বর্তমানের ইন্টারনেট অধ্যুষিত যুগে কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক হয়েও তাঁর নাম আমাদের স্কুলের টেক্সট বইগুলোতে নেই। তিনি অ্যালান টুরিং। এহেন মানুষটিকে তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করার পাশাপাশি চেনার প্রয়াস হিসেবেই এই লেখা।
![]() |
| অ্যালান টুরিং |
অ্যালান টুরিং-এর জন্ম লন্ডনে ১৯১২ সালের ২৩ জুন। পুরো নাম অ্যালান ম্যাথিসন টুরিং। মায়ের গর্ভে থাকাকালীন, তাঁর বাবা মা দুজনই ভারতে থাকতেন; তাঁরা এদেশে প্রশাসনে কাজ করতেন। তাঁরা চেয়েছিলেন তাঁদের সন্তান যাতে ইংল্যান্ডের শিক্ষা, সংস্কৃতিতে বড় হয়। তাই তাঁরা ইংল্যান্ডে চলে আসেন। বাবা জুলিয়াস টুরিং ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভেন্ট। মা সারা স্টোনি ছিলেন মাদ্রাজ রেলওয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার এডওয়ার্ড ওয়েলার স্টোনির কন্যা।
ছয় বছর বয়সে সেইন্ট মাইকেলস-এ ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে, শৈশবেই তাঁর মেধার পরিচয় মেলে। ১৯২৬ সালে চৌদ্দ বছর বয়সে ডরসেটের শেরবর্ন স্কুলের ভর্তি হন। স্কুলের প্রথম দিনেই ছিল ধর্মঘট, সকল যানবাহন ছিল বন্ধ। টুরিং কিন্তু স্কুলে যাওয়া বাদ দেননি, প্রথমদিনেই বাড়ি থেকে ষাট মাইল দূরে স্কুলে যান সাইকেল চালিয়ে। স্থানীয় পত্রিকায় সেই সংবাদ ছাপাও হয়েছিল।
শৈশব থেকেই বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে এবং গণিতে বিশেষ আকর্ষণ ছিলো টুরিংয়ের। কিন্তু তৎকালীন শিক্ষা ছিল সাহিত্য নির্ভর। তাই ডরসেটের শেরবর্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক টুরিংয়ের এই অসুবিধার কথা বুঝে তাঁর অভিভাবককে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্নতার কথা লিখেছিলেন। অগোছালো টুরিংয়ের শৈশবটা ছিল বন্ধুত্বহীন, একাকীত্বে ভরা৷ লাজুক স্বভাবের টুরিং সহপাঠীদের সঙ্গে তেমন একটা মিশতেন না। হাতের কাছে যা পেতেন তাই নিয়েই ভাবতেন, আর তার সঙ্গে গণিতকে জুড়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন। শেরবর্নে পড়ার সময়েই তিনি স্কুলের প্রায় প্রতিটি ছাত্রের কাছ থেকে নিয়মিত বিদ্রূপের শিকার হতে শুরু করেন।
সেসময়েই আবির্ভাব ঘটে ক্রিস্টোফারের। ‘ক্রিস্টোফার মরকম’, যে কিনা টুরিং এর উপরের ক্লাসে পড়তো। বন্ধুত্বহীন টুরিংয়ের জীবনে ক্রিস্টোফার যখন সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, টুরিং সেই হাতকেই গভীর আবেগ নিয়ে আঁকড়ে ধরেন। ক্রিস্টোফারই টুরিংকে জ্ঞানের উচ্চতর শাখা, জ্যোতির্বিদ্যা, সংখ্যাতত্ত্ব সহ আরো অনেক কিছুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৩০ সালে বোভাইন টিউবারকুলেসিসে আক্রান্ত হয়ে ক্রিস্টোফারের মৃত্যু টুরিংয়ের জীবনকে একেবারে তছনছ করে দিলেও তিনি ঘুরে দাঁড়ান, ব্যথিত মন নিয়েই আবার শুরু করেন পড়াশোনা।
১৯৩১ সালের অক্টোবরে টুরিং কেমব্রিজে যান, কিংস কলেজে বিদ্যার্জনের জন্য। তথাকথিত শিক্ষাব্যবস্থায় অনাগ্রহের দরুণ তাকে বঞ্চিত হতে হয় ট্রিনিটি কলেজের বৃত্তি থেকে। অগত্যা কিংস কলেজে তিনি গণিত নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৩৩ সালে টুরিং পরিচিত হন গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার সঙ্গে। ১৯৩৫ সালে মাত্র বাইশ বছরে তিনি সেই কলেজের ফেলো নির্বাচিত হন ‘গাউসিয়ান এরর ফাংশন’ নিয়ে গবেষণার জন্য। সেই বছরেই ‘টুরিং মেশিন’-এর প্রস্তাবনা করেন তিনি। প্রস্তাব করেন যে, “কোনো যন্ত্রকে যদি অ্যালগরিদমের আওতাধীন করা হয়, তাহলে সেটার পক্ষে সকল গাণিতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব।” অ্যালগরিদম শব্দটি বর্তমানে খুবই প্রচলিত, অথচ সেই ধারণাটিই কিন্তু প্রথম নিয়ে আসেন অ্যালান টুরিং। সম্ভাব্যতা থিওরিতে অবদানের জন্য ১৯৩৬ সালে টুরিংকে স্মিথ পুরষ্কার প্রদান করা হয়।
১৯৩৭ সালে টুরিং চলে আসেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানে তিনি গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার উপর গবেষণা শুরু করেন আলোনজো চার্চের অধীনে এবং ১৯৩৮-এ পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৩৯ সালে টুরিং বাকিংহ্যামশায়ারের ব্লেচলি পার্কে চলে আসেন সরকারি কোড ও সাইবার স্কুলে যোগদানের উদ্দেশ্যে।
শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ। ইংল্যান্ড অসহায় হয়ে পড়েছিল নাৎজি বাহিনীর পরিকল্পনা বুঝে উঠতে না পেরে, কারণ তাদের সমস্ত পরিকল্পনা “এনিগমা” নামের একটা মেশিন দিয়ে কোড করা অবস্থায় আদান-প্রদান করা হতো বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে। আর এনিগমা দ্বারা কোডেড মেসেজের অর্থোদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু ইংল্যান্ডকে জিততে হলে এনিগমার সংকেত বোঝাটা ছিলো ভীষণ জরুরী, কারণ, যুদ্ধে জিততে হলে তথ্যই শক্তি!
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এনিগমা মেশিনে প্রায় ১৫ মিলিয়ন কনফিগারেশন ছিল। ফলত এনিগমা বোঝা ছিল দুর্বোধ্য। এনিগমার কোড বিশ্লেষণের জন্য ইংল্যান্ডে আগেই একটি দল ছিলো, পরে এই দলে যুক্ত হন অ্যালান টুরিং। তিনি ও আর তার দল মিলে, পোল্যান্ডের বিজ্ঞানী মারিয়ান রেজোস্কির আবিষ্কৃত “বোম্বা” মেশিন ব্যবহার করে একটি সার্বজনীন ডিক্রিপ্টিং মেশিন আবিষ্কার করেন ১৯৪০ সালে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের ভাষ্য অনুযায়ী, টুরিং এর এই যন্ত্রের ফলে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ প্রায় দু বছর আগেই শেষ হয়েছিলো এবং কয়েক কোটি মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে, ব্রিটিশ সরকার তার এই অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৪৬ সালে তাঁকে “Order of the British Empire” উপাধি দান করে। যদিও ব্রিটিশ সরকার পরবর্তীতে তা গোপন করে যায়!
যুদ্ধশেষে ১৯৪৫ সালে টুরিং যোগ দেন লন্ডনের ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবে। সেখানে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় একটি কম্পিউটার নির্মাণের। তিনি তখন তাঁর স্বপ্ন-বাস্তবায়নের কাজে হাত দেন। স্বয়ংক্রিয় গণনাকারী যন্ত্রের নকশা করেন তিনি, যাতে ডিজিটাল গণনার জন্য অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়। ১৯৪৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটিং ল্যাবে পরিচালকরূপে নিয়োগে পান টুরিং।
১৯৪৮ সালে টুরিং তাঁর এক কলিগের সঙ্গে মিলে এমন একটি প্রোগ্রাম তৈরি করতে সক্ষম হন, যে প্রোগ্রামটি কোনো মানুষের সঙ্গে দাবা খেলতে পারবে। সেসময়ে এই প্রোগ্রাম চালিয়ে দাবা খেলতে সক্ষম এমন উন্নত কম্পিউটারই ছিল না। টুরিং তবু ‘ফেরান্টি মার্ক-১’ কম্পিউটারে চালানোর চেষ্টা করেন। সেইসময়ে দাবার একেকটি চাল দিতে আধ ঘণ্টার মত সময় লাগতো প্রোগ্রামটির।
টুরিং এবার যন্ত্রের চিন্তাশক্তি নির্ণয়ের একটি পদ্ধতি বের করার কথা ভাবতে শুরু করেন। সেই চিন্তা থেকেই জন্ম হয় ‘টুরিং টেস্ট’-এর। ১৯৫০ সালে টুরিং একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন ‘Computing Machinery & Intelligence’ এই নামে। একেই বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। এই গবেষণাপত্রটি যখন প্রকাশিত হয়, মানুষের কাছে পুরোটা ব্যাপারটিই সায়েন্স ফিকশনের মত লেগেছিল। আমরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত Turing Test এর সম্মুখীন হচ্ছি অনেকটা না বুঝে। ফেসবুকে লগইন করতে, কোনো নিবন্ধন ফরম পূরণ করাতে, ই-মেইল বা যে কোনো অ্যাকাউন্ট খুলতে ক্যাপচা’র (CAPTCHA – Completely Automated Public Turing test to tell Computers and Humans Apart) ব্যবহার আদপে টুরিং টেস্ট-এর ফল।
এতসব কিছু পরিচয়ের বাইরেও তিনি একজন দৌড়বিদ ছিলেন। অবসাদগ্রস্থতা দুর করার জন্য তিনি দৌড়ানোকেই বেছে নিয়েছিলেন। এমনকি বিভিন্ন দৌড় প্রতিযোগিতায় তাঁর অনেকগুলো দৌড়ের রেকর্ডও আছে।
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকনিশিয়ান আর্নল্ড ম্যুরের সঙ্গে টুরিংয়ের সমকামিতার সম্পর্ক ১৯৫২ সালে সামনে এলে টুরিংকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। সে সময় সমকামিতাকে রোগ মনে করা হতো। তিনি ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করে নেন এবং এর স্বপক্ষ সমর্থন করে কোনোরূপ বিবৃতিও দেননি। আইন অনুযায়ী তাঁকে হয় জেলে যেতে হবে, না হয় ইস্ট্রোজেন হরমোন সেবন করতে হবে। টুরিং তার অসমাপ্ত কাজগুলোয় মনোনিবেশ করার জন্য ইস্ট্রোজেন হরমোন সেবনকেই বেছে নেন শাস্তিস্বরূপ। ইস্ট্রোজেন টুরিংকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক দুর্বল করতে শুরু করে। কিন্তু তবু তিনি তাঁর কাজ থেকে পিছিয়ে পড়েননি। সে সময়টাতে তিনি গবেষণা করছিলেন কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে। সমকামিতার দরুণ তাঁকে সকল সরকারী গোপনীয় কার্যাবলী থেকে বহিষ্কার করা হয়। সম্ভবত এতে টুরিং মাত্রাতিরিক্ত কষ্ট পান এবং ১৯৫৪ সালের ৭-ই জুন আত্মহত্যা করেন।
টুরিং যখন মারা যান, সাধারণ জনগণের কোনো ধারণাই ছিল না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে টুরিং কী অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। তথ্য প্রযুক্তিতে টুরিংয়ের অবদানের স্বীকৃতি হিসেব কম্পিউটার জগতের নোবেল পুরষ্কার হিসেবে প্রণীত যে পুরষ্কারটি, সেটির নামকরণ করা হয়েছে- ‘দ্য টুরিং অ্যাওয়ার্ড’। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক মানা হয় কিন্তু অ্যালান টুরিংকেই।
বহু বছর পর ব্রিটিশরা বুঝতে পারল, তাঁরা শুধু ভুলই নয়, অন্যায় করেছে। রানি এলিজাবেথ ২০১৩ সালে টুরিংয়ের মৃত্যুর ৬০ বছর পর রাজকীয় ক্ষমার দলিলে সাক্ষর করেন। ২০১৪ সালে অফিশিয়ালি ভুল স্বীকার ও ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে ইতিহাসের দায়মুক্তি ঘটে। মুক্ত হয় দলিল-দস্তাবেজ। এর পর ব্রিটিশরা সমকামিতার জন্য পূর্বে শাস্তিপ্রাপ্তদেরকেও ‘টুরিং আইন’-এর আওতায় ক্ষমা করে এবং ক্ষমাও চায় তাদের সকলের কাছে।
অ্যালান টুরিং তার সময়ের চেয়ে অনেক অগ্রবর্তী একজন মানুষ যার অকাল মৃত্যু আমাদের ভবিষ্যৎ যাত্রার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের পথকে করেছে আরো দীর্ঘ।
(তারিণী খুড়ো)

অজানা তথ্য জেনে খুশি হলাম।
উত্তরমুছুন