গোলাম দস্তাগীর - এক অখ্যাত নায়কের নাম

শুনেছেন গোলাম দস্তাগীর-এর নাম?

না শোনাটার মধ্যে কোনই অস্বাভাবিকতা নেই। উনার বা উনাদের মতন মানুষদের নাম বেশি শুনলে, বেশি জানলে রাষ্ট্রের নিঃস্পৃহতার বিরুদ্ধে আপনার মুষ্টিবদ্ধ হাত যদি ভেঙ্গে দিতে চায় এই ব্যবস্থাটা, তাই উনাদের নিয়ে আলোচনা হোক, পাঠ্যপুস্তকের পাতায় উঠে আসুক উনাদের কথা, এটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা যে চাইবে না সেটা, তা বলাই বাহুল্য।

গোলাম দস্তাগীর

দিনটা ছিল ১৯৮৪ সালের দোসরা ডিসেম্বরের মাঝরাত!

রোজকার মতন রাত দশটায় স্টেশনের ডিউটিতে এসেছিলেন গুলাম দস্তাগীর। সেই সময়ে সেন্ট্রাল রেলের এক পদস্থ কর্মচারী গোলাম জমে থাকা কিছু ফাইলে চোখ বোলাচ্ছিলেন। দেখতে দেখতে কখন যে রাত একটা বেজে গেছে খেয়াল করেন নি। প্লাটফর্মে গোরখপুর কানপুর এক্সপ্রেস এসে দাঁড়াতে আড়ামোড়া ভেঙে অফিসের বাইরে এলেন।

প্লাটফর্মে পা রাখতেই চোখ দুটো তার তীব্র জ্বালা করে উঠলো, গলা এমন শুকিয়ে গেল যেন দমবন্ধ হয়ে যাবে। বুঝে উঠতে পারলেন না ঠিক কি হয়েছে। কিন্তু কিছু একটা ভয়ঙ্কর কান্ড ঘটেছে আন্দাজ করে উনি সাথে সাথেই খবরটা জানালেন মধ্য রেলের কন্ট্রোল রুমে, দুদিকের বিদিশা আর ইটারসি স্টেশনে খবর দেন কোন ট্রেন যেন সেখান থেকে ছেড়ে এদিকে না আসে!

এবারে তার নজর গেলো এক্সপ্রেস ট্রেনটার দিকে। কেবিনে সিগন্যাল সবুজ করতে বলে ছুটে গেলেন ইঞ্জিনের দিকে। ড্রাইভারকে ডেপুটি স্টেশন সুপার গোলাম বললেন এখুনি ট্রেন ছাড়ার জন্য। বিস্মিত চালক যখন বললো ছাড়ার সময় আসতে এখনও পনেরো মিনিট বাকি, উনি দায়িত্ব নিয়ে লগবুকে লিখে দিলেন, তার নির্দেশের কথা। হাজারের ওপর যাত্রী নিয়ে নিরাপদে বেরিয়ে গেল এক্সপ্রেস ট্রেনটি। তখনও গোলাম জানতে পারেননি স্টেশন মাস্টার সহ তেইশজন রেলকর্মী ইতিমধ্যেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন!

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝেছেন কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে দেখতে পেলেন এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ দায়িত্বশীল মুখ?

চৌত্রিশ বছর আগে ডিসেম্বরের এক শীতের রাতে ভূপালের ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার স্টোরেজ ট্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে এসেছিল প্রায় ৩০ টন বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানেট বা মিক গ্যাস। যার প্রভাবে সে রাতে ছয়লক্ষ মানুষের স্বাভাবিক জীবনটাই গেলো বদলে। হাজার হাজার মানুষ যারা মারা গেলো সেদিন তারা তো একদিক দিয়ে বেঁচে গেলো, বাকিরা কেউ বিকলাঙ্গ কেউ অন্ধ কেউ ভয়ঙ্কর ফুসফুস বা চর্মরোগ নিয়ে দগ্ধে দগ্ধে বেঁচে ছিল বাকি জীবন।

ভাবুন তো একবার গোলাম সাহেব যদি নিজে দায়িত্বে এত বড় একটি সিদ্ধান্ত না নিতেন, তাহলে ঐ ট্রেনের কতজন যাত্রী সেদিন মারা যেত?

গোলাম দস্তাগীর কিন্ত ট্রেনটা ছেড়ে যাবার পরও সে রাতে তার বউ বাচ্চার হাল দেখতে কোয়ার্টারে ফিরে যাননি, নিজের কর্তব্য আর দায়িত্বের প্রতি অবিচল থেকেছেন ঐ কঠিন সময়েও। চারিদিকে ফোন করে ডাক্তার ও এ্যাম্বুলেন্স আনিয়েছেন বিষাক্ত গ্যাসের ছোবলে যারা প্লাটফর্মে ছটফট করছিল তাদের জন্য। সারারাত নাকে রুমাল বেঁধে আচ্ছন্ন সহকর্মীদের হাসপাতালে পাঠিয়েছেন, যোগাযোগ রেখেছেন আশেপাশের সব স্টেশনের সাথে।

রাত কেটে সকাল হলো একসময়, ক্লান্ত আচ্ছন্ন গুলাম দস্তাগীর কোনক্রমে শরীরটা টানতে টানতে পৌঁছালেন রেল কোয়ার্টারে। গ্যাসের ছোবল ততক্ষণে কেড়ে নিয়েছে তার এক পুত্রকে, আরেকজনের সারা শরীরে ছড়িয়েছে সংক্রমণ। সারারাত গ্যাসের প্রত্যক্ষ স্পর্শে থাকার দরুন গোলাম সাহেবেরও শ্বাসনালী হয়েছিল ভীষন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বাকি জীবনটা তাঁকে বাড়ি আর হাসপাতাল করেই কাটাতে হয়েছিল ।

২০০৩ সালে দুনিয়া থেকে কিছুটা অভিমান নিয়েই বিদায় নেন এই (অ)সাধারণ মানুষটি। মৃত্যুর কারণ হিসাবে সার্টিফিকেটে লেখা হয়েছিল "suffering from diseases caused as a direct result of exposure to MIC (Methyl Isocyanate) gas." অজানা জ্বর নয়!

কজনই বা জানি তাঁর নাম? ভুলিয়ে দিতে চাওয়া এই অকল্পনীয় সাহসী ও কর্তব্য পরায়ণ মানুষটিকে কি আমরা ভুলে যেতে পারি? যাকে রাষ্ট্র যথাযোগ্য সম্মান দেয়নি, তাঁর অসাধারণত্বের কথা আরো বেশি বেশি করে মানুষকে জানানোর মধ্যে দিয়ে আমরা তো পারি তাঁকে সম্মান জানাতে!

আজকের এই স্বার্থপর দুনিয়ায় মাঝে মাঝে আচমকাই চলে আসেন এইসব মৃত্যুহীন প্রাণ, মানবিকতার খাতিরে কোন প্রত্যাশা ছাড়াই রেখে যান এক অভূতপূর্ব উদাহরণ .........

আদাব গোলাম সাহেব!!!

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন