সম্বিৎ সেনগুপ্ত নামটার সাথে সেভাবে পরিচিত নই আমরা। কিন্তু বিশ্বজয়ী এই প্রবাসী বাঙালির জীবন কাহিনী কোনো রূপকথার থেকে কম নয়। আসুন আজ জেনে নেওয়া যাক তাঁর জীবনের অনন্য উত্থানের কাহিনী।
সম্বিৎ সেনগুপ্ত’র জন্ম ১৯৫৪ সালে কাঁচড়াপাড়ার শহীদ নগর উদ্বাস্তু কলোনিতে। সদ্য দেশভাবের দগদগে ঘা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে এদেশে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিল সম্বিৎ-এর পরিবারকে। বাবা ছিলেন সেই সময়কার একজন সমর্পিত কমিউনিস্ট নেতা এবং ব্রিটিশ-বিরোধী কর্মী, যিনি ফরাসিদের শিল্প কলার উপরে বিশেষ করে সহানুভূতিশীল ছিলেন। প্রায় সর্বক্ষণের রাজনৈতিক কর্মী বাবার আয়ের স্থিরতা ছিল’না। মা অবশ্য ছিলেন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা।
| সম্বিৎ সেনগুপ্ত |
ইলেকট্রিক আলোও জ্বলত না তখন উদ্বাস্তু কলোনির সেই ঘরে। মায়ের এক খ্রিশ্চান সহকর্মীর সঙ্গে যেতেন বেল ইনস্টিটিউশন নামে কাঁচড়াপাড়ার রেলওয়ে ক্লাবে৷ সেখানেই পরিচয় পশ্চিমের চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতের সঙ্গে৷ অন্য দিকে, বাবা এনে দিতেন রাশিয়ান বই৷
কিন্তু জীবনের সূচিমুখটি নির্ধারিত হয়েছিল জনৈক পরিচিত শিল্পী, সুধীন্দ্র কুমার রায়ের কথায়৷ তিনি ছেলেটিকে বলেছিলেন যা ভালো লাগে না তা কখনও করো না৷ আরও বলেছিলেন, তুলি, রং আর মন যখন এক বিন্দুতে আসে তখনই শিল্পের সৃষ্টি হয়৷ ছেলেটি ঠিক করলো, তুলি ও রঙের মধ্যেই তাঁর জীবনের বাকি অধ্যায়গুলি রচিত করতে৷
সম্বিত ভর্তি হলেন কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট-এ৷ সেখানে পড়ার সময়ই জনৈকা পরিচিতার সঙ্গে একদিন হাজির হলেন আমেরিকান লাইব্রেরিতে৷ সেই সুরম্য পরিসরে মামুলী পায়জামা পাঞ্জাবি পরে হয়তো কিছুটা বিব্রতই বোধ করেছিল সে। প্রথম যে বইটিতে তাঁর হাত পড়ে তার প্রথম পাতাতেই ছিল, ভ্যান গঘ-এর ‘সানফ্লাওয়ার’৷ তত্ক্ষণাত্ তাকে যেন কেউ তাড়া দিতে থাকে, যেন বলতে থাকে প্যারিসে গিয়ে আঁকা শিখতেই হবে৷ কিন্ত্ত টাকা কোথায়?
অগত্যা মায়ের কাছে আর্জি, সোনার হার বিক্রি ও পকেটে আট ডলার আর একটি ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে ১৯৭৩-এ সম্বিৎ উঠলেন প্যারিস গামী বিমানে।
অপরিচিত শহরে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় অযাচিত সাহায্য মেলে ডাঃ সি কে পাইন নামক এক প্রবাসী বাঙালি ভদ্রলোকের কাছ থেকে৷ তিনি তাঁকে থাকার জায়গা জুটিয়ে দেন সঙ্গে দেন তিনশো ফ্রাঁ৷ প্রথম কাজ জোটে আঁতেইয়ে গুর্দোঁ নামের এক লিথোগ্রাফিক প্রিন্ট শপে ঝাড়ুদার হিসাবে৷ সেখানেই তাঁর পরিচয় হতে থাকে ফ্রান্সের তত্কালীন নামজাদা শিল্পীদের কাজের সঙ্গে৷ দোকানের মালিকদের দাক্ষিণ্যে কখনও সখনও শিল্পীদের সঙ্গে আলাপের সুযোগও জুটে যায়৷ সাধারণের জন্য শিক্ষা বিনামূল্যে হওয়ায় একটি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সেনগুপ্ত, প্যারিস-এ অবস্থিত আর্ট স্কুল, ইকোলে ন্যাশনাল সুপারিউর দেস বেউক্স-আর্টস –এ নাম লেখান ১৯৭৪ সালে। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী-ও এই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন একসময়। নিজের খরচ সামলানোর জন্য, তিনি পেইন্টিং তৈরি এবং বিক্রি করা শুরু করেন এই সময় থেকেই।
এই প্রবাস জীবনে আট বার চাকরি পাল্টান সম্বিৎ৷ বিদেশে কাজ করার জন্য জরুরি কাগজপত্রের অভাবে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে পত্রপাঠ ফিরে আসার ঝুঁকিও ছিল৷ শেষে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় প্রথম নিয়মিত কাজের সুযোগ পান শিল্পী হিসাবে৷
ধীরে ধীরে নিজের পায়ের তলার জমি শক্ত করতে থাকেন সম্বিৎ। প্রতিষ্ঠা করেন সানশাইন কর্পস এর। অচিরেই তার সংস্থার কাজ নজর কাড়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলির। পৃথিবীর খ্যাতনামা ব্র্যান্ড গুরু হওয়া পর্যন্ত আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে৷ উইপ্রো থেকে ক্যাডবেরী, ল্যাকমে থেকে গার্ণিয়ের অসংখ্য বহুজাতিক সংস্থার উৎপন্ন দ্রব্যের মোড়কের ডিজাইন করে থাকে সানশাইন কর্পস।
উদ্বাস্ত্ত কলোনির গলি থেকে প্যারিসের রাজপথ পর্যন্ত বর্ণিল অভিজ্ঞতার এই সম্ভার সম্বিৎকে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের অন্তরমহলকে চিনে নিতে সাহায্য করেছে৷ সেখান থেকেই তিনি খুঁজে পান মানুষের অবচেতনের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে একটি ব্যবসায়িক ব্র্যান্ডকে প্রতিষ্ঠিত করার গূঢ় রহস্য৷ ১৯৮৪ সালে সেই দক্ষতাকে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংস্থার কাজে লাগাবার জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন শাইনিং কনসালটিং৷ কী ভাবে উপভোক্তা চিন্তা করে এবং সময়ের সঙ্গে সেই চিন্তা কী ভাবে পাল্টাতে থাকে, সম্বিতের এই নিয়ে মৌলিক দিকদর্শনকে কাজে লাগিয়েছে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা৷ ব্র্যান্ড ও বিপণনের নিরিখে বাণিজ্যিক কৌশলের উদ্ভাবক হিসেবে সম্বিৎ সেনগুপ্ত নিজেই এখন এক প্রতিষ্ঠান।
সম্বিৎ সেনগুপ্তর নিজের সৃষ্টি যে ঘরানা, সেই জেশ্চারিজম, তার গুণমুগ্ধের সংখ্যা নেহাত কম না, তারা ছড়িয়েও আছে সারা পৃথিবী জুড়ে। কলকাতা থেকে প্যারিস সহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে তাঁর আঁকা ছবির প্রদর্শনী চলে নিয়মিত। রং-তুলিতে ভাব প্রকাশের প্রচলিত নানা ধারার বাইরে তিনি যে নতুন ধারার জন্ম দিয়েছেন, তা প্রশংসা পেয়েছে সারা বিশ্বে।
আন্তর্জাতিক এই বাঙালি কর্মকাণ্ডে শরিক করেছেন তাঁর স্বদেশকেও, বেঙ্গালুরুতে স্থাপন করেছেন তাঁর সংস্থার এক শাখা৷ তিনি আজ যতটা পৃথিবীর, ততটা ভারতেরও।
(সংকলন - তারিণী খুড়ো)
খুব ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুন1975 e Paris gelen ar 1974 e Paris e job... Ektu bemamn na.
উত্তরমুছুনPlease review