আজ সুমহান মে-ডে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ১৮৮৬-র সেই রক্তঝরা দিনটিকে স্মরণ করেই সারা বিশ্বে এই দিনটি পালিত হয় শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের দিন হিসেবে।
মে দিবস-এর ইতিহাস কমবেশি সকলেরই জানা, তবুও খুব অল্প পরিসরে সেই ইতিহাসের পাতায় একবার চোখ রাখা যাক। ১৮৮১ সালে নভেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ‘আমেরিকান ফেডারেশ অব লেবার’ ১৮৮৪ সালের ৭-ই অক্টোবর তাদের চতুর্থ সম্মেলনে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে; সেই সিদ্ধান্তে বলা হয় ১৮৮৬ সালের ১-লা মে থেকে সব শ্রমজীবী মানুষ আট ঘণ্টার বেশি কোনওভাবেই কাজ করবে না। ওই দিনটিতে তাই প্রায় ১৩০০০ কারখানা এবং ব্যাবসায়ী সংস্থার পাঁচ লক্ষ শ্রমিক দাবী আদায়ের লক্ষ্যে প্রত্যক্ষভাবে ধর্মঘটে যোগ দেন।
ধর্মঘট অহিংস হলেও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্থবিরতার ফলে সরকার এবং কর্তৃপক্ষ বল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। শিকাগোর বিক্ষোভরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে প্রচুর পুলিশ মাঠে নামে। শিকাগোর ম্যাককরমিক হারভেস্টিং মেশিন কোম্পানির সামনে পুলিশ গুলি চালায় শ্রমিকদের উপর, সেখানে নিহত হয় দুজন। ছত্রভঙ্গ শ্রমিকদের বিপুল সংখ্যক হতাহত-ও হন। এই সংবাদ শ্রমিকদের মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি করে। বৃহত্তর আন্দোলনের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে শিকাগোর 'হেমার্কেট স্কোয়ারে' ৪-ঠা মে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে সমবেত হয় হাজার তিনেকের মতন শ্রমিক। পুলিশ চারিদিক থেকে তাদের ঘিরে রাখে। তাদের উদ্দেশ্য এই জমায়েতকে ছত্রভঙ্গ করা। এর মধ্যে পুলিশের কিছু উচ্চ পদস্থ অফিসার এলে হঠাৎ একটি বোম এসে পরে। কে যে তা ছোড়ে তা আজ পর্যন্ত অজানাই থেকে গেছে। বোমা নিক্ষিপ্ত হলে পুলিশ বেপরোয়া গুলি চালায়। কতজন মারা যায় তার কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। সরকারী হিসাবে সাত জন পুলিশ ও আট জন শ্রমিক মারা যায়। পৃথিবীর শ্রমিক সংগ্রামের ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে এটি লেখা হয়ে আছে ‘হে মার্কেট ম্যাসাকার’ নামে। ১৮৮৬ সালের আগস্ট মাসে বিচার নামক প্রহসন শুরু হয়। আটজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সাত জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একজনকে পনেরো বছরের জেল।
শ্রমিকরা সেই সময়ে যে ফ্লাগ বহন করতো তার রং থাকতো সাদা, ৪-ঠা মে’র 'হেমার্কেট স্কোয়ারে'-র জমায়েতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। গুলি চলার পর মৃত এবং আহতদের রক্তে ওই ফ্লাগগুলো এবং শ্রমিকদের শার্টগুলি রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। সেই রক্তে রঞ্জিত ফ্লাগ আর শার্টগুলো শ্রমিক বস্তিতে শ্রমিকরা টাঙ্গিয়ে দেয়। জন্ম হয় লাল পতাকার।
দেশকালের গণ্ডি পেরিয়ে এই নৃশংস বর্বরতার খবর পৌঁছয় দুনিয়ার সব মেহনতি, শ্রমজীবি মানুষের কানে। তাদের জীবনদানের মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রসহ গোট বিশ্বের শাসকশ্রেণী ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবি মেনে নেয়। ১৮৮৯ সালে জুলাই মাসে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথম দিনের অধিবেশনেই সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয় যে, ১৮৯০ সালের ১-লা মে থেকে প্রতি বছর এই দিনটি শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি, সৌভ্রাতৃত্ব ও সংগ্রামের দিন হিসেবে পালিত হবে। এভাবেই ১৮৮৬ সালের ঐতিহাসিক 'মে দিবস' ১৯৯০ সালে আন্তর্জাতিক 'মে দিবসে' পরিণত হয়।
বনে বনে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করে জীবনধারণ করা মানুষ থেকে আজকের দিনের মানুষ হয়ে ওঠার ইতিহাসে যে কয়েকটি অধ্যায়কে মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তার মধ্যে আজকের দিনটিকে কিন্তু সেভাবে উল্লেখ করা হয়না; অথচ আজকের দিনটির গুরুত্ব মানব সভ্যতার ইতিহাসে অপরিসীম। মে-দিবসের ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফলে কাজের সময় বেঁধে দেওয়ার মতন যে এক যুগান্তকারী অধিকার অর্জিত হয়, তার ফলেই মানুষ পায় অবসর - নিজেকে নিয়ে, সমাজকে নিয়ে ভাবার অবসর। আট ঘন্টা কাজের পরে, বাকি ১৬ ঘন্টা নিজের মতো করে ব্যবহার করার সুযোগ। আর এই সুযোগ মানুষের সামনে খুলে দেয় নতুন নতুন পথে তার চিন্তা ভাবনাকে চালিত করতে। উদ্ভাবিত হয় নব নব দিক। এই সুযোগ না পেলে আজ মানব সভ্যতা যে সোপানে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেখানে যে সে কোনমতেই পৌঁছাতে পারতো না, তা আশাকরি সবাই উপলব্ধি করবেন।
গত বছরের মতো এই বছরের মে দিবসও এমন একটা সময়ে এলো যখন দুনিয়া ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা ‘বাড়ি থেকে কাজ’ নামক এক নতুন আবহাওয়ার মধ্যে একরকম গৃহবন্দী। অনেকর জন্য সেটাই নতুন বাস্তব - নিউ নর্মাল। কিন্তু তাঁদের কী হবে যাঁদের না আছে বাড়ি, না আছে কাজ?
আট ঘন্টা শ্রমের অর্জিত অধিকার আজ প্রবল সঙ্কটের মুখে। করোনার অতিমারির আবহে শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম আজ সবচেয়ে কঠিন। দুবেলা অন্ন জোগানোই এখন দায়। ইতিমধ্যেই কাজ হারিয়েছেন বহু শ্রমজীবী মানুষ। অনেকেই আবার অনেক কম মাইনে নিয়েও কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন; শ্রমের মূল্য প্রতিদিন কমছে। করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মুনাফার স্বার্থে কর্মজীবীদের আরও আরও বেশি করে শোষণ করেই যাচ্ছে পরশ্রমজীবী, বৃহদাকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
অন্য দিবসের জঞ্জালে মানুষ তার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত 'দিবস'-টিকে প্রায় ভুলতে বসেছে। বরং বলা যায় অতি ধূর্ততায় ভুলিয়ে দেওয়ার প্রয়াস চলেছে। বেশ কয়েক বছর ধরেই এই দিনটিতে অনেক প্রাইভেট স্কুল খোলা থাকছে; এখন তো আবার ওয়ার্ক ফ্রম হোমের যুগ! জানি না কারখানাগুলোর কতগুলোতে আজ পালিত হ’ল মে-দিবস, অথচ এ দেশে প্রায় একশো বছরের কমিউনিস্ট পার্টির জন্মের ইতিহাস। কত নাম জানা ও নাম না জানা কমিউনিস্ট দল দেশভর ছড়িয়ে আছে। আছে তাদের ইউনিয়ন। এই দলগুলোতে বা ইউনিয়নগুলোতে যারা আছেন তাঁদের বেশীরভাগের কাছেই "মে দিবসে" মানে ছুটির দিন। ব্যাতিক্রমী এক আধজন ছাড়া প্রায় কেউ জানে না, এই দিনটির তাৎপর্য। তারা জানেন ইউনিয়নে থাকার অর্থ চাকরীতে সুরক্ষা পাওয়া। আজকাল তো ধর্ণা বা ধর্মঘটেও আস্থা নেই তাঁদের। তবুও অন্য উপায় নেই। তা'ই তারা নেতাদের প্রতি ঘৃণা নিয়েও বাধ্য হয়েই থাকেন। আর ভাবেন কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়ার এ এক হাতিয়ার। তার বেশি কিছু নয়। তারা আজও জানলেন না ইউনিয়ন কেন চাই? ইউনিয়ন আসলে কি। কেন এমন দুর্দশা? একশো বছরের কমিউনিস্ট ইতিহাস এত করুন পরিণতিতে কি ভাবে পৌঁছাল? কারন কি খুঁজবো না আমরা? স্রোতের অভিমুখে শুধুই গা ভাসিয়ে চলবো?
ধনকুবেরদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শোষণমুক্ত পৃথিবী গড়ার যে বার্তা দিয়েছিলো ১৮৮৬-র মে দিবস, তা আজ হয়ত এক স্বপ্ন মাত্র হয়েই রয়ে গিয়েছে অনেকের কাছে। অথচ আসল শক্তি তো শ্রমিক শ্রেনীর হাতেই। তাঁরা চাইলেই সভ্যতার অগ্রগতির চাকা বন্ধ হয়ে যাবে, তাঁরা চাইলেই শাসকের গদি যাবে টলে, তাঁরা চাইলে তবেই বদলাবে এই অসহনীয় পরিস্থিতি। শ্রমিকদের জাতি, ধর্ম, বর্ণের রঙে বিভাজিত করে রাখার চক্রান্তের পর্দা ফাঁস হয়ে যাবে যেদিন, সেদিন কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাসে সংযোজিত হবে আর একটা মাইল ফলক। প্রগতির এক নতুন ধারার জন্ম হবে সেদিন। সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া শুধুই সময়ের অপেক্ষা।
(তারিণী খুড়ো)

Sothik porjobekkhon ebong bislation. Bortomane amra (mane sromikera jara ekta stahi korma kormoroto) amader porer projommoke ki obosthai nia jachchi ta chinta korchi na. Samoik anando ba sujog mangmenter kachthake nia bortomaner bhalolagatukke upobhog korchi. Amra nijarai nijeder-ka ki andhokooper moddha thale dichchi ta bujhtai chaichi na. Porer projommo kintu amader dikai angul toolba. Bolbe " Ja omanobik kosto o sohissnuta dara orjito adhikar ek-kale sromikera enadiya chilo ta tomra nijeder sarther jonno dhore rakhla na."
উত্তরমুছুনদারুণ লেখা
উত্তরমুছুন