অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত

মেদিনীপুর কলেজ। ক্লাস চলছে। রাশভারী এক অধ্যাপক ক্লাস নিচ্ছেন। পড়ানোর পাশাপাশি মাঝেমাঝে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে ঘুরে চক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলি লিখছেন। ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসেছেন দুই তরুণ। তাদের বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই ক্লাসে। চাপা কণ্ঠে তারা কিসব আলোচনা করে চলেছে। মনসংযোগ হারাল অধ্যাপকের।

- No Talk Please !

দীনেশ গুপ্ত

অধ্যাপকের তাড়া খেয়ে মিনিটখানেকের জন্যে চুপ থাকলেন ওই দুই তরুন। অধ্যাপক পুনরায় পড়ানোয় মেতে উঠলেন। নিজেদের মধ্যে পুনরায় আলাপচারিতায় মেতে উঠলেন দুই যুবক। আবার মনসংযোগ হারাল অধ্যাপকের।

- The two boys sitting in the last bench! Can you please be silent?

অধ্যাপকের ধমকে মাথা নিচু করলেন দুই যুবক। আবার পড়ানো শুরু করলেন অধ্যাপক। অধ্যাপক ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে ঘুরে কিছু একটা লিখতে লাগলেন, এই সুযোগে সবার অজ্ঞাতে ক্লাসরুমের পিছনের দরজা দিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন দুজনে।

ব্ল্যাকবোর্ডের লেখা শেষ হতেই সামনের দিকে তাকালেন অধ্যাপক। কিছুক্ষণের মধ্যেই অধ্যাপকের দৃষ্টি পড়ল শেষ বেঞ্চের দিকে। দেখলেন শেষ বেঞ্চের দুই যুবক আর ক্লাসে নেই। এবার মেজাজ হারালেন অধ্যাপক। উপস্থিতির রেজিস্টার খুললেন। রাগত স্বরে বলে উঠলেন -

- I mark them absent !

ক্ষনিকের বিরতি দিয়ে আবার বললেন -

- That boy from Dacca! I don’t understand what he is running after!

ক্লাসের বাকি ছাত্ররা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন। অধ্যাপক আবার পড়ানো শুরু করলেন। ক্লাস চলতে লাগল। এদিকে ওই দুই যুবক ক্লাসের বাইরে এসে কলেজ প্রাঙ্গণের গাছের তলায় বেঞ্চিতে এসে বসলেন‌ দেখতে দেখতে জড়ো হলেন আরও কিছু যুবক। সকলেই ওই কলেজের ছাত্র। কিন্তু ওই জটলাতেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হল ঢাকার সেই যুবক

ঢাকা থেকে মেদিনীপুর কলেজে পড়তে আসা এই ছেলেটি সকলের থেকে আলাদা। চোখে উন্মুক্ত স্বচ্ছ দৃষ্টি। বুকে দুর্দমনীয় সাহস। পেশীবহুল স্বাস্থ্য আর প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা মুখ। তিনি একধারে দার্শনিক, অন্যদিকে সাহিত্যিক। মাসিক "প্রবাসী" পত্রিকায় তাঁর লেখা গল্প ইতিমধ্যেই বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছে। সাহিত্য বড় প্রিয় ছিল তাঁর। পড়তে ভালবাসতেন আশৈশব। রবীন্দ্রনাথের অন্ধ অনুরাগী। রবিঠাকুরের অজস্র কবিতা-গান ছিল মুখস্থ।

কিন্তু এইসব কিছুর উপরে ছিল তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা। মেদিনীপুরের অগ্নিযুগের যে নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছিল তাঁর মূলে ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন মেদিনীপুরের বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স শাখার প্রতিষ্ঠাতা। একক প্রচেষ্টায় অসামান্য দক্ষতায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন মেদিনীপুরের বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স শাখা।

শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহসই হোক বা বিপ্লবী আদর্শের গ্রামভিত্তিক প্রচার, মেদিনীপুর বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে উঠল বাংলায় অগ্রগণ্য। যে যুবকের হাতের ছোঁয়ায় মেদিনীপুরের ঘুমন্ত দৈত্য সেদিন জেগে উঠেছিল তাঁর নাম দীনেশচন্দ্র গুপ্ত। বাড়ির সকলের আদরের 'নসু'। অগ্রজদের কাছে দীনেশ এবং অনুজদের কাছে দীনেশদা।

অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের জন্ম ১৯১১ সালের ৬-ই ডিসেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহের নেত্রকোনা গ্রামে। তাদের আদি বাড়ি ছিল ঢাকার যশলং গ্রামে। তাঁর পিতার নাম ছিল সতীশচন্দ্র গুপ্ত। আর মা ছিলেন বিনোদিনী দেবী।

ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই দীনেশ যোগ দেন বিপ্লবী দলে। পড়াশোনায় তাঁর বিশেষ মন ছিল না। পাঠ্যক্রমের বাইরের বই পড়তেই বেশী ভালবাসতেন। বাবা সতীশচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন পোস্টমাস্টার। বিপ্লবী দলে যোগ দেওয়ার কথা জানার পর বাবা মারধর করেও তাঁকে আটকাতে পারেননি। দীনেশের বাবার ভয় ছিল ছেলের বিপ্লবী কাজকর্মের জন্যে তার পোস্টমাস্টারের চাকরি চলে যাবে।

দীনেশ রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠতেন ভোর চারটেয়। তারপর ব্যায়াম ও কুস্তি লড়তেন। সাড়ে ছয়টায় বাড়ি ফিরে পড়তে বসতেন। রাতে বিপ্লবী কাজকর্ম করে ফিরতেন অনেক রাতে। বাবা তাকে এরপর মেদিনীপুরে পাঠিয়ে দেন। সেখানে দীনেশের দাদা জ্যোতিষচন্দ্র গুপ্ত থাকতেন। দীনেশের দাদা ছিলেন মেদিনীপুর আদালতের স্বনামধন্য আইনজীবী। সেখানেই দীনেশ প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সের মেদিনীপুর শাখা। এরপর তিনি ঢাকা ফিরে আসেন। ১৯২৮ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষা দেন। কিন্তু পড়াশুনার চেয়ে বিপ্লবী দলের কাজকর্মের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে তিনি আইএসসিতে পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য হতে পারেননি।

দীনেশ ছিল ভীষণ জেদি আর প্রতিবাদী। একবার উয়ারিতে দুই যুবক কিছু মেয়েকে কটূক্তি করেছিল। দীনেশ দেখতে পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ছেলেদুটির উপর। মেরে একজনকে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন। এতটাই নির্ভীক ছিল দীনেশ।

১৯৩০ সালে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার-নির্যাতন আরো বহুগুণে বেড়ে যায়। এই সময় ব্রিটিশ পুলিশ সুভাষচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এবং সত্য বকসীর মতো নেতৃত্ব সহ আরো বহু নেতা- কর্মীকে-কেও গ্রেফতার করে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে আটক রাখে; একপর্যায়ে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে নতুন বন্দীদের জায়গা দেওয়া যাচ্ছিলনা নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে। জেলের মধ্যে সৃষ্টি হলো এক অসহনীয় অবস্থা। রাজবন্দীদের মধ্যে বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠল। তাঁরা জেলকোড অনুযায়ী কয়েকটি দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেন। এই আন্দোলন দমানোর জন্য ব্রিটিশ পুলিশ নিষ্ঠুরভাবে লাঠিচার্জ করে। রাজবন্দীদের উপর চলল নির্মম-নিষ্ঠুর অত্যাচার। এই নির্মম-নিষ্ঠুর অত্যাচার থেকে সুভাষচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এবং সত্য বকসীরাও বাদ গেলেন না। এঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ল জেলের বাইরে। এই নির্মম- নিষ্ঠুর অত্যাচারের পিছনে ছিল ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এনএস সিম্পসন।

