প্রতিবন্ধী মানেই মানুষের করুণা নিয়েই সারাটি জীবন বেঁচে থাকতে হয় - এরকম প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দেওয়া এক নাম হেলেন কেলার। অন্ধ-বধির হয়েও কীভাবে মানুষ তার দেখা ও বোঝার ক্ষমতা দিয়ে আকাশ স্পর্শ করতে পারে, তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হেলেন কেলারের আজ প্রয়াণ দিবস। এরকম এক বিদুষী মহিলাকে জানার ও চেনার মধ্যে দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়াস থেকেই এই লেখা।

হেলেন কেলার
মাত্র ১৯
মাস বয়সেই হেলেনের জীবনে একটি মারাত্মক দূর্ঘটনা ঘটে। স্নান করানোর সময় মায়ের কোল
থেকে হঠাৎ পড়ে যান শিশু হেলেন। সেই আঘাতে সাময়িক জ্ঞান হারানোর পর তা ফিরে এলেও
তার মা লক্ষ্য করলেন তার আদরের সন্তানের দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি একেবারেই লোপ পেয়েছে।
অনেক ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার ফলে হেলেনের জীবন রক্ষা পেলেও তার কথা
বলা, শোনা এবং দেখার শক্তি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়।
টেলিফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল ছয় বছর বয়সের হেলেনকে
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর হেলেনের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দেখে পিতা আর্থারকে হেলেনের
জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যাতে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটি সুন্দর জীবন ফিরে পেতে পারে সে।
বেলের
পরামর্শ অনুযায়ী বোস্টনের পার্কিনস ইন্সটিটিউশনে হেলেনকে ভর্তি করা হয় যেখানে
অন্ধদের শিক্ষাদান করা হ’ত। এর প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার ‘হো’ হেলেনের শিক্ষা গ্রহণের ভার নিজ হাতে তুলে নেন।
কিন্তু অকস্মাৎ ডাক্তার হো মারা গেলে নতুন ডিরেক্টর মাইকেল এ্যাগানোস হেলেনের
সমস্ত কথা শুনে ‘অ্যানি সুলিভ্যান ম্যানসফিল্ড’ নামের এক গৃহশিক্ষিকার হাতে হেলেনের জীবনকে আলোকিত করার দায়িত্ব দেন।
অ্যানিও ছোটবেলা থেকে চোখে কম দেখতে পেতেন। পার্কিনস ইনস্টিটিউশনের সহযোগিতায় তার
চোখে দু’বার অপারেশন করা হয়। তারপর থেকে তিনি স্বাভাবিক
দৃষ্টি ফিরে পান। অন্ধকার জীবনের যন্ত্রণা অনুভব থেকেই তিনি অন্ধদের জন্য কাজ করার
সংকল্প নেন। অ্যানির কাছে শিশু হেলেন হাতে স্পর্শের মাধ্যমে জগত চিনতে লাগলেন এবং
অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সব শিখে নিতে লাগলেন।
লুই
ব্রেইল আবিষ্কৃত ব্রেইল পদ্ধতির মাধ্যমে হেলেন লেখাপড়া শিখতে শুরু করে কয়েক বছরেই
ইংরেজি, ল্যাটিন,
গ্রীক, ফরাসি এবং জার্মান ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে ব্রেইল টাইপ রাইটারে
লিখতেও শেখেন। এগারো বছর বয়সে এক বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে কথা বলার চর্চা করতে
শুরু করে ধীরে ধীরে চিকিৎসার মাধ্যমে তাঁর বাকশক্তি অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে
আসে। ১৯০০ সালে হেলেন রেডক্লিফ কলেজে ভর্তি হন। সেখানে বিশ্বখ্যাত লেখক মার্ক
টোয়েনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। ১৯০৪ সালে হেলেন প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হিসেবে
স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিশ বছর
বয়সে হেলেন সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম, ইতিহাসে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। কলেজে
পড়াকালীন তিনি লেখেন তাঁর প্রথম আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘অপ্টিমিজম’। চার বছর পর তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে স্নাতক হন এবং লেখেন তাঁর
