আজ জানবো পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ থাকা সবচেয়ে দূরতম বন্ধুটির কথা।
ভয়েজার বৃহষ্পতি গ্রহকে অতিক্রম করেছে ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে। যাত্রাপথে সে আমাদেরকে পাঠিয়েছে বৃহষ্পতির ছবি। আমরা দেখেছি দানবগ্রহ বৃহষ্পতির বুকে ১৮৮ বছর ধরে বয়ে চলেছে এক দানবঝড় - দ্য গ্রেট রেড স্পট। এই ঝড়ের আয়তন তিনটে পৃথিবীর সমান!
ভয়েজার-১ শনি গ্রহ অতিক্রম করে ১৯৮০ সালের নভেম্বর মাসে। ভয়েজার আমাদেরকে জানিয়েছে শনিকে প্রদক্ষিণ করছে আরো অনেকগুলো বরফের তৈরী চাঁদ!
ভয়েজার-১ ইউরেনাস গ্রহ-কে অতিক্রম করেছে ১৯৮৬ সালের জানুয়ারি মাসে আর নেপচুন গ্রহকে অতিক্রম করেছে ১৯৮৯ সালের আগস্ট মাসে।
২০১২ সালেই সৌরজগত্ ছেড়ে গেছে নাসার পাঠানো এই নভোযান।
ভয়েজার তাঁর সর্বশেষ ছবিটি তুলেছিল ১৯৯০ সালের ভালোবাসার দিবসে। অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারিতে। সর্বশেষ এই ছবিটি ভয়েজার তুলেছিল কার্ল স্যাগান নামক সেই বিখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী, বিজ্ঞান লেখক এবং মার্কিন মহাকাশ প্রকল্পসমূহের পুরোধা ব্যক্তিত্ব-এর অনুরোধে, যার বিজ্ঞান বিষয়ক টিভি সিরিজ কসমস: আ পারসোনাল ভয়েজ- তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছিল।
'কার্ল স্যাগান' নামটি ভয়েজার-১ -এর সাথে মিশে আছে একটু ভিন্নভাবে। সংক্ষেপে বলা যাক।
ভয়েজার-১ তৈরির কাজ তখন প্রায় শেষ। নাসা দ্রুত ভয়েজারকে অনন্ত মহাশূণ্যের উদ্দেশ্যে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৪০ বছর বয়েসী কার্ল স্যাগান তখন ভাবলেন একটু ভিন্ন ব্যাপার। তিনি ভাবলেন, এই স্পেসক্রাফটটি তো চলতেই থাকবে। এর গতি কমবে না, বরং বাড়বে। এক সময় এটা আমাদের সৌরজগতকে ছেড়ে চলে যাবে। হয়তো ছেড়ে যাবে আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথকেও। এমনও সময় আসবে যখন ভয়েজার থেকে আমাদের দূরত্ব হবে কয়েক হাজার আলোকবর্ষ। এই দূরতম বন্ধুর সাথে আমাদের আর কোনো যোগাযোগই তখন থাকবেনা। কে বলতে পারে এই ভয়েজার কোনও দিন কোনও বুদ্ধিমান প্রাণীর দেখা পাবে না!
কী হবে যদি কয়েক কোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো স্বজনের সাথে দেখা হয় ভয়েজারের!
কার্ল স্যাগান দূরতম সেই স্বজনদের জন্য বার্তা এবং উপহার পাঠাতে চাইলেন। নাসায় কমিটি তৈরী করা হল। স্যাগান হলেন কমিটির প্রধান। এক বছর ধরে চলল ভিনগ্রহের স্বজনদের জন্য বার্তা সংগ্রহের কাজ।
৫৫ টি ভাষায় 'হাই' জানানো হলো দূরতম স্বজনদের।
প্রথম জানালেন, তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব কার্ট ওয়াল্ডহেইম। তিনি বললেন, "I send greetings on behalf of the people of our planet. We step out of our solar system into the universe seeking only peace and friendship, to teach if we are called upon, to be taught if we are fortunate."
আছে বাংলা ভাষাও। কন্ঠ দিয়েছেন সুব্রত মুখার্জি। তিনি বলেছেন 'নমস্কার, বিশ্বের শান্তি হোক।'
পাঠানো হল বৃষ্টির শব্দ, বাতাসের শব্দ, হাসির শব্দ। হেসেছিলেন কার্ল স্যাগান নিজেই। পাঠানো হল পাখির ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। ভয়েজারের সাথে পাঠানো হল ৯০ মিনিট দীর্ঘ গান এবং সুর। এর মধ্যে ছিল সাড়ে তিন মিনিটের একটি ভারতীয় সুরও।
অচেনা স্বজনদের জন্য ছবি পাঠানো হল ১১৬-টি। এর মধ্যে আছে আমাদের ডিএনএ-র ছবি, হাড়ের ছবি, পাখির ছবি, সূর্যোদয়ের ছবি, সূর্যাস্তের ছবি, নারীপুরুষের জননাঙ্গের ছবি, মিলনের ছবি! খাওয়ার ছবি, পান করার ছবি, শিশুকে স্তন পান করানোর ছবি!