বিপ্লবীরা প্রস্তুতি নিলেন অত্যাচারী সিম্পসনকে উচিৎ শিক্ষা দেয়ার জন্য। পরিকল্পনা হলো শুধু সিম্পসন নয়, ইংরেজ আমলাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, বাঙ্গালীরাও লড়তে জানে, মারতে জানে। কাঁপিয়ে দিতে হবে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদকে।

বিপ্লবীরা ডালহৌসি স্কোয়ারে অবস্থিত ব্রিটিশ শাসকদের সচিবালয়, 'রাইটার্স বিল্ডিংআক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনা চলল কে এই আক্রমণ পরিচালনা করবেন? এই দুঃসাহসী অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন দীনেশ গুপ্ত, বিনয় বসু ও বাদল গুপ্ত। কিশোর বয়স থেকেই বিনয় বসু, দীনেশ গুপ্ত ও বাদল গুপ্ত পরস্পর পরিচিত ছিলেন। তিনজনই ছিলেন পূর্ববাংলার (ঢাকার) সন্তান। কৈশোরকাল থেকে তিনজন দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশমাতার মুক্তিযজ্ঞে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেন। ঘটনাচক্রে এই তিন বন্ধুই একসঙ্গে 'রাইটার্স বিল্ডিং' আক্রমণের দায়িত্ব নেন।

১৯৩০ সালের ৮-ই ডিসেম্বর 'রাইটার্স বিল্ডিং' আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। আক্রমণের জন্য সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। ৮-ই ডিসেম্বর এ্যাকশনের জন্য তিন বিপ্লবী প্রস্তুত। বেলা ঠিক ১২ টা। সামরিক পোশাক পরে তিনজন বাঙালী যুবক এসে কর্নেল সিম্পসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

তাঁরা সিম্পসনের চাপরাশীকে (সহকারী) ঠেলে কামরার ভিতরে প্রবেশ করেন। হঠাৎ পদধ্বনী শুনে কর্নেল তাঁদের দিকে তাকান। বিস্ময়-বিমূঢ় চিত্তে দেখতে পান সম্মুখে মিলিটারী পোশাক পরে তিনজন বাঙালী যুবক রিভলবার হাতে দণ্ডায়মান। মুহূর্তের মধ্যে বিনয়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, "প্রে টু গড কর্নেল। ইওর লাষ্ট আওয়ার ইজ কামিং।" কথাগুলি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তিনটি রিভলবার হতে ছয়টি গুলি সিম্পসনের দেহ ভেদ করে। সিম্পসন লুটিয়ে পড়ে মেঝের উপর।

এরপরই গুলির আঘাতে আহত হন জুডিসিয়েল সেক্রেটারী মি. নেলসন। এলোপাথাড়ি গুলি বর্ষণ করতে করতে আততায়ীরা পরবর্তী লক্ষ্য হোম সেক্রেটারী আলবিয়ান মারের কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। ততক্ষণে এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য ছুটে আসেন পুলিশ-ইন্সপেক্টর জেনারেল মি. ক্র্যাগ ও সহকারী ইন্সপেক্টর জেনারেল মি. জোনস। তাঁরা কয়েক রাউণ্ড গুলিও ছোঁড়েন। কিন্তু বিনয়-বাদল- দীনেশের বেপরোয়া গুলির মুখে তাঁরা দাঁড়াতে পারলেন না। প্রাণ নিয়ে পালালেন। সমস্ত 'রাইটার্স বিল্ডিং' জুড়ে তখন এক বিভীষিকাময় রাজত্ব। চারিদিকে শুধু ছুটাছুটি। কে কোন দিকে পালাবে খুঁজে পায় না। কলরব-কোলাহল- চিৎকার। শুধু এক রব 'বাঁচতে চাও তো পালাও''রাইটার্স বিল্ডিং' আক্রমণের সংবাদ পেয়ে পুলিশ কমিশনার টেগার্ট আসেন। ডেপুটি কমিশনার গার্ডন আসেন সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে। জুডিসিইয়াল সেক্রেটারী মি. নেলসন, মি. টয়নয় প্রমুখ আহত হলেন। আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ডেকে আনা হল গুর্খা বাহিনীকেও।

একদিকে তিনজন বাঙালী তরুণ, হাতে শুধু তিনটি রিভলবার। আর অপরদিকে রাইফেলধারী সুশিক্ষিত গুর্খাবাহিনী। আরম্ভ হল 'অলিন্দ যুদ্ধ'। ইংরেজ মুখপত্র 'স্টেটসম্যান' পত্রিকার ভাষায় 'বারান্দা বেটল'। দীনেশের পিঠে একটি গুলি বিদ্ধ হল। তিনি তাতে ভ্রুক্ষেপও করলেন না। অসংকোচে গুলিবর্ষণ করতে লাগলেন শত্রুকে লক্ষ্য করে। যতক্ষণ পর্যন্ত বিনয়- বাদল-দিনেশের হাতে গুলি ছিল, ততক্ষণ কেউ তাঁদের আক্রমণ করে প্রতিহত করতে পারেননি। একপর্যায়ে তাঁদের গুলি নিঃশেষ হল। গুর্খা ফৌজ অনবরত গুলিবর্ষণ করে চলল। তখন তিনজন বিপ্লবী একটি শূন্য কক্ষে প্রবেশ করে সঙ্গে আনা 'সায়নাইড'-বিষের পুরিয়াগুলি মুখে দিলেন। বিষ-ক্রিয়ায় অতি-দ্রুত জীবনপ্রদীপ নিবে না যাওয়ার আশংকায় এবং মৃত্যুকে নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেকেই নিজ নিজ ললাট লক্ষ্য করে রিভলবারে রাখা শেষ গুলিটি ছুঁড়ে দিলেন। বাদল তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করেন। বিনয় ও দীনেশ সাংঘাতিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মেঝের উপর পড়ে রইলেন।

ভীষণভাবে আহত বিনয় ও দীনেশকে একটু সুস্থ করে ইংরেজ বাহিনী তাঁদের উপর চালাল প্রচণ্ড অত্যাচার। এরপর উভয়কেই পুলিশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়।

বিনয় ছিলেন মেডিকেল স্কুলের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তিনি জানতেন মৃত্যুর পথ। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তিনি ১৪-ই ডিসেম্বর রাতে আকাঙ্খিত মৃত্যুকে বরণ করার জন্য মস্তিষ্কের ব্যাণ্ডেজের ভিতর অঙ্গুল ঢুকিয়ে স্বীয় মস্তিষ্ক বের করে আনেন এবং মৃত্যুকে বরণ করে নেন।

অন্যদিকে ডাক্তার ও নার্সদের আপ্রাণ চেষ্টায় দীনেশ ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠেন। সুস্থ হওয়ার পর তাঁকে হাসপাতাল থেকে 'কনডেমড' সেলে নেয়া হয়। তারপর দীনেশের বিচারের জন্য আলীপুরের সেসন জজ মি. গ্রালিকের সভাপতিত্বে ব্রিটিশ সরকার এক ট্রাইবুনাল গঠন করে ফাঁসির আদেশ দেয়।

আলিপুর জেলে বসে বাড়ির লোকদের উদ্দেশ্যে বহু চিঠি লেখেন দীনেশ। যার মধ্যে ৯২ টি চিঠি পাওয়া যায়। সেই চিঠি যা মানুষের জীবনদর্শন বদলিয়ে দিতে পারে। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু দীনেশের সেই চিঠি পড়ে বলেছিলেন, "এগুলো শুধু চিঠি নয়, এগুলো মূল্যবান জীবনদর্শন।" দীনেশ সময়ের থেকে বহুকাল এগিয়েছিলেন ওই চিঠিগুলো তার প্রমাণ। চিঠিগুলিতে ধরা রয়েছে উনিশের যুবকের চিন্তার ব্যাপ্তি, জীবনদর্শনের গভীরতা।

বৌদিকে যেমন লিখছেন, “যে দেশে মানুষকে স্পর্শ করিলে মানুষের ধর্ম নষ্ট হয়, সে দেশের ধর্ম আজই গঙ্গার জলে বিসর্জন দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত”, ভাই-কে তেমনই দিশা দেখাচ্ছেন জীবনবোধের, “যুগ যুগ ধরিয়া এই যাওয়া আসাই বিশ্বকে সজীব করিয়া রাখিয়াছে, তাহার বুকের প্রাণ স্পন্দনকে থামিতে দেয় নাই।আর সান্ত্বনার পরশ দিতে চাইছেন শোকাচ্ছন্ন মা-কে, “তাঁহার বিচার চলিতেছে। তাঁহার বিচারের উপর অবিশ্বাস করিও না, সন্তুষ্ট চিত্তে সে বিচার মাথা পাতিয়া নিতে চেষ্টা কর।

১৯৩১ সালের ৭ জুলাই। দীনেশ গুপ্ত ভোরবেলা স্নান করার পর ফাঁসির পোশাক পরে হাসতে হাসতে সার্জেন্টকে বললেন, "এবার যাওয়া যেতে পারে"। এরপর ধীর পায়ে ফাঁসিমঞ্চের দিকে অগ্রসর হলেন মৃত্যুঞ্জয়ী দীনেশ গুপ্ত। সার্জেন্ট তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন,"তোমার কিছু বলার আছে কি বন্দী?" দীনেশ গুপ্ত উত্তর দিলেন, "প্লিজ স্টপ। আমাদের বলার অধিকার যে কেড়ে নিয়েছে, সে কথা তোমরাই ভাল জান। ডু ইওর ডিউটি, আই এম রেডি।" পর মুহূর্তে দীনেশ গুপ্ত ফাঁসির মঞ্চে উঠে স্বহস্তে ফাঁসির রজ্জু গলায় পরেন। 'বন্দেমাতরম, বন্দেমাতরম, বন্দেমাতরম' বলতে বলতে ফাঁসির রজ্জুতে তাঁর শেষ নিঃশ্বাস থমকে যায়। সেই সাথে নিভে যায় বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের জীবন প্রদীপ।

পরদিন, অর্থাৎ ৮-ই জুলাই দীনেশের শোকে শোকাভিভুত কলকাতা নগরী হরতাল পালন করে। লক্ষ লক্ষ বিষাদ-ক্লিষ্ট নর- নারী মনুমেন্টের নীচে সমবেত হয়ে সেদিন বিকালবেলা দীনেশের বিপ্লবী কর্মকান্ডের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করার শপথ নেয়। আর বিপ্লবী তরুণরা ঘোষণা করেছিল, "দীনেশ আমাদের জাতীয় বীর। অন্যায়ভাবে তাঁর ফাঁসি আমরা কিছুতেই বরদাস্ত করিব না। এর প্রতিশোধ আমরা নিবোই।" সত্যিই বিপ্লবীরা এর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন।

দীনেশের মৃত্যুদণ্ডের আদেশকারী গার্লিককে হত্যা করেছিলেন বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য। দীনেশের হাতে গড়া মেদিনীপুর বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্সের বিপ্লবীরাই জেলাশাসক পেডি, ডগলাস, বার্জ হত্যা করেছিলেন। পেডিকে হত্যা করেছিলেন বিমল দাশগুপ্ত ও জ্যোতিজীবন ঘোষ। ডগলাসকে হত্যা করেছিলেন প্রদ্যোতকুমার ভট্টাচার্য ও প্রভাংশুশেখর পাল। বার্জকে হত্যা করেছিলেন অনাথবন্ধু পাঁজা ও মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত।

বাংলা সহ ভারতের অন্যান্য অংশে বিনয়, বাদল এবং দিনেশকে শহীদ বিপ্লবী হিসেবে সম্মান করা হয়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে বিনয়-বাদল-দীনেশের নামানুসারে কলকাতার ডালহৌসি স্কয়ারের নাম পাল্টে রাখা হয় বি-বা-দী বাগ। অর্থাৎ বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ।

(সংকলন - তারিণী খুড়ো) 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন