একটি প্রেমের গল্প

যাঁদের কাছে ১-লা জানুয়ারি মানে বর্ষবরণ-এর নামে শুধুমাত্র আনন্দের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেওয়া নয়, উদ্দাম নাচের তালে তালে শরীর দোলানো নয় বা রঙিন নেশায় বুঁদ হয়ে যাওয়া নয়, আজকের কাহিনী তাঁদের জন্য। আজকের এই সত্য কাহিনীতে, আছে প্রেম, অপার প্রেম, আছে শ্রমিকের ঘামের গন্ধ, আছে দারিদ্র, আছে হারানোর চরমতম যন্ত্রণা আর আদর্শের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার মধ্যে দিয়ে ভালবাসাকে অমরত্ব দানের জেদ।

সফদর হাসমি ও মলয়শ্রী হাসমি

উপরের ছবিটা ওদের কম বয়সের ছবি, চোখ মুখ দেখুন। কি উজ্বল, ঝকঝকে, বুদ্ধিদীপ্ত! ওরা নাটক করতো; জীবন সংগ্রামের নাটক; অন্যায়ের বিরুদ্ধতায় শোষিত মানুষকে জাগানোর নাটক। ‘করতো’ লিখলাম, কারণ ছেলেটি আর বেঁচে নেই। বয়সের ভারে ক্লান্ত, তবুও মেয়েটি আজও ছেলেটির স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে।

১৯৮৯ সালের ১লা জানুয়ারী। গাজিয়াবাদের সাহিবাবাদে, ঝান্ডাপুর এলাকা। ওরা রাস্তায় নাটক করে। সাধারন মানুষ, খেটে খাওয়া মজুর, দোকানি, পথচলতি মানুষ ভীড় করে দেখে সে নাটক। ওরা নাটকে শোষনমুক্তির কথা বলে, নৈশব্দের সংস্কৃতি ভাঙার কথা বলে। নাটকের নাম তাই "হল্লা বোল"। সেবারের গাজিয়াবাদ পৌরসভার র্নিবাচনে ওরা খেটে খাওয়া মানুষের জোটকে আরো শক্তিশালী করতে চায়। ওরা মানে সফদর হাসমি আর মলয়শ্রী। নাম দেখে আবার ধর্মের নিক্তি বার করবেন না যেন! বরং ভালোবাসা কাকে বলে, সেই গল্পটা শুনুন আজ আপনারা।

নাটক শুরু হতেই ভীড় জমে গেল। বেশ জমে উঠছে নাটক। এমন সময়ে স্থানীয় এক রাজনৈতিক মাফিয়া মুকেশ শর্মা আর তার দলবল ঝাঁপিয়ে পড়লো নাটক-টি যারা করছিল তাদের উপর। বোমার পর বোমা, রড়, লাঠি চলতে লাগলো। সফদরকে ওরা মাটিতে ফেলে রড়, লাঠি দিয়ে মারতে লাগলো। মলয়শ্রী, অন্য সহ নাট্যকর্মীরা আপ্রান বাঁচাতে চাইলো ওকে। জনতা ছত্রভঙ্গ।

সফদর মারা গেছে ভেবে ঘাতকরা তাদের কাজ সেরে চম্পট দিলো। তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলো সবাই। না, জ্বলজ্বলে চোখের ছেলেটি বাঁচেনি। পরদিন চলে গেল মেয়েটিকে একা রেখে। মেয়েটি শ্রমজীবি মানুষের কাঁধে চড়ে অন্তিমের পথে যেতে যেতে হত দেখেছিলো তার ভালোবাসাকে।

সেদিন মেয়েটি কান্নায় ভেঙে পড়েনি। প্রতিটি স্রষ্টার কাছে সৃষ্টি যেমন সন্তানসম তেমনি ওদের সন্তান ‘নাটক’ কে যে সম্পুর্ন করতে হবে। শ্রেনীশত্রুর চোখে চোখ রেখে যে বলতে হবে...  "এ দেশ তোমার লুঠের জন্য নয়!" 

তারপর মাত্র দুদিনের অপেক্ষা, মেয়েটি তাদের সৃষ্টি, তাদের ভালোবাসা কে মঞ্চস্থ করলো ৪-ঠা জানুয়ারি তারিখে ওই একই জায়গায়, একই সময়ে! হ্যাঁ, মঞ্চ.... রাস্তাই যে ওদের মঞ্চ। 

সে রাস্তায় ছিল সেদিন মেহনতি মানুষের অধিকারের গর্জন........

"জব ইনকিলাব কি ঝান্ডা লহরায়েগা....

তব না কৌই সফদর নুক্কড় পে মারা যায়েগা...." ‌

ভালোবাসা শুধু পার্কস্ট্রিটে, সিটি সেন্টারে গুনগুন করেনা। কান পাতো, শুনতে পাবে সে আওয়াজ তোমার হৃদয়ে। খালি সোচ্চারে বলতে শেখো সেই ভালোবাসার কথা...."হল্লাবোল ভাই হল্লাবোল"।

যে পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ এই বর্ষবরণের রাতেও ঘুমোতে গিয়েছেন ভুখা পেটে, অন্তত সেই মানুষগুলির কথা ভেবে আসুন সফদর হাসমি আর মলয়শ্রীর ভালবাসাকে, ভালবাসার গল্পকে আরো আরো বেশি মানুষের কাছে নিয়ে যাই।

(সংকলন - তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন