“তোমার বাড়ি, আমার বাড়ি নকশালবাড়ি!”
এই স্লোগান আজ আর শোনা যায় না আকাশে বাতাসে। শোনা যায় না সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বানও। তবুও, এই ২৫ মে’র তাৎপর্য আমরা অস্বীকার করতে পারি না। কারণ ১৯৬৭ আলের আজকের দিনেই কৃষকদের অধিকারের দাবিতে গর্জে উঠেছিল একটি ছোট্ট জনপদ, নকশালবাড়ি। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যা নিয়ে আসে যুগান্তকারী পরিবর্তন।
![]() |
| নকশালবাড়ি আন্দোলনে নারীরা |
যে কোনো আন্দোলন বা বড়ো কোনো অভ্যুত্থানের পিছনে কোনো না কোনো ঘটনা ‘স্ফুলিঙ্গের’ কাজ করলেও তার বীজ বোনা শুরু হয়ে যায় অনেক আগে থেকেই। ঠিক তেমনই ঘটেছিলো নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও। বীজ বোনার কাহিনীতে আসবো পরে; আগে দেখে নেওয়া যাক সেই দিনগুলির ঘটনাসমূহ যা বারুদের স্ফুলিঙ্গের কাজ করেছিলো।
১৯৬৭ সালের ২৪ এবং ২৫শে মে, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের একেবারেই অপরিচিত একটি এলাকা 'নকশালবাড়ি'-তে সংগঠিত হয় কৃষক বিদ্রোহ। এই কৃষক বিদ্রোহই পরবর্তীতে 'নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান' রূপে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাসহ গোটা দেশে; ‘নকশাল’ নামটি আজও কোনো শাসক বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।
কী ঘটেছিল সেই দিন দুটিতে?
২৪-শে মে সকালে খবর পাওয়া গেল, হাতিঘিষায় পুলিশ এসেছে। চারদিক থেকে হাজার হাজার কৃষক দৌড়ে পৌঁছে গেলেন হাতিঘিষায়। জোতদারদের স্বার্থে পুলিশ এসেছে চাষীদের ধরতে, তাই পুলিশকে গ্রামেই ঢুকতে দেওয়া হবে না এমনটাই ঠিক হল। চাষীরা প্রস্তুত লাঠি, তীর-ধনুক হাতে। টুকুরিয়া চা-বাগানের শ্রমিকেরা খবর পেয়ে হাতিঘিষায় জড়ো হলেন লাঠি নিয়ে। হাজার হাজার কৃষক শ্রমিক ঘিরে ফেলল পুলিশকে। লাঠি আর তীর দেখে বন্দুক ফেলে পালালো পুলিশ। সাব ইন্সপেক্টর সোনাম ওয়াংড়ি ও নকশালবাড়ি থানার একজন অফিসারের বুকে বিঁধল তীর। সোনাম ওয়াংড়ি মারা গেলেন।
২৫-শে মে, প্রসাদজোতে মহিলা সমাবেশ ডাকা হয়। সেই সমাবেশের নেতা প্রহ্লাদ সিং। পুলিশ বড় ফোর্স নিয়ে উপস্থিত হয় সেখানে। এখানেই পুলিশ হঠাৎ গুলি চালায়। ১১ জন নিহত। যার মধ্যে ৮ জন মহিলা, ২-টি শিশু। একটি শিশু ছিল প্রহ্লাদ সিং-এর স্ত্রীর পিঠে বাঁধা অবস্থায়। রাইফেলের গুলি প্রহ্লাদের স্ত্রী ধলেশ্বরী দেবীর বুক ভেদ করে পিঠের বাচ্চাটিকেও শেষ করে। বাকিদের নাম ফুলমণি দেবী, গাউদ্রাউ শৈবানী, নয়নেশ্বরী মল্লিক, সামশ্বরী শৈবানী, সীমাশ্বরী মল্লিক, সেনামতি সিং, সুরবালা বর্মন এবং পনেরর কিশোর-খরসিং মল্লিক।
সেদিনের মূল নেতা ছিলেন খোকন মজুমদার। সঙ্গে পাঞ্জাব রাও, শান্তি মুন্ডা, সুনীতি বিশ্বকর্মা, সাবিত্রী রাও; এছাড়া হাতিঘিষা, জমিদারগুরি অঞ্চলের হোচাই মল্লিক জোতের বিশাল সশস্ত্র কিষান ও কিষানী বাহিনী।
এই নারীরা বুঝেছিলেন লাঙল যার, জমি তার না হলে, ঘরে উনুন জ্বলে না৷ পৃথিবীতে কৃষির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছিল নারীরই হাতে। বর্তমানের বৈবাহিক সমাজব্যবস্থার পূর্ববর্তী পর্যায়ে মানব জীবনে পুরুষ নারী নির্বিশেষে শিকারে বা খাদ্যের সন্ধানে বের হলে, গুহা কন্দরে থাকতে বাধ্য হতো অসুস্থ বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীরা। গর্ভবতী নারীই প্রথম খিধের জ্বালায় শষ্য আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেখায় বলেই মনে করেন সব ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্বিকেরা।
তবুও নারীকে আমরা কৃষক হিসেবে চিনিনি, চিনতে দেওয়া হয়নি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, জমির ও উৎপাদনের উপকরণের উপর নারীর নিয়ন্ত্রণ রাখতে দেয়নি। নকশাল আন্দোলনও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রথমত, নকশাল আন্দোলন ঘিরে নস্ট্যালজিয়ায় ধীমান পুরুষেরা আছেন, আদিবাসী মেয়েরা নেই। এমনকি শহরের মেয়েরাও সেখানে ফুটনোট। নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থানে নারীদের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব ও স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ও শিক্ষণীয়।
ঘটনাটি ঠিক কতটা মর্মান্তিক, তা পরবর্তীতে বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায় ফুটে উঠেছে। এই ঘটনার পর "কোনও কিছুই আর আগের মতো রইল না" (সমর সেনের কথায়)। এরপরই গোটা দেশ জেনেছে নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের কথা।
এই নকশালবাড়ি আন্দোলনের মূল পর্বে আসা যাক। কেন গুলি চালানো হল কৃষকদের উপর? কেনই বা কৃষকেরা আন্দোলন করছিলেন? কৃষকদের কোন সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এতবড় আন্দোলনের পথে যেতে হল? সেইগুলো নিয়েই কথা বলা এবার জরুরী।
১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭, এই ২০ বছরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্যেই দিয়েই নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের মতো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। ১৯৪৭-এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পরেই তেলেঙ্গানার সংগ্রামী কৃষকদের মরণপণ লড়াই, ১৯৫০-এর দশকের খাদ্য আন্দোলন, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৫৯ সালের ৩১-শে আগস্ট কলকাতায় খাদ্যের দাবীতে আন্দোলনরত একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে প্রায় ৮০ জন আন্দোলনকারীকে হত্যার ঘটনা, ৬৭-র নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের জমি তৈরি করে।
এছাড়াও চীন-ভারত যুদ্ধে সামরিক খাতে রাজকোষের বেশিরভাগটা ব্যয় করে ফেলার কারণে দেশে মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যবৃদ্ধি, কালোবাজারি বেড়ে যায়; সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে গেলেও ফুলে ফেঁপে ওঠে জমির মালিক ও দেশীয় পুঁজিপতিরা। এরই ফলে ১৯৬৬ সালে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয়। শুরু হয়ে যায় আরও বড়ো মাপের খাদ্য আন্দোলন। পশ্চিমবঙ্গে ৬৬-এর ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই খাদ্য আন্দোলন জোরদারভাবে শুরু হয়। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী, মধ্যবিত্ত সকলেই ক্ষোভে ফেটে পড়তে শুরু করে। সেই বছর সরকারি হিসেবে রাজ্যে কমপক্ষে ৪০ জন আন্দোলনকারীকে হত্যা করে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় হাজার হাজার মানুষকে। ৬৬-এর তীব্র খাদ্য আন্দোলন বুঝিয়ে দেয় যে, পারদ চড়তে শুরু করে দিয়েছে।
এই সময়ে উত্তরবঙ্গে দার্জিলিং জেলার তরাই অঞ্চলের তিনটি
থানা নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি ও ফাঁসিদেওয়া অঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে ৭০ শতাংশ
ছিলেন গরীব ও ভূমিহীন, ২০ শতাংশ মধ্য কৃষক এবং ১০ শতাংশ ধনী
কৃষক। বর্গাচাষ-এর আধিক্য বেশি হওয়ায় অর্ধেকের বেশি কৃষকই বর্গাদার। জোতদার ও ধনী
কৃষকদের শোষণে তাঁরা নিষ্পেষিত। এর আগে ১৯৫৫-৫৬ সালে চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির
আন্দোলন চলে। তারপর ১৯৫৮-৬২ পর্যন্ত চলে বেনামী জমি উদ্ধারের আন্দোলন। ৬৬-র কৃষক
আন্দোলন জঙ্গী রূপ ধারণ করে। ১৯৬৭-র রাজ্য রাজনীতিতে পালাবদল এবং আরও একাধিক ঘটনা
ঘটে যায় স্বল্প সময়পর্বের মধ্যেই।
শেষমেশ 'কৃষক কমিটি'-র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মার্চ মাসেই কৃষক সম্মেলনে আহ্বান জানানো হয় জমির একচেটিয়া মালিকানা ভেঙে ফেলে কৃষক কমিটি মারফত নতুন বাটোয়ারা করার এবং জোতদারদেরকে চূর্ণ করার। সেই মতোই শুরু হয়ে যায় জোতদারদের জমি দখল করে সেখানে কৃষকদের সংঘবদ্ধ চাষাবাদ। কৃষক সমিতির নেতৃত্ব জমি বন্টন শুরু করে। জোতদারদের ভাঁড়াটে গুণ্ডাদের ঠেকিয়ে তাদের যথোপযুক্ত জবাব দেওয়া হয়; জোতদারদের অস্ত্র দখল করে গড়ে ওঠে কৃষকদের সশস্ত্র দল। এরপরেই ঘটে ২৪-শে মে, ২৫ শে মে'র ঘটনা।
২৫-শে মে'র পর পুলিশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নকশালবাড়ির কৃষকদের লড়াই তীব্রতর হয়ে ওঠে। জুন মাসে বুড়াগঞ্জ এলাকাকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করেন কৃষকেরা। এরপরেই প্রতিক্রিয়া স্বরূপ সরকারী পক্ষ থেকে সামরিক বাহিনী নামানো হয়। গরীব কৃষকদের বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে হামলা, মেয়েদের উপর অত্যাচার, বাড়ি ভাঙচুর, গোলায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া, গ্রেপ্তার করা থেকে শুরু করে রাতের অন্ধকারে এনকাউন্টার পর্যন্ত চলতে থাকে। ইতিমধ্যেই আন্দোলনের খবর, নারী-শিশুদের নির্মম হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ে গোটা বাংলায়। আর সেই সঙ্গে কলকাতা সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষকদের উপর নির্মম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শুরু হয়ে যায় জোরদার আন্দোলন। ছাত্রছাত্রী, যুব, মধ্যবিত্ত সকলেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। আন্দোলন আর শুধুমাত্র তরাইতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলার আন্দোলন হিসেবে উঠে আসে। কৃষক আন্দোলনের স্লোগান - "লাঙল যার, জমি তার" ছড়িয়ে পড়ে শহরের বুকেও।
যে স্ফুলিঙ্গের সঞ্চার ঘটিয়েছিল নকশালবাড়ি, তা থেকে কৃষিবিপ্লবের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, কেরল, তামিলনাড়ু ও ত্রিপুরায়। নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান গোটা দেশকে পথ দেখাতে শুরু করে। নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের জোর এতটাই তীব্র হয় যে স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারা কেরিয়ার ছেড়ে, সুখের জীবন ছেড়ে গ্রামে গ্রামে চলে যেতে থাকেন কৃষকদের সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে, নয়া সমাজব্যবস্থা কায়েম করার লক্ষ্য নিয়ে, নিজেদের শ্রেণী অবস্থান ছেড়ে কৃষকদের জীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে। নকশালবাড়ি আর শুধুমাত্র কোনো একটা নির্দিষ্ট জায়গার নাম হিসেবে নয়, বরং একটা মতাদর্শের প্রতীক হিসেবে পরিণত হয়। কৃষক অভ্যুত্থানের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করা ছাত্র-যুবদের পরিচিতি তৈরি হয় 'নকশাল' হিসেবে।
সম্পূর্ণ আন্দোলনটির নেতৃত্বে ছিলেন কৃষকরা। আন্দোলনের তেজ এতটাই বেশি ছিল যে সামরিক বাহিনী, ভাঁড়াটে বাহিনী দিয়ে আন্দোলন দমন করে, কৃষক নেতাদের এনকাউন্টার করে, জেলে ঢুকিয়ে আন্দোলন ধ্বংস করে দেওয়ার পরও পরবর্তী সরকারকে বাধ্য করেছিল ভূমি সংস্কার করতে। পুরোপুরি ভূমি সংস্কার না হলেও একটা বড়ো অংশের কৃষকদের হাতে এসেছিল জমি।
বাংলার ইতিহাসে তো বটেই, এমনকি ভারতবর্ষের ইতিহাসে নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলন একটা অধ্যায়। আজকের কৃষক আন্দোলন জমির অধিকারের আন্দোলন নয় ঠিকই, কিন্তু আজকের আন্দোলন ফসলের ন্যায্য মূল্যের দাবীতে, আজকের আন্দোলন কৃষকদের আত্মহত্যা আটকাতে। আজকের দিনে কৃষিতে সরাসরি পুঁজির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কৃষকেরা নেমেছেন রাস্তায়। নকশালবাড়ির দেখানো পথে শোষণের উল্টোদিকে কৃষকদের আজকের লড়াইকে তাই আজ বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে ফিরে দেখা বিশেষ প্রয়োজন।
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

👌👌👌
উত্তরমুছুন