মাদার তেরেসা – সন্ত না অন্যকিছু?

মাদার তেরেসা সম্পর্কে বেশির ভাগ মানুষ যা জানেন, বা বলেন তার বেশীরভাগটাই সেটা, যেটা তাদের (জনগণ) জানানো হয় বা হয়েছে। ভেড়ার পালের মতো যেদিকে সব মানুষ যায়, সেদিকে যায় বা যাওয়ার আগে প্রশ্ন করে না,জানতে চায় না কেনো যাবো, এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। পত্র-পত্রিকা তেরেসাকে ভালো বলছে, রেডিও টেলিভিশন ভালো বলছে, প্রতিবেশীরা ভালো বলছে, বিখ্যাতলোক ভালো বলছে, চেনা পরিচিতরা ভালো বলছে, সুতরাং তিনি ভালো--- এই যুক্তি মানা লোকের সংখ্যাই বেশি; কিন্তু সবাই না।

Home for Dying Destitute
মাদার তেরেসা যাকে লোকে সন্ত বলে জানে, মহামানবী বলে জানে, তিনি যে আদপে এক ধর্মান্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন মহিলা, সেটা মানতে অন্তত কারো অসুবিধে থাকার কথা নয়। মানুষের যত সেবা তিনি করেছেন, সবই করেছেন নিজের জন্য, নিজের পরলোকগত ভাবনার থেকে করেছেন, মানুষের জন্য নয়। নিজের পূণ্য হবে বলে করেছেন। স্বর্গে ঠাঁই পাওয়ার জন্য করেছেন। মরণাপন্ন রোগীদের রাস্তা থেকে তুলে এনে আশ্রমে বিছানা দিতেন মরার জন্য। জল চাইলে জল দিতেন ঠিকই কিন্তু ওষুধ চাইলে ওষুধ দিতেন না; কথাটা যাচাই করে দেখবেন। বাঁচতে চাইলে বাঁচতে দিতেন না। তিনি মনে করতেন বাঁচানো তার কাজ না।

তার কাজ ছিল মৃত্যুর সময় রোগীদের বলা, প্রভু যীশু তোমাকে কষ্ট দিচ্ছেন, এই কষ্ট সহ্য করার মধ্যে দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ প্রভু যীশুর কষ্টের সাথে একাত্বতা অনুভব করবে, খুশি হবেন প্রভু যীশু, দেবেন আশীর্বাদ।

একবার এক প্রেস কনফারেন্সে নিজেই বলেছেন, উনত্রিশ হাজার রোগীকে জিজ্ঞেস করেছেন তারা যীশুর আশীর্বাদ চায় কী না, কেউ অস্বীকার করেনি। তিনি মুমূর্ষু রোগীদের খ্রিস্টান বানিয়েছেন। মিশনারির কাজই এই। মিশনারির এই কাজ করতেই তিনি ভারতে এসেছিলেন। হিন্দু বৌদ্ধ শিখ মুসলমান-- যাকেই অসহায়, দুর্বল, রুগ্ন পান, তাকেই সেবা করার সুযোগে ধর্মান্তরিত করবেন। তার প্রভুকে তৃপ্ত করবেন। এই কাজে তেরেসা নিঃসন্দেহে সফল।

১৯৯৪ সালে, ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেটের তৎকালীন সম্পাদক রবিন ফক্স, কলকাতায় অবস্থিত “Home for Dying Destitute” পরিদর্শন করেন এবং সেখানকার রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে "এলোমেলো" বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, যে সিস্টারেরা এবং স্বেচ্ছাসেবকরা, যাদের মধ্যে কারো কারো চিকিৎসা জ্ঞান ছিল না, তারা প্রায়শই হাসপাতালে ডাক্তারের অভাবের কারণে রোগীর চিকিৎসা বিষয়ে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতেন যা আদপে ভালোর থেকে ক্ষতি-ই করত রুগীর। ভুলে গেলে কিন্তু চলবে না, মাদার যে পরিমাণ অর্থ দান হিসেবে সংগ্রহ করেছিলেন তার পরিমাণ অকল্পনীয়।

মেরি লাউডন, যিনি এই হোমেই স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন, তিনি জানিয়েছেন। "সিরিঞ্জগুলি ঠান্ডা জলের নীচে ধুয়ে পুনরায় ব্যবহার করা হ, যাদের টার্মিনাল ক্যান্সার রয়েছে তাদের অ্যাসপিরিন দেওয়া হত এবং সবাইকে ঠান্ডা স্নান দেওয়া হত।

অনেকেই ভারতের বাইরে এবং ভিতরে মাদারের কর্মভূমি কলকাতাকে চিনেছেন মাদারের চেনানোর মধ্যে দিয়ে৷ কেমন সেই চেনা? কলকাতাকে মাদার টেরেসা কুষ্ঠরোগী, দরিদ্র আর পথশিশুর শহর হিসেবেই চিহ্নিত করে গিয়েছেন। এই ভাবনার সাথে কি আপনি একমত? সত্যি-ই কি দ্যা সিটি অফ জয়কলকাতা বলতে এটা? কলকাতার কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বলে কিছু নেই? কলকাতায় দারিদ্র আছে বটে, কলকাতায় কবি সাহিত্যিকও আছেন, কলকাতা নোবেল পুরস্কার পাওয়া রবীন্দ্রনাথের শহর। কলকাতায় উন্নত মানের নাটক সিনেমা হয়, নৃত্য সঙ্গীত হয়। কলকাতায় বড় বড় বিজ্ঞানীদের বাস।

তেরেসা গরিবের বন্ধু ছিলেন না কখনও, বরং গরিবকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন নিজের স্বার্থে। কলকাতার দারিদ্র দূর করার কোনও উদ্দেশ্য তার কখনও ছিল না; একটাও এমন কাজের উদাহরণ দিতে পারেন, যেটা দিয়ে প্রমাণ করা যাবে যে কলকাতার ফুটপাতবাসী মানুষের দুঃখ, কষ্ট দূর করতে, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে তিনি ভূমিকা নিয়েছেন? দুর্নীতিবাজ আর পাঁড় ক্রিমিনালদের কাছ থেকে, চোর ডাকাত কাউকে বাদ দেননি, সবার কাছ থেকেই টাকা নিয়েছেন। বদমাশগুলোকে সমাজের চোখে মহৎ মানুষ বানিয়েছেন। কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করেছেন, ওই টাকা দিয়ে দেশে দেশে নিজের নামে মিশনারি ছাড়া আর কিছু বানাননি।

কলকাতায় এমন কিছু গড়ে দেননি, যা থেকে দরিদ্রের দুর্দশা ঘুচতে পারে। ভালো একটি হাসপাতালও বানাননি, যে হাসপাতালে দরিদ্র রোগীরা আধুনিক চিকিৎসা পেতে পারে, স্বল্প মূল্যে। নিজে কোনও রোগীর রোগ সারাবার ব্যবস্থা করেননি। কিন্তু তার যখন অসুখ হলো, বিদেশের বড় বড় হাসপাতালে নিজের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন।

এসবকে তো আমরা হিপোক্রেসিই বলি, তাই না?

কলকাতার গরিব ছেলেমেয়েদের বিদেশে দত্তক দিতেন টাকার বিনিময়ে; এটা কিন্তু প্রমাণিত সত্য, একটু খোলা চোখে খোঁজ নিলেই জানবেন।

সনাতন পাওয়েল বেলজিয়াম থেকে কলকাতায় নিজের শেকড় খুঁজতে এসে বলেছেন, বেলজিয়ামে যে দম্পতি তাকে দত্তক নিয়েছিলেন, তাদের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখেছেন, তাদের কাছ থেকে তেরেসার শিশু সদন লাখ টাকার ওপর নিয়েছে। কোনও শিশুকে দত্তক দেওয়ার অধিকার কোনও চ্যারিটি সংস্থার নেই। মাদার তেরেসা সেবা কেন্দ্ররও নেই। এটা স্রেফ শিশুপাচার। সনাতনের বাবা-মা বেঁচে থাকারও পরও সনাতনকে অনাথ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, দত্তক দেওয়ার সময় সনাতনের বাবা মার কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি।

১০০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশে থাকতেন তেরেসা, গর্ভপাত আর জন্মনিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। গণধর্ষণের কারণে মেয়েরা গর্ভবতী হলেও তিনি গর্ভ রক্ষা করার উপদেশ দিতেন। তিনি নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিলেন। নারীর নিজের শরীরের ওপর নিজের কোনও অধিকার আছে বলে তিনি মানতেন না। মানবাধিকারেরও বিরোধী ছিলেন।

তেরেসা সম্পর্কে সত্যিটা মানুষকে জানানো বিপদ অনেক। কারণ স্রোতটাই তেরেসার পক্ষে। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে শিরদাঁড়ায় জোর থাকতে হয়, সেটি হাতে গোনা কজনেরই আছে। সেরকমই একজন হলেন, ভারতীয় লেখক এবং চিকিত্সক ডাঃ অরূপ চ্যাটার্জি, যিনি মাদার তেরেসার হোমে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কাজ করেছিলেন। ডাঃ চ্যাটার্জি, তেরেসা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত সেবাকেন্দ্র, নির্মল হৃদয়-এর আর্থিক দিকগুলি বিশেষভাবে খতিয়ে দেখে অনেক অনেক অসঙ্গতি সামনে আনেন।

১৯৯৪ সালে, দুই ব্রিটিশ সাংবাদিক, ক্রিস্টোফার হিচেনস এবং তারিক আলী, ডাঃ চ্যাটার্জির কাজের উপর ভিত্তি করে একটি সমালোচনামূলক ডকুমেন্টারি, “হেলস অ্যাঞ্জেলতৈরি করেন এবং ব্রিটিশ চ্যানেল ফোর-এ সেটি সম্প্রচারিতও হয়। পরের বছর, হিচেনস, “দ্য মিশনারি পজিশন: মাদার তেরেসা ইন থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিসপ্রকাশ করেন, যাতে ডকুমেন্টারিতে তোলা অভিযোগের পাশাপাশি তেরেসা সম্বন্ধীয় অরো প্রাসঙ্গিক বিষয়ের উপরে আলোকপাত করেন।

ক্রিস্টোফার হিচেনসের লিখেছেন, মাদার তেরেসা তার হোমের সদস্যদেরকে ব্যক্তিগত ধর্ম বিবেচনা না করে গোপনে মৃত রোগীদের ব্যাপটাইজ করতে উৎসাহিত করতেন। সুসান শিল্ডস, মিশনারিজ অফ চ্যারিটির প্রাক্তন সদস্য, লিখেছেন যে "মিশনারিজ অফ চ্যারিটির সিস্টারেরা মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করত, যে সে 'স্বর্গের টিকিট' চায় কিনা; তার ইতিবাচক উত্তর ছিল ব্যাপটাইজ করতে সম্মতি দেওয়া।

মাদার তেরেসা আর তার মিশনারিজ অফ চ্যারিটি সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী হলে নিজেরাই খুঁজে খুঁজে পড়ুন, খোলা মনে আর দায়িত্ব নিয়ে সত্যকে ছড়িয়ে দিন বাকিদের মধ্যে। অরূপ চট্টোপাধ্যায় লিখিত মাদার টেরেসা: মুখোশের আড়ালেবইটি সংগ্রহ করতে পারেন আরো বিস্তারিত জানতে।

(তারিণী খুড়ো)

1 মন্তব্যসমূহ

  1. সাধারণ মানুষ ( অধিকাংশ )ভেড়া,নিজের মস্তিস্ক অব্যবহারে, সবটাই গেছে, আর বই পড়া, কাহারে কয়!

    উত্তরমুছুন
নবীনতর পূর্বতন