মাত্র সাড়ে তিন দশকব্যাপী জীবন, কিন্তু তাতেই যে অনন্য কীর্তি তিনি রেখে গেছেন— কি সংখ্যায়, কি উৎকর্ষের বিচারে— তা প্রায় অবিশ্বাস্য। পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গসংগীতের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যাতে পড়েনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর। সোনাটা, সিম্ফনি, মাস, চেম্বার মিউজিক, কনসার্ট, অপেরা— প্রতিটি ক্ষেত্রই তাঁর অনলস সৃষ্টিসুখে নিরন্তর ঝংকৃত হয়েছে। আরও দীর্ঘজীবন পেলে নিজেকে কোন অনতিক্রম্য উচ্চতায় তিনি নিয়ে যেতেন, সে ভাবনা সুদূর কল্পনাকেও হার মানায়। তিনি ভল্ফগাং আমাডিউস মোৎসার্ট— শুধু মোৎসার্ট নামেই যিনি সুবিদিত সারা বিশ্বে। আসুন জেনে নেওয়া যাক এই অনন্য প্রতিভাধর মানুষটির কথা।
| ভল্ফগাং আমাডিউস মোৎসার্ট |
অস্ট্রিয়ার সালঝবুর্গ শহরটির পুরনো অংশে রয়েছে গেটরিডগাসে (গ্রেইন লেন নামেও পরিচিত) নামে একটি ব্যস্ততম রাস্তা। রাস্তার দুপাশে দোকানপাট। এখানেই ৯ নং বাড়িতে মোৎসার্ট ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি জন্মগ্রহন করেন মোৎসার্ট। আনা মারিয়া পারটেল ও লিওপোল্ড মোৎসার্ট-এর একমাত্র ছেলের সাংগীতিক প্রতিভার কিছুটা নিশ্চয়ই উত্তরাধিকার সূত্রেই পাওয়া। লিওপোল্ড ছিলেন সাল্জ্বুর্গের প্রতিষ্ঠিত সংগীতকার, বেহালাবাদক ও দরবারের সহকারী কনসার্ট মাস্টার। মেয়ে মারিয়া আনা নার্নেলকে মাত্র সাত বছর বয়সেই পিয়ানো প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন লিওপোল্ড। তিন বছরের ছোট্ট ভল্ফগাং মোৎসার্ট বড় বোনকে দেখে দেখেই সুর তুলতে শুরু করেন পিয়ানোয়। শিশুপুত্রের সাংগীতিক মেধায় বিস্মিত লিওপোল্ড তাকেও প্রশিক্ষণার্থী করে নেন। মহা উদ্যমে চলতে থাকে দুই ভাইবোনের সংগীত শিক্ষণপর্ব।
লিওপোল্ড
একদিকে যেমন ছিলেন নিষ্ঠাবান শিক্ষক, তেমনি আবার শিক্ষাটাকে কী করে
আনন্দময় করে তুলতে হয় সে জাদুটাও জানা ছিল তাঁর। ফলে তাঁর তত্ত্বাবধানে ভাইবোন
দুজনেই সংগীতশাস্ত্রে কুশলী হয়ে উঠলেন অচিতেই। শিশু মোৎসার্ট পাঁচ বছর বয়সেই প্রথম
সুর রচনা করেন এবং বেহালা ও হার্পসিকর্ড বাদনে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখান। এরপর অতি
দ্রুত তিনি পিয়ানো, অরগ্যান ও ভায়োলাতেও উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে
শুরু করেন।
লিওপোল্ড
মোৎসার্ট ঠিকই টের পেলেন তাঁর সন্তানদের শিশুপ্রতিভা। গানবাজনার লোক হলেও বিষয়ী ছিলেন
লিওপোল্ড। তাঁর প্রতিভাবান শিশুদের জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন তিনি।
সময়টা ১৭৬৩
সালের মাঝামাঝি। মোৎসার্ট- এর বয়স তখন ছয়। ছেলেমেয়েকে নিয়ে ট্যুরে বেরুলেন লিওপোল্ড।
মিউনিখ, প্যারিস, লন্ডন, হেগ, জুরিখের মতো বড় বড় ইউরোপীয় নগরীর সংগীতপিপাসু শ্রোতৃমণ্ডলীকে
সুরের জাদুতে মোহিত করল এই শিশুপ্রতিভাদ্বয়। মোৎসার্ট আর মারিয়া আনা ওখানকার রাজদরবারে বাজালো
ভায়োলিন, বাজালো পিয়ানো। বড় বড় ইউরোপীয় শহরে ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন
লেওপোল্ড। কত কত মিউজিশিয়ানের সঙ্গে ওদের জানাশোনা হল। রাজ পরিবারের সামনেও বাজাল
আনা ও মোৎসার্ট- বিশেষ করে অস্ট্রিয়ার সাম্রাজ্ঞী তো মুগ্ধ। মুগ্ধ অন্যরাও।
এর পরপরই
প্রথম সিরিয়াস কম্পোজিশন করলেন মোৎসার্ট। বয়স যখন নয়, লিখতে শুরু করলেন সিম্ফোনি। ইউরোপময়
তার সংগীতের চাহিদা বাড়তে লাগল। ১৭৬৩ সালের ট্যুরের নয় মাস পর গেলেন ভিয়েনা।
ভিয়েনা থেকে
ফিরে মোৎসার্ট গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত হল। শুধু ট্যুর করলেই হল! শিখতে হবে না? শেখার কি
শেষ আছে? এইসব ভেবে ১৭৭০ অবধি আর কোনও নতুন সফরে বেরুলেন না। ১৭৬৯-এর ডিসেম্বরে বাবার
সঙ্গে মোৎসার্ট লম্বা সফরে বেরোলেন ইতালির বিভিন্ন প্রান্তে। ওানকার
সংগীতপ্রেমিদের দারুণ মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন। ইতালিয় ধারাও গ্রহন করলেন নিজস্ব
রচনাশৈলীতে। বোন নার্নেল তত দিনে সে যুগের হিসেবে বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠেছেন। ফলে অত
সম্ভাবনাময়ী হওয়া সত্ত্বেও সংগীতের ক্যারিয়ারে দাঁড়ি টানতে হয়। মোৎসার্টের সেসব
ঝামেলা নেই, ফলে তাঁর প্রতিভার পূর্ণ বিকাশের অনুকূল সুযোগ ও পরিবেশ
তিনি পেলেন ও তার সদ্ব্যবহার করলেন। এই সফরেই নতুন তিনটি অপেরা রচনা করলেন তিনি।
বয়স তখনো ১৬ পেরোয়নি।
ইতালি সফর
থেকে ফিরে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মজীবনে ঢুকলেন মোৎসার্ট; সাল্জ্বুর্গের
আর্চবিশপ তাঁকে স্বল্পবেতনে সহকারী কনসার্ট মাস্টার হিসেবে নিয়োগ দিলেন। ক্রমেই তিনি
আরও পরিণত সুরস্রষ্টা হয়ে উঠতে থাকলেন। জন্ম দিলেন নিরীক্ষাধর্মী, অভিনব ও
দুরূহ সব সুরমূর্ছনার। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি একাধিক সিম্ফনি, স্ট্রিং
কোয়ার্টেট, সোনাটা, অপেরা, ভায়োলিন কনসার্টো, পিয়ানো
কনসার্টো রচনা করলেন।
১৭৭৫ সালে
গেলেন মিউনিখ। সেখানে পরিচালনা করলেন অপেরা। সালঝবুর্গ আসলে ইউরোপের তুলনায় মফস্বল
অঞ্চল। ওখানে থাকলে বেশি কিছু হবে না। কাজেই ১৭৭৭ সালে মোৎসার্ট পাকাপাকিভাবে
থাকার জন্য রওনা হলেন মিউনিখ। সঙ্গে মা; তবে ওখানে মনোমত পদ পেলেন না।
মনক্ষুন্ন হয়ে প্যারিস গেলেন। জীবন বাঁক নিতে শুরু করল। প্যারিসে ১৯৭৮-এর ৩-রা জুলাই
মা মারা গেলেন। প্যারিসেও মনের মত পদ পেলেন না মোৎসার্ট।
অবশেষে
বাবার দৌত্যে কোর্ট অরগ্যানিস্টের চাকরি নিয়ে আবার সাল্জ্বুর্গেই ফিরলেন। এ দফায়
করোনেশন, মাস সহ প্রচুর চার্চসংগীত রচনা করলেন। রচিত হলো অপেরাও। তবে কর্মক্ষেত্রে
মনোমালিন্য আবার মাথাচাড়া দিল। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন ভিয়েনাতেই থিতু হবেন
এবং স্বাধীনভাবে কাজ করবেন।
ভিয়েনাতে
বেশ গুছিয়ে বসলেন মোৎসার্ট। কাজ জুটিয়ে নেন, ছাত্রছাত্রী মেলে অনেক, কনসার্টে
বাজানোর আমন্ত্রণও আসে বেশুমার। এদিকে ভিয়েনায় প্রথম উঠেছিলেন যাঁর বাড়িতে, সেই
ফ্রিডোলিন ওয়েবারের কন্যা আলোইশিয়া ভেবার প্রেমে পড়লেন; কিন্তু বিয়ে হ’ল না তার
সাথে। নতুনভাবে সম্পর্কে জড়ালেন আলোইশিয়া ভেবার বোন কনস্ট্যাঞ্জার সাথে। বাবা লিওপোল্ডের
প্রাথমিক অনাপত্তি কাটিয়ে এ সম্পর্ক পরিণতি পেল ১৭৮২ সালের ৪ আগস্ট। এ দম্পতি ছয়
সন্তানের জনক-জননী, তবে এর মধ্যে কেবল দুজন ছাড়া আর সবাই বাল্যেই মারা
যান।
পরের
বছরগুলো যথারীতি মোৎসার্ট সংগীতসৃষ্টিতে উদ্বেল। এ সময়, বাখ ও
হান্ডেলের রচনা তাঁকে প্রাণিত করে এবং বারোক রীতির প্রভাব স্পষ্টতই পরিলক্ষিত হয়
তাঁর পরের দিককার রচনাগুলোতে। তা ছাড়া, এ সময় জোসেফ হেইডনের সঙ্গে তাঁর
গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। ১৭৮২-৮৫ সালের মধ্যে মোৎসার্ট হেইডনকে উৎসর্গ করে ছয়টি
কোয়ার্টেট (চারটি যন্ত্রের একত্র বাজনা) রচনা করেন। এ সময় তাঁর অপেরা ‘ডাই
এন্টফুহরুং’ বিপুল সফলতা লাভ করে এবং ইউরোপের একজন অগ্রগণ্য সংগীতকার
হিসেবে তাঁর আসনটি পাকাপোক্ত করে দেয়। এসব সাফল্য হাত ধরে নিয়ে আসে আর্থিক
সচ্ছলতাও। ভিয়েনার বিলাসী অ্যাপার্টমেন্টে সপরিবারে ঠিকানা হয় মোৎসার্টের।
১৭৮২-১৭৮৫
সাল পর্যন্ত সময়টাকে বলা যায় মোৎসার্টের সৃষ্টিশীলতার সর্বোৎকৃষ্ট পর্ব। এমনও
হয়েছে, পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে একাদিক্রমে ২২-টি কনসার্টে তিনি বাজিয়েছেন, এর মধ্যে
পাঁচটিই ছিল তাঁর একক পরিবেশনা— তাঁরই প্রযোজনা। এ সময়ে থিয়েটারে জায়গা না পেয়ে অনেক
সময় অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের বড় কক্ষ অথবা রেস্টুরেন্টের বলরুমেও আয়োজিত হয়েছে
তাঁর অনুষ্ঠান। যেখানেই হোক, বিপুলসংখ্যক শ্রোতা আবিষ্ট হয়েছে তাঁর
মূর্ছনামাধুরীতে। যুগশ্রেষ্ঠ এক সংগীতজ্ঞের সৃষ্টিসুখ প্রত্যক্ষরূপে উপভোগের এই
সুবর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি হয় কেউ?
১৭৮৫-এর শেষ
নাগাদ, মোৎসার্টের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ভেনিশীয় সংগীতজ্ঞ ও কবি লরেঞ্জো দা পন্টের। দুজনে
মিলে নির্মাণ করলেন ‘দ্য ম্যারেজ অব ফিগারো’ অপেরাটি। ভিয়েনা-প্রাগে এটি
দুর্দান্ত সাফল্য পায়। এই সাফল্যের রেশ ধরেই পরপর এল তাঁদের দ্বিতীয় যৌথ নির্মাণ ‘দোন
জিওভান্নি’। জটিল সূক্ষ্ম সাংগীতিক কুশলতার জন্য এ দুটো অপেরা কেবল মোৎসার্টের
ক্যারিয়ারেই নয়, সমগ্র অপেরা রেপার্টরিতেই বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে।
নাটকীয় মুহূর্তকে উত্তুঙ্গ করে তুলতে সংগীতের অপূর্ব প্রয়োগ এগুলোকে অনন্যসাধারণ
করে তুলেছে। এ পর্যায়ে ১৭৮৭-এর ডিসেম্বরে, সম্রাট দ্বিতীয় জোসেফের তাঁকে
চেম্বার কম্পোজার হিসেবে নিয়োগদান করেন।
১৭৮০-এর
দশকের শেষভাগ থেকে মোৎসার্টের জীবনে যেন কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে। অস্ট্রিয়ার রাজনৈতিক
পরিস্থিতি উত্তপ্ত, যুদ্ধের ডামাডোলে সংগীত-শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকেরাও
গুটিয়ে নিয়েছেন হাত। এ অবস্থায় মোৎসার্টের আয়-রোজগার গেল ভীষণ কমে। অবসাদ ও
বিষণ্নতা চেপে ধরল তাঁকে। সংসারখরচ চালাতে বন্ধুদের কাছ থেকে বিস্তর ধারদেনা
করলেন। ১৭৮৮-এর মধ্যভাগে ভিয়েনার আয়েশি জীবন ছেড়ে চলে এলেন কাছাকাছি এক উপশহরে।
তবু মহান শিল্পীর সৃষ্টিশীলতা তো থেমে থাকার নয়! এ সময়েই রচিত হলো তাঁর শেষ তিনটি
সিম্ফনি আর অপেরা ‘কোসি ফান তুত্তে’।
১৭৯০ সাল
নাগাদ হাওয়া আবার ঘুরতে শুরু করল। অবসাদ ঝেড়ে ফেলে কাজে ডুবে গেলেন মোৎসার্ট।
সৃষ্টি হলো অনবদ্য সব সুরঝংকার। ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’, বি ফ্ল্যাটে শেষ পিয়ানো কনসার্টো, এ মেজর-এ
ক্ল্যারিনেট কনসার্টো মাতিয়ে দিল সংগীতামোদীদের। বিভিন্ন জায়গা থেকে বাজানোর ডাক
পড়তে লাগল। অর্থসমাগম বাড়ায় ধারদেনাও শুধিয়ে ফেললেন।
১৭৯১-এর শেষ
নাগাদ মোৎসার্টের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতে থাকে। এর মধ্যেও
রাজকীয় আমন্ত্রণে গিয়েছিলেন প্রাগে। তবে নভেম্বর মাসে অসুস্থতা এমন চেপে ধরে যে
মোৎসার্ট একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। তবে কাজপাগল সুরের কারিগরকে থামাবে কে? এ অবস্থাতেও
অসমাপ্ত রিক্যুয়েমের ভাবনা তাঁর চেতনাজুড়ে।
শেষ রক্ষা
হলো না অবশ্য। ১৭৯১-এর ৫ ডিসেম্বর জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হলো বিশ্বসংগীতের এই
অবিস্মরণীয় প্রতিভার। বয়স তখন মাত্রই ৩৫। তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে মতভিন্নতা আছে, তবে
অফিশিয়াল রেকর্ড অনুসারে মিলিয়ারি ফিভারে মৃত্যু রিউমেটিক ফিভারে । কেউ কেউ বলে
বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছিল মোৎসার্ট-এর ।
মোৎসার্টসৃষ্ট
সুরসম্ভার বিশ্বসংগীতের এক চিরকালীন অমূল্য সম্পদ। মানবমনের নিগূঢ় ভাবপ্রকাশে
সাবলীল অথচ জটিল সূক্ষ্ম কারুকার্যময় সুরের এমন ফল্গুধারা সে যুগে যেমন, তেমনি আজও
বিমোহিত করে চলেছে সংগীতামোদীদের। বেটোফেন থেকে শুরু করে ভাগনার-চাইকভ্স্কিসহ
উত্তরকালের প্রায় সব উল্লেখযোগ্য সংগীতকারকে প্রভাবিত করেছে তাঁর সৃষ্টি।