যুদ্ধ আর অস্ত্রের ছবি পাঠানোর কথা থাকলেও পরে আর পাঠানো হয়নি।
কার্ল স্যাগান তখন ভয়েজার-১ -এর জন্য 'গোল্ডেন রেকর্ড' তৈরীর কাজে দিনরাত ব্যস্ত এবং ভীষণ উত্তেজিত। একদিন ভোরবেলা তিনি তার সুন্দরী সহকর্মী অ্যান ড্রুয়ানকে ফোন করলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর ফোন রেখে দিলেন।
ফোন রাখার পর স্যাগান আবিষ্কার করলেন, তিনি ড্রুয়ানের প্রেমে পড়েছেন! স্যাগান মনের কথা জানালেন ড্রুয়ানকে। ড্রুয়ান জানালেন, তিনিও...।
এরপর কার্ল স্যাগান করলেন আরেক ছেলেমানুষী কাজ। তিনি তাঁর প্রেমিকাকে এক ঘন্টা চুপচাপ শুয়ে থেকে পৃথিবীর কথা, মানব সভ্যতার কথা এবং স্যাগানের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা ভাবতে বললেন।
বেচারী ড্রুয়ান এক ঘন্টা চোখ বন্ধ করে এসব ভাবলেন। এই সময় তাঁর ব্রেইনওয়েভ রেকর্ড করা হল। এই ব্রেইনওয়েভও জুড়ে দেওয়া হল ভয়েজার ওয়ানের সাথে!
ভয়েজার ওয়ান ৪৪ বছর থেকে ছুটছে। যাত্রার ১৩ বছর পর ভয়েজার-১ তখন পৃথিবী থেকে ৬ বিলিওন কিলোমিটার দূরে। আমাদের সৌরজগতকে যখন বিদায় জানাচ্ছে এই স্পেসক্রাফট, তখন কার্ল স্যাগান তাঁর শেষ পাগলামীটা করলেন। নাসার বিজ্ঞানীদের তিনি অনুরোধ করলেন এত দূরত্ব থেকে ভয়েজার-১ পৃথিবী নামক গ্রহের একটা ছবি তুলে পাঠাক।
অনেক বিজ্ঞানীদের আপত্তি ছিল। তাঁরা বলেছিলেন ভয়েজারের ক্যামেরা পৃথিবীর দিকে ঘুরালে সূর্যের আলোতে সেটার ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু স্যাগানের অনুরোধে শেষবারের মতো পৃথিবীর ছবি তুলেছিল ভয়েজার-১। একটা বিন্দুর চেয়েও ছোট দেখাচ্ছিল আমাদের প্রিয় পৃথিবীকে!
কার্ল সেগান এই ছবিটির নাম দেন, “দ্যা পেল ব্লু ডট”। এই
ছবিটা তাঁকে এত বেশি ভাবায়, যে তিনি একটি সম্পূর্ণ বই লিখে ফেলেন, নামঃ পেল ব্লু ডট
- এ ভিশন অফ দ্য হিউম্যান ফিউচার ইন স্পেস। বিষয়বস্তু, মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের
এই গ্রহের বাসিন্দারা খুবই নগণ্য; আমরা নিজেদের যতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবি আসলে আমরা
কিছুই না, এই মহাবিশ্বে আমরা বড় একা।
কার্ল স্যাগান মারা গেছেন ১৯৯৬ সালে। ভয়েজার -১ আমাদের সৌরজগতকে চির বিদায় বলেছে ১৯৯০ সালেই। হেলিওশিথকে বিদায় বলেছে ২০১২ সালে। ভয়েজার-১ এখন আছে ইন্টারস্টেলার স্পেসে। নিঃসীম শীতল অন্ধকারে ঘন্টায় ৬২ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে ভয়েজার-১।
বিকল্প কোনো শক্তির উৎস না পেলে ২০২৫ সাল নাগাদ ভয়জারের ইলেকট্রিক পাওয়ার সাপ্লাই ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তাই নাসা ধীরে ধীরে এর অব্যবহৃত যন্ত্র গুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। কিন্তু এর অ্যান্টেনাগুলো এতই অত্যাধুনিক কৌশলে তৈরি যে তারও একশো বা দুশো বছর পর পর্যন্ত সেটা পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে। এরপর বিজ্ঞানীরা ভয়েজারকে অনন্ত ঘুমে পাঠিয়ে দেবে, যাকে বলে ইন্টারনাল স্লিপ। সম্ভবত ২০২৫ সালের পর ভয়েজারের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ থাকবে না। কিন্তু ভয়েজার ছুটে চলতে থাকবে অসীমের পানে। গ্রহান্তরে। তার বুকে বয়ে বেড়াবে সুবিশাল এই মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র গ্রহ পৃথিবীর শুভেচ্ছা সংগীত, অনুভূতি আর ৫৫ টি ভাষা।
আর কয়েকটা বছর মাত্র। তারপর কোথায় যাবে ভয়েজার-১, কোথায় থাকবে আমাদের প্রিয় গ্রহের কয়েক কিলোবাইট স্মৃতি আমরা জানতে পারবো না কোনও দিনও!
গত মাসের ৫ তারিখ, ভয়েজার-১ তার মিশনের ৪৪ বছর পূর্ণ করেছে। নাসা তাঁদের ওয়েব সাইটে ১৪ বিলিওন মাইল দূরের বন্ধুর স্মরণে পোস্টার প্রকাশ করে লিখেছে:
ভালো থেকো ভয়েজার-১
তোমার জন্য ভালোবাসা ...
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)
Khubi bhalo Laglo. Onek bisoe jante parlem.
উত্তরমুছুন