আত্মজীবনীমূলক বই “দ্যা স্টোরি অফ মাই লাইফ” যেখানে তিনি তাঁর জীবনের বিপর্যয়,
লড়াই, অ্যানির কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসার জীবনচিত্র তুলে ধরেন তার অপূর্ব লেখনীতে। আর এই রচনার মধ্য দিয়ে
তিনি ব্যাপক খ্যাতিও অর্জন করেন। লোকের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকে তাঁর নাম।
বলতে গেলে, এই গ্রন্থ রচনার পরেই তিনি একজন সুপ্রতিষ্ঠিত
লেখিকা হয়ে উঠেন। তারপর হেলেনকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
হেলেন
সাংবাদিক পেশায় তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। সেসময় অ্যানি র্যাতডিক্যাল পার্টির
কর্মকর্তা মি. ম্যাকির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ভালোই চলছিল সবকিছু। কিন্তু
রাজনৈতিক প্ররোচনায় অ্যানি ও হেলেনের লেখার নামে বিভিন্ন সমালোচনা ও কুৎসা রটতে
থাকে। রাজনৈতিক সমস্যার জেরে অ্যানির সংসারও ভেঙে গেল।
অ্যানি ও
হেলেন পুনরায় দুজন দুজনের ছায়াসঙ্গিনী হয়ে কাজ করা শুরু করেলেন। তাঁরা বিভিন্ন
জায়গায় ছোট ছোট মঞ্চে বক্তৃতার আয়োজন করতেন। দলে দলে লোক ভিড় করতে থাকে সেসব
অনুষ্ঠানে। সেই সময়ে আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় বক্তা মার্ক টোয়েনের সহযোগিতা পান।
একই মঞ্চে টোয়েনের পাশাপাশি হেলেনও বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পান। ক্রমেই হেলেন একজন
জনপ্রিয় বক্তা হয়ে উঠেন। বিভিন্ন দেশ থেকে বক্তব্য রাখার জন্য হেলেনের আমন্ত্রণ
আসতে থাকে। তিনি যখন যে দেশে গিয়েছেন, সে দেশের মানুষই তাঁকে অকুণ্ঠ
ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় সিক্ত করেছে। তাঁর বক্তৃতায় সূক্ষ্মতা ও চিন্তার গভীরতা দেখে
মুগ্ধ হন শ্রোতারা। কিছুদিনের মধ্যেই হেলেনের অসংখ্য অনুরাগী ভক্ত তৈরি হয়। এই
বিস্ময়কর নারীর প্রতিভা দেখে রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সকলেই মুগ্ধ
হতেন। তিনি প্রচন্ড রাজনীতি সচেতন ছিলেন। নারীদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে তিনি
ছিলেন সোচ্চার। সবাইকে লিঙ্গগত বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানাতেন। সর্বোপরি, নিজের কঠিন জীবন সংগ্রামের গল্প বলে সাধারণ মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস ও
অনুপ্রেরণা জোগাতেন।
হেলেন
দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও সঙ্গীত উপভোগ করার এক আশ্চর্য
ক্ষমতা ছিল। বাদ্যযন্ত্রের ওপর হাত রেখেই বলতে পারতেন কী ধরনের সুর বাজছে।
গায়ক-গায়িকার কণ্ঠে হাত দিয়ে অনায়াসে বলতে পারতেন কী সঙ্গীত গাইছে। তার এমনই
আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল যে, বহুদিনের পরিচিত মানুষের সঙ্গে
করমর্দন করে বলে দিতে পারতেন তাঁর পরিচয়। দৃষ্টিহীন হয়েও তিনি নৌকা চালাতে, নদীতে সাঁতার কাটতে পারতেন, খেলতে পারতেন দাবা ও তাস। এমনকি
তিনি সেলাই পর্যন্ত করতে পারতেন।
হেলেন
সমাজসেবার ব্রত নিয়ে তাঁর মতো আরও যারা বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রয়েছেন, তাঁদের জন্য কিছু করার চেষ্টায় ১৯১৫ সালে জর্জ কেসলারকে সঙ্গে নিয়ে “হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল” নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা
প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থাটি এখনও বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে
যাচ্ছে। হেলেন এই প্রতিষ্ঠান ছাড়াও পৃথিবীর বহু দেশের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে
প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিয়ে যা অর্থ পাওয়া যেত, তা দিয়ে বিভিন্ন দেশে পঞ্চাশটিরও বেশি অন্ধদের কল্যাণার্থে প্রতিষ্ঠান গড়ে
তুলেন হেলেন। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সাহায্য পেয়ে হাজার হাজার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী
মানুষ শিক্ষালাভ করে নিজেকে সফলভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
হেলেন
ছিলেন আমেরিকান সোশ্যালিস্ট পার্টির সমর্থক। ১৯০৯ সালে তিনি এই পার্টিতে যোগ দেন।
তিনি আয়ের সুষম বণ্টন দেখতে চাইতেন। ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অসমতার শেষ দেখাই
ছিল তাঁর ইচ্ছা। তাঁর বই ‘আউট অব দ্য ডার্ক’-এ এই ইচ্ছার কথা লিখে গেছেন তিনি। ১৯১২ সালে তিনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স
অব দ্য ওয়ার্ল্ডে যোগ দেন। তিনি ছিলেন একজন প্যাসিফিস্ট এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে
আমেরিকার জড়িত থাকার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তবে ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন বিভিন্ন হাসপাতালে
যুদ্ধাহত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাবিক ও সৈনিকদের দেখতে যেতেন এবং শান্তি ও আশার বাণী
শোনাতেন।
এতকিছুর
মাঝে একসময় হেলেন একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য একজন পরিচালকের কাছ থেকে প্রস্তাব
পান। সিনেমাটির নাম ছিল ‘Deliverance’। বাক-শ্রবণ
ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিশপ্ত বিড়ম্বনাময় জীবনের বিষাদের ওপর নির্মিত এই
চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন হেলেন।
কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেলেনকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। নোবেল প্রাপ্তির পর
আমেরিকার এক সম্মেলনে বক্তৃতা দেয়ার সময় হেলান কেলারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। হেলেন
রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার আমন্ত্রণ পান। তবে রবীন্ত্রনাথ
ঠাকুরের জীবিতাবস্থায় হেলেন শান্তিনিকেতনে আসতে পারেননি। ১৯৫৫ সালে ভারতে আসেন
হেলেন। সেই সময়েই দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় হেলেনকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান
করে।
১৯৫০ সালে
হেলেনের পঞ্চাশ বছরের কর্মময় জীবনকে সম্মান জানাতে প্যারিসে এক বিরাট সংবর্ধনা
সভার আয়োজন করা হয়। তখন তার বয়স সত্তর বছর। ১৯৫৯ সালে হেলেন জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ
সম্মানে ভূষিত হন। তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই হলো- The
story of my life (1903), The world I live in (1908), Let us have
faith (1904), Teacher Annie Sullivan (1955), The open door
(1957)।
১৯৬৮
সালের ১ জুলাই হেলেন কেলার চলে যান পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। তবে তিনি পৃথিবীর
মানুষের কাছে আজও বিস্ময়কর প্রতিভা। হেলেন কেলার এমনই এক নাম যা অন্ধ, বিকলাঙ্গ, প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে এক
আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। যুগে যুগে এই মহীয়সী নারীর রেখে যাওয়া দৃষ্টান্তই হোক সকলের
পথচলার মন্ত্র। প্রচণ্ড- ইচ্ছেশক্তি মানুষকে যে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদারহণ হেলেন কেলার। তিনি কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও
শ্রদ্ধা নিয়ে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
(তারিণী
খুড়ো)
🙏🙏🙏
উত্তরমুছুন