাম একসাথে! আগামী বছর সে আবার আসছে। জীবনের সবচেয়ে বড় না পাওয়া হবে তার সাথে আমার যেতে না পারা। হয়তো পাকাপাকি ব্যবস্থাই হয়ে রয়েছে- ব্যাটারা এসেছিলো একসাথে, যাবেও একসাথে!

ভবিষ্যদ্বাণী সত্য করে দিয়ে ১৯১০ এর ২১ এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান টোয়েন।

মৃত্যুর আগে তিনি হাতে লেখা আত্মজীবনীর প্রায় পাঁচ হাজার পৃষ্ঠার একটি অসম্পাদিত পান্ডুলিপি রেখে যান। সঙ্গে একটি চিরকুটও ছিল। এতে তাঁর আত্মজীবনীটি মৃত্যুর অন্তত ১০০ বছর পর প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। মার্ক টোয়েনের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষ পর ১৫ নভেম্বর প্রকাশিত হলো যুক্তরাষ্ট্রের তিন খন্ডের ওই আত্মজীবনীর প্রথম খন্ড। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলিতে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বইটি প্রকাশ করেছে। আত্মজীবনীটির পান্ডুলিপিটি এতদিন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিন্দুকে গচ্ছিত ছিল।

(সংকলন তারিনী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন