মৃণাল সেন – শোষিত মানুষের চলচ্চিত্রকার

সময়ের উন্মত্ততাকে সিনেমার পর্দায় ধরতে পারা সেই পরিচালক, যিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “প্রতি বছর আমি তরুণ হয়ে উঠি”, সেই মানুষটিকে চেনাতেই, আজকের এই প্রয়াস।

মৃণাল সেন - এক বামপন্থী চলচ্চিত্রকার

১৯২৩ সালের ১৪-ই মে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত পূর্ব বঙ্গের ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলি মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন মৃণাল সেন। বাবা দীনেশ সেন ছিলেন আইনজীবী ও স্বদেশী কংগ্রেসী। তাঁদের বাড়িতে নিয়মিতই বিপ্লবীদের আনাগোনা ছিল। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু দুবার তাঁদের বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন। কেবল রাজনীতিবিদেরাই নন, তাঁদের বাড়িতে আসতেন কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমুদ্দীনের মতো বিখ্যাত কবিরা। মৃণাল সেনের মা ছিলেন স্বাধীনতা অনুরাগী স্বশিক্ষিত। ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের জনসভায় উদ্বোধনী গান গাইতেন তাঁর মা। 

মৃণাল সেনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি ফরিদপুরের ঈশান স্কুলে ১৯২৯ সালে। এই স্কুলে পড়া অবস্থায় এক মিছিলে  ব্রিটিশবিরোধী স্লোগান দেওয়ার অপরাধে কিশোর মৃণাল সেনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এরপর তাঁর বাবা থানা থেকে তাঁকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। ঈশান স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মৃণাল সেন ভর্তি হলেন ফরিদপুরের বিখ্যাত রাজেন্দ্র কলেজে। 

তাঁর পিতা-মাতা কখনোই ভাবেননি তাঁদের প্রিয় স্বদেশ ছাড়তে হবে। কিন্তু পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটলে  পরিস্থিতির ফেরে বাধ্য হয়ে ১৯৪৩ সালে তাঁরা সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে দেশত্যাগ করবেন। জলের দরে সব বিক্রি করে দিয়ে তাঁরা সপরিবারে কলকাতায় উপস্থিত হলেন, ‘উদ্বাস্তুপরিচয়ে। বাড়ি ছাড়ার পূর্বে যিনি তাঁদের সম্পত্তি ক্রয় করেছিলেন তাঁর কাছে মৃণালের বাবা ছোট্ট একটা অনুরোধ করেন: আপনাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে না কিন্তু চেষ্টা করে দেখবেন যদি সম্ভব হয় পুকুরের পাশে যে-ছোট্ট স্মৃতিস্তম্ভটি আছে, তা যেন রক্ষা পায়।স্মৃতিস্তম্ভটি হলো মৃণালের ছোট বোন রেবার। সে পাঁচ বছর বয়সে পা পিছলে পুকুরে পড়ে যায় এবং ডুবে মারা যায়। ১৯৯০ সালে মৃণাল আবার ও দেশে ফিরে গিয়ে দেখেন সেই ভদ্রলোক‌ ওই অনুরোধ রেখেছিলেন। 

১৯৪৩ সালে ভর্তি হলেন স্কটিশ চার্চ কলেজে, পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে অনার্স পড়ার জন্য। সেই সময়ের কলকাতায় বামপন্থার অমোঘ আকর্ষণে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন মৃণাল সেন, এরপর পুরোদস্তুর জড়িয়ে পড়লেন বামপন্থী রাজনীতিতে। কখনও কোনো কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যতা না নেওয়া মৃণাল নিজেকে একজন প্রাইভেট মার্ক্সিস্টবা ইন্ডিভিজুয়াল মার্ক্সিস্টবলতেন। 

স্নাতকোত্তর শেষে যোগ দিলেন সাংবাদিকতায়। সেখানেও স্বস্তি না পেয়ে যোগ দিলেন এক ওষুধ কোম্পানিতে ওষুধ বিপণনকারী হিসেবে। কিন্তু সেখানে বেশি দিন টেকেননি মৃণাল সেন; একটা ভয়ংকর অস্বস্তি তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াতো সেই সময়। সিনেমা বানানোয় বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও, ফিজিক্সের ছাত্র মৃণালের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল রুডলফ আর্নহেইম-এর ফিল্ম ইসথেটিক্সও আইজেনস্টাইনের শিষ্য নীলসেনের সিনেমা অ্যাজ এ গ্রাফিক আর্টসিনেমা দুটি। শুরু হল ফিল্ম সোসাইটিতে ছবি দেখতে শুরু করেন, আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় সদস্য হতে পারেননি। লিখতে শুরু করেন চলচ্চিত্র বিষয়ে তাত্ত্বিক ও গবেষণামূলক লেখা। প্যারিসের নব্য তরঙ্গ আন্দোলন তাঁকে বিচলিত করে। 

চলচ্চিত্রের শব্দ প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দিলেন; সেখানেই পেলেন চলচ্চিত্র তৈরির প্রথম পাঠ। মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে হাতেখড়ি হয় "রাত ভোর" চলচ্চিত্র দিয়ে। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া এই ছবিতে উত্তম কুমার ও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা ছবি বিশ্বাসও। যদিও এই চলচ্চিত্রটি তেমন একটা সাফল্য পায়নি। ছবিটি সম্পর্কে তিনি নিজেই পরবর্তীতে বলেছেন, ‘অত্যন্ত জঘন্য ছবি

মৃণাল সেনের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র "নীল আকাশের নিচে" মুক্তি পায় আরও তিন বছর পরে, যা বেশ সাড়া ফেলেছিল। এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা উৎপল দত্ত। এই চলচ্চিত্রে ব্রিটিশ ভারতের শেষ দিককার পটভূমিকায় কলকাতায় সমাজের নানা স্তরের মানুষের জীবন তুলে ধরা হয়েছিল, যেখানে ফেরিওয়ালা ও বাসন্তী নামের এক নারীর মধ্যে প্রেম চিত্রায়িত করা হয়েছে। এই চলচ্চিত্রে ভারত সরকারের সেন্সর কর্তৃপক্ষ প্রথমে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। এটিই ছিল ভারতের প্রথম নিষেধাজ্ঞা পাওয়া চলচ্চিত্র। যদিও দুমাস পরে এই চলচ্চিত্রের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল।

এরপর ১৯৬০ সালে মুক্তি পায় "বাইশে শ্রাবণ", যা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে মৃণাল সেনকে। এই চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে ভীষণ তৃপ্তি পেয়েছিলেন মৃণাল সেন। বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ না দেখলেও এই ছবি তাঁকে তৃপ্তি দেয়। এই চলচ্চিত্রে উঠে এসেছিল প্রত্যন্ত এক গ্রামের অজস্র সমস্যার কথা, যে গ্রাম আক্রান্ত হয়েছিলো তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, অভাবে।

এরপর একাধারে মুক্তি পেয়েছিল মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র "পুনশ্চ", "অবশেষে", "প্রতিনিধি", "আকাশ কুসুম"। ১৯৬৫ সালে "কাঁচ কাটা হীরে" চলচ্চিত্র পরিচালনার মধ্য দিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে মৃণাল সেনের। এর পরের বছর মাটির মনিষচলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে ওড়িয়া ভাষার চলচ্চিত্রে অভিষেক; এক কৃষক পরিবারের যৌথ সংসারের সমস্যা নিয়ে এই ছবি। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে কৃষক পরিবারের সমস্যার বিশ্লেষণে তিনিই প্রথম, এই ছবিতে, মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ করেন।

১৯৬৯ সালে মুক্তি পেল মৃণাল সেনের বিখ্যাত হিন্দি চলচ্চিত্র "ভুবন সোম"। ভুবন সোমকে ভারতীয় নতুন ধারার চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ বলা হয়। ভুবন সোম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার এই তিনটি শাখায় ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিল। 

এর পরের ছবি মৃণাল সেনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘"ইন্টারভিউ"। যে চলচ্চিত্রে মৃণাল সেন তুলে ধরেছিলেন কলকাতার এক সাধারণ তরুণের চাকরির সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গ। "ইন্টারভিউ" ছিল মৃণাল সেনের কলকাতা ত্রয়ীর প্রথম চলচ্চিত্র। একই বছর মুক্তি পেয়েছিল মৃণাল সেনের কলকাতা ত্রয়ীর বিখ্যাত চলচ্চিত্র কলকাতা ৭১। কলকাতা ত্রয়ীর শেষ চলচ্চিত্র ছিল "পদাতিক"। "পদাতিক" মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৩ সালে। কলকাতা ত্রয়ীর তিন চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে মৃণাল সেন তৎকালীন কলকাতার অস্থির অবস্থাকে তুলে ধরেছিলেন। 

মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে মৃণাল সেন তুলে ধরেন ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র "এক দিন প্রতিদিন" এ। মধ্যবিত্ত পরিবারের এক কর্মজীবী মেয়ে চিনু। একদিন সে রাতে বাড়ি ফিরতে পারে না। সেই রাতে গোটা পরিবারের উৎকণ্ঠা, ভয় আতঙ্ক সব মিলিয়ে একটি মেয়ের পরিবার যে কলকাতা শহরে কতোটা অসহায় তা তুলে ধরা হয়েছে। "একদিন প্রতিদিন" জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিল তিনটি বিভাগে। 

এর পরের বছর মুক্তি পেয়েছিল মৃণাল সেনের আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্র আকালের সন্ধানে”, বিষয়বস্তু ছিল তেতাল্লিশের মন্বন্তর। এই চলচ্চিত্র ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তো পেয়েছিলই, পেয়েছিল বিশ্বখ্যাত বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার বিয়ার। 

১৯৮২ সালে মুক্তি পায় মৃণাল সেনের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র "খারিজ"। এই চলচ্চিত্র বিশ্বখ্যাত কান চলচ্চিত্র পুরস্কারে পেয়েছিলো বিশেষ জুরি পুরস্কার। শিকাগো চলচ্চিত্র উৎসব পেয়েছিল ব্রোঞ্জ হুগো পুরস্কার আর ভ্যালাডয়েড চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন স্পাইক পুরস্কার।

১৯৮৫ সালে নির্মাণ করেন জেনেসিস’, যা হিন্দি, ফরাসি ও ইংরেজি তিনটি ভাষায় তৈরি হয়। মৃণাল সেনের পরবর্তীকালের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ছিল ‘মহাপৃথিবী’ ও ‘অন্তরীন’। মৃণাল সেনের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘আমার ভুবন’ মুক্তি পেয়েছিল ২০০২ সালে। 

ভারত এবং ভারতের বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়া ছাড়াও তিনি ইন্টারন্যাশন্যাল ফেডারেশন অফ দ্য ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে তিনি ভারত সরকারের পদ্মভূষণ পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৫ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ অবধি ভারতীয় সংসদের সাম্মানিক সদস্যপদ লাভ করেন। ফরাসি সরকার ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান কম্যান্ডার অফ দ্য অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারস (Ordre des Arts et des Lettres ) সম্মানে সম্মানিত করেন। ২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁকে অর্ডার অফ ফ্রেন্ডশিপ সম্মানে ভূষিত করেন।

বাংলা চলচ্চিত্রে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করে আছেন যে তিন চলচ্চিত্রকার- সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় কর্মব্যাপ্তি ছিল মৃণাল সেনের। ৪৭ বছরের চলচ্চিত্র পরিচালনার জীবনে মৃণাল সেন নির্মাণ করেছেন ৩১-টি চলচ্চিত্র। কেবল বাংলা ভাষাই নয়, বাংলার পাশাপাশি তিনি  চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন হিন্দি, ওড়িয়া, তেলেগু ভাষায়। 

মৃণাল সেন তো কেবল একজন নিছক চলচ্চিত্রকারই ছিলেন না। কিংবা তাঁর চলচ্চিত্র কেবলই নিছক চলচ্চিত্র ছিল না। মৃণাল সেন ছিলেন চলচ্চিত্র আন্দোলন থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সমাজ ও রাজনীতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরোধা। যিনি সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, গণ মানুষের ভাষ্য সমস্ত কিছুকে বিবেচনা করতেন চলচ্চিত্রের দলিল হিসেবে। এতো বিখ্যাত চলচ্চিত্র স্রষ্টা হয়েও আজীবন নিজের আদর্শ আর গভীর সমাজ ভাবনায় ও চিন্তায় অটুট ছিলেন মৃণাল সেন। মৃণাল সেন মানেই একটা কমিটমেন্ট। স্ট্রেট লাইনে ভাবা। অনেকেই ভাবতে পারেন, 'বড্ড ডিরেক্ট'। কিন্তু তিনি ভাবতেন, 'আই মাস্ট মেক এ পয়েন্ট' 

দীর্ঘকালীন জরা থেকে পরিত্রাণ পেয়ে ১৯১৮ সালের ৩০-শে ডিসেম্বর, ৯৫ বছর বয়সে জীবনকে খারিজ করে আকালের সন্ধানে চলে গিয়েছেন পরিযায়ী এই রেবেল। অভিভাবকের মতো রেখে গেছেন তাঁর প্রজ্ঞা, মুক্ত বাতাস, কয়েক দশকের সিনেমা সম্পদ আর অকুতোভয়তা - যা বর্তমানে ভীষণ ভাবে দরকার, হয়ত ভবিষ্যতেও। 

(তারিণী খুড়ো) 

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন